|
ধর্মনিরপেক্ষতা ও নজরুলদেবরাজ দেবনাথ |
“বিংশ শতাব্দীর অসম্ভবের সম্ভাবনার যুগে আমি জন্মগ্রহণ করেছি। এরই অভিযান সেনাদলের তূর্য্যবাদকের একজন আমি— এই হোক আমার সবচেয়ে বড় পরিচয়। আমি এই দেশে, এই সমাজে জন্মেছি বলেই শুধু এই দেশেরই, এই সমাজেরই নই; আমি সকল দেশের, সকল মানুষের। কবি চায় না দান, কবি চায় অঞ্জলি। কবি চায় প্রীতি। কবিতা আর দেবতা সুন্দরের প্রকাশ। সুন্দরকে স্বীকার করতে হয়, যা সুন্দর তাই দিয়ে। সুন্দরের ধ্যান, তাঁর স্তবগানই আমার ধর্ম। তবু বলছি, আমি শুধু সুন্দরের হাতে বীণা, পায়ে পদ্মফুলই দেখিনি, তাঁর চোখে চোখ ভরা জলও দেখেছি। শ্মশানের পথে, গোরস্তানের পথে তাঁকে ক্ষুধাদীর্ণ মুর্তিতে ব্যথিত পায়ে চলে যেতে দেখেছি। যুদ্ধভূমিতে তাঁকে দেখেছি। কারাগারের অন্ধকূপে তাঁকে দেখেছি। ফাঁসির মঞ্চে তাঁকে দেখেছি। |
সর্বকালের তৃতীয় শ্রেষ্ঠ বাঙালি নজরুল। ২০ দিনের সমীক্ষার শেষে জানালো বিবিসি ২০০৪ সালে। এ হেন কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের প্রাত্যহিক স্মরণ থেকে মুছেই যাচ্ছেন ক্রমে; ২০২৩ সালে ‘কারার ওই লৌহকপাট’এর সুরবদলের বিতর্কটি আর কিছু সাম্প্রতিক নজরুল কেন্দ্রিক আখ্যানের প্রকাশ না হলে বিদগ্ধ মহল, ইদানিংকালে নজরুলকে নিয়ে বিশেষ মাথা ঘামাননি। অথচ গত দশ বছরে বিশেষ করে ভারত যেভাবে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির মূলস্রোতে চলে এসেছে, তাতে নজরুল হতে পারতেন মৌলবাদের নিরোধে এক শঠে শাঠ্যং হাতিয়ার। কাজী নজরুল ইসলামরা ছিলেন তিন ভাই, এক বোন। এক ভাই কাজী আলী হোসেন মক্তবে লেখাপড়া করেন। বাবার দলিল লেখার ব্যবসায় ঢোকেন। এলাকায় কৃষক-শ্রমিকদের হয়ে কাজ করতে গিয়ে স্থানীয় জমিদারের রোষানলে পড়েন। ১৯৫১ সালে প্রকাশ্যে তাকে হত্যা করা হয়। ততদিনে নজরুল অসুস্থ। হিসাব করতে গেলে নজরুল সুস্থাবস্থায় পরিণত বয়সে সাহিত্যচর্চা করে উঠতে পেরেছেন মেরেকেটে তেইশ বছর। তেতাল্লিশ বছর বয়সে প্রথমে বাকশক্তিরহিত হন, পরে ক্রমশ মানসিক ভারসাম্যই হারিয়ে ফেলেন, পরবর্তীকালে পরীক্ষায় ধরা পড়ে মস্তিষ্কের ফ্রন্টাল লোব সংকুচিত হয়ে গিয়েছিল। দীর্ঘকাল ওনার চিকিৎসা যথাযথভাবে করে ওঠা যায়নি, বিশেষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলায়। ১৯৭৬ সালে উনি মারা যান। মৃত্যুর আগের শেষ চার বছর সদ্যস্বাধীন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশে কাটান, তদ্দিনে তাঁর স্ত্রীবিয়োগ ঘটে গেছে। তার আগে অবধি থাকতেন পশ্চিমবাংলাতেই। পরে বাংলাদেশে জাতীয় কবির মর্যাদা পেয়েছেন। এই কথাগুলো টুকরো টুকরো করে শুরুতে বলে নিতে হল। নজরুল স্মৃতিহীন অসুস্থাবস্থায় দীর্ঘসময় কাটালেও উনি নিজে বিস্মৃত হয়ে যাননি। এমনকি বড়মুখ করে লিখেও গেছেন কবিরা : ‘আর সব কিছু ভাগ হয়ে যাবে, ভাগ হবে না কো নজরুল।’ যে প্রশ্নের সামনে দাঁড়াতে হয় আমাদের তা হল- নজরুল কি সত্যিই ভাগ হলেন না? এ নিয়ে সন্দেহের জায়গা নেই নজরুল নিজে শুধু অসাম্প্রদায়িক ছিলেন তা না, উনি ছিলেন প্রকৃতঅর্থেই ধর্মনিরপেক্ষ। অনেকে বলেন শুধু ক্যাহেনেওয়ালাই নেহি, পালনেওয়ালাও ছিলেন। হিন্দু রমণী আশালতা সেনগুপ্তের সঙ্গে ওনার প্রণয় ও পরিণয় তাই দর্শায়। আশালতা বিয়ের পরে প্রমীলা দেবী নামে পরিচিত হবেন, বিয়ের পরে স্বামীর ধর্মে ধর্মান্তরিত হবেন না। এমনকি সন্তানদের নামকরণেও রয়েছে একধরনের সম্প্রীতির চেতনা। নিজের চার সন্তানের নাম রাখেন যথাক্রমে : কৃষ্ণ মহম্মদ, অরিন্দম খালেদ বুলবুল, কাজী সব্যসাচী এবং কাজী অনিরুদ্ধ। প্রথম দুই সন্তান শিশু অবস্থাতেই মারা যান। শেষের দুজনও মধ্য চল্লিশ আর পঞ্চাশের গোড়াতে মারা যান, শেষ দুজনের মৃত্যুর আগে অবশ্য নজরুল সুস্থতা হারিয়েছেন। কিন্তু প্রথম দুই শিশুসন্তানের মৃত্যু তাকে প্রচণ্ড নাড়া দিয়েছিল। শুরুতে বলেছিলাম নজরুলের ভাইয়ের কথা। নজরুল নিজেও ১৯২১ সাল নাগাদ অসহযোগ আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন, যদিও অসহযোগ আন্দোলনের পন্থা ও খিলাফত আন্দোলনের উদ্দেশ্যের সঙ্গে তিনি সহমত ছিলেন না, তবুও তিনি জড়িয়ে পড়েন, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াইকে গুরুত্ব দিতে। অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন এটি নজরুলের দ্বিচারিতা। কারণ ১৯১৭ থেকে ১৯২০ পর্যন্ত ব্রিটিশ সেনাবাহিনীরই ৪৯তম বেঙ্গল রেজিমেন্টের হাবিলদার হিসাবে কাজ করেন নজরুল। রেজিমেন্টটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তিনি সেনার কাজে ইস্তফা দেন। ব্রিটিশ সেনার হয়ে কাজ করবার অব্যবহিত পরেই তিনি ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে কলম ধরছেন, পথে নামছেন, এমনকি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাও করছেন— এ খানিক আশ্চর্য ঠেকে অনেকের কাছে। কিন্তু গভীরে বিচার করলে এখানে দ্বন্দ্বের জায়গা নেই কোনো। ছোটবেলায় অনটনের কারণে মক্তবে পড়ে বেড়ে ওঠা নজরুল লেটোর গানের পালা অবধি লিখেছেন। তাতে যেমন ‘আকবর বাদশা’ পালা আছে, তেমনি আছে ‘দাতা কর্ণ’ বা ‘মেঘনাদবধ’ পালা-ও। অনটনের কারণেই তিনি সেনাবাহিনীর ট্রায়ালে যান ও সুযোগও পান। দুটি বিষয় এইখানে লক্ষ করব আমরা। নজরুল খিদে মেটানোর প্রয়োজন থেকে ভিনধর্মের বিষয় নিয়ে পরিণত চেতনা গড়ে উঠবার আগে থেকেই যখন লেখালেখি শুরু করছেন, তখন তা প্রত্যক্ষত তার ধর্মনিরপেক্ষ চেতনার নির্মাণে সহায়তা করেছে। দ্বিতীয়ত, অনটন তাকে সাম্রাজ্যবাদের সেনাশিবিরে ভিড়িয়ে দেওয়া সত্ত্বেও, তিনি সেই জীবন এগিয়ে নিয়ে যাননি, প্রথম যে সুযোগ পেয়েছেন, সেখানেই ট্রেন থেকে নেমে ভিন্ন লাইন ধরেছেন, সাম্রাজ্যবাদী চেতনা তাকে গ্রাস করতে অক্ষম শুধু হয়নি, তাকে সাম্রাজ্যবাদের প্রতিই বিরূপ করে তুলেছে। ঘাঁটলে বরং দেখা যাবে, সেনাজীবনের তিন বছর তিনি নিজের সাহিত্য ও সঙ্গীতচর্চার ট্রেনিং করে গেছেন কেবল! খানিক আগে বলেছিলাম খিলাফতের উদ্দেশ্যের সঙ্গে তিনি সহমত ছিলেন না। তরুণ তুর্কি কামাল পাশা নজরুলের কাছে একজন কাল্ট ফিগার বলা চলে। সশস্ত্র অভ্যুত্থানে খলিফাতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে কামাল পাশা তুর্কির যে নবনির্মাণ করতে শুরু করলেন, তা নজরুলকে আবিষ্ট করে রেখেছিল। একাধিক রচনায় তার প্রমাণ মেলে। কামাল পাশার তুর্কি ইসলামের গোঁড়ামি থেকে মুক্ত তুর্কির ঘোষণা করে। এইখান থেকে নজরুলের সম্প্রীতিচেতনার একটা দিক ধরা যেতে পারে। নজরুল শুধুমাত্র হিন্দু-মুসলমান বা সর্বধর্মসমন্বয় বা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির কথাটুকু বলে থেমে যাননি। তিনি যেকোনো ধর্মেরই, এমনকি নিজধর্মেরও গোঁড়ামি, কুসংস্কারের বিরুদ্ধে বারংবার তোপ দেগেছেন। ধর্মনিরপেক্ষ হতে গিয়ে ধর্মের যাবতীয় কু-আচার সহিষ্ণু হয়ে যাননি। নজরুল ৩০০র বেশি ইসলামি গান লিখেছেন। ‘ওরে ও মদিনা বলতে পারিস কোন সে পথে তোর/ খেলত ধূলা-মাটি নিয়ে মা ফাতেমা মোর।’ ইসলামের ভিতরকার ভক্তি, আবেগকে পুঁজি করে অসংখ্য গান লিখেছেন এরকম। তবে তা শুধু নিবেদনমূলক হয়েই থেমে থাকেনি। ইসলাম যে সাম্যের ইঙ্গিত দেয় নজরুল সেই সাম্যকেই তার গানে প্রকাশ করেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ করব ‘ঈদের চাঁদ’ গানের কথা। ‘সিঁড়ি-ওয়ালাদের দুয়ারে এসেছে আজ চাষা মজুর ও বিড়িওয়ালা;/ মোদের হিস্সা আদায় করিতে ঈদে দিল হুকুম আল্লাতালা!/… নির্যাতিতের জাতি নাই, জানি মোরা মজলুম ভাই–/ জুলুমের জিন্দানে জনগণে আজাদ করিতে চাই!/ এক আল্লার সৃষ্ট সবাই, এক সেই বিচারক,/ তাঁর সে লীলার বিচার করিবে কোন ধার্মিক বক?/ বকিতে দিব না বকাসুরে আর, ঠাসিয়া ধরিব টুঁটি/ এই ভেদ-জ্ঞানে হারায়েছি মোরা ক্ষুধার অন্ন রুটি।’ আমরা নজরুলকে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উর্ধ্বে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে যত সোচ্চারে নজরুলের শ্যামাসংগীতের কথা বলি তত ঔদাসিন্যেই ওনার ইসলামি সংগীত এড়িয়ে যাই। অথচ এই অসামান্য ধর্মবোধ, যার পরতে পরতে তিনি শ্রেণিচেতনা মিশিয়ে দিচ্ছেন, মিশিয়ে দিচ্ছেন সাম্যের ধারণা, যা ভেদাভেদের পাঁকে যে মানুষ ডুবে যাচ্ছে তাকে উদ্ধার করবে আগে— তাকে আমরা স্বীকৃতি দিচ্ছি না যথার্থভাবে। এ নিয়ে নিশ্চিত সন্দেহ নেই যে নজরুল মানবতার ধর্মকেই ঊর্দ্ধে স্থান দিচ্ছেন। তার একাধিক রচনায় এই প্রমাণ আমরা পাই। অথচ তার ইসলামি গান গ্রহণ করল মুসলমানরা, শ্যামাসংগীত গ্রহণ করল হিন্দুরা। ভাগ হয়ে গেল নজরুল? এই প্রশ্ন উঠতে পারে। কিন্তু এত সহজে এর বিচার চলে না। ‘কাটায়ে উঠেছি ধর্ম-আফিম-নেশা/ ধ্বংস করেছি ধর্মযাজকী পেশা,/ ভাঙি মন্দির, ভাঙি মসজিদ/ ভাঙিয়া গির্জা গাহি সঙ্গীত,/ এক মানবের একই রক্ত মেশা/ কে শুনিবে আর ভজনালয়ের হ্রেষা!' এই মানবিক আবেদন এখন এতটা সোচ্চারে বলব এই বুকের জোর আমাদের দেশে এখন অপসৃয়মান। আমরা আইন, রাজনীতি, খেলা, দুর্নীতি, গান, সাহিত্য, অর্থনীতি, সমাজনীতি, এমনকি বিজ্ঞান, ইতিহাস ইত্যাদি নানা কিছু নিয়েও অসংখ্য বিতর্ক করতে পারি, প্রশ্ন তুলতে পারি, আক্রমণ করতে পারি, কিন্তু যখনই ধর্মনীতি নিয়ে তর্কের পরিস্থিতি তৈরি হয়, আমাদের সরে আসতে হয়, জল মেপে কথা বলতে হয়; সংবেদনশীলতার দোহাই পেড়ে আমাদের অনাচার নিয়েও কথাটুকু বলতে গেলেও এখন সাত-পাঁচ ভাবতে হয়। অথচ নজরুলের প্রকাশ কী উদাত্ত ও সত্য! তাই অবলীলায় ‘হিন্দু-মুসলমান’ প্রবন্ধে উনি লিখতে পারছেন : ‘ইহারা ধর্মমাতাল। ইহারা সত্যের আলো পান করে নাই, শাস্ত্রের অ্যালকোহল পান করিয়াছে।’ অথচ এই উচ্চারণ আজ করলে হয়ত গঙ্গায় তুফান উঠে যেত। এ খানিক আমাদেরই দায়িত্ব হওয়া উচিৎ এই উচ্চারণের দ্যোতনা জিইয়ে রাখা। ১৯২৯ সালে চট্টগ্রাম এডুকেশন (মুসলিম সংস্কৃতির চর্চা, রুদ্র-মঙ্গল) সোসাইটির প্রতিষ্ঠা উপলক্ষে অনুষ্ঠানের সভাপতির ভাষণে নজরুল বলেছেন, ‘ভারত যে আজ পরাধীন এবং আজও যে স্বাধীনতার পথে তার যাত্রা শুরু হয়নি শুধু আয়োজনেরই ঘটা হচ্ছে এবং ঘটাও ভাঙছে তার একমাত্র কারণ আমাদের হিন্দু-মুসলমানের পরস্পরের প্রতি হিংসা ও অশ্রদ্ধা।’ এই সারসত্যটুকু ওনার নজর এড়িয়ে যায়নি মোটে। এর মর্মান্তিক পরিণতি দেশভাগের বিনিময়ে স্বাধীনতালাভের যন্ত্রণা উনি অবশ্য পরে অনুভব করতে পারেননি। কিন্তু বারংবার ওনার তরফে চেষ্টা জারি রেখেছেন যাতে এর উর্দ্ধে উঠতে পারে মানুষ : 'মানবতার এই মহান যুগে একবার/ গণ্ডী কাটিয়া বাহির হইয়া আসিয়া বল যে,/ তুমি ব্রাহ্মণ নও, শূদ্র নও, হিন্দু নও, মুসলমানও নও,/ তুমি মানুষ- তুমি ধ্রুব সত্য।' ১৯৪১ সালের ৬ই এপ্রিল বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির অনুষ্ঠানে সভাপতি হিসাবে কাজী নজরুল ইসলামের বক্তব্য ওনার সুস্থ অবস্থায় শেষ প্রকাশ্য ভাষণ ছিলো। “বিংশ শতাব্দীর অসম্ভবের সম্ভাবনার যুগে আমি জন্মগ্রহণ করেছি। এরই অভিযান সেনাদলের তূর্য্যবাদকের একজন আমি— এই হোক আমার সবচেয়ে বড় পরিচয়। আমি এই দেশে, এই সমাজে জন্মেছি বলেই শুধু এই দেশেরই, এই সমাজেরই নই; আমি সকল দেশের, সকল মানুষের। কবি চায় না দান, কবি চায় অঞ্জলি। কবি চায় প্রীতি। কবিতা আর দেবতা সুন্দরের প্রকাশ। সুন্দরকে স্বীকার করতে হয়, যা সুন্দর তাই দিয়ে। সুন্দরের ধ্যান, তাঁর স্তবগানই আমার ধর্ম। তবু বলছি, আমি শুধু সুন্দরের হাতে বীণা, পায়ে পদ্মফুলই দেখিনি, তাঁর চোখে চোখ ভরা জলও দেখেছি। শ্মশানের পথে, গোরস্তানের পথে তাঁকে ক্ষুধাদীর্ণ মুর্তিতে ব্যথিত পায়ে চলে যেতে দেখেছি। যুদ্ধভূমিতে তাঁকে দেখেছি। কারাগারের অন্ধকূপে তাঁকে দেখেছি। ফাঁসির মঞ্চে তাঁকে দেখেছি। আমাকে বিদ্রোহী বলে খামোখা লোকের মনে ভয় ধরিয়ে দিয়েছেন কেউ কেউ। এ নিরীহ জাতটাকে আঁচড়ে-কামড়ে তেড়ে নিয়ে বেড়াবার ইচ্ছা আমার কোনওদিনই নেই। আমি বিদ্রোহ করেছি, বিদ্রোহের গান গেয়েছি— অন্যায়ের বিরুদ্ধে, অত্যাচারের বিরুদ্ধে, যা মিথ্যা-কলুষিত-পুরাতন-পচা, সেই মিথ্যা সনাতনের বিরুদ্ধে। ধর্মের নামে ভন্ডামি ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে। কেউ বলেন আমার বাণী যবন, কেউ বলেন কাফের। আমি বলি, ও দু’টোর কোনওটাই নয়। আমি কেবলমাত্র হিন্দু-মুসলমানকে এক জায়গায় ধরে এনে হ্যান্ডশেক করাবার চেষ্টা করেছি; গালাগালিকে গলাগলিতে পরিণত করার চেষ্টা করেছি। সে হাতে হাত মেলানো যদি হাতাহাতির চেয়ে অশোভন হয়ে থাকে, তাহলে ওরা আপনি আলাদা হয়ে যাবে। আমার গাঁটছড়ার বাঁধন কাটতে তাদের কোন বেগ পেতে হবে না। কেননা, একজনের হাতে আছে লাঠি, আরেকজনের আস্তিনে আছে ছুরি। হিন্দু-মুসলমানে দিনরাত হানাহানি, জাতিতে জাতিতে বিদ্বেষ, যুদ্ধ-বিগ্রহ। মানুষের জীবনে এক দিকে কঠোর দারিদ্র-ঋণ-অভাব; অন্যদিকে লোভী অসুরের যক্ষের ব্যাঙ্কে কোটি কোটি টাকা পাষাণ স্তূপের মতো জমা হয়ে আছে। এই অসাম্য, ভেদজ্ঞান দূর করতেই আমি এসেছিলাম। আমার কাব্যে সংগীতে কর্মজীবনে অভেদ ও সুন্দর সাম্যকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলাম।” কবিতায় নজরুল বারবার মানবতার কথা বলছেন। সাম্যের কথা বলেছেন। নজরুলকে বারবার বিদ্ধ করা হয় এই বলে যে, সমকালে জরুরি ও যথাযথ হলেও, রবীন্দ্রনাথের মতন শাশ্বত লেখনী ওনার নয়। অথচ লেখায় যে মনোভাব ও রচনার পরিচয় আমরা পাই, তা এ কথা বলে না। নজরুল ভীষণভাবে প্রাসঙ্গিক খালি নয়, আক্ষরিক অর্থেই আধুনিকও। যে সংকটের আভাস বারবার দিয়েছেন তার লেখায়, সেখান থেকে মুক্তির যে দীপ্ত পথের সন্ধান দিয়েছেন, পীড়িত মানুষের যন্ত্রণার উল্লেখ করেছেন, ধর্ম নামক প্রতিষ্ঠানটির শৃঙ্খলের কথা বলেছেন, সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে চিরন্তন ভাষ্য নির্মাণ করেছেন,— তার প্রয়োজন কোনোভাবে ফুরিয়ে যায়নি। নজরুলকে ধীরে ধীরে মুছে ফেলবার নানান ফন্দি আঁটলেও, নজরুল তার স্বভাবগুণেই ধর্মকারবারিদের মুখে ঝামা ঘষে দীপ্ত ও ভাস্বর থাকবেন। প্রকাশের তারিখ: ২৫-মে-২০২৪ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |