|
সতীশ পাকড়াশীর 'অগ্নিযুগ'কাকলী মুখার্জি |
যুগান্তর দলের চল্লিশ জন বিপ্লবী অরবিন্দ ঘোষের মানিকতলার বাগানবাড়ি থেকে বোমা, ডিনামাইট, বন্দুক, কার্তুজ, রিভলবার ও গোপনীয় কাগজপত্র সহ পুলিশের কাছে ধরা পড়েন। এই ঘটনা আলিপুর ষড়যন্ত্র মামলা নামে স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে পরিচিত। এই মামলার থেকেও যে বিষয়টি এই সময় আলোড়ন তুলেছিল তা হল, এই মামলার রাজসাক্ষী নরেন গোঁসাইয়ের হত্যা। দুই বিপ্লবী কানাই লাল দত্ত ও সত্যেন বসু গোপনে বাইরে থেকে পিস্তল আনিয়ে এই হত্যা সংঘটিত করেন। |
সতীশ পাকড়াশী ১৮৯৯ সালের ১৩ ডিসেম্বর অবিভক্ত বাংলার ঢাকা জেলার মাধবদী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯০৫-০৬ সালের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময় তিনি কিশোর ছাত্ররূপে প্রথম স্বদেশী রাজনীতির সাথে যুক্ত হন। এই সময় থেকে তিনি কীভাবে ধীরে প্রথমে জাতীয়তাবাদী বিপ্লবী আন্দোলন থেকে সমাজতান্ত্রিক রাজনীতি ও সাম্যবাদের প্রতি আকৃষ্ট হলেন এবং স্বাধীনতার পরেও সেই বিশ্বাসেই অটল রইলেন এই গ্রন্থে তা আলোচিত হয়েছে। এই গ্রন্থকে তিনটি পর্যায়ে ভাগ করা যায়। ১) স্বদেশী থেকে বিপ্লবী আন্দোলন, ২) বিপ্লবী আন্দোলন থেকে সাম্যবাদ ও ৩) সাম্যবাদী মতাদর্শে আস্থাজ্ঞাপন স্বদেশী থেকে বিপ্লবী আন্দোলন এই প্রথম পর্যায়ে লেখক কিভাবে স্বদেশী রাজনীতি থেকে বিপ্লববাদে আকৃষ্ট হলেন তা বর্ণিত হয়েছে। ১৯০৬ সালে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের সর্বত্র সভা, সমিতি, মিছিল, ধর্না, বিদেশি বস্ত্র পোড়ানোর নানা কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছিল। লেখকের মামার বাড়ির গ্রাম যা ঢাকার নরসিংদি গ্রামের সাটীর পাড়ায় অবস্থিত ছিল, সেখানে এই সকল কর্মসূচিতে ছাত্ররূপে লেখক যোগ দেন ও স্বদেশী আন্দোলনের প্রতি তিনি আকৃষ্ট হন। তবে সেই সময় থেকেই তাঁর মধ্যে একটি পর্যবেক্ষণকারী মনন ছিল। তাঁর বিদ্যালয়ে আয়োজিত এই ধরণের এক সভায় তিনি লক্ষ করেন যে হিন্দু–মুসলমান ঐক্যের প্রতীক হিসেবে নেতাদের নির্দেশে যখন রাস্তা থেকে গরিব মুসলমান চাষিদের সমাদরে বসানো হয়, চাষিরা অসোয়াস্তি বোধ করছিলেন। প্রতিদিনের জীবনে যাঁরা ভদ্রলোকেদের থেকে অনাদর আর অসম্মানজনক আচরণে অভ্যস্ত, তাঁদের কাছে এই ব্যবহার স্বাভাবিকভাবেই অস্বাচ্ছন্দ্য সৃষ্টি করেছিল। মনে রাখা প্রয়োজন যে এই আন্দোলনে মূলত যাঁরা নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ও অংশ নিয়েছিলেন তাঁরা ছিলেন জমিদার, তালুকদার, উকিল, ডাক্তার, শিক্ষক, ছাত্র – প্রমুখ ভদ্রলোক শ্রেণির প্রতিনিধি। এই শ্রেণি প্রেক্ষিত থেকেই এই সময় ছাত্র – যুবরা স্বদেশী থেকে বিপ্লবী রাজনীতিতে অংশ নেন। ঢাকায় এই সময় অনুশীলন সমিতির প্রতিষ্ঠাতা ব্যারিস্টার পি মিত্র ছাত্রদের সামনে স্বাধীনতার লড়াইয়ে রাষ্ট্র–বিপ্লবের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। তরুণ ছাত্র–যুবরা এর দ্বারা অনেকেই আলোড়িত হন। ঢাকা অনুশীলন সমিতির অধিনায়ক ও সর্বাধিনায়ক পুলিন দাস এ বিষয়ে বিশেষ উদ্যোগ নেন। সাটীরপাড়া গ্রামেও এই সমিতির শাখা গড়ে ওঠে। এই প্রেক্ষিতে সতীশ পাকড়াশী অনুশীলন সমিতির সভ্য হন। পূর্ণ স্বাধীনতাই ছিল এই বিপ্লবী গোষ্ঠীর লক্ষ্য। এই সমিতির সদস্যদের প্রাথমিক কাজ ছিল লাঠি খেলা, ছুরি খেলা, ড্রিল, কুচকাওয়াজ ইত্যাদির সাথে যুক্ত হওয়া। যার মূল উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশ রাজের সামনে বাঙালি জাতিকে বীর হিসেবে প্রতিপন্ন করা। সেই উদ্দেশ্যেই সমিতির সদস্যদের ‘যুগান্তর’ পত্রিকা মারফত পুরাণ, মহাকাব্য, মারাঠা ও রাজপুতদের মোগল–বিরোধী লড়াই সম্পর্কে অবহিত ও অনুপ্রাণিত করার চেষ্টা করা হয়। সেই সঙ্গে ইতালির ম্যাৎসিনি, গ্যারিবল্ডির গুপ্ত সমিতি ও ঐক্য আন্দোলনের ইতিহাস বর্ণনা করে তরুণ বুদ্ধিজীবিদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা হয়। এই বীরত্বের ইতিহাস, প্রাচীন গৌরব গাথা একদিকে যেমন তরুণদের প্রভাবিত করে ও অন্যদিকে হিন্দু পুনরুত্থানবাদী সংস্কৃতির প্রসার ঘটে। এর ফলস্বরূপ বিপ্লবী দলগুলির সদস্যরা এক হাতে গীতা ও অপর হাতে তরবারি নিয়ে দেশ উদ্ধারের শপথ নিয়ে মৃত্যুঞ্জয়ী সংকল্প গ্রহণ করেন। এই প্রেক্ষাপটে বাংলায় ১৯০৭ সাল থেকে বিপ্লবী কার্যকলাপ কীভাবে শুরু হয় লেখক তা বিস্তারিতভাবে লিখেছেন। ১৯০৭ সালে সুরাট কংগ্রেসে নরমপন্থী ও চরমপন্থীদের মধ্যে বিভাজনের পরে সরকার কঠোর দমননীতি প্রয়োগ করতে আরম্ভ করে। কংগ্রেসের অন্তর্দ্বন্দ্ব ও সরকারি নিষ্পেষণে স্বদেশী আন্দোলন স্তিমিত হয়ে পড়ে। এই সময় থেকে অনুশীলন ও যুগান্তরের মতো গুপ্ত সমিতিগুলি সক্রিয় হয়ে ওঠে। ১৯০৭ সালের শেষ দিকে বাংলার লেফটেন্যান্ট গভর্নর ফ্রেজারকে বোমা দিয়ে ট্রেন লাইন উড়িয়ে হত্যার চেষ্টা হয়, ঢাকা জেলার ম্যাজিস্ট্রেটকে গুলি করা হয়, চন্দননগরের ফরাসি মেয়রের প্রাণনাশের চেষ্টা করা হয়। বিপ্লবী গুপ্ত সমিতিগুলির এই লাগাতার প্রয়াস সরকারের মনে ভীতির সঞ্চার করেছিল। এই ঘটনাগুলির চরম প্রকাশ ঘটে ১৯০৮ সালে। কলকাতা প্রেসিডেন্সির প্রাক্তন ম্যাজিস্ট্রেট যিনি স্বদেশী আন্দোলনকারীদের উৎপীড়ন করে কুখ্যাত হন, তিনি বিহারের মুজঃফরপুর জেলায় বদলি হন। তাঁর গাড়ি লক্ষ্য করে কিশোর বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বোস ও প্রফুল্ল চাকী বোমা নিক্ষেপ করেন। কিন্তু তাঁর পরিবর্তে দুজন মেমসাহেব নিহত হন। ক্ষুদিরাম পরে ধরা পড়েন ও স্বাধীনতা সংগ্রামের শহিদ রূপে ফাঁসিতে জীবন দান করেন। অন্যদিকে প্রফুল্ল চাকি গ্রেপ্তারের আগেই নিজেকে গুলি করে আত্মত্যাগ করেন। এই ঘটনা বাংলা সহ ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষকে আলোড়িত করে। এরই প্রতিক্রিয়ায় কংগ্রেসের চরমপন্থী নেতা তিলক ‘কেশরী’ পত্রিকায় যা লেখেন তার নির্যাস ছিল – সরকারি শাসন নীতির দোষে বোমা ফাটে। এরই জন্য তাঁকে ছয় বছর কারাদণ্ডে দন্ডিত করে মান্দালয়ে নির্বাসন দেওয়া হয়। তিলকের গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে বিভিন্ন স্তরে প্রতিরোধ গড়ে উঠলেও বোম্বাইয়ের সুতোকল শ্রমিকদের বিরাট ধর্মঘট লেখকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। কিন্তু মধ্যবিত্ত ভদ্রলোক নির্ভর কংগ্রেস তথা বিপ্লবী দলগুলির কাছে শ্রমিক শ্রেণির এই রাজনীতি সচেতনতার মূল্য তেমন কিছু ছিলনা। নীচুতলার এই শোষিত শ্রেণিকে স্বাধীনতা আন্দোলনে যুক্ত করার কথা কেউ ভাবেননি। এরই কিছুদিন পরে যুগান্তর দলের ৪০ বিপ্লবী অরবিন্দ ঘোষের মানিকতলার বাগানবাড়ি থেকে বোমা, ডিনামাইট, বন্দুক, কার্তুজ, রিভলবার ও গোপনীয় কাগজপত্র সহ পুলিশের কাছে ধরা পড়েন। এই ঘটনা ‘আলিপুর ষড়যন্ত্র মামলা’ নামে স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে পরিচিত। এই মামলার থেকেও যে বিষয়টি এই সময় আলোড়ন তুলেছিল তা হল এই মামলার রাজসাক্ষী নরেন গোঁসাইয়ের হত্যা। দুই বিপ্লবী কানাই লাল দত্ত ও সত্যেন বসু গোপনে বাইরে থেকে পিস্তল আনিয়ে এই হত্যা সংঘটিত করেন। এই ঘটনা বাঙালি যুবকদের সাহস ও দেশপ্রেমের অনন্য নজির হয়ে ওঠে। সরকারী উকিল হিউমেরও প্রাণনাশের চেষ্টা হয়। এই সময় ‘যুগান্তর’ নামে একটি ইস্তেহারে বন্দুক, গুলি, বোমার জন্য সরকারি কোষাগার, পোস্ট অফিস, ব্যাঙ্ক ডাকাতির আহ্বান জানান হয়, যা মূলত রাজনৈতিক ডাকাতি রূপে স্বীকৃত হয়। লেখক এখানে স্বীকার করেছেন যে এই ব্যক্তিহত্যা কেন্দ্রিক সন্ত্রাসবাদের মূলে ছিল বীরত্বব্যঞ্জক ও অতীত গৌরব নির্ভর হিন্দুত্ববাদ। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে বিপ্লবীদের রাজনৈতিক শিক্ষার মূল ভিত্তি ছিল বঙ্কিমচন্দ্রের ‘আনন্দমঠ’, বিবেকানন্দের ‘বর্তমান ভারত’, ‘চিকাগো বক্তৃতা ‘, ‘প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য’, সখারামের ‘দেশের কথা’, ফরাসি বিপ্লবের ইতিহাস, আয়ারল্যান্ডের সশস্ত্র সংগ্রাম যা একদিকে ব্যক্তিগত বীরত্ব ও অন্যদিকে ভারতীয় সনাতন ধর্ম, সভ্যতাকে গৌরবান্বিত করে। লেখক পরে উপলব্ধি করেন যে এই হিন্দুত্ববাদী ধর্মীয় গৌরব মুসলমান সম্প্রদায়কে বিপ্লবী আন্দোলন থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছিল। বিপ্লবী জীবনের সূচনাপর্বে ১৯১১ সালে লেখক প্রথম কতগুলি রিভলবার আনতে গিয়ে পুলিশের হাতে ধরা পড়েন ও এক বছর কারারুদ্ধ হয়ে থাকেন। এই সময় জেলে রাজনৈতিক বন্দিদের কোন মর্যাদা ছিল না, উপরন্তু প্রতি পদক্ষেপে জুটত অমানবিক ব্যবহার। স্বদেশী ও বিপ্লবীরা বলতেন ‘ফাটক, প্রতি কথায় আটক’। জেলে চরম অত্যাচারের সাথে সতীশ পাকড়াশী বসন্ত রোগে জর্জরিত হয়ে নিদারুণ অবহেলা সহ্য করেও দেশকে শৃঙ্খলামুক্ত করার সঙ্কল্পে অটুট ছিলেন। জীবনের ঝুঁকি নিয়েও জেল প্রেসে কাজ করার সময় দলের চিঠি পুলিন দাসের নির্দেশে বাইরে পাঠানোর ব্যবস্থা করতেন। ১৯১২ সালে মুক্তি পাবার পর দলের নির্দেশে সংগঠন গড়ে তোলার কাজে সতীশ পাকড়াশীকে ঢাকা, কলকাতা ও উত্তরবঙ্গের ম্যালেরিয়া অধ্যুষিত অঞ্চলগুলিতে কাজ করতে হয়েছিল। ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রোধ হয়। ১৯১২ সালে কলকাতা থেকে দিল্লিতে রাজধানী স্থানান্তরিত করা হয়। এই উপলক্ষে লর্ড হার্ডিঞ্জের দিল্লি প্রবেশ অনুষ্ঠানকে একটি শোভাযাত্রার মাধ্যমে স্মরণীয় করে রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এই শোভাযাত্রায় বড়লাটের ওপরে বোমা নিক্ষেপ করা হলে বড়লাট আহত হন ও শোভাযাত্রা পণ্ড হয়। কিন্তু কে বা কারা বোমা নিক্ষেপ করেছিলেন তা জানা সম্ভব হয়নি। এর ফলে সর্বত্র পুলিশী নিপীড়ন তীব্র হয়ে ওঠে। অন্যদিকে অনুশীলন দল বাংলা ভাষায় লিখিত বই স্বাধীনতা ও ইংরাজিতে প্রকাশিত লিবার্টি–র মাধ্যমে ভারতের নানা স্থানে নিজেদের মতাদর্শের প্রচার চালাতে শুরু করে। এই সময় কলকাতায় বাদুড়বাগানে স্বনামধন্য বিপ্লবী রাসবিহারী বসুর সাথে লেখকের দেখা হয়, যিনি এই সময় (১৯১৩ –১৪) সারা উত্তর ভারতজুড়ে আমেরিকায় অবস্থিত গদর পার্টির সহায়তায় একটি বিদ্রোহ সংঘটিত করার চেষ্টা করছিলেন। দিল্লি ষড়যন্ত্র মামলারও প্রধান আসামি ছিলেন তিনি। এই পটভূমিকায় কলকাতায় তথা বাংলায় বিপ্লবী আন্দোলনের গতি বৃদ্ধি পায়। অনেক সময় এই কাজ করতে গিয়ে বিপ্লবীরা শুধু অকার্যকরই হতেন না, নানা দুর্ঘটনার সম্মুখীন হতেন। ১৯১৪ সালে আই বি পুলিশের ডেপুটি সুপারিন্টেন্ডেন্ট বসন্ত চট্টোপাধ্যায়কে হত্যা করতে গিয়ে লেখক সহ তাঁর সাথীদের হাতেই বোমা ফেটে গিয়ে সকলে মারাত্মক আহত হন। কিন্তু এই ব্যর্থতাগুলি কখনোই বিপ্লবীদের হতাশ করেনি। ইতিমধ্যে অনুশীলন দলের সাথে চন্দননগরের বিপ্লবী দলের অমৃত হাজরার যোগাযোগ হয় যিনি এই সময় এক বিশেষ শক্তিশালী বোমা প্রস্তুত করছিলেন। এই দুই দলের সাথে রাসবিহারী বসু বৃহত্তর প্রয়োজনে যোগাযোগ করেন। তাঁর বিশ্বস্ত সহযোগী ছিলেন শচীন সান্যাল। এই সময় গদর পার্টির বিষ্ণু গণেশ পিঙলে ও রাসবিহারী বসু উত্তর ভারত জুড়ে সেনা ছাউনিগুলিকে যুক্ত করে যে বিদ্রোহের পরিকল্পনা করেছিলেন তার অন্যতম ভিত্তি ছিল আসন্ন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ব্রিটেনের প্রতিপক্ষ জার্মানির সহায়তা অর্জন। জার্মানির সাহায্যে অস্ত্র লাভ করে ব্রিটিশ সরকারকে পর্যুদস্ত করা ও তার পরে ‘ফেডারেল রিপাবলিক অফ ইন্ডিয়া’ গড়ে তোলা ছিল উদ্দেশ্য। এই সময় জার্মানি থেকে আসা ‘মাউজার’ পিস্তল বিপ্লবী দলগুলির কাছে বিশেষ কাঙ্খিত হাতিয়ার হয়ে ওঠে। ভারতব্যাপী এই বিপ্লব প্রচেষ্টার মধ্যে জেলায় জেলায় বন্দুক চুরির হিড়িক পরে যায়। ইতিমধ্যে মধ্যবিত্ত ছাত্র–যুবরা বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির আক্রমণে ব্রিটেনের পরাজয়ে উত্তেজিত হয়ে ওঠে। এই যুদ্ধের সুযোগ নিয়ে ১৯১৫ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি অভ্যুত্থানের দিন স্থির হয়েছিল। কিন্তু একজন সৈনিক এই পরিকল্পনা ফাঁস করে দেওয়ায় সব আয়োজন ব্যর্থ হয়ে যায়। ১৯১৫ সালে একদল বিপ্লবী সুন্দরবনের ‘মঙ্গলদৈ’ সমুদ্র খাঁড়িতে অস্ত্রের অপেক্ষায় থেকে হতাশ হন। কারণ তাঁরা জানতেই পারেননি যে তাঁদের প্রত্যাশিত অস্ত্র–জাহাজ ‘ডোভার’ ইংরেজদের হাতে ধরা পড়ে গেছে। এই ভাবে বিপ্লবী যতীন মুখোপাধ্যায়ের দল অস্ত্রের অপেক্ষায় ওড়িশার বালেশ্বরে অবস্থান করার সময় পুলিশ বাহিনীর দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে সংঘর্ষে লিপ্ত হন। যতীন মুখোপাধ্যায় ও চিত্তপ্রিয় রায় শহিদের মৃত্যু বরণ করেন। বিপ্লবী আন্দোলন থেকে সাম্যবাদ বইয়ের এই দ্বিতীয় পর্যায়ে বিপ্লবীদের অনেকের মধ্যেই স্বাধীনতার পরের লক্ষ্য সম্পর্কে প্রশ্ন উত্থিত হয়। এই সময় লেখক প্রথম বাকুনিনের নৈরাজ্যবাদী ধারণার সাথে পরিচিত হন। সমাজতন্ত্রের ধারণার সাথেও পরিচিতি ঘটে। মার্ক্সের নাম তখনো তাঁদের কাছে অশ্রুত ছিল। তখনো পর্যন্ত স্বাধীন ভারত সম্পর্কে তাদের ধারণা ছিল অস্পষ্ট। তাঁরা ভাবতেন দেশ শিল্প–বাণিজ্যে সমৃদ্ধ হবে। ধনীর সম্পদের ন্যায্য বন্টন হবে। অত্যাচারী জমিদারদের কঠোর আইন প্রয়োগ করে নোয়াতে হবে। কিন্তু শ্রেণি সমাজে তা কীভাবে সম্ভব হবে, দেশপ্রেমের আবেগে সেই প্রশ্ন চাপা পড়ে যেত। তার থেকেও বড় কথা ১৯১৭ সালে যখন বিপ্লবী আন্দোলন স্তিমিত হয়ে পড়েছিল, তখনও এর জন্য সেই সাধারণ শ্রমিক – কৃষককে রাজনৈতিক চেতনারহিত বলে অভিযুক্ত করে দেশের দুরবস্থার জন্য দায়ী করেন। কিন্তু কেন তাঁরা জাতীয় আন্দোলনের পরিসর থেকে দূরে সরে ছিলেন, কেন এই বিপুল গণশক্তিকে কংগ্রেস ও বিপ্লবী দলগুলি পরিহার করে চলছিল সেই ভাবনার দ্বারা তাঁরা তাড়িত হননি। সেই কারণেই মূলত শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ভদ্রলোক বৃত্ত থেকেই বিপ্লবী আন্দোলনের সৈনিক সন্ধান করা হত। তবে তাঁদের দেশপ্রেম ছিল প্রশ্নাতীত। ১৯১৭ সালেও কংগ্রেস স্বায়ত্তশাসনের দাবি তুলতে দিধাগ্রস্ত ছিল। লেখক মনে করেন ১৯১৭ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে ভারতকে স্বায়ত্তশাসন দেওয়ার যে প্রতিশ্রুতি সরকার দিয়েছিল তার মূলে ছিল রুশ বিপ্লব। ১৯১৭ সালে লেখক ও তাঁর সহকর্মীরা রাশিয়ার ফেব্রুয়ারি বিপ্লবকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা একটি ব্রিটিশ ছবি দেখেন। জারতন্ত্রের উচ্ছেদ তাঁদের ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদকে উৎখাত করতে প্রেরণা যুগিয়েছিল। এই প্রসঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন যে রাশিয়ার প্রজাতন্ত্র যে আসলে শোষিত মানুষের মুক্তির পথ দেখাতে পারেনি, তা তিনি অনেক পরে উপলদ্ধি করেন। ১৯১৮ সালে পুলিশ তাঁকে আবার গ্রেপ্তার করে। ১৯২১ সালে জেল থেকে মুক্তি পান। এই সময় সারা দেশ গান্ধীর নেতৃত্বে অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দেয়। অনুশীলন সমিতি ছাড়া অন্যান্য বিপ্লবী দলগুলিও এই আন্দোলনে যোগ দেয়। যদিও এক্ষেত্রে তাদের মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল অসহযোগ আন্দোলনে যোগদানকারীদের মধ্যে থেকে ভবিষ্যতের সম্ভাবনাময় বিপ্লবীদের নিজ নিজ দলে সংযুক্ত করা। কিন্তু এই আন্দোলন যখন একটি গণ আন্দোলনে পরিণত হয়েছিল সেই মুহূর্তে চৌরিচৌরার হিংসাত্মক ঘটনার প্রেক্ষিতে গান্ধীর তা প্রত্যাহার করাকে অধিকাংশ তরুণ, এমনকি কংগ্রেসের মধ্যে একটি বড় অংশও, মানতে পারেননি। ফলে চিত্তরঞ্জন দাশ, মোতিলাল নেহরুর নেতৃত্বে গড়ে ওঠে স্বরাজ্য দল। অনুশীলন ও যুগান্তর এই দুই প্রধান বিপ্লবী দল এই নতুন দলে যোগ দেয়। ১৯২৩ সাল নাগাদ বাংলার বিপ্লবীরা কংগ্রেসের ও স্বরাজ্য দলের মধ্যে সংগঠন বিস্তার করে নতুন উদ্যোগে মেতে ওঠেন। আবার একই সাথে লেখক ও তাঁর অনেক সহযোগী আর ব্যক্তিহত্যা–নির্ভর সন্ত্রাসবাদে আস্থা হারান। এই সময় রাশিয়া ও তৃতীয় কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক থেকে বহিষ্কৃত হয়ে অবনী মুখার্জী ভারতে আসেন। কিন্তু এই বহিষ্কারের ঘটনা গোপন করে তিনি অনুশীলন দলের সাথে যোগাযোগ করেন। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল অনুশীলন দলকে রাশিয়া থেকে অস্ত্রলাভের সুযোগের আশ্বাস দিয়ে এই দলের পরিচয় পত্র নিয়ে পুনরায় রাশিয়ায় অনুপ্রবেশ করা। সতীশ পাকড়াশীর তাঁর সাথে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু জাহাজে উঠে শুরুতেই পুলিশি জেরার সম্মুখীন হয়ে তাঁরা দ্রুত পালিয়ে গিয়ে কোন রকমে গ্রেপ্তারি এড়াতে সক্ষম হন। কিন্তু লেখক পুনরায় ১৯১৮ সালের ৩ রেগুলেশন আইনে গ্রেপ্তার হন। ১৯২৩ থেকে ১৯২৮ সাল – এই পাঁচ বছরের বন্দি জীবনে তিনি বহু অভিজ্ঞতা লাভ করেন ও নতুন রাজনৈতিক দিশা সম্পর্কে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। এই সময় তিনি আলিপুর, মেদিনীপুর, ঢাকা, কর্ণাটকের বেলগাঁও ও মহারাষ্ট্রের ইয়েরাওয়ারা জেলে ছিলেন। মেদিনীপুর জেলে বিপ্লবী গণেশ ঘোষ, নিরঞ্জন সেন, যতীন দাস প্রমুখের সাথে তাঁর আলাপ ও রাজনৈতিক মতবিনিময় হয়। আলিপুর জেলপর্বে লেখক প্রথম ‘গণবাণী’ পত্রিকা সম্পর্কে অবহিত হন যার মাধ্যমে রাশিয়ার সাম্যবাদী বিপ্লবী মত প্রচার করা হত। এই সময় কমিউনিস্ট কর্মী গোপেন চক্রবর্তী ও ধরণী গোস্বামী ব্যক্তিহত্যা নির্ভর সন্ত্রাসবাদের সমালোচনা করে অনুশীলন সমিতিতে আলোড়ন ফেলে দেন তাও লেখকের কানে আসে। কিন্তু তখনো নির্বিবাদে পার্টির মত ও নেতাদের বক্তব্যকে মেনে চলতেন। তাঁর নিজের কথা থেকেই জানা যায় যে এই সময়েও তাঁর রাজনৈতিক বোধ ছিল ঘোলাটে। কিন্তু তাঁরা বুঝেছিলেন সন্ত্রাসবাদ স্বাধীনতা আনতে অক্ষম। রুশ বিপ্লবের সাফল্য তাঁর মতো অনেককেই প্রভাবিত করেছিল। কিন্তু তা যে গণশক্তি ব্যতিরেকে সম্ভব নয়, সে বিষয়ে তাঁরা সচেতন হননি। বিপ্লবী দলের নেতা ও কর্মী সকলেই ছিলেন এ বিষয়ে উদাসীন। প্রকৃতপক্ষে এখানে মূল অন্তরায় ছিল তাঁদের মধ্যবিত্ত ভদ্রলোক –সুলভ মানসিকতা, যা তাঁদের পক্ষে চিহ্নিত করা ও তাকে অস্বীকার করা তখনো সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে কর্ণাটকের বেলগাঁও জেলে গিয়ে তিনি বুঝতে পারেন যে দেশের স্বাধীনতা চেয়ে তাঁরা মুক্তিকামী হয়েছিলেন সেই দেশের অনেকেরই তখনো পর্যন্ত বিপ্লবী আন্দোলন, এমনকি দেশের নানা প্রান্ত সম্পর্কে কোনও ধারণাই নেই। কর্ণাটকের বেসরকারি জেল পরিদর্শক বিপ্লবী বন্দিদের কোন দেশীয় রাজ্যের রাজা মনে করেছিলেন যাঁরা কোনও কারণে সরকারের রোষে পড়েছেন। এই পর্বে পুনার ইয়েরাওয়ারা জেলে গ্রেট ব্রিটেনের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য জর্জ এলিসনের সাথে আলাপ হয় যিনি লেখককে দৃঢ়ভাবে বলেন গণশক্তিকে উপেক্ষা করে কোনও বিপ্লব হয় না। তাঁর এই কথা লেখকের মনে যে গভীর রেখাপাত করেছিল তা স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়। ১৯২৮ সালে সতীশ পাকড়াশী মুক্তি পান। জেলে থাকাকালীন তরুণ বিপ্লবীদের উদ্যমী অংশ একত্রে আয়ারল্যান্ডের বিদ্রোহীদের মত ছোট ছোট বিদ্রোহ সংঘটিত করার কথা ভেবেছিলেন। সূর্য সেনের সাথেও একসাথে কাজ করার কথা হয়েছিল। বিপ্লবীদের মুক্তির পরে যুগান্তর ও অনুশীলন দলের নেতারা এই উদ্দেশ্যে বহু বৈঠকে মিলিত হন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কংগ্রেসকে বাদ দিয়ে শুধু বিপ্লবী দলগুলির প্রগতিশীল জাতীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার কাজে নেতারা সাহস না পাওয়ায় সকল জাতীয়তাবাদীদের নিয়ে গড়ে ওঠে “ভারত স্বাধীনতা সঙ্ঘ”। যদিও লেখক–সহ কিছু ব্যক্তির এই ব্যবস্থা পছন্দ হয়নি। তবে ঢাকা জেলায় তিনিই হন এই সঙ্ঘের সম্পাদক। কলকাতায় এই সময় দুটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা ঘটে। এর আগেই কলকাতায় একটি বড় শ্রমিক ধর্মঘট আলোড়ন তুলেছিল। কিন্তু এ বিষয়ে কংগ্রেস তথা বিপ্লবী দলগুলির কোন ভাবনা ছিলনা। এই বিপুল গণশক্তিকে স্বাধীনতার লড়াইয়ে যুক্ত করার বিষয়ে উভয়েই ছিল উদাসীন। লেখকের থেকে জানা যায় যে, বিপুল শ্রমশক্তিকে তাঁরা অবহেলা করেছিলেন তাঁরাই যখন ছাত্র ও যুবকদের আকৃষ্ট করে ‘ইয়ং কমরেড লীগ’ গঠন করেন তখন তা বিপ্লবীদের চিন্তার কারণ হয়ে ওঠে । কারণ নেতারা মনে করতেন যুব সংগঠন বিপ্লবীদের একচেটিয়া এক্তিয়ার ভুক্ত। এই প্রেক্ষাপটে কলকাতায় ১৯২৮ এর অক্টোবর মাসে পাঞ্জাবের সোহন সিং যোশের সভাপতিত্বে ‘ভারতের মজদুর কৃষক পার্টি’র প্রথম সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। অ্যালবার্ট হলে অনুষ্ঠিত এই অধিবেশনে লেখক মুজফফর আহ্মেদকে প্রথম দেখেন। এই সভার বক্তারা শ্রমিক – কৃষক আন্দোলন, সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রাম সম্পর্কে আলোচনার পরে সদ্য প্রতিষ্ঠিত “ভারত স্বাধীনতা সঙ্ঘ”–কে একটি বুর্জোয়া প্রতিষ্ঠান রূপে প্রচণ্ড সমালোচনা করেন। এই সম্মেলনে যোগ দেওয়ার জন্য দলের থেকে সতীশ পাকড়াশী তীব্রভাবে তিরস্কৃত হন। কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি পরের দিন সম্মেলনে যান। তখনও তিনি মনে করতেন যে সাম্যবাদী নীতি কার্যকর হতে অনেক দেরি, তাই তাঁদের নির্দিষ্ট কার্যকলাপ চালিয়ে যাওয়া উচিত। কিন্তু তাঁর পরের দিন সম্মেলনে যাওয়া প্রমাণ করেছিল গণ আন্দোলন নির্ভর শ্রমিক – কৃষক সংগ্রাম তাঁর মনোযোগ আকৃষ্ট করেছিল। তাঁর রাজনীতির ঝোঁক দিশা বদলের দিকে অগ্রসর হয়েছিল। এর কিছুদিন পরে ডিসেম্বর মাসে কংগ্রেসের কলকাতা অধিবেশনে বিপ্লবী দলগুলি অংশ নিয়ে পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি তোলে যা কংগ্রেসের ‘স্বায়ত্ত্বশাসনের” মূল প্রস্তাবের কাছে মাত্র ১০০ ভোটে পরাজিত হয়। এই ঘটনা কংগ্রেসের দক্ষিণপন্থী নেতাদের মধ্যে বিপ্লবীদের প্রতিরোধ শক্তি সম্পর্কে বিস্ময় জাগিয়েছিল। কিন্তু এই সভায় কলকাতার শ্রমিকদের রবাহূত হয়ে আগমন ও তাদের দাবি শুনতে নেতৃত্বকে বাধ্য করা ছিল ভারতের রাজনীতিতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা যা লেখকের মনে বিশেষভাবে স্থান করে নিয়েছিল। এর সাথে কংগ্রেসের অধিবেশনে প্রথম বার বেশ কিছু কমিউনিস্ট সাহিত্যের আমদানি হয়েছিল। এর মধ্যে ‘এ বি সি অফ কমিউনিজম’ তখন বিপ্লবী দলের কর্মীরা ফ্যাশন হিসেবে পড়তে শুরু করেছিলেন। লেখক ১৯২৯ সালের মাঝামাঝি কলকাতায় লক্ষ লক্ষ চটকল মজুরের ধর্মঘটের কথা উল্লেখ করেছেন। যা লেখককে শ্রমশক্তির বিপুল সম্ভাবনা সম্পর্কে অবহিত করে। লেখক মনে করেন এই বিপুল শ্রমশক্তির উত্থানে ভীত ইংরেজ সরকার মিরাট ষড়যন্ত্র মামলার মাধ্যমে সকল কমিউনিস্ট নেতাদের গ্রেপ্তার করে আন্দোলনকে দমিয়ে রাখতে চেয়েছিল। ইতিমধ্যে লেখকের কিছু সহযোগী নাগপুর ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস থেকে এসে এই মতামত ব্যক্ত করেন যে, জাতীয় কংগ্রেসের থেকে শ্রমিক আন্দোলন অনেক বেশি সম্ভাবনাময়। এই খবরে লেখক–সহ বিপ্লবীরা অনেকেই আনন্দিত হন যা বাংলার বিপ্লবীদের একটি অংশের মধ্যে সাম্যবাদী রাজনীতির প্রতি যে একটি ঝোঁক তৈরি হয়েছিল তা স্পষ্ট করে। ইতিমধ্যে বিপ্লবীরা রিভোল্ট গ্রুপ গড়ে আয়ারল্যান্ড এর ধাঁচে ছোট ছোট বিদ্রোহ গড়ে তুলতে তৎপর হয়ে ওঠেন। কিন্তু ১৮ই ডিসেম্বর লেখক পুনরায় মেছুয়াবাজার ষড়যন্ত্র মামলায় ধরা পড়ে সাজাপ্রাপ্ত হন। এর চার মাস পরেই ১৯৩০ সালে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠন সংঘটিত হয়, যা প্রত্যেক বিপ্লবীর মত লেখককেও আলোড়িত করেছিল। এই অধ্যায়ে লেখক বিশেষ শ্রদ্ধার সাথে বিপ্লবী আন্দোলনে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, কল্পনা দত্তের গুরুত্বপূর্ণ যোগদানের উল্লেখ করেছেন। দুকড়ি বালা দেবী, ননীবালা দেবী, শান্তি ঘোষ, সুনীতি চৌধুরী, বীণা দাস, উজ্জ্বলা মজুমদার প্রমুখের বিপ্লবী আন্দোলনে উজ্জ্বল ভূমিকার কথা এই গ্রন্থে আলোচিত হয়েছে। এই পর্যায়ের জেল জীবনে কমিউনিস্ট সদস্য আব্দুল হালিম তাঁর ওপরে গভীর প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। বিপ্লবী দলের সদস্যরা প্রেসিডেন্সি জেলে তাঁকে বার বার ডেকে এনে রাজনৈতিক আলোচনা করতেন যার থেকে বোঝা যায় কীভাবে বিপ্লবীরা অনেকেই সাম্যবাদের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছিলেন। এই জেল থেকেই তাঁরা জানতে পারেন কংগ্রেসের করাচি অধিবেশনে প্রথমবার শ্রমিক–কৃষকের কয়েকটি সাধারণ দাবি স্বীকৃত হয়েছে। এই সময় লাহোর ষড়যন্ত্র মামলায় ভগৎ সিং, শুকদেব ও রাজগুরুর ফাঁসি হয়। লেখক মনে করেছিলেন যে এই মর্মান্তিক ঘটনা ছিল বিপ্লবীদের জীবনের মূল্যে গান্ধী তথা জাতীয় নেতাদের আপস রফা, যার পরিণতি ছিল গান্ধী–আরউইন চুক্তি। এর পরে হাজারিবাগ জেলে বদলি হওয়ার পরে সতীশ পাকড়াশী সন্ত্রাসবাদী রাজনীতিকে সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করে সাম্যবাদের প্রতি মনসংযোগ করেন। সাম্যবাদী মতাদর্শে আস্থাজ্ঞাপন গ্রন্থের এই শেষ পর্যায়ের শুরু হয়েছিল ১৯৩৩ সালে আন্দামান দ্বীপের কারাগারে নির্বাসনের যাত্রার মধ্যে দিয়ে। এই যাত্রায় তাঁর অন্যতম সঙ্গী ছিলেন বিপ্লবী নিরঞ্জন সেন, ডাঃ নারায়ণ রায়, ডাঃ ভূপাল বসু, ও তরুণ ছাত্র বর্ধমান জেলার হরেকৃষ্ণ কোঙার। যাত্রার আগেই বিপ্লবী কৃষ্ণপদ চক্রবর্তীর ভবিষ্যত কর্মপন্থা নিয়ে এক প্রশ্নের উত্তরে লেখক জানিয়েছিলেন যে, তিনি নতুন মতবাদ নিয়ে পড়াশোনায় আগ্রহী, আর কোনভাবে পেছনে ফিরে তাকাবেন না। তিনি বলেন, আগামী যুগ গণ আন্দোলনের যুগ। এই নতুন জীবনের প্রতি পদে ছিল নির্মম, কঠিন পথ। আন্দামানের বন্দিজীবন ছিল ভয়াবহ। মানুষের বসবাসের উপযুক্ত কোনও পরিবেশ সেখানে ছিলনা। প্রায় তিনশ রাজবন্দি সেখানে নির্বাসিত হলেও তাঁদের দেখা করার কোন সুযোগ ছিল না। সারবাঁধা পায়রার মত প্রকোষ্ঠে তাঁদের থাকতে হত, না ছিল বাতির ব্যবস্থা, না ছিল যথাযথ শৌচাগার। একমাত্র কাজ ছিল জাল বোনা ও নারকেলের ছোবড়া দিয়ে দড়ি বানানো। স্বাস্থ্যরক্ষা ও শিক্ষার কোন অধিকার তাঁদের ছিল না। ঘরগুলি বিষাক্ত পোকামাকড়ে ভর্তি থাকত। সাপ্তাহিক স্টেটসম্যান কাগজ ছাড়া আর কিছুই পড়ার অনুমতি ছিলনা। প্রায়ই ম্যালেরিয়ার প্রকোপে তাঁরা অসুস্থ হতেন। তার সাথে ছিল জঘন্য খাদ্য। প্রতিবাদ করলেই তৃতীয় শ্রেণির বন্দিদের স্তরে নামিয়ে দিয়ে শাস্তি দেওয়া হত। সকলে মিলে এর প্রতিকারের উদ্দেশ্যে বহু আবেদন, নিবেদন করে ব্যর্থ হয়ে অনশন করার সিদ্ধান্ত নেন। ফলে সকলকে তৃতীয় শ্রেণির বন্দিতে পর্যবসিত করা হয়। পুলিশ জোর করে গলায় নল দিয়ে পেটে দুধ প্রবেশ করিয়ে দিত। সারা দিন সকলকে এক একটি কুঠূরিতে তালাবন্ধ করে রাখা হত। এই নিষ্ঠুর পদ্ধতিতে খাওয়ানোর ফলে মোহিত মিত্র, মোহন কুমার দাস ও লাহোর ষড়যন্ত্র মামলায় দণ্ডিত মহাবীর সিং মারা যান। শহিদের মৃত্যু আন্দোলন তীব্রতর করে তোলে। প্রায় দুমাস পরে কর্নেল বার্কারের উদ্যোগে ও তাঁদের দাবিগুলি বিবেচনা করার আশ্বাসে এই অনশন প্রত্যাহৃত হয়। তিনটি প্রাণের বিনিময়ে রাজবন্দিরা দাবি আদায়ে সক্ষম হন। এরই পরে এই জেল স্বাস্থ্যরক্ষা ও জ্ঞানলাভের উপযুক্ত হয়ে ওঠে। এই পর্যায়েই শুরু হয় কমিউনিস্ট সাহিত্য পাঠ। এই পড়াশোনার বৃত্ত থেকেই ডাঃ নারায়ণ রায়, নিরঞ্জন সেন ও শিউ বর্মার নেতৃত্বে শুরু হয় অধ্যয়ন ও অধ্যাপনার কাজ। বিপ্লবীদের প্রায় নব্বই শতাংশ কমিউনিস্ট মতাদর্শে আস্থাশীল হয়ে পড়েন। জেলের মধ্যে এইভাবে গড়ে ওঠে কমিউনিস্ট পার্টির সংগঠন যা কমিউনিস্ট কনসলিডেশন নামে পরিচিত হয়। নিরন্তর জিজ্ঞাসা ও রাজনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে লেখক ১৯৩৬ সালে তাঁর বন্ধুদের জানান যে তিনি কমিউনিস্ট পার্টির অন্তর্ভূক্ত হয়েই ভবিষ্যতে কাজ করবেন। জেলের দীর্ঘ সময়ে তিনি বার বার নিজের কাছেই জীবনের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন করে উপলব্ধি করেন, সাম্যবাদই মানুষের হিতে এক পরশপাথর, যেখানে কেউ প্রভু নয়, কেউ গোলাম নয়, কেউ শাসক নয়, কেউ শোষিত নয়। তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাবে মনে করেছিলেন সন্ত্রাসবাদী বিপ্লববাদ ছিল অবৈজ্ঞানিক, অস্পষ্ট। তবে তিনি মনে করতেন দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদে বিশ্বাস রাখতে না পারলে কমিউনিজমের আদর্শে গণবিপ্লব করা যায় না। রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দের ধর্মাদর্শ, গীতার অধ্যাত্ম সাধনার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক ধারণা ত্যাগ করে, সংস্কারের সঙ্গে লড়াই করে, ব্যক্তি প্রাধান্যের ধারণা বর্জন করে, ব্যক্তিগত সম্পত্তির অধিকার অস্বীকার করে সাম্যবাদী হওয়ার যে লড়াইয়ে লেখক উত্তীর্ণ হয়েছিলেন তার মূলে ছিল দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের বৈজ্ঞানিক চেতনা। তিনি বিশ্বাস করেছিলেন এর পরে তাঁর মূল পথ হল সুপরিকল্পিত বৈজ্ঞানিক যুক্তিসঙ্গত আদর্শে সমাজ গড়ে তোলা যার ভিত্তিতে বিপ্লবী পথে গণতান্ত্রিক স্বাধীনতার স্বপ্ন সফল ও সার্থক হবে। এর পরে মুক্তি পেয়ে তিনি ১৯৩৮ সালে কমিউনিস্ট পার্টির বঙ্গীয় শাখার সদস্য হন। শুরু হয় এক নতুন লড়াই। ১৯৪০ সালে সাম্যবাদী কর্মী রূপে আবার গ্রেপ্তার হন। আড়াই বছর পরে মুক্তি পেয়ে শুরু হয় নতুন কর্মোদ্যম। ১৯৪৫ সালে কংগ্রেসের প্রতিক্রিয়াশীল চরিত্র ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে আসায় অধিকাংশ কমিউনিস্ট সভ্য, কর্মীর মত তিনিও ঢাকা জেলা কংগ্রেস কমিটির সভ্যপদ ত্যাগ করেন। ১৯৪৫–৪৬ সালে দেশজুড়ে যে গণ অভ্যুত্থান শুরু হয়, তিনিও হয়ে ওঠেন তার সেনানী। আবারও আক্রমণ, নিপীড়ন সহ্য করেও তিনি এই বন্ধুর পথেই আস্থা রাখেন, কারণ তিনি নিশ্চিত হয়েছিলেন যে সাম্যবাদই মানব কল্যাণের মূল মন্ত্র। গণশক্তি ছাড়া বিপ্লব অসম্পূর্ণ। ১৯৪৮ সালে স্বাধীন ভারতে এই মতাদর্শের জন্যই আবার গ্রেপ্তার হন। ১৯০৫ থেকে ১৯৫২ এই দীর্ঘ সময়ে তাঁর জীবনের ৬০% কেটেছিল জেলে। যে দেশকে স্বাধীন করবেন বলে একদিন প্রাণের মায়া ত্যাগ করে সন্ত্রাসবাদী বিপ্লবী আদর্শে আস্থা রেখে রাজনীতির ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, সেই দেশের রাজনৈতিক মুক্তিতে তাঁর বন্দিদশার অবসান হয়নি। কিন্তু তা তাঁকে হতাশ করেনি, কারণ তিনি কমিউনিস্ট মতাদর্শে প্রত্যয়ী হয়ে এই চেতনায় উদ্বুদ্ধ হন যে, মেহনতী মানুষের মুক্তিই জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের পথে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র গড়ে তুলবে। প্রকাশের তারিখ: ২৩-নভেম্বর-২০২২ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |