বেসরকারি বীজ শিল্পের স্বার্থই চরিতার্থ করবে বীজ বিল ২০২৫

সোমা মারলা
বেসরকারি বীজ কোম্পানিগুলির জাল ও খারাপ বীজ কৃষকদের ক্ষতি বাড়িয়ে দেয়। এর জন্য অপরাধী বীজ কোম্পানিগুলির বড়ো অঙ্কের জরিমানা কিংবা কঠোর শাস্তির কোনো ব্যবস্থা খসড়া বীজ বিলে রাখা হয়নি। যে শাস্তির বিধান রাখা হয়েছ তা হলো — নিম্নমানের বীজ, কিউআর কোড না-থাকা প্রভৃতি ছোটোখাটো নিয়ম লঙ্ঘনের জন্য ৫০ হাজার থেকে ১ লক্ষ টাকা জরিমানা এবং বীজের উন্নত বৈশিষ্ট্যের মিথ্যা দাবি, অঙ্কুরোদ্গমন ঠিভাবে না-হওয়ার মতো বড়ো ধরনের নিয়ম লঙ্ঘনের জন্য ১০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত জরিমানা এবং ৫ বছর পর্যন্ত জেল হতে পারে। যদি খারাপ বীজের জন্য ফসল উৎপাদন ব্যাহত হয় তাহলে কৃষককে ক্ষতিপূরণ পেতে হলে আদালতের অনুমোদনের দরকার পড়বে।

সময়মতো গুণমানসম্পন্ন  বীজ পেলে কৃষি উৎপাদন ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে কৃষি ও কৃষক কল্যাণ মন্ত্রক দ্বারা প্রস্তাবিত খসড়া বীজ বিল ২০২৫-এ প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে যে, কৃষকদের কাছে সেই গুণমানসম্পন্ন  বীজ সহজলভ্য করা হবে এই বিল সম্ভবত আগামী বাজেট অধিবেশনে পেশ হবে এই বিল আইনে পরিণত হলে তা বীজ আইন ১৯৬৬ এবং বীজ (নিয়ন্ত্রণ) অর্ডার ১৯৮৩-র স্থানে কার্যকর হবে বীজ আইন ১৯৬৬ চালু হয়েছিল সবুজ বিপ্লবের সময় যখন বীজের গুণমান, উৎপাদন এবং সরবরাহ প্রাথমিকভাবে সরকার সুনিশ্চিত করত বীজসমূহের উৎপাদন ও বিক্রির যে আইনি পরিকাঠামো এই নতুন খসড়া বীজ বিলে দেওয়া হয়েছে সেখানে বীজ সার্বভৌমত্ব ও জীবন-জীবিকার অধিকারসমূহের প্রসঙ্গে কৃষকদের ন্যায্য উদ্বেগকে বিবেচনায় আনা হয়নি

ধান, গম, ফুল, ফল ও সবজি চাষের জন্য যে বীজ প্রয়োজন হয় তার উৎপাদনে ভারত প্রায় স্বনির্ভর ভারতে প্রতিবছর ৬০ লক্ষ টন বীজ উৎপাদন হয় যার প্রায় ৮৭ শতাংশই হল ধান, গম, ভুট্টার; অবশিষ্ট শাক-সবজির বীজ স্বাধীনতার পর থেকে খাদ্যশস্য উৎপাদন ৬ গুণ, দুধ ১২ গুণ সবজি ও ফল ১০ গুণ এবং মাছ উৎপাদন ১২ গুণ বেড়েছে আমাদের দেশের ক্ষুদ্র ও ভাগচাষিদের কঠিন পরিশ্রম এবং আমাদের রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রের কৃষিবিজ্ঞানীদের কৃষিতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উদ্ভাবনের ফলেই এই সাফল্য অর্জন হয়েছিল

যদিও, ডাল ও তৈলবীজের গুণমানসম্পন্ন  বীজের সহজলভ্যতার ক্ষেত্রে এখনও এইসব বীজের উৎপাদন  এক প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে রয়েছে আজকের হিসেবে আমাদের দেশের কৃষকরা আগের মরসুমের বীজ থেকেই সঞ্চয় ও বীজবপনের ৮০ শতাংশ করে অবশিষ্ট ২০ শতাংশ বিপণন করে বেসরকারি ভারতীয় ও বিদেশি বহুজাতিক বীজ কোম্পানিগুলি তা সত্ত্বেও তুলা, টম্যাটো, ভুট্টা ও কিছু সবজির সংকর জাতীয় বীজে বেসরকারি বীজ কোম্পানিগুলি ৯০ শতাংশ বাজার দখল করে আছে বর্তমানে ভারতে ৪৫০টি বেসরকারি বীজ কোম্পানি আছে, যার ৭০ শতাংশই তেলেঙ্গানায় অবস্থিত বর্তমানে বেসরকারি বীজ কোম্পানিগুলির (বহুজাতিক কোম্পানিগুলি সহ) বাজারের আয়তন ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং অনুমিত যে ২০৩০ সালে তা ১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছবে

বেশিরভাগ দেশীয় কোম্পানি বায়ার (মনসান্টো’র সঙ্গে একীভূত হয়েছে), করটেভা এগ্রিসায়েন্স, সিনজেনটা (কেমচায়না’র অংশ) ও বিএএসএফ-এর মতো পশ্চিমের বহুজাতিক কোম্পানিগুলির সঙ্গে সংযুক্ত হচ্ছে অনেক কোম্পানির কাজকর্ম ক্ষুদ্র পরিসরে কিন্তু উচ্চমূল্যের বীজের ব্যবসা (যেমন সংকর প্রজাতির সবজি বীজ) তারা করে প্রতি মরসুমে বীজ প্রতিস্থাপনের হার-কে বৃদ্ধি করতে ও বাজারের ওপর কৃষকদের নির্ভর করে তোলার জন্য বেসরকারি বীজ কোম্পানিগুলি আরও বেশি বেশি করে ধান ও গমের মতো স্বপরাগিত খাদ্যশস্যের চাষ সংকর জাতের বীজে  রূপান্তর করতে উৎসাহিত করছে যাতে কৃষকরা প্রতিবছর ওই বীজের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে প্রস্তাবিত বীজ বিলে যেসব বিষয় রয়েছে সেগুলি হলো— বাধ্যতামূলক নিবন্ধীকরণ, বীজ শংসাপত্র প্রদানে কেন্দ্রীকরণ, সহজ ক্ষতিপূরণ, জাল বীজ বিক্রিতে শাস্তি হ্রাস এবং এই বিল বেসরকারি কোম্পানিগুলির বীজ আমদানিতে নিয়ন্ত্রণ হ্রাস ও অনুমোদনে বেশিমাত্রায় পক্ষপাতপূর্ণ দেশীয় ও বহুজাতিক কোম্পানিগুলিকে উৎসাহ দিতেই এই সব ব্যবস্থা বিলে রাখা হয়েছে  এক্ষেত্রে ক্ষুদ্র কৃষকদের স্বার্থকে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে

বিভিন্ন জাতের বীজের বাধ্যতামূলক নিবন্ধীকরণ

ক্ষুদ্র কৃষক বীজ উৎপাদকরা, কৃষি উৎপাদক সংস্থাসমূহ, মহিলা বীজ সংগ্রাহক, প্রথাগত বীজ সঞ্চয়, বীজ ব্যাঙ্কগুলিকে ব্যবসায়িক বীজ কোম্পানিগুলির গোত্রভুক্ত করা হয়েছে এই বিলে এবং বৃহৎ বীজ কোম্পানিগুলির মতোই এই ক্ষুদ্র বীজ উৎপাদক ব্যবস্থাগুলিরও নিবন্ধীকরণ করা বাধ্যতামূলক (বিলের ১২নং ধারা) ক্ষুদ্র কৃষকদের মধ্যে বীজের আদানপ্রদান, বীজবপন, বীজ পুনঃবপন,বীজ সংরক্ষণের মতো বিভিন্ন সম্প্রদায়ের যে ঐতিহ্যগত বীজ সংস্কৃতি রয়েছে তাকে উপেক্ষা করা হয়েছে প্রস্তাবিত বীজ বিলে এবং সচতুরভাবে এদের সবাইকে বীজ-ভোক্তায় রূপান্তরিত করা হয়েছে স্থানীয় প্রজাতির বীজ সংরক্ষণ ও জৈব বৈচিত্র্য রক্ষায় এই প্রক্রিয়া তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করে কিন্তু এগুলিকে ব্যবসায়িক বীজ কোম্পানিগুলির মতো বিবেচনা করা হবে এই নতুন ধারা ‘প্রোটেকশন অব প্ল্যান্ট ভ্যারাইটিস অ্যান্ড ফার্মারস রাইটস্‌ অ্যাক্ট’ (পিপিভিআরএফ ২০০১-এর ৫৩ ধারা)-কে পরিষ্কারভাবে লঙ্ঘন করছে বীজকে কেবলমাত্র একটা পণ্য হিসেবে বিবেচনা না করে যে কোম্পানি এটা বিক্রি করছে সে এর মেধাস্বত্ব অধিকারের মালিক বলে গণ্য করা হচ্ছে প্রস্তাবিত খসড়া বীজ বিল ব্যবসায়িক বীজ কোম্পানিগুলিকে বীজ বাজারে একচেটিয়া কারবারের সুযোগ করে দেবে এই বিলে ক্ষুদ্র ও ভাগচাষিদের স্বার্থকে পুরোপরি উপেক্ষা করা হয়েছে বহুজাতিক সংস্থাসহ বৃহৎ বীজ করপোরেশনগুলোকে অবাধ সুযোগ দেওয়া হয়েছে যাতে বীজ ও ভারতের বীজ বাজারকে তারা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে

বীজের শংসাপত্র প্রদান

যেকোনো বীজ ভিসিইউ (ভ্যালু ফর কালটিভেশন অ্যান্ড ইউজস) ট্রায়ালের পরই ভারতের বাজারে বিক্রির অনুমোদন পায় এই ভিসিইউ ট্রায়াল পরিচালনা করে মানক কেন্দ্রগুলি, এখনও পর্যন্ত যেগুলি হলো কাউন্সিল অব এগ্রিকালচারাল রিসার্চ, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলি কিংবা এইরকম সংস্থাগুলি নতুন খসড়া বিলে ‘অন্য সংস্থাসমূহ’-এর কথা বলা হয়েছে, যারা মানক কেন্দ্রের  প্রয়োজনীয় নির্ধারিত যোগ্যতা মানকে পূরণ করতে পারবে এটা তো কোনো গোপনীয় ব্যাপার নয় যে, বেসরকারি করপোরেশনগুলির কাছে এই ধরনের বেসরকারি মানক প্রতিষ্ঠানগুলিকে নিজেদের উদ্দেশ্যসাধনে ব্যবহার করা অনেক সহজ বিষয় এই প্রসঙ্গেই বিলে প্রস্তাব করা হয়েছে— ‘ভারতের বাইরে প্রতিষ্ঠিত যে কোনো সংস্থা এই ভিসিইউ নির্ণয়ের পরীক্ষা পরিচালনা করতে পারবে’ এই ব্যবস্থা বহুজাতিক সংস্থাগুলিকে বিরাট সুযোগ করে দেবে বীজের গুণমান নির্ণয়ে নিজেদের উদ্দেশ্যসাধন করতে

এই খসড়া বিলে বিদেশি সংস্থাগুলোকে ভিসিইউ ট্রায়াল ভারতের মাটিতে না করে বিদেশের মাটিতে করার অনুমতি দেওয়ার সুযোগ (পৃঃ ২২, আইটেম ৩৩, ১৬.৩৩) রাখা আছে এরফলে দেশের বাস্তুতন্ত্র সংক্রামিত হবার ঝুঁকি রয়ে যাচ্ছে এর দুটো দিক আছে

বিদেশে পরীক্ষিত বিভিন্ন জাতের বা প্রকরণের বীজের ট্রায়াল ভারতের জন্য উপযোগী নাও হতে পারে কেননা ভারতের ১৫টি কৃষি-জলবায়ু জোন আছে, যার প্রত্যেকটির মৃত্তিকা ও আবহাওয়ার ধরনের বিভিন্নতা রয়েছে দ্বিতীয়ত, সীমাহীন গবেষণাকৃত প্রজনন উপকরণের উদার আমদানির আড়ালে ভারতীয় বীজ কোম্পানিগুলি জিইএসি এবং অন্যান্য সরকারি নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলিকে পাশ কাটিয়ে ক্ষতিকর জেনেটিক্যালি কারিগরিপূর্ণ ও জিনোম-সম্পাদিত সংকর শস্য বীজ ভারতের গ্রামগুলিতে নিয়ে আসতে পারে একইসঙ্গে, বেসরকারি বীজ পরীক্ষণ সংস্থাগুলিকে দিয়ে পরীক্ষা করানোর যে সুযোগ খসড়া বীজ বিলে রয়েছে তাকে কাজে লাগিয়ে যথাযথ পরীক্ষা ছাড়াই বিভিন্ন প্রকরণের বীজ উচ্চফলনশীলতার ভুয়ো দাবি তুলে বেসরকারি কোম্পানিগুলি বাজারে ছাড়তে পারে অনুমোদনের আগে সমস্ত আমদানিকৃত প্রকরণের বীজ/ সংকর বীজ/ গবেষণাকৃত উপকরণকে অবশ্যই আইসিএআর কোয়ারান্টাইন ও জিএম নিরীক্ষার পরীক্ষাগারগুলি থেকে উত্তীর্ণ হতে হবে 

ডিজিটাল কোডস

এই বিলে বলা হয়েছ( ২১ডি, ১১.২, ২ডি, জেড ডি), সমস্ত বিপণনযোগ্য বীজের প্যাকেট ও ব্যাগে ডিজিটাল কিউআর কোড থাকতে হবে এই ডিজিটাল কোডের মধ্যে সমস্ত তথ্য বিবৃত করতে হবে, যেমন— গুণমান,অঙ্কুরোদগমনের শতকরা হার, ফলন, কীটনাশক, রোগ প্রভৃতি যদিও এটি একটি ভালো ব্যবস্থা তবে এই ব্যবস্থা ছোটো বীজ উৎপাদকদের ওপর একটা ডিজিটাল বোঝা চাপাবে সীমিত ইন্টারনেট পরিষেবা কিংবা ডিজিটাল সাক্ষরতার অভাবের কারণে গ্রামের ছোটো বীজ সংরক্ষকদের এই বিস্তৃত ডিজিটাল রিপোটিং, কিউআর কোডস, অনলাইন জমা এবং ধারাবাহিক যোগাযোগের কাঠামো তৈরির ব্যবস্থা করতে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দেবে

ক্ষতিপূরণের বিষয়টি লঘু করা হয়েছ

বেসরকারি বীজ কোম্পানিগুলির জাল ও খারাপ বীজ কৃষকদের ক্ষতি বাড়িয়ে দেয় এর জন্য অপরাধী বীজ কোম্পানিগুলির বড়ো অঙ্কের জরিমানা কিংবা কঠোর শাস্তির কোনো ব্যবস্থা খসড়া বীজ বিলে রাখা হয়নি যে শাস্তির বিধান রাখা হয়েছ তা হলো — নিম্নমানের বীজ, কিউআর কোড না-থাকা প্রভৃতি ছোটোখাটো নিয়ম লঙ্ঘনের জন্য ৫০ হাজার থেকে ১ লক্ষ টাকা জরিমানা এবং বীজের উন্নত বৈশিষ্ট্যের মিথ্যা দাবি, অঙ্কুরোদ্গমন ঠিভাবে না-হওয়ার মতো বড়ো ধরনের নিয়ম লঙ্ঘনের জন্য ১০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত জরিমানা এবং ৫ বছর পর্যন্ত জেল হতে পারে যদি খারাপ বীজের জন্য ফসল উৎপাদন ব্যাহত হয় তাহলে কৃষককে ক্ষতিপূরণ পেতে হলে আদালতের অনুমোদনের দরকার পড়বে বহু ছোটো কৃষকের এই সুযোগ গ্রহণ করার মতো ক্ষমতা নেই সমালোচকরা দেখিয়েছেন, এই বিলে এই সব অপরাধমূলক কাজের বিচার পাওয়ার জন্য  কোনো বাস্তব ও সহজবোধ্য কাঠামো নেই জরিমানা ও জেলের যে শাস্তির ব্যবস্থা এই বিলে করা হয়েছে তা যথেষ্ট নয়

ক্ষতিগ্রস্ত কৃষককে ক্ষতিপূরণের যে প্যাকেজ দেওয়া হবে তাতে এই বিষয়গুলি যুক্ত থাকা উচিত — ক) বীজের দাম খ) চাষের খরচ, বীজ বিমা সহ ভালো বীজে চাষ করলে কৃষকের যে পরিমাণ লাভ হতো সেই অর্থ কিন্তু প্রস্তাবিত বিলে ক্ষতিপূরণ হিসেবে শুধু বীজের দামটাই রাখা হয়েছে বিদর্ভ ও ওরাঙ্গলে কৃষকদের আত্মহত্যার বড়ো অংশই হয়েছে জাল বীজের জন্য ফসল নষ্ট হওয়ার কারণে

মূল্য নিয়ন্ত্রণের অভাব

বেসরকারি বীজ কোম্পানিগুলি যে বীজ বিক্রি করে তার ওপর এখনো পর্যন্ত কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই উদাহরণস্বরূপ, বিজি ১জিএম তুলা বীজের একটা প্যাকেটের দাম প্রায় ১৭০০ টাকা এবং সংকর প্রজাতির টোমাটো বীজের একটা ১০ গ্রাম প্যাকেটের দাম ২০ হাজার টাকার কাছাকাছি অন্যান্য সবজি বীজের দামও প্রচুর যা ছোটো কৃষকদের নাগালের বাইরে সারা ভারত কৃষক সভার দীর্ঘ সংগ্রাম ও আইনি লড়াইয়ের ফলে মনসান্টোর বিটি কটনের এক প্যাকেট বীজের দাম ৫৬০ টাকায় নামানো গেছে কিছু সবজির ক্ষেত্রে এক একরে বীজের খরচ মোট চাষের খরচের এক পঞ্চমাংশের মতো

প্রস্তাবিত বিলে বীজের সর্বোচ্চ মূল্য নির্ধারণ বা কালোবাজারি রোধে কোনো কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ নেই বেসরকারি বীজ কোম্পানিগুলির বীজের অত্যধিক দাম নির্ধারণ  করা আটকাতে সরকারকে অবশ্যই একটা কাঠামো তৈরি করতে হবে যেখানে প্রস্তাবিত বিলে বলা হয়েছে — বীজের আকাল, অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, একচেটিয়া মূল্য নির্ধারণ বা একচেটিয়া মুনাফার মতো জরুরিকালীন পরিস্থিতিতেই একমাত্র ‘সরকার বিক্রয়মূল্য নিয়ন্ত্রণ করতে পারে’ এই ধারাটি একেবারেই যথেষ্ট নয় এবং বৃহৎ বীজ করপোরেশনগুলির কায়েমি স্বার্থের প্রতি নজর রেখেই এই ব্যবস্থা করা হয়েছে ছোটো কৃষকদের বীজ পাওয়াকে সুগম করতে বীজের মূল্য নিয়ন্ত্রণে কড়া ব্যবস্থা চালু করতে হবে

বিদেশি জিএম বীজের জন্য আইনে ফাঁক

বহুজাতিক কোম্পানিগুলির বিদেশের অনুমোদিত  ফিল্ড টেস্ট (ভিসিইউ)-কে এই বিল অনুমতি দিয়েছে এর ফলে বিদেশে হওয়া ফিল্ড টেস্টের মূল্যায়নের ভিত্তিতে জিএম বীজ বা পেটেন্ট বীজ ভারতের বাজারে প্রবেশের আশঙ্কা থাকবে প্ল্যান্ট বিডার রাইটস-এর আবেদনের পরীক্ষা, প্রক্রিয়াকরণ ও ফাইলিংয়ের ক্ষেত্রে ইন্টারন্যশনাল সিস্টেম অফ করপোরেশন(আইএসসি)-কে এদেশে সহজে কার্যকর করতে ভারত সরকারের ওপর প্রচণ্ড চাপ তৈরি করেছে পশ্চিমের বহুজাতিক বীজ করপোরেশনগুলি প্রস্তাবিত বীজ বিল ২০২৫-এর কিছু ধারা রয়েছে যেখানে ভিসিইউ-র বিদেশে ফিল্ড টেস্ট, নিবন্ধীকরণের অনুমোদন ভারতের গ্রামীণ বাজারে বহুজাতিক বীজ করপোরেশনগুলিকে প্রবেশ সহজসাধ্য করবে বিটি কটন, বিটি ব্রিনজল, হারবিসাইড কটন এবং অন্যান্য এই ধরনের জিএম ফসল মাটি, মৌমাছি, পরিবেশ ও মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য বিষাক্ত ও ক্ষতিকর

রাজ্যের অধিকারকে লঙ্ঘন

কৃষি রাজ্যের বিষয় এবং বর্তমানের বীজ বিল ১৯৬৬-এ নির্দেশ রয়েছে সমস্ত রাজ্যের প্রতিনিধিত্ব সহ একটা কেন্দ্রীয় বীজ কমিটির যখন এই সময়ের প্রয়োজন অনুসারে আইনকে সময়োপযোগী করা দরকার তখন খসড়া বীজ বিলে প্রস্তাব করা হয়েছে একটা কেন্দ্রীয় বীজ কমিটির যেখানে আমলাদের আধিপত্য থাকবে এবং রাজ্যগুলিকে পাঁচটি বৃহৎ ভাগে বিভক্ত করে রাজ্য/ কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলির নামমাত্র প্রতিনিধি ওই কমিটিতে রাখা হবে কমসূচি, পরিকল্পনা, উৎপাদন, মজুত, প্রক্রিয়াকরণ এবং বীজের আমদানি ও রপ্তানি সহ সমস্ত বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা থাকবে এই কমিটির নিবন্ধীকরণ, শংসাপত্র প্রদান, পরীক্ষা প্রভৃতি এদের ওপরই নির্ভর করবে নিজের রাজ্যের পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নতুন শস্যের নিবন্ধীকরণ ও বীজ শংসাপত্র দেওয়ার যে ক্ষমতা রাজ্য সরকারের ছিল তা প্রস্তাবিত বিল অনুসারে এখন কেন্দ্রীয় বীজ কমিটির হাতে  চলে যাবে স্থানীয় আবহাওয়া ও মাটির সঙ্গে মানানসই  নতুন শস্যের প্রকরণের নিবন্ধীকরণ ও শংসাপত্র দেওয়ার ক্ষমতা রাজ্য কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলির হাতে থাকা উচিত

বিদেশি বহুজাতিক বীজ করপোরেশনগুলির  ভারতের বাজারে অবাধ প্রবেশ

বর্তমানে বায়ার (মনসান্টো), করটেভা এগ্রিসায়েন্স (ডাউডুপন্ট), সিনজেনটা (কেমচায়না’র অংশ), বিএএসএফ এবং লিমাগ্রেন আন্তর্জাতিক শস্যদানা ও বীজের বাজারের ৭০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে উন্নয়নশীল দেশগুলিতে বীজ বিক্রি নিয়ন্ত্রণ করতে বহুজাতিক করপোরেশনগুলি খাদ্যকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে আফ্রিকা ও এশিয়ায় ২০০৮ সালে বিপর্যয়কর খাদ্যের হাহাকার ও দুর্ভিক্ষের জন্য আন্তর্জাতিক এগ্রি-বিজনেস লবিই দায়ী ছিল সম্প্রতি মার্কিন শুল্ক বৃদ্ধি সেদেশে আমদানিতে প্রধান বাধা হবে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভুট্টা ও সোয়াবিন জিএম সংকর বীজের জন্য ভারতের বীজ বাজার উন্মুক্ত হয়ে যাবে

ধানের চাষের জন্য ভালো মানের বীজ যদি সরকারি  কোনো প্রতিষ্ঠান—যেমন আইসিএআর, ন্যাশনাল সিডস করপোরেশন  বা কোনো রাজ্য কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কেনা হয়, তবে সেই বীজ সংরক্ষণ করে পরের চাষের মরসুমে আবার বপন করা যায় কিন্তু কোনো বেসরকারি সংস্থার বিক্রি করা সংকর বীজ পরের মরসুমে বপন করা যায় না টার্মিনেটর বীজের মতোই এই বীজ পুনরায় বপন করলে ফলন পাওয়া যায় না

ধানের মতো স্ব-পরাগায়িত ফসলের ক্ষেত্রে কৃষক নিজের উৎপাদিত বীজ সংরক্ষণ করে পরের মরসুমে আবার ব্যবহার করতে পারেন কিন্তু জিএম (জেনেটিকালি মডিফায়েড) ও অন্যান্য সংকর বীজ পুনরায় বপন করলে ভালো ফলন দেয় না তাই সংকর বীজের ক্ষেত্রে (সাধারণ জাতের বীজের মতো নয়) কৃষককে প্রতি চাষের মরসুমে বাজার থেকে নতুন বীজ কিনতে হয় এতে বেসরকারি বীজ কোম্পানিগুলোরই লাভ হয়

এই কারণেই বর্তমানে প্রায় সব তুলা, প্রায় ৯০ শতাংশ ভুট্টা এবং অধিকাংশ সবজি বীজই সংকর জাতের ফলে কৃষকদের প্রতি চাষের মরসুমে বাজার থেকে এসব বীজ কিনতে হয় গম ও ধানের ক্ষেত্রে  তুলনায় সংকর জাতের বীজের পরিমাণ কম হলেও দাম অনেক বেশি

বিদেশি বহুজাতিক বীজ করপোরেশনগুলি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত 

প্রধান পাঁচটি আন্তর্জাতিক এগ্রি-বিজনেস বীজ বহুজাতিক করপোরেশন  বিশ্বের বীজ বাজারের ৭০ শতাংশকে নিয়ন্ত্রণ করে মাহেকো, নুজিভিদু, কাবেরি এবং অন্যান্য কয়েকটি ভারতীয় বীজ কোম্পানি বহুজাতিক করপোরেশনগুলিকে রয়ালটি দিয়ে তাদের বীজ ভারতে বিক্রি করে পশ্চিমের বহুজাতিক বীজ করপোরেশনগুলি ভারত ও অন্যান্য দেশের  বীজ,গাছের কোষ, ডিএনএ,জীবাণু  প্রভৃতি প্রজনন ও গবেষণার জন্য সংগ্রহ করে রেখে দিয়েছে এই সংগৃহীত কোষে তারা মডিফায়েড জিন যুক্ত করে (যেমন বিটি কিংবা হারবিসাইড) তারপর তারা মেধাস্বত্ব অধিকার দাবি করে এবং অতি উচ্চ মূল্যে উন্নয়নশীল দেশগুলিকে সেই নতুন বীজ বিক্রি করে ভারতের বাজারে আমাদের উচ্চমূল্যের তুলো, ভুট্টা কিংবা সবজির বিজি ১ বীজের অভিজ্ঞতা আছে প্রস্তাবিত বীজ বিল ২০২৫-এ দেশি শস্য, দীর্ঘদিন দিন ধরে ব্যবহৃত বিভিন্ন জাতের বীজের জীববৈচিত্র্যের চুরি আটকানো এবং কৃষকদের ওপর বীজের জন্য উচ্চ মূল্য চাপানো প্রতিরোধের  কোনো নিয়ন্ত্রক ক্ষমতা নেই

রাষ্ট্রায়ত্ত বীজ উৎপাদন ব্যবস্থা

সময়মতো ন্যায্যমূল্যে উচ্চ গুণমানের বীজ সরবরাহের জন্য ভারত সরকার রাষ্ট্রায়ত্ত বীজ উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিল আইসিএআর, রাজ্য কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলি, ন্যাশনাল সিডস করপোরেশন,  রাজ্য বীজ করপোরেশনসমূহ  শস্যের নতুন প্রকরণের বা জাতের বীজ তৈরি ও উৎপাদন করে খুব কম মূল্যে ক্ষুদ্র কৃষকদের কাছে পৌঁছে দিত বেসরকারি কোম্পানিগুলি তা করে না এই সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলি শস্যের নতুন ও চালু প্রকরণগুলির ভিত্তি-বীজ ও প্রজননকারী পেত আইসিএআর-এর কাছ থেকে এছাড়াও ন্যাশনাল সিডস করপোরেশন নিবন্ধীকৃত ৮ হাজার কৃষক বীজ উৎপাদকের সঙ্গে গুণমানসম্পন্ন বীজ উৎপাদনের ব্যাপারে চুক্তিবদ্ধ আছে রাজ্য সরকারগুলি এই উৎপাদকদের কাছ থেকে বীজ কিনে বীজরোপণের মরসুম শুরুর আগে তা জেলাগুলিতে কৃষকদের কাছে ভরতুকিমূল্যে বিতরণ করত অন্যান্য রাষ্ট্রায়ত্ত  কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলি ১৯৫০ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত অসংখ্য  সবজি ও ফলের সংকর বীজ ও বিভিন্ন জাতের বীজ ছাড়াও  প্রধান খাদ্যশস্যের বীজের ৭৭০টি এইচওয়াইভি প্রকরণ,২৩৬টি ডালের প্রকরণ, ২৩৫টি তৈলবীজের, ইক্ষুর ৫২টি প্রকরণ তৈরি করেছে

একইসময়ে, আইসিএআর শস্য ফসলের জন্য প্রজননগতভাবে উৎকৃষ্ট  বীজ উৎপাদন বৃদ্ধি করেছে, যার ফলে উৎপাদন ২০২১ সালে মোট প্রয়োজন ১ লক্ষ ৫ হাজার কুইন্টালকে অতিক্রম করে গেছে গুণমানসম্পন্ন বীজের উচ্চফলনশীল প্রকরণ তৈরি ও তার সহজলভ্যতা ( বেশিরভাগ আইসিএআর এবং এনএসসি উৎপাদিত) বর্তমানে খাদ্যশস্য উৎপাদন ৩০ লক্ষ টনে পৌঁছতে অবদান রেখেছে যদিও গত ১৫ বছরে কৃষিতে সক্রিয় বেসরকারিকরণ এবং নয়া-উদার অর্থনৈতিক সংস্কার নীতি রূপায়ণের ফলে আইসিএআর, রাজ্য কৃষি বিশ্ববিদ্যলয়সমূহ, ন্যাশনাল সিড করপোরেশন, রাজ্য বীজ করপোরেশনসমূহের বীজ উৎপাদনের প্রায় ৮০ শতাংশ পরিমাণ কমে গেছে এরসঙ্গেই ঠিক সময়ে জেলাগুলিতে কৃষকদের ভরতুকি মূল্যে বীজ সরবরাহ প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে ফলত কৃষকদের বীজের ব্যাপারে প্রায়  সম্পূর্ণতই বেসরকারি বীজ কোম্পানিগুলির ওপর নির্ভরশীল করে তুলেছে বিশেষকরে তুলো, ভুট্টা, মিলেট এবং সবজির ক্ষেত্রে এই সমস্যা খুবই প্রকট

বর্তমান কাঠামোয় প্রস্তাবিত বীজ বিল ২০২৫ কৃষকদের উন্নতমানের বীজ দেওয়ার কথা বললেও, ভেজাল ও নকল বীজের হাত থেকে কৃষকদের সুরক্ষা দেওয়া, কিংবা বীজের ন্যায্য ও সাশ্রয়ী মূল্য নিশ্চিত করার মতো বিষয়ে  ন্যূনতম কোনো কার্যকর ব্যবস্থার কথাও এতে উল্লেখ নেই

বীজ বিল ২০২৫-এ বিদেশি বীজ কোম্পানিগুলিকে ভারতে বাজারে প্রবেশের পৃষ্ঠপোষকতায় এবং ভারতীয় বীজ কোম্পানিগুলিকে বীজ বাণিজ্যে উৎসাহ দিতে খুবই বেশিরকমভাবে পক্ষপাতিত্ব দেখানো হয়েছে গুণমানযুক্ত বীজ সামর্থ্যের মধ্যে মূল্যে ক্ষুদ্র ও ভাগচাষিদের কাছে সহজলভ্য করতে আইসিএআর এবং অন্যান্য রাষ্ট্রায়ত্ত গবেষণা সংস্থাগুলিকে বীজ উৎপাদনের ব্যবস্থাকে সম্প্রসারিত করতে বীজ বিলে সুযোগ রাখা উচিত ছিল কিন্তু তা করা হয়নি

বেসরকারি বীজ শিল্পের অত্যধিক দামের বীজের বাস্তব ও কার্যকর বিকল্প হিসেবে অগ্রসর কৃষক এবং কৃষক সংগঠনগুলিকে একজোট হয়ে বীজ সমবায় গড়ে তোলা প্রয়োজন যাতে এই ধরনের সমবায়গুলি আইসিএআর ও রাজ্য বীজ সংস্থার উদ্ভাবিত নতুন উচ্চফলনশীল ফসলের ফাউন্ডেশন বা সার্টিফায়েড বীজ ভরতুকি মূল্যে সংগ্রহ করতে পারে এবং গ্রামস্তরে তা ব্যাপকভাবে উৎপাদন করতে সক্ষম হয়

কৃষক সংগঠনের তত্ত্বাবধানে সমবায়গুলির মাধ্যমে বীজ গ্রাম গড়ে উঠলে, ছোটো ও প্রান্তিক কৃষকদের কাছে সময়মতো এবং স্বল্পমূল্যে উন্নতমানের বীজ পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে একইসঙ্গে এই উদ্যোগ নারী কৃষকদের আয়ের সুযোগ বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে এ ছাড়া, ঐতিহ্যবাহী ও স্থানীয় পরিবেশের সঙ্গে মানানসই ফসলের বীজ সংরক্ষণ ও উৎপাদন বাড়ানো, ফসলের বৈচিত্র্য রক্ষা করার পাশাপাশি বীজের উপর কৃষকের অধিকার ও স্বনির্ভরতা বজায় রাখার এটা একটস গুরুত্বপূর্ণ উপায়

[ড. সোমা এস মারলা প্রধান বৈজ্ঞানিক (জিনোমিক্স), অবসরপ্রাপ্ত, আইসিএআর এনবিপিজিআর, নতুন দিল্লি: প্রাক্তন অ্যাসোসিয়েটস প্রফেসর (বায়োইনফরমেটিক্স), ভারজিনিয়া ইউনিভার্সিটি, ব্ল্যাকসবার্গ, ইউএসএ]

ভাষান্তর: শংকর মুখার্জি


প্রকাশের তারিখ: ০৭-মার্চ-২০২৬

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org