|
সঙ্ঘের পথ, মমতার মতচন্দন দাস |
|
ধর্ম এবং ইতিহাসের সম্পর্ক আছে? বেদ, পুরাণ কি ইতিহাস? আরএসএস তাই মনে করে। আর মনে করেন মমতা ব্যানার্জি। কোনও খবরের কাগজের কাটিং নয়, ঐতিহাসিক বিধানসভার ছাপার অক্ষরে প্রকাশিত কার্যবিবরণী রয়েছে প্রমাণ হিসাবে। দিনটি ছিল ২০ জুন, ২০২২। বিধানসভায় তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী, বর্তমানে দুর্নীতির দায়ে জেলবন্দী পার্থ চ্যাটার্জি একটি দৃষ্টি আকর্ষণী বক্তব্য পেশ করেন। সেই প্রসঙ্গে ভাষণ দেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। বেলা সাড়ে ১২টা থেকে পৌনে ২টো পর্যন্ত। এক দীর্ঘ ভাষণ। সেখানেই তাঁর মুখ থেকে শোনা যায়, ‘ধর্ম নিয়ে যদি কেউ পুরাণ, বেদ-বেদান্ত, তপোবন থেকে শুরু করে শৃণ্বন্তু বিশ্বে অমৃতস্য পুত্রা এই সব নিয়ে কথা বলেন আমি তাকে স্যালুট জানাব। কারণ এগুলি ধর্ম নয়, এগুলি ইতিহাস। ধর্মের সাথে ইতিহাসের একটা যোগাযোগ থাকে। আমাদের ভারতবর্ষের ইতিহাস তিনটি ভাগে বিভক্ত। একটা অতীত, একটা মধ্যযুগীয় এবং আর একটা বর্তমান।’ (Assembly Procceedings, official report, June session, 2022, from 10th June to 24th June, 2022)। মমতা ব্যানার্জির ইতিহাস জ্ঞান নিশ্চিতভাবেই এখানে আলোচনার বিষয় নয়। কিন্তু পুরাণ, বেদের মত গ্রন্থ পৌরাণিক কাহিনী, ইতিহাস নয়। সঙ্ঘ এসবকে ইতিহাস বলে চালানোর চেষ্টা করে। আর ধর্মনিরপেক্ষ, প্রগতিশীল ঐতিহাসিকরা বারবার প্রমাণ করেছেন যে, সঙ্ঘের বক্তব্য ভুল এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। ভারতকে হিন্দুরাষ্ট্রে পরিণত করার চক্রান্তের অন্যতম অংশ এই মিথ্যা ইতিহাস নির্মাণ। সঙ্ঘের সেই বিপজ্জনক বক্তব্যই খাস বিধানসভায় প্রচার করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। শুধু বিধানসভাতেই নয়। ২০২২-র ১৫ আগস্ট রেড রোডে, স্বাধীনতা দিবসের কুচকাওয়াজে ‘দুর্গা’কে হাজির করেছিল তৃণমূলের সরকার। স্বাধীনতার ৭৫ বছর পূর্তির সেই সময়ে কমিউনিস্ট-সহ গণতান্ত্রিক শক্তিগুলি ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ তুলে ধরার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল। অন্যদিকে বিজেপি, সঙ্ঘ পরিবার দেশজুড়ে প্রচার চালাচ্ছিল সাভারকারের মত হিন্দুত্ববাদীদের স্বাধীনতা সম্পর্কে ধারণা। সেই সময় স্বাধীনতা দিবসের কুচকাওয়াজে মমতা ব্যানার্জির সরকারের কুচকাওয়াজের থিম ছিল– ‘বাংলার গর্ব দুর্গা মা।’ কুচকাওয়াজে শামিল করা হয় দুর্গাপুজোর ট্যাবলো। একইসঙ্গে ট্যাবলো প্রদর্শনের সময় মুখ্যমন্ত্রীর কণ্ঠে শোনা যায় স্তোত্রপাঠও। শুধু দুর্গার মূর্তিটি জন্য সরকার খরচ করেছিল ১৬ লক্ষ ১ হাজার টাকা। দুর্গার মতো দেবদেবীর স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রভাব, তার ফলাফল নিয়ে আলোচনা এক ভিন্ন প্রসঙ্গ। শুধু সতীশ পাকড়াশির উপলব্ধি উল্লেখ করা দরকার। আন্দামানের সেলুলার জেলে বন্দি থাকাকালীন কমিউনিস্ট আন্দোলনে সম্পৃক্ত হন তিনি। সশস্ত্র সংগ্রামী হিসাবে স্বাধীনতার জন্য লড়াইয়ের দিনগুলি সম্পর্কে অগ্নিদিনের কথায় পাকড়াশি বলেছেন, ‘তখন আমরা কোনো অ্যাকশান বা আক্রমণ করতে যাওয়ার আগে দেবীর আশীর্বাদ স্বরূপ নির্মাল্য নিয়ে যেতাম। কালী প্রতিমার সামনে দাঁড়িয়ে দেশ-সেবায় আত্ম-নিয়োগ করার শপথও গ্রহণ করা হ’ত। ...মুসলমানদের দলে নেওয়া সম্বন্ধে কারুর কোনো উৎসাহ ছিল না এবং একটা অবিশ্বাসের ভাবই বিদ্যমান ছিল।’ আর? কমরেড সতীশ পাকড়াশির কথায়, ‘প্রথমটায় আমরা স্বদেশী দলের উদ্দেশ্য সম্বন্ধে মধ্যযুগীয় চিন্তাধারাই পেয়েছিলাম। ভারতের গৌরবময় অতীতের সনাতন সভ্যতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করাই ছিল আমাদের লক্ষ্য। রাম-রাজ্য স্থাপনের পটভূমিকায় ছিল আমাদের লক্ষ্য পথের সাধনা।’ হিন্দুত্ববাদী সেই ‘রাম-রাজ্য’ স্থাপনের প্রচারকে কুঠারের মতো ব্যবহার করে নির্বাচনে নেমেছে বিজেপি। সঙ্ঘ তার পরিচালক। অযোধ্যায় রাম লালার মন্দির নির্মাণ তার প্রেক্ষাপট। ধর্মীয় বিভাজন তার কৌশল। আর সেই পথকে মসৃণ করার ‘দায়িত্ব’ পালন করেছেন মমতা ব্যানার্জি। ২০০৪-র ৮ এপ্রিল নয়াদিল্লিতে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ-র লোকসভা নির্বাচনের ইশ্তেহার প্রকাশিত হয়। নাম ছিল ‘ভিশন ডকুমেন্ট’। প্রকাশ করেছিলেন অটল বিহারী বাজপেয়ী। মঞ্চে হাজির ছিলেন এনডিএ-র তৎকালীন এগারো শরিক দলের মাত্র পাঁচটি দলের প্রতিনিধি। আর তার মধ্যে একজন ছিলেন মমতা ব্যানার্জি। সেদিন ইশ্তেহার প্রকাশিত হওয়ার আগে সম্মতি জানিয়ে সই করেছিলেন তিনি। ইশ্তেহারে ‘রামমন্দির নির্মাণকে লক্ষ্য হিসাবে ঘোষণা করা হলো জাতীয় ইস্যু। একে উপেক্ষা করা যায় না।’ মমতা ব্যানার্জি সেই মনোভাবের শরিক। সঙ্ঘ-বিজেপি’র মন্দির রাজনীতির বিরুদ্ধে মানুষের রুটি, জীবিকা, কাজের সঙ্কটের প্রসঙ্গই তুলে ধরেছেন বামপন্থীরা। তৃণমূল কী করেছে? মমতা ব্যানার্জির ‘অনুপ্রেরণায়’ তাঁর দলবল নিজেদের ‘বড়ো হিন্দু’ প্রমাণ করার প্রতিযোগিতায় নেমেছে। লাভ হয়েছে আরএসএসের। আগ্রাসী হিন্দুত্ববাদের। এবার, আগামী ১৭ এপ্রিল রামনবমীর দিন ছুটি ঘোষণা করেছেন মমতা ব্যানার্জি। শিবরাত্রীতে ইতিমধ্যেই ছুটি চালু করেছেন তিনি। তার শাসনে তৃণমূলের নেতারা হাতে খাপ খোলা তলোয়ার নিয়ে রামনবমীর মিছিল করেছেন। বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, বজরং দলের সঙ্গে তৃণমূলের নেতা, মন্ত্রীরা পাল্লা দিয়ে হনুমান জয়ন্তী পালন করেছেন। সরকারি টাকায় জগন্নাথ মন্দির হচ্ছে দীঘায়। ইসকনকে বিপুল জমি দেওয়া হয়েছে নদীয়ায়। গত ১১ জানুয়ারি মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি নবান্নে সগর্বে জানিয়েছেন, ‘আমরাও মন্দিরের অনেক কাজ করেছি। ৭০০ কোটি টাকার উপর সরকারের পক্ষ থেকে মন্দিরের জন্য বিভিন্নভাবে খরচ করেছি। গঙ্গাসাগরের মেলার জন্য আলাদা করে এবছর ২৫০ কোটি টাকা খরচ করছি।’ মন্দিরের পালটা মন্দির। সরকারি অনুপ্রেরণায় হিন্দুত্বর পোয়াবারো। বারণসীর মডেলে কলকাতায় গঙ্গা আরতি চালু– মমতা ব্যানার্জির নির্দেশে। সাগর দ্বীপে সরকারি টাকায় শিবলিঙ্গ বানানো– মমতা ব্যানার্জির ইচ্ছায়। সরকারি টাকায় ‘সতীর মাহাত্ম্য’ প্রচার– মমতা ব্যানার্জির সিদ্ধান্ত। সমাজে ধর্মীয় বিভাজনের অনুঘটক হয়েছে সরকার। ফলে এই সময়কালে যা ভুলে গিয়েছিল পশ্চিমবঙ্গ সেই সাম্প্রদায়িক হানাহানি দেখা গিয়েছে মমতা ব্যানার্জির শাসনে। ছোট বড় ৫২টি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছে রাজ্যে গত বারো বছরে। বসিরহাট, আসানসোল, রানীগঞ্জ, ধুলাগড়, পুরুলিয়া, কাঁকিনাড়ার ঘটনা তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য। প্রাণহানিও হয়েছে অনেক। প্রতিটি ঘটনায় হিন্দুত্ববাদীদের পাশাপাশি তৃণমূলের কর্মীদের একাংশকে এই হানাহানিতে কোনও না কোনও পক্ষের হয়ে হিংসাত্মক হতে দেখা গিয়েছে। হুগলীর ত্রিবেণীকে কেন্দ্র করে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টির চেষ্টা করেছে সঙ্ঘ পরিবার। সেক্ষেত্রে তৃণমূলকে দেখা গিয়েছে তাদের সহায়ক হিসাবে। যেমন ত্রিবেণীতে কুম্ভমেলা আয়োজনে সঙ্ঘ পরিবারকে সহায়তা করেছে তৃণমূল পরিচালিত পৌরসভা। সরকার পরিচালনায় ধর্ম অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত, এই ধারণা আরএসএসের। মমতা ব্যানার্জি সেই ধারণারই প্রসার ঘটিয়েছেন রাজ্যে। প্রসঙ্গ: অনুপ্রবেশ রাজ্যে বাংলাদেশ, বার্মা থেকে অনুপ্রবেশ এখন বিজেপি-র অন্যতম অ্যাজেন্ডা। মূলত সংখ্যালঘু মুসলমানদের বিরুদ্ধে সংখ্যাগরিষ্ট হিন্দুকে উত্তেজিত করার জন্য এই লাগাতার প্রচার। জাতীয় রাজনীতিতে এই ইস্যু বিজেপি-র সঙ্গে তুলে ধরেছেন কে? মমতা ব্যানার্জি। সংসদে ‘অনুপ্রবেশ’ নিয়ে মুলতুবি প্রস্তাবের উপর আলোচনা করেছিলেন লালকৃষ্ণ আদবানী। বারবার আসাম এবং পশ্চিমবঙ্গে বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশ নিয়ে বলেছিলেন। সিপিআই(এম)-র পক্ষ থেকে আলোচনা করেছিলেন কমরেড বাসুদেব আচারিয়া। দিনটি ছিল ২০০৫-র ২ আগস্ট। সেদিন তৃণমূল নেত্রী সংসদে ছিলেন না। ৪ আগস্ট হাজির হয়ে তিনি সেই ইস্যুতে আলোচনা করতে চান। লোকসভার অধ্যক্ষ তখন সোমনাথ চ্যাটার্জি। তবে সেদিন দায়িত্ব সামলাচ্ছিলেন উপাধ্যক্ষ চরণজিৎ অটওয়াল। আগের অ্যাজেন্ডায় সেদিন তিনি মমতা ব্যানার্জিকে আলোচনার অনুমতি দেননি। ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে মমতা ব্যানার্জি কাগজের তাড়া ছুঁড়ে মারেন উপাধ্যক্ষকে। ‘পশ্চিমবঙ্গে অনুপ্রবেশ’ ইস্যুকে তিনি নিজস্ব স্টাইলে সেই ভাবেই প্রচারে এনেছিলেন। সেদিন অনেক দলই তাঁর সেই আচরণের নিন্দা করেছিল। বিজেপি করেনি। তাঁর দাবি ছিল, পশ্চিমবঙ্গে অনুপ্রবেশ হচ্ছে। আর সিপিআই(এম) অনুপ্রবেশে মদত দেয়। এবং অনুপ্রবেশকারীদের নাম ভোটার তালিকায় তুলে দেয়। শুধু সংসদেই নয়। পশ্চিমবঙ্গে অনুপ্রবেশ হয়, এই বক্তব্য মমতা ব্যানার্জি রাষ্ট্রপতি, নির্বাচন কমিশনকেও জানিয়েছিলেন। আর ‘বাংলাদেশী’দের ভুয়ো রেশন কার্ড, ভোটার কার্ড ধরার দায়িত্ব সেই সময়ে কাকে দিয়েছিলেন মমতা ব্যানার্জি? তাঁর স্নেহের জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক ওরফে বালুকে। বালু এখন রেশন দুর্নীতির অভিযোগে জেলে। সঙ্ঘ-বিজেপি সেই ইস্যু নিয়ে ‘হিন্দু জাগরণে’ উন্মত্ত। ধর্মতলায় অমিত শাহ গত নভেম্বরে বলে গিয়েছেন, ‘ঘুষপেটিয়া বন্ধ করা হবে আমাদের লক্ষ্য।’ মমতা ব্যানার্জি চুপ। প্রসঙ্গ: এনআরসি, সিএএ ‘ঘুষপেটিয়া’র সূত্র ধরেই সিএএ, এনআরসি। জাতীয় নাগরিকপঞ্জীর প্রাথমিক কাজ অটলবিহারী বাজপেয়ীর প্রধানমন্ত্রিত্বের সময়েই শুরু হয়েছিল। আর সেই মন্ত্রীসভায় মন্ত্রী ছিলেন মমতা ব্যানার্জি। ২০০০-র আগস্টে বামফ্রন্টের সাংসদ অবনী রায় রাজ্যসভায় নাগরিকত্ব নিয়ে একটি প্রশ্ন করেন। জবাবে কেন্দ্রীয় সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের তৎকালীন রাষ্ট্রমন্ত্রী বিদ্যাসাগর রাও জানান, ‘সব নাগরিকের বাধ্যতামূলক পঞ্জীকরণ এবং নাগরিকত্ব প্রমাণের একটি আইডেন্টিটি কার্ডের প্রস্তাব কেন্দ্রীয় সরকার বিবেচনা করছে।’ সেই সময়ে সরকার বিজেপি-র। প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ী। রেলমন্ত্রীর নাম মমতা ব্যানার্জি। তারপর ২০০৩। নাগরিকত্ব আইনের সংশোধন করে এনডিএ সরকার। যুক্ত করা হয় ‘১৪-এ’ ধারা। ওই ধারা অনুসারে কেন্দ্রীয় সরকার প্রয়োজন মনে করলে প্রত্যেক ভারতবাসীর নাম নথিভুক্ত ও একইসঙ্গে প্রতিটি নাগরিকের জন্য ‘ন্যাশনাল আইডেনটিটি কার্ড’ ইস্যু বাধ্যতামূলক করতে পারে। ২০০৩-র সেই সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনে আরও বলে দেওয়া হয়েছে, ন্যাশনাল রেজিস্ট্রার অথরিটি তৈরি করে কেন্দ্রীয় সরকার প্রয়োজন মনে করলে প্রত্যেক দেশবাসীর জন্য জাতীয় নাগরিকপঞ্জি তৈরি করতে পারে। জাতীয় নাগরিকপঞ্জী (এনআরসি)-র ভিত্তি হলো সেই সংশোধনী। সেই ভিত্তি তৈরি হয়েছিল অটলবিহারী বাজপেয়ীর প্রধানমন্ত্রিত্বের সময়ে। সেই মন্ত্রিসভায় ছিলেন মমতা ব্যানার্জি। ২০০১-এ এনডিএ থেকে বেরিয়ে ফের ২০০৩-এ যোগ দেন বিজেপি-র সঙ্গে। প্রথমে দপ্তরবিহীন মন্ত্রী, তারপর কয়লামন্ত্রী হয়েছিলেন তিনি। তাঁর সমর্থনের ভিত্তিতে ওই সংক্রান্ত বিল পাশ হয়। তা আইনেও পরিণত হয়। সেই আইন অনুসারে রুল (বিধি)-ও তৈরি হয় সেই সময়কালে। তার নাম ‘দি সিটিজেনশিপ (রেজিস্ট্রেশান অব সিটিজেন অ্যান্ড ইস্যু অব ন্যাশানাল আইডেন্টিটি কার্ড) রুলস-২০০৩।’ সেই রুল কিংবা বিধির ৩নং ধারার শিরোনাম হলো– ‘ন্যাশনাল রেজিস্ট্রার অব ইন্ডিয়ান সিটিজেনস।’ সেই ৩নং ধারার ৪টি উপধারা। ৪নং উপধারায় বলা হয়– ‘কেন্দ্রীয় সরকার, এই সংক্রান্ত কোনও নির্দেশ জারি করে, একটি সময়সীমা নির্দ্ধারণ করে, যারা লোকাল রেজিস্ট্রারের এলাকার মধ্যে থাকেন, সেই সব ব্যক্তিদের পপুলেশন রেজিস্ট্রার তৈরি করতে পারে।’ অর্থাৎ ধর্মের নামে বিভাজন, কারো কারো নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার মত পদক্ষেপ অটলবিহারী বাজপেয়ীর সময় শুরু। মমতা ব্যানার্জির সেই সিদ্ধান্তগুলির দোসর ছিলেন। ২০১৯-র অক্টোবর থেকে জেলাগুলিতে সার্কুলার পাঠিয়ে সেই এনপিআর-র জন্য আধিকারিকদের প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছিল তৃণমূল সরকার। কিন্তু সেই প্রক্রিয়া গোপন থাকেনি। সিপিআই(এম) এনপিআর সম্পর্কে রাজ্যবাসীকে সতর্ক থাকার প্রচারও শুরু করে। মমতা ব্যানার্জি সরকারের ডিটেনশন ক্যাম্প বানানোর জমি চিহ্নিত করার চক্রান্তও সিপিআই(এম) প্রকাশ করে। ২০১৯-র ১৬ ডিসেম্বর রাজ্যের স্বরাষ্ট্র দপ্তর সূত্রে জানানো হয়, ডিটেনশন ক্যাম্পের জন্য কোনও জমি রাজ্যে নেওয়া হবে না। সেই কথা ঘোষণা করতে হয়েছিল কারণ কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশিকা অনুসারে রাজ্যে বনগাঁ ও নিউটাউনে দু’টি ডিটেনশনের ক্যাম্পের জন্য জমি চিহ্নিত করেছিল রাজ্য সরকার। এর তীব্র বিরোধিতা করে সিপিআই(এম)। পার্টির তৎকালীন রাজ্য সম্পাদক সূর্য মিশ্র জানিয়ে দিয়েছিলেন, ‘সরকারের চিহ্নিত করা জমি আমরা দখল করে নেব। একটি ইঁটও পড়তে দেব না ওই জমিতে।’ সেদিনও প্রমাণ হয়েছিল, তৃণমূল নিঃশব্দে সঙ্ঘের এজেন্ট হিসাবে কাজ করছিল। চালাকির মোক্ষম দৃষ্টান্ত মমতা ব্যানার্জি। এনআরসি অথবা সিএএ– এর সঙ্গে ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের ধারনার মৌলিক বিরোধ আছে। নাগরিকত্বের মত মানবাধিকারের সঙ্গে সরাসরি ধর্মকে মিশিয়ে দেওয়ার চেষ্টা ওই দুটি পদক্ষেপ। কিন্তু রাষ্ট্রের কার্যাবলীর সঙ্গে ধর্মকে মিশিয়ে দেওয়ার এই চেষ্টা সরকারে থেকে বিজেপি বরাবর চেষ্টা করে এসেছে। আর সেই সব চক্রান্তের সময়ে মমতা ব্যানার্জির অবস্থানই প্রমাণ করে তাঁর অবস্থান। তিনি ধর্ম, রাজনীতি সম্পর্কে সঙ্ঘের ধারণার অনুসারী। তাঁর দল আরএসএস-র এজেন্ট। প্রকাশের তারিখ: ২২-মার্চ-২০২৪ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |