সোনার রাজদণ্ড: একটি আবেদন

সি.এন আন্নাদুরাই
নতুন ভারতের যে প্রতীকগুলি নরেন্দ্র  মোদি তুলে ধরতে চাইছেন—  অযোধ্যায় রামমন্দির নির্মাণ, সেন্ট্রাল ভিস্টা ও নতুন সংসদ ভবন, এগুলো সবই নতুন স্বৈরতন্ত্রী হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্যসূচক চিহ্ন। নতুন এই ন্যারেটিভের উপযোগী করে তুলতে গিয়ে ইতিহাসকে বিকৃত করা হচ্ছে এবং কাল্পনিক ইতিহাস নির্মাণ করা হচ্ছে।

(দ্রাবিড় কাজাঘামের সভাপতি কে. বীরামণি সম্পাদিত তামিল দৈনিক ‘বিদুথালাই’ সম্প্রতি চিত্তাকর্ষক এবং উদ্ঘাটনমূলক সংবাদের একটি সাহিত্যরসসমৃদ্ধ নিবন্ধ পুনঃপ্রকাশ করেছে যা ১৯৪৭ সালের ২৪ আগস্ট তামিল সাপ্তাহিক ‘দ্রাবিড় নাড়ু’তে প্রকাশিত হয়েছিল। নিবন্ধের বিষয় ছিল ১৪ আগস্ট, ১৯৪৭ তামিলনাড়ুর শৈব মঠ থিরুবাডুথুরাই অধীনমের আচার্যের প্রতিনিধিদের ভারতের আগতপ্রায় প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর বাড়ি গিয়ে তাঁর হাতে স্বর্ণ রাজদণ্ড অর্পণ। নিবন্ধের লেখক ছিলেন সেই সাপ্তাহিকের সম্পাদক ও ১৯৪৯ সালের সেপ্টেম্বরে দ্রাবিড় মুন্নেত্রা কাজাঘামের প্রতিষ্ঠাতা এবং তামিলনাড়ুর পরবর্তী সময়ের মুখ্যমন্ত্রী সি, এন আন্নাদুরাই। কট্টর ব্রাহ্মণ্যতন্ত্র বিরোধী আন্নাদুরাই ধর্মীয় মঠগুলিকে, বিশেষ করে শৈব অধীনমগুলিকে তীব্র ঘৃণা করতেন। তিনি মনে করতেন, মানুষের মন ও দৈনন্দিন জীবনকে এই মঠগুলি শোষণ করে। তাদের কার্যকলাপের অন্তরালে থাকা দুরভিসন্ধিগুলির তিনি তীব্র বিরোধিতা করতেন। ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ, ইঙ্গিত ও অনুপ্রাসের মিশ্রণ ও অতীত স্মৃতিলাঞ্ছিত শব্দাবলীর ব্যবহারের সাথে লেখকের নিজস্ব শৈলীর মাধ্যমে সমগ্র বিষয়টি এই নিবন্ধে ফুটে উঠেছে। আন্নাদুরাই নতুন সরকার, বিশেষ নেহরুকে করে সতর্ক করে দিয়েছিলেন এর পেছনে থাকা দুরভিসন্ধি এবং এই 'রাজদণ্ড' অর্পণের সমাজ-রাজনৈতিক তাৎপর্য সম্পর্কে, যাকে তিনি অভিহিত করেছেন জনসাধারণের শোষকদের তরফে নিজেদের রক্ষা করার আবেদন হিসেবে। এখানে সেই নিবন্ধের অংশ তুলে ধরা হল। সেই সঙ্গে, এখানে পিপলস ডেমোক্রেসি পত্রিকার সাম্প্রতিক সংখ্যার সম্পাদকীয়ও যুক্ত করা হল। )


থিরুবাডুথুরাই মঠের অধীনাকর্তা নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুকে একটি সেঙ্গোল (স্বর্ণ রাজদণ্ড) উপহার দিয়েছেন।

শোনা গেল, এর উচ্চতা পাঁচ ফুট। এবং তা খাঁটি সোনা দিয়ে তৈরি। এই সেঙ্গোল দিতে যাওয়ার কারণ কী? এটা কি উপহার? নাকি একটা উপাচার? একটা অংশীদারিত্ব প্রদান? নাকি কোনো অনুজ্ঞাপত্রের মাশুল?

এটা একেবারেই অপ্রত্যাশিত। তবে এটুকুই কি শুধু বলবার? এটা আসলে অপ্রয়োজনীয়। শুধু অপ্রয়োজনীয় হলেও কিছু মনে করার থাকত না। কিন্তু এর পেছনে লুকিয়ে থাকা গভীরতর তাৎপর্য নিয়ে যদি কেউ ভাবে, তখন বিপদটা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

প্রথম দর্শনের মুহূর্তে পণ্ডিত নেহরু সেঙ্গোল নিয়ে কী ভেবে থাকতে পারেন? আমরা সেটা জানি না। অধীনাকর্তা কি সঙ্গে কোনও বার্তাও প্রেরণ করেছিলেন? সেটাও কারও জানা নেই।
কিন্তু পণ্ডিত নেহরু, যিনি এই সেঙ্গোল গ্রহণ করেছেন, তাঁকে আমাদের কিছু কথা বলার রয়েছে।

আপনি সারা বিশ্বের নানা দেশের ইতিহাস সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। জানেন সেই মুকুটধারী রাজা ও তাদের অমাত্যবর্গদের, যারা প্রজাদের খাটতে বাধ্য করে এবং তাদের খাটুনির ফলে নিজেরা ফুলেফেঁপে ওঠে। আপনি এ সম্পর্কেও যথেষ্ট অবগত যে তাদেরও ধর্ম ছিল যা তাদের নিজেদের সঞ্চিত ধনের মত সোনার দুর্গে অবাধে বিচরণশীল ছিল। আপনি এ সম্পর্কেও সচেতন যে গণতন্ত্র অর্থাৎ জনগণের শাসন প্রসারের ঐতিহাসিক প্রয়োজনীয়তা পূরণে এই ধরনের শক্তির অপসারণ কতটা জরুরি। আপনি প্রশাসন পরিচালনার ক্ষেত্রে আপনার এই জ্ঞানকে ব্যবহার করবেন এই ভয় থেকেই অধীনাকর্তা আপনার হাতে শুধু স্বর্ণ রাজদণ্ড অর্পণ করতে এগিয়ে আসেননি, নবরত্ন খচিত এই দণ্ড অর্পণ করেছেন নিজেদের সুরক্ষিত রাখতে। একজন কেউ ঈশ্বরের আশীর্বাদ কামনায় একটা ভজন বা পথিকম গেয়েছেন আর অমনি একটা সেঙ্গোল বা রাজদণ্ড অলৌকিকভাবে সোনা পিটিয়ে গড়া হয়ে গেল, ব্যাপারটা তো আর এমন নয়। অথবা এমনও নয় যে, শৈব ভক্তদের গল্পে যেভাবে শেয়াল ঘোড়ায় পরিণত হয় তেমনি একটা লোহার টুকরোর ওপর পবিত্র ভস্ম ছড়িয়ে দিতেই সেটা একটা স্বর্ণ রাজদণ্ড হয়ে গেল। মোদ্দা কথা, অন্যের শ্রমকে এখানে তাদের উপঢৌকন সেঙ্গোলে পরিণত করা হয়েছে। প্রকৃত সত্য সেটাই তো?

কোনো গড়পড়তা সাধারণ মানুষ এই উপহার তুলে দেননি। তাহলে তিনি কি কোনও রাজবংশের মানুষ? না, তিনি তার চেয়েও বড়ো। তিনি কি কোনও প্রাচীন বংশধারা বহন করছেন? তাঁর উত্তরাধিকার প্রাচীনতর বংশের, নাকি সদ্য গজিয়ে ওঠা কোনো অর্বাচীনের, এর ন্যূনতম গুরুত্বও নেই। এটা কোনো জাগতিক বংশধারার উত্তরাধিকার সম্পর্কিত নয়। এটা মহান কৈলাসের উত্তরাধিকারের প্রতিনিধিত্ব করছে।

আন্নান (অগ্রজ) : আমাদের অধীনমের হঠাৎ এ কী হল? (অধীনম কথাটা মঠ এবং মঠাধ্যক্ষ, যাকে অধীনকর্তারও বলা হয়, এই দুই অর্থেই ব্যবহৃত হতে পারে।)

হঠাৎ করে আমাদের অধীনম কেনই বা দেশপ্রেমে ভেসে যাচ্ছেন এটা তুমি আমাকে জিজ্ঞেস করছো, থাম্বী (অনুজ)?

আমাদের অধীনমের দৃষ্টি যাতে নতুন সরকারের দিকে নিক্ষিপ্ত হয়, এটা কি সেই শুভ সংযোগের জন্যেই? এটাই আমার প্রশ্ন। এটা আমার একইসঙ্গে সন্দেহও। এটা একটা বিস্ময়কর রাজদণ্ড, যা নিপুণভাবে নির্মিত। কিন্তু এটা হস্তগত করা এবং সরকার পরিচালনা করা.....

থাম্বী (অনুজ)! এখানে সোনা হল সেই মানুষ যে নিজের দারিদ্র্যের পরোয়া করে না, যার উপবাসে দিনরাত কাটে, যে অপরকে লুন্ঠন করে, যে হাড়মাস এক করে খেটে মরে, যে মজুরি কেটে নেয়, মাঠে যে শ্রম দেয় তাকে যে অত্যাচারিত করে, যারা মুনাফাজীবী, যে ঋণ নিয়ে দাতাকে প্রতারিত করে- তারাই সেই মানুষ যারা নিজেদের কুকর্ম ঢাকতে উপহার প্রদান করছে, নিজেদের পাপ স্খালন করতে। বলা যায়, খোদ ঈশ্বরের চোখেই ধুলো দিতে। এখানেও বিষয়টা সেটাই নয় কি? এবং নতুন পথে যাত্রা শুরু করতে যাওয়া একটি নতুন সরকার যদি এই সমস্ত মানুষ যারা প্রথমে মানুষের মন এবং তারপর তার জীবনকে শোষণ করার মধ্য দিয়ে মুনাফা রোজগার করে, তাদের হাত থেকে সেঙ্গোল গ্রহণ করলে সেটা কি শাসনকর্মের জন্যে শুভ ইঙ্গিত বহন করবে?

তুমি হাস্যকর কথা বলছো, আন্নান (অগ্রজ)

এতে কৌতুক কিছু নেই, থাম্বী (অনুজ)। আমার আসলে ভীষণ উদ্বেগ হচ্ছে। যারা সেঙ্গোল তৈরি করেছে তারা হয়ত এভাবে কথা বলেনি। কিন্তু নিশ্চিতভাবেই তারা এমন চিন্তাকে এড়িয়ে থাকতে পারেনি।

সেঙ্গোলের দিকে আরেকবার দৃষ্টি নিক্ষেপ করুন, এবার একটু তীক্ষ্ণ চোখে।

এখানে শুধু প্রকট হয়ে থাকা ষাঁড়টিই নয়, গবাদিপশুর মত খেটে মরা গরিব জনতাকেও দেখতে পাবেন।

যা চোখে পড়বে তা শুধু একটি ঝাঁ চকচকে শিল্পকর্ম নয়, যারা অন্যের শ্রম লুট করে নেয় তাদের চামড়ার ঔজ্জ্বল্যও দেখতে পাবেন।

দেখতে পাবেন হাজার হাজার ভেলিস (ভূমি মাপার তামিল একক) চাষের জমি। ছবি ভেসে উঠবে সেইসব সর্বহারাদেরও যারা সেখানে লাঙল চালায়, আবাদ করে এবং তারপরও চোখের জলে দিন অতিবাহিত করে। চোখে পড়বে সেই ঘুপচি ঘর যেখানে সে প্রাণপণে ঠাঁই জোটায়। এই সেঙ্গোল যে সুকঠিন দারিদ্র্য চাপিয়ে দিয়েছে সেখানে তাও নজরে আসবে। চোখে পড়বে জমিদারদের এবং তাদের হর্ম্যরাজিও। দেখা যাবে সোনার থালা ও তার ওপরে সাদা ধুলোর আস্তরণ। হতাশ চোখ ও ক্লান্ত শরীর। গলগল করে বেরোনো ঘাম ও রক্তদৃষ্টি এড়িয়ে যাবে না আপনার। ঘেঁটে যাওয়া দধির মত ভেঙে পড়া মানুষটিকেও দেখতে পাবেন।

দেখতে পাবেন মঠ, তাকে প্রদক্ষিণরত শৈব ভক্তদল। তাদের অঙ্গসজ্জা। এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তাদের অন্তঃস্থিত অস্থিরতাকে।

চোখে পড়বে বাগান এবং যে জলাশয়ে তারা স্নান করে তাকে। এই জলাশয়গুলি যদি কথা বলতে পারত তবে হয়ত অনেক কাহিনি শুনতে পেতেন আপনি।

দেখবেন শৈব সন্ন্যাসীদের এবং ‘যেভাবে’ তাদের কারো কারো ওপর কৃপা বর্ষিত হয়ে জীবনে সুউচ্চে আরোহণ করেছে।

চকমক করে দুলতে থাকা কানের দুল, সোনার পা এবং যে ভক্তরা তা জড়িয়ে থাকে এবং এমনতর আরো অনেক জ্বলজ্বল করতে থাকা ছবি দেখা যাবে এবং নিজেও প্রকট হবে যদি সেঙ্গোলের দিকে আপনি ফিরে ফিরে তাকান।

'আহা! অবিস্মরণীয়! যতই দুরূহ হোক এ কাজ, অধীনম প্রসন্ন হয়েছেন এবং আমরাও আশীর্বাদ ধন্য হলাম'। যারাই অধীনমে আসবে তারাই একথা বলবে। যে ভক্তদের মন ততটা খুশি নয় তাদের মুখে সেটাই তবুও দেখা যাবে। আরো অনেক অনেক কিছু দেখতে পাবেন।

কিছুক্ষণের জন্যে ভুলে যাওয়া যাক যে এটা খাঁটি সোনার তৈরি এবং পাঁচ ফুট দৈর্ঘ্যের ও সুনিপুণ ভাবে নির্মিত। এটা ভুলে গিয়ে একবার সেঙ্গোলের দিকে দৃষ্টি দিন। আর তখনই বোধগম্য হবে যে এই মঠাধ্যক্ষ ও অভিজাতদের দল জনতার রোষকে কতটা ভয় পায়। কিন্তু অধীনম দৃঢ়ভাবে আসীন রয়েছেন কোনো ভয় বা উদ্বেগ ব্যতিরেকেই। আর ভক্তরা ভয়ে তার পায়ে লুটাচ্ছে। সরকার তাকে সুরক্ষা দিচ্ছে এবং ধনবানেরা বাহিনী প্রেরণ করছে। সেঙ্গোল একটি আবেদন। এটা কোনও উপহার নয়, ভালোবাসার অভিব্যক্তি নয়। এমনকী দেশপ্রেমেরও প্রতীক নয়।

শাসকেরা! আজ সময় এসেছে যখন যে মানুষেরা অনেক কিছু জ্ঞাত হয়েছে, তারা দাবি জানাচ্ছে, জনগণকে পায়ে লুটিয়ে পড়তে বাধ্য করে প্রভূত সুনাম ও সম্পদ অর্জন করা অধীনমকে চূর্ণ করে ফেলার। তারা বলছে, আমাদের শাসন অবসানের এটাই সময়। আমরাই প্রকৃত সন্ন্যাসী! আপনার জন্যে আমাদের অপরিসীম ভালোবাসা। যদি কোনও সন্দেহ থাকে, তবে আরেকবার দৃষ্টি নিক্ষেপ করুন সেঙ্গোলের ওপর - পাঁচ ফুট উচ্চতা ও সুনিপুণ কর্মকুশলতা। যারা নতুন ব্যবস্থার দাবি জানিয়ে আক্রমণাত্মক কথাবার্তা বলছে তাদের হাত থেকে আমাদের অধীনমকে রক্ষা করুন। আমাদের প্রভু, নেহরু! আমাদের অন্তত আরো দু'দশকের জীবনদান করুন।

এটাই অধীনাকর্তার প্রার্থনা। এই সেঙ্গোল প্রদান করে, সরকারের সাথে তাদের বন্ধুত্ব প্রমাণে একে প্রদর্শন করার মধ্য দিয়ে তারা সাধারণ মানুষকে আরো প্রতারিত করতে চায়। নেহরু সরকারের প্রিয়পাত্র অধীনম ইতিমধ্যেই ভগবান শিবের কৃপালাভ করেছেন এবং অতএব তার আধিপত্যের সংকোচন বা অবসান কিছুই হচ্ছে না। অথবা মানুষই এ নিয়ে ভাবতে বাধ্য হবে।

এর পুরোটাই সোনার। আর এটা সর্বত্যাগী সন্ন্যাসীদের পথ গ্রহণ করা অধীনমদের গচ্ছিত বিপুল ধনসম্পদের সামান্য একটি অংশ মাত্র।

অধীনমদের কাছেই নবরত্নে ভরা ভাণ্ডার রয়েছে। নবরত্নের চেয়েও মহার্ঘ্য যে ফসলের উর্বর ভূমি সেখানেও অধীনমদের কর্তৃত্ব।

মানবজাতির সর্বাধিক মহার্ঘ্য অংশ যে সর্বহারা তারা সেখানে পদানত ও অত্যাচারিত। তঞ্চকের দল অধীনমদের 'সিদ্ধার' নামে অভিহিত করে। প্রতারিত জনতার উপাচার হিসেবে দেওয়া যে বিপুল অর্থ, তার এক অতি সামান্য অংশই সেঙ্গোলে ব্যয় হয়ে আপনার কাছে পৌঁছেছে।

এর চেয়ে অনেক বেশি অর্থ সংগৃহীত হয়েছে (সেঙ্গোলে যতটা খরচ হয়েছে তার তুলনায়) এবং এগুলো গেছে কানের দুল, নুপুর ও অন্যান্য গহনার খাতে।
আপনি দেখতে পাবেন খাঁটি সোনা স্তুপাকৃত হয়ে আছে সেখানে। এ দিয়েই সেঙ্গোল তৈরি হয়েছে এবং অধীনমগুলির দীর্ঘতর আয়ুর স্বার্থে অর্পণ করা হয়েছে। অধীনমগুলি সহ অন্যান্য ধর্মস্থানের অর্থ যদি বাজেয়াপ্ত করা হয় এবং দেশের নাগরিকদের সচ্ছলতা বৃদ্ধিতে ব্যবহার করা হয়, তখন অধীনমদের প্রদান করা সেঙ্গোল আর অলঙ্কার থাকবে না, বরং জনগণের জীবনের মান উন্নত করবে এবং তখনই সম্মানের সাথে প্রদত্ত হবে। আমরা তাই আবেদন রাখছি, আপনি মাঝে মাঝেই সেঙ্গোলের প্রতি দৃষ্টিনিক্ষেপ করুন এবং এর থেকে গৃহীত শিক্ষার প্রতি মনোনিবেশ করুন।

পিপলস ডেমোক্রেসি’র সম্পাদকীয়

সেঙ্গোল নিয়ে আশ্চর্য কারসাজি

২৮ মে নতুন সংসদ ভবনের উদ্বোধন অনুষ্ঠান বয়কট করেছে ২০টি বিরোধী দল। যে যুক্তিতে তারা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা হল, মোদি সরকার রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুকে এড়িয়ে গিয়ে কাজ করেছে। অথচ তিনিই রাষ্ট্রপ্রধান এবং একইসঙ্গে সংসদেরও প্রধান। তার বদলে সরকারের তরফে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে প্রধানমন্ত্রী মোদিই নতুন সংসদের উদ্বোধন করবেন। এভাবে শাসন বিভাগের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিকে সংসদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়াটা সাংবিধানিকভাবে একেবারে অনুচিত একটা কাজ। সেকারণেই বিরোধীদের প্রতিবাদ জানানোর কারণটা ছিল বৈধ। 

কিন্তু উদ্বোধনের দিন যেসব ঘটনা ক্রমশ সামনে এল তাতে বিরোধীদের ওই অনুষ্ঠান থেকে দূরে সরে থাকার সিদ্ধান্তটাই জোরদার হয়েছে। হঠাৎ করেই, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, অমিত শাহ,ঘোষণা করেন যে, একটা সেঙ্গোল (‌রাজদণ্ড)‌ যা ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেন জওহরলাল নেহরুর হাতে তুলে দিয়েছিলেন ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রতীক হিসাবে, সেটাকেই সংসদের ভেতর স্থাপনা করা হবে। অমিত শাহের কথায়, ‌‌‌‘ভারতে ক্ষমতা হস্তান্তর হয়েছিল পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুর হাতে সেঙ্গোল তুলে দেওয়ার মাধ্যমে।’‌ এভাবে, একটি হিন্দু ধর্মীয় শিল্পকর্মকে ব্রিটিশদের হাত থেকে নতুন সরকারের হাতে ‌‌‌‘‌ক্ষমতা হস্তান্তরের’‌  প্রতীক হিসাবে দাঁড় করিয়ে পুরোপুরি আষাঢ়ে গল্প ফাঁদা হল। 

এবিষয়ে সরকারি ভাবে ঘোষণা করা হল যে, লর্ড মাউন্টব্যাটেন জওহরলাল নেহরুর কাছে জানতে চেয়েছিলেন ক্ষমতা হস্তান্তরের সঙ্গে মানানসই কোনও ভারতীয় প্রথা আছে কিনা। তখন নেহরু বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন প্রবীণ কংগ্রেস নেতা সি রাজাগোপালাচারীর সঙ্গে। রাজাগোপালাচারী তামিলনাড়ুর ধর্মীয় মঠে খোঁজখবর নেন এবং তার ভিত্তিতে পরামর্শ দেন যে, সেঙ্গোলকেই ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রতীক করা উচিত। সরকারিভাবে একইসঙ্গে একথাও বলা হল যে, লর্ড মাউন্টব্যাটেন নিজে ১৪ আগস্ট রাতে নিজে ওই সেঙ্গোল নেহরুর হাতে তুলে দেন সংবিধান পরিষদে সরকারি বৈঠক শুরুর আগে। 

কিন্তু সেঙ্গোল বিষয়ে আসল তথ্য কী?‌ এই রাজদণ্ডের ইতিহাসই বা কী?‌ এবিষয়ে কোনও নথি বা প্রমাণ নেই যে, ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রতীক হিসাবে ব্যবহারের জন্য মাউন্টব্যাটেন নেহরুকে কিছু বলেছিলেন। এব্যাপারে রাজাজির ভূমিকারও কোনও প্রমাণ নেই। ঘটনা হল মাউন্টব্যাটেনও নিজে নেহরুর হাতে সেঙ্গোল তুলে দেননি। ১৩ আগস্ট বিকেলে তিনি করাচি চলে যান এবং ১৪ আগস্ট অনেক রাতে দিল্লি ফেরেন। 

তামিলনাড়ুর একটি শৈব মঠের আদেশেই সেঙ্গোলটি নির্মাণ করা হয়েছিল। এরপর সেটিকে দিল্লিতে আনা হয় এবং ১৪ তারিখ রাতে নেহরুর বাসভবনে সেটি তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হয়। এই হস্তান্তরের সময় কোনও সরকারি অনুষ্ঠান হয়নি। গোটা বিষয়টা ছিল পুরোপুরি বেসরকারি উদ্যোগ। ঘটনা হল আরও অনেক উপহারের মতো নেহরু সেঙ্গোলটিও গ্রহণ করেছিলেন এবং পরে তার স্থান হয় এলাহাবাদ মিউজিয়ামে। এথেকেই বোঝা যায় নেহরু বিষয়টিকে কীভাবে দেখেছিলেন। 

১৪ আগস্ট রাতে ‘ক্ষমতার হস্তান্তর’ হয়েছিল সেঙ্গোল হস্তান্তরের মধ্যে দিয়ে—  এইরকম ভুয়ো দাবিআসলে বিজেপি-আরএসএস-এর ন্যারেটিভের সঙ্গে খাপ খেয়ে যায়। এই ভাবে তারা বোঝাতে চায়  যে, শতাব্দীব্যাপী দাসত্বের অবসান হয়েছিল হিন্দু রাজ-এর পুনরুত্থানের মধ্যে দিয়ে। ক্ষমতা হস্তান্তরের এই ‘হিন্দুত্বকরণ’ করা হয়েছে স্রেফ একটা অনৈতিহাসিক ভোজবাজির সাহায্যে যেখানে ঘটনার তথাকথিত নায়কদের তৈরি করা ভূমিকায় নামিয়ে অভিনয় করানো হয়েছে। সেঙ্গোল নিয়ে এই একটাই কাহিনি রচনা করা হয়েছিল এবং তা রচনা করেছিলেন আরএসএস-এর মতাদর্শের ধ্বজাধারী এস গুরুমূর্তি। ২০২১ সালেই এই কাহিনি তিনি একটি তামিল পত্রিকায় লিখেছিলেন। 

প্রধানমন্ত্রী মোদি সেঙ্গোল দুহাতে ধরে বয়ে নিয়ে যাচ্ছেন এবং তাঁকে অনুসরণ করে আদিনামরা (‌মঠের পুরোহিত এবং প্রধানেরা)‌ সারি দিয়ে হেঁটে চলেছেন সেটিকে স্পিকারের চেয়ারের পিছনে প্রতিষ্ঠা করার জন্য—  ২৮ মে-র সকালের এই দৃশ্য এক নতুন ভারতের প্রতীকের অংশ, যে নতুন ভারত হিন্দু রাষ্ট্রকে অনুকরণ করতে চাইছে। এটা পুরোপুরি ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের বিরোধী। ঐতিহ্যগতভাবে সেঙ্গোল হল একটা রাজদণ্ড যা প্রধান পুরোহিত রাজ্যাভিষেকের পর নতুন রাজার হাতে তুলে দেন ন্যায়পরয়াণতার সঙ্গে রাজ্যশাসন করার জন্য। গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রে এর কোনও স্থান নেই। কারণ গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রে নাগরিকেরাই তাঁদের সরকারকে নির্বাচিত করেন। কোনও ধর্মীয় প্রতীককে সংসদের গুরুত্বপূর্ণ একটা জায়গায় স্থাপন করাটাও প্রজাতন্ত্রের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রের বিরোধী।

২৮ মে দিনটিকে নতুন সংসদ ভবন উদ্বোধনের দিন হিসাবে বেছে নেওয়া হয়েছিল এই কারণেও যে, ওই দিনটি ছিল ভিডি সাভারকারের জন্মবার্ষিকী। এর ফলে ওই দিনটিকে ব্যবহারও করা হয়েছে এক নতুন ভারতের ন্যারেটিভ গড়ে তোলার লক্ষ্যে। সাভারকার জীবন শুরু করেন স্বাধীনতা সংগ্রামী হিসাবে। আন্দামানের সেলুলার জেল থেকে তাঁকে ছেড়ে দেওয়ার পর তিনি ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে পাট তিনি তুলে দেন। বার বার ক্ষমাভিক্ষার আর্জি পেশ করার পরেই ব্রিটিশরা তাকে জেল থেকে ছেড়ে দিয়েছিল। এরপর থেকে তিনি দেশের পূর্বতন মুসলিম শাসকদের বিরুদ্ধে এবং হিন্দুত্বের প্রতিষ্ঠাকল্পে লড়াই শুরু করেন। বিজেপি শাসকেরা সাভারকারের হিন্দুত্বকে অনুমোদন করেন এবং হিন্দু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকে দেখেন হাজার বছরের দাসত্বের অবসানের পর চূড়ান্ত সাফল্যের শীর্ষবিন্দু হিসাবে। 

সেঙ্গোল ধর্ম (‌ন্যায়পরায়ণতা)‌–এর প্রতীক—  বিজেপি শাসকদের এহেন দাবির বৈধতা সেইদিনেই প্রবলভাবে ক্ষয়ের মুখে পড়ে, কারণ ওই দিনেই নতুন সংসদ ভবন থেকে কয়েক শ মিটার দূরত্বে মহিলা কুস্তিগিরেরা, যাঁরা শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ দেখাচ্ছিলেন, তাঁদের পুলিশ নির্মমভাবে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে গিয়ে গ্রেপ্তার করে। 

নতুন ভারতের যে প্রতীকগুলি নরেন্দ্র  মোদি তুলে ধরতে চাইছেন—  অযোধ্যায় রামমন্দির নির্মাণ, সেন্ট্রাল ভিস্টা ও নতুন সংসদ ভবন, এগুলো সবই নতুন স্বৈরতন্ত্রী হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্যসূচক চিহ্ন। নতুন এই ন্যারেটিভের উপযোগী করে তুলতে গিয়ে ইতিহাসকে বিকৃত করা হচ্ছে এবং কাল্পনিক ইতিহাস নির্মাণ করা হচ্ছে।

  ৩১ মে, ২০২৩‌


ভাষান্তর: শুভপ্রসাদ নন্দী মজুমদার ও সুচিক্কণ দাস


প্রকাশের তারিখ: ০৭-জুন-২০২৩

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org