|
'না' বলাটাই আজ জরুরিএলা কায়দার |
তখন থেকে রাজনৈতিক সক্রিয়তাই আমার জীবনের কেন্দ্রবিন্দু। রূপান্তরকামী মানুষদের নিয়ে নানান মিথ্যা প্রচার চালানো হয়, তাদের প্রতি যে-বিদ্বেষ আর ঘৃণা তার প্রতিবাদে আমি একটা গণবিক্ষোভ কর্মসূচি সংগঠিত করেছি, প্যালেস্তিনীয় আন্দোলনকর্মীদের সঙ্গে জমির জবরদখলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সামিল হয়েছি। সেনাবাহিনী আমাদের লক্ষ করে স্টান গ্রেনেড, রবারের বুলেট ছুঁড়েছে। আমরা রাস্তা আটকে দিয়েছি, পুলিশের মারে আহত হয়েছি |
[বয়স আঠেরো, এলা কায়দার গ্রিনবার্গ। ইজরায়েলের কমিউনিস্ট ইউথের একজন সক্রিয় সদস্য। ইজরায়েলে সেনাবাহিনীতে যোগদান বাধ্যতামূলক হলেও এলা তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। একবুক প্রত্যয়ের সঙ্গে জানিয়েছে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সামরিক বাহিনীতে যোগ দেবে না। আর এই ‘অপরাধে’ এলাকে নেতানিয়াহুর সামরিক বন্দিশালায় আটক করা হয়েছে। গ্রেপ্তারির আগে, গত সপ্তাহে, এলা একটা লিখিত বিবৃতি প্রকাশ করেছে, তার শিরোনাম 'The Imperative is Refusal'।– মার্কসবাদী পথ] আমার নাম এলা কায়দার গ্রিনবার্গ। যত্ন করে আমাকে বড়ো করা হয়েছিল যাতে আমি একজন আদর্শ পুরুষ হয়ে উঠতে পারি, যাতে যুদ্ধে যেতে পারি। আমার যখন চোদ্দ বছর বয়স তখন আমি একজন ট্রান্স-নারী হিসেবে নিজের পরিচয় প্রকাশ করলাম। সমাজ যে-নিয়মে ঠিক করে দেয় কার লিঙ্গ পরিচিতি কী হবে সেই নিয়মটাকে আমি প্রত্যাখ্যান করেছিলাম। এখন আমার বয়স আঠেরো। আমি ঠিক করেছি আমি সেনাবাহিনীতে নাম লেখাব না। যুদ্ধবাজ সমাজের জারি করা সামরিক পরওয়ানাকেও আমি প্রত্যাখ্যান করছি। আমার দিদার বইয়ের ঘরে কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো-র একটা কপি ছিল। একদিন সেটা আমার হাতে এসে পড়ল। তখন আমি সদ্য প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছি যে আমি একজন ট্রান্স-নারী। পরবর্তী দু-বছর আমার কেটেছে কেবল রাজনৈতিক দর্শন আর মার্কসবাদ বিষয়ে পড়াশোনা করে। পড়াশোনা করতে করতেই আমি জেনেছিলাম আমার দেশের রক্তাক্ত ইতিহাস আর বর্তমান সম্পর্কে। বিচারমূলক অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে যখন প্রতিবাদ আন্দোলন শুরু হল তখন আমার মনে হয়েছিল এই পথে হেঁটেই আমার ভেতরের নৈরাশ্য আর হতাশার অনুভূতিগুলোকে আশা আর রাজনৈতিক সক্রিয়তায় রূপান্তরিত করতে পারি। তারপর আর দেরি করিনি। দখলদারির অবসান ঘটানোর জন্য যে-সংগ্রাম চলছিল তাতে একজন সক্রিয় কর্মী আর সংগঠক হিসেবে আমি যোগ দিই। প্রথমে অ্যান্টি-অকুপেশন ব্লকে, তারপর কাপলান স্ট্রিটে সাপ্তাহিক বিক্ষোভে আর তার পরে মেসারভোট নেটওয়ার্কে, কমিউনিস্ট ইয়ুথ ইউনিয়ন, হাদাশ এবং কমিউনিস্ট পার্টিতে। তখন থেকে রাজনৈতিক সক্রিয়তাই আমার জীবনের কেন্দ্রবিন্দু। রূপান্তরকামী মানুষদের নিয়ে নানান মিথ্যা প্রচার চালানো হয়, তাদের প্রতি যে-বিদ্বেষ আর ঘৃণা তার প্রতিবাদে আমি একটা গণবিক্ষোভ কর্মসূচি সংগঠিত করেছি, প্যালেস্তিনীয় আন্দোলনকর্মীদের সঙ্গে জমির জবরদখলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সামিল হয়েছি। সেনাবাহিনী আমাদের লক্ষ করে স্টান গ্রেনেড, রবারের বুলেট ছুঁড়েছে। আমরা রাস্তা আটকে দিয়েছি, পুলিশের মারে আহত হয়েছি, মাগাভের (সীমান্ত পুলিশবাহিনী) হিংস্র আক্রমণ নেমে এসেছে আমাদের ওপরে, ইউথ এগেইনস্ট ডিক্টেটরশিপ-এর ব্যানারে গণপ্রত্যাখ্যান কর্মসূচি গ্রহণ করেছি, মাসাফের ইয়াট্টায় সম্মিলিত প্রতিরোধে যোগ দিয়েছি। এতকিছুর পরে আজ আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমি যুদ্ধে যাব না। কেন আমি এই সিদ্ধান্ত নিলাম? কারণ আমার দেশ গাজায় হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করছে। সেখানে গণহত্যা চলছে। হাজার হাজার মানুষ মারা গেছে বোমাবর্ষণে, নির্বিচার গুলিচালনায়, অনাহারে; ইচ্ছাকৃতভাবে সমস্ত পরিকাঠামো ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। লক্ষ লক্ষ মানুষকে উৎখাত করা হয়েছে। এখনও তারা ঘরছাড়া। গত আঠেরো মাস ধরে একটানা এটাই গাজার প্রতিদিনকার বাস্তবতা। এতকিছু হয়েছে একটা যুদ্ধের জন্য। বলা হয়েছিল এই যুদ্ধের উদ্দেশ্য নাকি বন্দিদের ফিরিয়ে আনা, কিন্তু আসলে তাদেরকেই ত্যাজ্য করা হয়েছে। এই যুদ্ধের ধ্বংসলীলা ওয়েস্ট ব্যাঙ্ক অতিক্রম করে ছড়িয়ে পড়েছে। দখলদারদের হিংস্রতা বেড়ে চলেছে আর সবথেকে বড়ো কথা হল তাদের শক্তি যোগাচ্ছে সামরিক বাহিনী। একটি জাতিকে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করতে গিয়ে কয়েক ডজন গ্রাম উজাড় করে দেওয়া হয়েছে। যেন কোনওকালে তাদের কোনও অস্তিত্বই ছিল না। জেনিন আর তুলকারেমে হামলা চালিয়ে এক একটা লোকালয় ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। এলাকাগুলো জনমানবহীন। গাজার বিরুদ্ধে সরকার আবারও অভিযান চালাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কাজেই ধরে নেওয়া যায় পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটবে। ইজরায়েলে যেভাবে বামপন্থী কর্মী ও প্যালেস্তিনীয়দের ওপর পুলিশি ও রাজনৈতিক নিপীড়ন চালানো হচ্ছে আমরা তা স্বচক্ষে দেখছি। ১৯৪৮-১৯৬৬ সালের সামরিক শাসনের পর এ-দেশে এমন পরিস্থিতি আর কখনও তৈরি হয়নি। সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনও একটা লেখা, প্রতিবাদে অংশ নেওয়া, এমনকি নাগরিক মঞ্চ সংগঠিত করলেও গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সবকিছু উপেক্ষা করা হচ্ছে। আরব সমাজকে নিশানা করে সংগঠিত সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড চলছে। ২৪ জন জলজ্যান্ত বন্দি যারা এখনও বাড়ি ফিরতে পারেনি, তাদের পরিবার অপেক্ষায় দিন গুনছে। এক ভয়ংকর অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছে যার প্রভাবে সবার আগে আর সবচাইতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শ্রমজীবী মানুষ। গৃহ-হিংসার হার বেড়েছে ৬৫%, যা বেসামরিক আগ্নেয়াস্ত্রর ব্যবহার ৪০% বৃদ্ধির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। এর পাশাপাশি রূপান্তরকামী মানুষ, প্রান্তিক লিঙ্গ যৌনতার মানুষের ওপর হিংসাত্মক আক্রমণ আরও বেড়ে গিয়েছে। আবার সরকারি বাজেটেও দেদার কাটছাঁট হয়েছে। যে বিচারমূলক অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে এই সেদিন আমরা পথে নেমেছিলাম এখন দেখছি আমাদেরই নাকের ডগায় তাড়াহুড়ো করে তার পক্ষে নতুন আইন তৈরি করা হচ্ছে। যা কিছু ঘটছে তার সঙ্গে গাজার গণহত্যার কোনও সম্পর্ক নেই— এমনটা নয়। যা যা ঘটছে তা আসলে সমাজের ওপরে যুদ্ধের প্রত্যক্ষ ও পরিব্যাপ্ত প্রভাব। ওরা চায় বর্তমান পরিস্থিতি যেমন তেমনটাই চলতে থাকুক। তার জন্য দেশের সব মানুষকে এই সিস্টেম যা যা ভূমিকা পালন করতে বলেছে ঠিক সেইভাবে তেল-দেওয়া যন্ত্রের কলকব্জার মতো সবাইকে কাজ করে যেতে হবে। চাকরি করতে হবে, সেনাবাহিনীতে নাম লেখাতে হবে, মানুষ খুন করতে হবে, বিয়ে করতে হবে, পরিবার গঠন করতে হবে, সন্তানের জন্ম দিতে হবে যাতে তারাই আবার বড়ো হয়ে দখলদারি, পুঁজিবাদ আর পুরুষতন্ত্রের এই বিরাট যন্ত্রটাকে চালু রাখতে পারে। চেকপয়েন্টে যে-সৈনিক দাঁড়িয়ে পাহারা দিচ্ছে, যে-মালিক খুব কম বেতন দেয় অথবা যারা আমাদের লিঙ্গ পরিচিতির স্বাধীনতা বা স্বাস্থ্যব্যবস্থার স্বশাসনের তোয়াক্কা করে না, কেবল তারাই নয়, এই গোটা ব্যবস্থাটা আসলে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, সমস্ত সামাজিক প্রক্রিয়ার সমষ্টি যা আমাদের এই ব্যবস্থার আজ্ঞাবহ দাসে পরিণত করে। এই যুক্তিটাকে ট্রান্স মানুষরা, বিদ্রোহী মানুষরা পাত্তা দেয় না। তাই ওরা আমাদের ভয় পায়। কারণ এই চলমান ব্যবস্থা টিঁকে আছে আমাদের মতো সাধারণ মানুষের কাঁধে ভর দিয়ে— আমাদের শৃঙ্খলা, আনুগত্য আর প্রশ্নহীনতার ওপর ভিত্তি করে। কিন্তু আনুগত্য আমাদের কিছুই দেয় না— শুধু বিস্মৃতি ছাড়া। সামরিক বাহিনীর মাথায় যারা রয়েছে, যারা সরকার চালাচ্ছে, তারা বারবার নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করে দিয়েছে, যুদ্ধবিরতি চুক্তি বা আমাদের অধিকার রক্ষা বা বন্দিদের ফিরিয়ে আনার বিষয়ে তারা আদৌ মাথা ঘামাচ্ছে না। তাদের যুদ্ধ আর সাম্রাজ্যবিস্তারের জন্য আমাদের কতটা কাজে লাগানো যেতে পারে সেইটেতেই কেবল তাদের আগ্রহ। রাষ্ট্রের নাগরিকরা বাধ্য হয়ে আইন মেনে চললে এই অন্ধকারের রাজত্ব আর তার ভয়াবহতার অবসান ঘটানো সম্ভব না। আমরা যদি মনে করি আমাদের যেমনটা নির্দেশ দেওয়া হবে আমরা মুখ বুজে তাই করব আর দেশের মাথায় যারা বসে আছে তাদের হঠাৎ করে অকারণেই একদিন সম্বিত ফিরবে আর তারা বুঝতে পারবে যা ঘটে চলেছে তা এখনই বন্ধ হওয়া দরকার– এমনটা হবে না। গণহত্যা, উদ্দেশ্যমূলক অবহেলা, অধিকার লঙ্ঘন ও যুদ্ধের বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে— এখন ‘ না’ বলাটাই জরুরি। উদাসীন থাকবেন না; একত্রিত হন, সংগঠিত হন, প্রতিরোধ করুন। আজ থেকে বছর চল্লিশ পরে আমাদের নাতি-নাতনিরা যখন আমাদের জিজ্ঞেস করবে, গাজায় যখন এত মানুষকে মেরে ফেলা হচ্ছিল তোমরা তখন কী করেছিলে, যখন তারা জানতে চাইবে আমরা হাল ছেড়ে দিয়েছিলাম নাকি লড়াই করেছিলাম, কী উত্তর দিতে চাইবেন আপনি? আমি জানি আমি কী উত্তর দেব। আমি বলব, আমি প্রতিরোধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। আর তাই আমি ‘না’ বলেছি।
প্রকাশের তারিখ: ২৮-মার্চ-২০২৫ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |