|
সোনার রাজদণ্ড: একটি আবেদনসি.এন আন্নাদুরাই |
নতুন ভারতের যে প্রতীকগুলি নরেন্দ্র মোদি তুলে ধরতে চাইছেন— অযোধ্যায় রামমন্দির নির্মাণ, সেন্ট্রাল ভিস্টা ও নতুন সংসদ ভবন, এগুলো সবই নতুন স্বৈরতন্ত্রী হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্যসূচক চিহ্ন। নতুন এই ন্যারেটিভের উপযোগী করে তুলতে গিয়ে ইতিহাসকে বিকৃত করা হচ্ছে এবং কাল্পনিক ইতিহাস নির্মাণ করা হচ্ছে। |
(দ্রাবিড় কাজাঘামের সভাপতি কে. বীরামণি সম্পাদিত তামিল দৈনিক ‘বিদুথালাই’ সম্প্রতি চিত্তাকর্ষক এবং উদ্ঘাটনমূলক সংবাদের একটি সাহিত্যরসসমৃদ্ধ নিবন্ধ পুনঃপ্রকাশ করেছে যা ১৯৪৭ সালের ২৪ আগস্ট তামিল সাপ্তাহিক ‘দ্রাবিড় নাড়ু’তে প্রকাশিত হয়েছিল। নিবন্ধের বিষয় ছিল ১৪ আগস্ট, ১৯৪৭ তামিলনাড়ুর শৈব মঠ থিরুবাডুথুরাই অধীনমের আচার্যের প্রতিনিধিদের ভারতের আগতপ্রায় প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর বাড়ি গিয়ে তাঁর হাতে স্বর্ণ রাজদণ্ড অর্পণ। নিবন্ধের লেখক ছিলেন সেই সাপ্তাহিকের সম্পাদক ও ১৯৪৯ সালের সেপ্টেম্বরে দ্রাবিড় মুন্নেত্রা কাজাঘামের প্রতিষ্ঠাতা এবং তামিলনাড়ুর পরবর্তী সময়ের মুখ্যমন্ত্রী সি, এন আন্নাদুরাই। কট্টর ব্রাহ্মণ্যতন্ত্র বিরোধী আন্নাদুরাই ধর্মীয় মঠগুলিকে, বিশেষ করে শৈব অধীনমগুলিকে তীব্র ঘৃণা করতেন। তিনি মনে করতেন, মানুষের মন ও দৈনন্দিন জীবনকে এই মঠগুলি শোষণ করে। তাদের কার্যকলাপের অন্তরালে থাকা দুরভিসন্ধিগুলির তিনি তীব্র বিরোধিতা করতেন। ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ, ইঙ্গিত ও অনুপ্রাসের মিশ্রণ ও অতীত স্মৃতিলাঞ্ছিত শব্দাবলীর ব্যবহারের সাথে লেখকের নিজস্ব শৈলীর মাধ্যমে সমগ্র বিষয়টি এই নিবন্ধে ফুটে উঠেছে। আন্নাদুরাই নতুন সরকার, বিশেষ নেহরুকে করে সতর্ক করে দিয়েছিলেন এর পেছনে থাকা দুরভিসন্ধি এবং এই 'রাজদণ্ড' অর্পণের সমাজ-রাজনৈতিক তাৎপর্য সম্পর্কে, যাকে তিনি অভিহিত করেছেন জনসাধারণের শোষকদের তরফে নিজেদের রক্ষা করার আবেদন হিসেবে। এখানে সেই নিবন্ধের অংশ তুলে ধরা হল। সেই সঙ্গে, এখানে পিপলস ডেমোক্রেসি পত্রিকার সাম্প্রতিক সংখ্যার সম্পাদকীয়ও যুক্ত করা হল। )
এটাই অধীনাকর্তার প্রার্থনা। এই সেঙ্গোল প্রদান করে, সরকারের সাথে তাদের বন্ধুত্ব প্রমাণে একে প্রদর্শন করার মধ্য দিয়ে তারা সাধারণ মানুষকে আরো প্রতারিত করতে চায়। নেহরু সরকারের প্রিয়পাত্র অধীনম ইতিমধ্যেই ভগবান শিবের কৃপালাভ করেছেন এবং অতএব তার আধিপত্যের সংকোচন বা অবসান কিছুই হচ্ছে না। অথবা মানুষই এ নিয়ে ভাবতে বাধ্য হবে। পিপলস ডেমোক্রেসি’র সম্পাদকীয় ২৮ মে নতুন সংসদ ভবনের উদ্বোধন অনুষ্ঠান বয়কট করেছে ২০টি বিরোধী দল। যে যুক্তিতে তারা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা হল, মোদি সরকার রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুকে এড়িয়ে গিয়ে কাজ করেছে। অথচ তিনিই রাষ্ট্রপ্রধান এবং একইসঙ্গে সংসদেরও প্রধান। তার বদলে সরকারের তরফে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে প্রধানমন্ত্রী মোদিই নতুন সংসদের উদ্বোধন করবেন। এভাবে শাসন বিভাগের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিকে সংসদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়াটা সাংবিধানিকভাবে একেবারে অনুচিত একটা কাজ। সেকারণেই বিরোধীদের প্রতিবাদ জানানোর কারণটা ছিল বৈধ। কিন্তু উদ্বোধনের দিন যেসব ঘটনা ক্রমশ সামনে এল তাতে বিরোধীদের ওই অনুষ্ঠান থেকে দূরে সরে থাকার সিদ্ধান্তটাই জোরদার হয়েছে। হঠাৎ করেই, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, অমিত শাহ,ঘোষণা করেন যে, একটা সেঙ্গোল (রাজদণ্ড) যা ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেন জওহরলাল নেহরুর হাতে তুলে দিয়েছিলেন ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রতীক হিসাবে, সেটাকেই সংসদের ভেতর স্থাপনা করা হবে। অমিত শাহের কথায়, ‘ভারতে ক্ষমতা হস্তান্তর হয়েছিল পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুর হাতে সেঙ্গোল তুলে দেওয়ার মাধ্যমে।’ এভাবে, একটি হিন্দু ধর্মীয় শিল্পকর্মকে ব্রিটিশদের হাত থেকে নতুন সরকারের হাতে ‘ক্ষমতা হস্তান্তরের’ প্রতীক হিসাবে দাঁড় করিয়ে পুরোপুরি আষাঢ়ে গল্প ফাঁদা হল। এবিষয়ে সরকারি ভাবে ঘোষণা করা হল যে, লর্ড মাউন্টব্যাটেন জওহরলাল নেহরুর কাছে জানতে চেয়েছিলেন ক্ষমতা হস্তান্তরের সঙ্গে মানানসই কোনও ভারতীয় প্রথা আছে কিনা। তখন নেহরু বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন প্রবীণ কংগ্রেস নেতা সি রাজাগোপালাচারীর সঙ্গে। রাজাগোপালাচারী তামিলনাড়ুর ধর্মীয় মঠে খোঁজখবর নেন এবং তার ভিত্তিতে পরামর্শ দেন যে, সেঙ্গোলকেই ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রতীক করা উচিত। সরকারিভাবে একইসঙ্গে একথাও বলা হল যে, লর্ড মাউন্টব্যাটেন নিজে ১৪ আগস্ট রাতে নিজে ওই সেঙ্গোল নেহরুর হাতে তুলে দেন সংবিধান পরিষদে সরকারি বৈঠক শুরুর আগে। কিন্তু সেঙ্গোল বিষয়ে আসল তথ্য কী? এই রাজদণ্ডের ইতিহাসই বা কী? এবিষয়ে কোনও নথি বা প্রমাণ নেই যে, ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রতীক হিসাবে ব্যবহারের জন্য মাউন্টব্যাটেন নেহরুকে কিছু বলেছিলেন। এব্যাপারে রাজাজির ভূমিকারও কোনও প্রমাণ নেই। ঘটনা হল মাউন্টব্যাটেনও নিজে নেহরুর হাতে সেঙ্গোল তুলে দেননি। ১৩ আগস্ট বিকেলে তিনি করাচি চলে যান এবং ১৪ আগস্ট অনেক রাতে দিল্লি ফেরেন। তামিলনাড়ুর একটি শৈব মঠের আদেশেই সেঙ্গোলটি নির্মাণ করা হয়েছিল। এরপর সেটিকে দিল্লিতে আনা হয় এবং ১৪ তারিখ রাতে নেহরুর বাসভবনে সেটি তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হয়। এই হস্তান্তরের সময় কোনও সরকারি অনুষ্ঠান হয়নি। গোটা বিষয়টা ছিল পুরোপুরি বেসরকারি উদ্যোগ। ঘটনা হল আরও অনেক উপহারের মতো নেহরু সেঙ্গোলটিও গ্রহণ করেছিলেন এবং পরে তার স্থান হয় এলাহাবাদ মিউজিয়ামে। এথেকেই বোঝা যায় নেহরু বিষয়টিকে কীভাবে দেখেছিলেন। ১৪ আগস্ট রাতে ‘ক্ষমতার হস্তান্তর’ হয়েছিল সেঙ্গোল হস্তান্তরের মধ্যে দিয়ে— এইরকম ভুয়ো দাবিআসলে বিজেপি-আরএসএস-এর ন্যারেটিভের সঙ্গে খাপ খেয়ে যায়। এই ভাবে তারা বোঝাতে চায় যে, শতাব্দীব্যাপী দাসত্বের অবসান হয়েছিল হিন্দু রাজ-এর পুনরুত্থানের মধ্যে দিয়ে। ক্ষমতা হস্তান্তরের এই ‘হিন্দুত্বকরণ’ করা হয়েছে স্রেফ একটা অনৈতিহাসিক ভোজবাজির সাহায্যে যেখানে ঘটনার তথাকথিত নায়কদের তৈরি করা ভূমিকায় নামিয়ে অভিনয় করানো হয়েছে। সেঙ্গোল নিয়ে এই একটাই কাহিনি রচনা করা হয়েছিল এবং তা রচনা করেছিলেন আরএসএস-এর মতাদর্শের ধ্বজাধারী এস গুরুমূর্তি। ২০২১ সালেই এই কাহিনি তিনি একটি তামিল পত্রিকায় লিখেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী মোদি সেঙ্গোল দুহাতে ধরে বয়ে নিয়ে যাচ্ছেন এবং তাঁকে অনুসরণ করে আদিনামরা (মঠের পুরোহিত এবং প্রধানেরা) সারি দিয়ে হেঁটে চলেছেন সেটিকে স্পিকারের চেয়ারের পিছনে প্রতিষ্ঠা করার জন্য— ২৮ মে-র সকালের এই দৃশ্য এক নতুন ভারতের প্রতীকের অংশ, যে নতুন ভারত হিন্দু রাষ্ট্রকে অনুকরণ করতে চাইছে। এটা পুরোপুরি ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের বিরোধী। ঐতিহ্যগতভাবে সেঙ্গোল হল একটা রাজদণ্ড যা প্রধান পুরোহিত রাজ্যাভিষেকের পর নতুন রাজার হাতে তুলে দেন ন্যায়পরয়াণতার সঙ্গে রাজ্যশাসন করার জন্য। গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রে এর কোনও স্থান নেই। কারণ গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রে নাগরিকেরাই তাঁদের সরকারকে নির্বাচিত করেন। কোনও ধর্মীয় প্রতীককে সংসদের গুরুত্বপূর্ণ একটা জায়গায় স্থাপন করাটাও প্রজাতন্ত্রের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রের বিরোধী। ২৮ মে দিনটিকে নতুন সংসদ ভবন উদ্বোধনের দিন হিসাবে বেছে নেওয়া হয়েছিল এই কারণেও যে, ওই দিনটি ছিল ভিডি সাভারকারের জন্মবার্ষিকী। এর ফলে ওই দিনটিকে ব্যবহারও করা হয়েছে এক নতুন ভারতের ন্যারেটিভ গড়ে তোলার লক্ষ্যে। সাভারকার জীবন শুরু করেন স্বাধীনতা সংগ্রামী হিসাবে। আন্দামানের সেলুলার জেল থেকে তাঁকে ছেড়ে দেওয়ার পর তিনি ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে পাট তিনি তুলে দেন। বার বার ক্ষমাভিক্ষার আর্জি পেশ করার পরেই ব্রিটিশরা তাকে জেল থেকে ছেড়ে দিয়েছিল। এরপর থেকে তিনি দেশের পূর্বতন মুসলিম শাসকদের বিরুদ্ধে এবং হিন্দুত্বের প্রতিষ্ঠাকল্পে লড়াই শুরু করেন। বিজেপি শাসকেরা সাভারকারের হিন্দুত্বকে অনুমোদন করেন এবং হিন্দু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকে দেখেন হাজার বছরের দাসত্বের অবসানের পর চূড়ান্ত সাফল্যের শীর্ষবিন্দু হিসাবে। সেঙ্গোল ধর্ম (ন্যায়পরায়ণতা)–এর প্রতীক— বিজেপি শাসকদের এহেন দাবির বৈধতা সেইদিনেই প্রবলভাবে ক্ষয়ের মুখে পড়ে, কারণ ওই দিনেই নতুন সংসদ ভবন থেকে কয়েক শ মিটার দূরত্বে মহিলা কুস্তিগিরেরা, যাঁরা শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ দেখাচ্ছিলেন, তাঁদের পুলিশ নির্মমভাবে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে গিয়ে গ্রেপ্তার করে। নতুন ভারতের যে প্রতীকগুলি নরেন্দ্র মোদি তুলে ধরতে চাইছেন— অযোধ্যায় রামমন্দির নির্মাণ, সেন্ট্রাল ভিস্টা ও নতুন সংসদ ভবন, এগুলো সবই নতুন স্বৈরতন্ত্রী হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্যসূচক চিহ্ন। নতুন এই ন্যারেটিভের উপযোগী করে তুলতে গিয়ে ইতিহাসকে বিকৃত করা হচ্ছে এবং কাল্পনিক ইতিহাস নির্মাণ করা হচ্ছে। — ৩১ মে, ২০২৩
প্রকাশের তারিখ: ০৭-জুন-২০২৩ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |