|
‘নিগৃহীত নিপীড়িতের’ ছদ্মবেশে স্থায়ী বসতির উপনিবেশবাদের তাণ্ডবপ্রভাত পট্টনায়েক |
অন্যায়কারীর প্রতি দেশে দেশে সাম্রাজ্যবাদ এবং দক্ষিণপন্থী শাসকদলগুলি যে চরম সুবিধাবাদী পদক্ষেপ গ্রহণ করে, গাজার জনগণের ওপরে ইজরায়েলের নিরন্তর নিষ্ঠুর হত্যালীলার ক্ষেত্রেও সেই একই অবস্থান গ্রহণ করেছে—প্যালেস্তাইনী জনগণের পক্ষে বিক্ষোভ প্রদর্শনের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারী করেছে। তবু দেশে দেশে ইজরায়েল সরকারের বিরুদ্ধে ফেটে পড়া সাধারণ মানুষের বিক্ষোভ প্রদর্শনকে কোনো নিষেধাজ্ঞার বেড়াজালে সামাল দেওয়া যাচ্ছে না। |
আঠারো-উনিশ শতকে দুনিয়ার বুকে দু’-ধরনের উপনিবেশবাদ দেখা গিয়েছিল। প্রথমটি হচ্ছে যেসব দেশে ঐতিহাসিক ভাবে এক কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল এবং সমাজের উদ্বৃত্ত আদায় করার এক প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে এই কেন্দ্রীভূত প্রশাসন তার টিকে থাকার জীবনরস সংগ্রহ করতো, সেই দেশগুলিকে সশস্ত্র আগ্রাসনের দ্বারা অধীনস্থ করা হ’ত এবং পুরনো প্রশাসনকে হঠিয়ে দিয়ে উপনিবেশিক শক্তি শাসন ক্ষমতায় জাঁকিয়ে বসতো। বৃটিশদের ভারতে উপনিবেশ স্থাপন এরকম উপনিবেশবাদের ক্লাসিক উদাহরণ। এই উপনিবেশবাদের মূল উদ্দেশ্য দ্বিবিধ— এক, দেশীয় কারিগরদের হঠিয়ে দিয়ে ইওরোপীয় পণ্যের জন্য নতুন বাজার স্থাপন, এবং দুই, দেশীয় শ্রমজীবিদের দ্বারা উৎপাদিত উদ্বৃত্ত দখল করে জাহাজে করে পাশ্চাত্য দুনিয়ায় পাঠানো, বিশেষ করে সেই সব পণ্য যা পাশ্চাত্য দেশগুলির প্রয়োজন। এই সব উপনিবেশগুলিতে ইওরোপীয় দেশগুলি থেকে খুবই কম লোকজন এখানে স্থায়ীভাবে এসে বসতি স্থাপন করেছে। তার কারণ প্রথমত, এই দেশগুলি খুবই লোকালয়পূর্ণ, বাইরে থেকে আরও লোক আসার প্রয়োজন ছিল না, দ্বিতীয়ত, মে্ট্রোপলিসের নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের লোকেরা এই গ্রীষ্মপ্রধান দেশে আসতে চাইত না। আরেক ধরণের উপনিবেশ—যার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র—যেখানে উপনিবেশবাদীরা স্থানীয় মানুষদের ওপর আক্রমণ ক’রে তাদের এলাকাচ্যুত করেছে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পাইকারী হত্যার মাধ্যমে অনিচ্ছুকদের কচুকাটা করেছে। পাশ্চাত্যের এই উপনিবেশবাদীরা নিজেদের দেশ থেকে প্রচুর লোকজন এনে দখলীকৃত দেশে তাদের স্থায়ী বসতি স্থাপন করেছে , দেশিয় অধিবাসীদের জমি দখল করেছে, তাদের যা কিছু সম্পত্তি ছিল সেসব ছিনিয়ে নিয়েছে। দেশিয় মানুষদের হয় নির্মূল করেছে, নতুবা তাদের গরু-ছাগলের মত তাড়িয়ে এনে কিছু ‘সংরক্ষিত অঞ্চলে’ স্থানান্তরিত করেছে। প্রথম ধরনের উপনিবেশগুলিকে আমরা বলবো জবরদখলীকৃত উপনিবেশবাদ (expropriative colonialism) এবং দ্বিতীয় ধরনের উপনিবেশগুলিকে বলবো স্থায়ী বসতির উপনিবেশবাদ (settler colonialism)। এই দুই ধরণের উপনিবেশের মধ্যেকার মূল তফাৎ হল প্রথম ক্ষেত্রের উপনিবেশবাদ জমির উৎপন্ন ফসল জবরদখল করে, এবং দ্বিতীয় ক্ষেত্রের উপনিবেশবাদ গোটা জমিটাই জবরদখল করে। এই দুই পদ্ধতির বৈশিষ্ট্যগত তফাতের মধ্যে এক গুরুত্বপূর্ণ তাৎপর্য রয়েছে। প্রথম ক্ষত্রে উৎপাদন পদ্ধতি চালিয়ে যাওয়ার জন্য উপনিবেশিক প্রভুদের বাধ্যতামূলকভাবে স্থানীয় অধিবাসীদের সহায়তার প্রয়োজন হত, নইলে জমি চাষ করবে কে? উপনিবেশিক প্রভুরা যদি উৎপন্ন ফসলের পুরোটা জোর করে নিয়ে নিত, তবে স্থানীয় অধিবাসীরা অনাহারে মারা যেত। এর বহিঃপ্রকাশ দেখা যায় বৃটিশ-ভারতে ঘন ঘন দুর্ভিক্ষের ঘটনায়। অবস্থা যখন শোচনীয় হয়ে উঠত তখন উপনিবেশিক প্রভুকে ন্যূনতম রসদে মানুষের বেঁচে থাকার মতো ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হত। কিন্তু স্থায়ী বসতির উপনিবেশে কিছু মানুষকে খাইয়ে পরিয়ে বাঁচিয়ে রাখার কোন বাধ্যবাধকতা ছিল না। পাশ্চাত্যের দেশগুলি থেকে দারিদ্র পীড়িত মানুষ অথবা ভাগ্যান্বেষী ও ভবঘুরেদের পরিযান(migration) নিরবচ্ছিন্ন চলতেই থাকতো। স্থানীয় মানুষদের ঝাড়ে বংশে নিকেশ করার ফলে( ethnic cleansing) যদি অবস্থা এমন সঙ্গীন হয়ে উঠতো যে কৃষি-শ্রমিক পাওয়াই যাচ্ছে না, তাহলে তুলনায় অনুন্নত অন্য দেশ থেকে প্রায় গায়ের জোরে (অথবা দাস ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে) লোকজন নিয়ে এসে জমিতে চাষের কাজে জুতে দেওয়ারও ব্যবস্থা ছিল। এসবই স্থায়ী বসতির বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে খাপ খেয়ে যায়। এই ধরণের উপনিবেশবাদের আর একটি বৈশিষ্ট্যও লক্ষ্য করা যায়। এই উপনিবেশবাদের প্রবণতাই ছিল সম্প্রসারণবাদ, সেটা এই অর্থে যে, যে দেশ বা অঞ্চল এইভাবে করতলগত হ’ল, তার সীমার মধ্যে উপনিবেশবাদের আকাঙ্ক্ষার নিবৃত্তি হ’ত না। ক্রমাগত জমির পরিমাণ বাড়িয়ে চলাতেই এর মোক্ষ, ততক্ষণ যতক্ষণ না পর্যন্ত জমির সীমানা শেষ হয়ে যাচ্ছে, অথবা সমান শক্তিধর কোন প্রতিপক্ষ হুমকি দিয়ে বলেছে, খবরদার! আর এক পা-ও এগোনো নয়! তারও হাতে উদ্যত তরবারী। অনেকের মনে হতে পারে ‘এসব তো অতীতের কথা। হ্যাঁ, পুঁজিবাদের জমানায় সাম্রাজ্যবাদ এক বাস্তব সত্য বটে, কিন্তু বর্তমানে উপনিবেশবাদের আর তেমন কোনো প্রাসঙ্গিকতা নেই।' এই ধারণা ভুল। আজকের দিনে স্থায়ী বসতির উপনিবেশবাদের ধ্রুপদী উদাহরণ হিসেবে ইজরায়েল আবির্ভূত হয়েছে। শত শত বছর ধরে ইহুদীরা দেশে দেশে অত্যাচারিত হয়েছে এবং হিটলারের ইহুদী নিধনের তাণ্ডব (holocaust) মধ্য দিয়ে তা ভয়ঙ্কর পরিণতি লাভ করেছে। অতঃপর, বৃটিশ উপনিবেশবাদের মদতে দুনিয়ার যাবতীয় শত্রু ভাবাপন্ন দেশগুলি থেকে দলে দলে ইহুদীরা প্যালেস্টাইনে এল উদ্বাস্তু হিসেবে। এখানে এসে অবশেষে তারা ১৯৪৮ সালে এক জায়নবাদী রাষ্ট্র স্থাপন করলো। সেখানে একের পর এক উগ্র দক্ষিণপন্থী সরকারগুলি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের প্ররোচনায় ও সক্রিয় হস্তক্ষেপে বলীয়ান হয়ে যা একদা ছিল দেশে দেশে নিপীড়িত উদ্বাস্তু ইহুদীদের শান্তির আশ্রয়স্থল, তাকে পরিণত করলো আধুনিক বিশ্বের স্থায়ী বসতির উপনিবেশবাদী এক দেশ হিসেবে। এই রকম উপনিবেশবাদের যা কিছু বৈশিষ্ট্য, তার সবই ইজরায়েলের কর্মকান্ডের মধ্য দিয়ে প্রকট হচ্ছে। এই উপনিবেশবাদের অন্তর্নিহিত প্রবণতার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে সশস্ত্র স্থায়ী বসতি স্থাপনকারীদের সে দেশের জায়নবাদীরা মদত দিচ্ছে নতুন নতুন স্থানে, যথা গাজায়, ওয়েষ্ট ব্যাংক প্রভৃতি স্থানে বসতি স্থাপন করতে, এলাকার অধিবাসীদের জাতিগতভাবে নির্মূল করতে (ethnic cleansing), এবং এখন দেখা যাচ্ছে গণহত্যার পথে পা বাড়াতেও ইজরায়েল পিছপা নয়। সমস্ত স্থায়ী বসতির উপনিবেশবাদী জমানার আর একটা বৈশিষ্ট্য বর্ণবিদ্বেষ (apartheid)। এটা প্রায় সকল ধরনের উপনিবেশবাদের সাধারণ বৈশিষ্ট্য। উপনিবেশবাদীদের গড়ে তোলা সমস্ত উপনিবেশিক শহরে উপনিবেশিক প্রভুরা যে এলাকায় থাকে, সেখানে স্থানীয় মানুষদের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল, তাদের আবাসস্থল ছিল শহরের অন্য প্রান্তে। কিন্তু স্থায়ী বসতির উপনিবেশে উপনিবেশিক শহরের যে অঞ্চলে উপনিবেশিক পদাধিকারীরা বাস করতো(‘white area’) সেখানে প্রচুর সংখ্যায় পরিযায়ী (immigrant) মানুষজনের জায়গা হ’ত। ফলে বর্ণবিদ্বেষী পরিস্থিতির প্রাদুর্ভাব আরও ঘনিষ্ঠভাবে এখানে পরিলিক্ষিত হ’ত। ফলে এটা মোটেই আশ্চর্যজনক নয় যে আধুনিক কালে ইজরায়েল বর্ণবিদ্বেষের জীবন্ত চিত্র তুলে ধরছে। স্থায়ী বসতির উপনিবেশবাদের যে চিত্র তারা আজ তুলে ধরেছে, সাম্রাজ্যবাদের প্রত্যক্ষ মদত ছাড়া সেটা সম্ভব ছিল না। শত শত বছর ধরে ইহুদীরা যেভাবে নিপীড়িত হয়েছে, পশ্চিমী সাম্রাজ্যবাদের মনে হয়েছে আজকের ইজরায়েলের যাবতীয় কুকর্মে মদত দিয়ে ইহুদীদের বিরুদ্ধে সংঘঠিত যাবতীয় নিপীড়নের অপরাধ থেকে দায়মুক্ত হওয়া যাবে। প্যালেস্তানীয় জনতা মৃত্যু দুর্দশা নিপীড়নের বিনিময়ে পশ্চিমী সাম্রাজ্যবাদ তাদের পূর্বকৃত অপরাধবোধ থেকে মুক্ত হতে চাইছে। অপরদিকে ইজরায়েলী দক্ষিণপন্থীদের সামনে এক সুযোগ উপস্থিত হয়েছে যে তাদের স্থায়ী বসতির উপনিবেশবাদের যাবতীয় বীভৎস কুকর্মকে ইহুদীদের ওপরে সংঘটিত বিগত শত বছরের লাঞ্ছনা ও সর্বোপরি নাৎসীদের হলোকস্টের বীভৎসতাকে অবগুন্ঠনের মত আড়াল হিসেবে ব্যবহার করে চলেছে। তাদের বিরুদ্ধে বর্ণবিদ্বেষের, সম্প্রসারণবাদের অথবা গণহত্যার কোনো অভিযোগ তোলা হলে তারা হিংস্রভাবে এসব অভিযোগকে সেমিটিজম বিরোধী মনোভাবের প্রকাশ বলে নস্যাৎ করে দিতে চাইছে। তাদের এই মনোভাব এই কারণে আরও বেশি নক্কারজনক যে তারা নিজেরাই এই দুর্দশার মধ্য দিয়ে শত শত বছর অতিবাহিত করেছে। অন্যায়কারীর প্রতি দেশে দেশে সাম্রাজ্যবাদ এবং দক্ষিণপন্থী শাসকদলগুলি যে চরম সুবিধাবাদী পদক্ষেপ গ্রহণ করে, গাজার জনগণের ওপরে ইজরায়েলের নিরন্তর নিষ্ঠুর হত্যালীলার ক্ষেত্রেও সেই একই অবস্থান গ্রহণ করেছে—প্যালেস্তাইনী জনগণের পক্ষে বিক্ষোভ প্রদর্শনের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারী করেছে। তবু দেশে দেশে ইজরায়েল সরকারের বিরুদ্ধে ফেটে পড়া সাধারণ মানুষের বিক্ষোভ প্রদর্শনকে কোনো নিষেধাজ্ঞার বেড়াজালে সামাল দেওয়া যাচ্ছে না। বস্তুত, লন্ডনে প্যালেস্টাইনপন্থী বিপুল বিক্ষোভ প্রদর্শনের ঘটনায় ক্ষিপ্ত হয়ে বৃটিশ স্বরাষ্ট্র সচিব সুয়েলা ব্রেভারম্যান অভিযোগ করেছিলেন লন্ডন পুলিশ প্যালেস্টাইন পন্থীদের প্রতি সহানুভূতিশীল। ইজরায়েলী স্থায়ী বসতির উপনিবেশবাদের প্রতি সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলির সমর্থনের দ্বিতীয় কারণ হ’ল, হয় এই সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলির জন্মই হয়েছে স্থায়ী বসতির উপনিবেশবাদ প্রতিষ্ঠার পঙ্কিল পথে, অথবা তারা এই ধরণের উপনিবেশবাদের দ্বারা উপকৃত হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং অষ্ট্রেলিয়ার মত দেশগুলি স্থায়ী বসতির উপনিবেশবাদের জঠরে জন্মলাভ করেছে। নিজেদের জন্মলাভের পথ সুগম করার জন্য এরা প্রত্যেকে স্থানীয় জাতিগুলিকে নির্মূল করেছে(এথনিক ক্লীনজিং)। ফলে তারা আজ কোন্ যুক্তিতে সেই একই পদ্ধতিতে গড়ে ওঠা একান্ত সুহৃদ ইজরায়েলী জায়নবাদের বিরুদ্ধাচরণ করবে? ইজরায়েলের প্রতি সাম্রাজ্যবাদের অকুন্ঠ সমর্থনের সবচেয়ে শক্তিশালী কারণ হ’ল ইজরায়েল সাম্রাজ্যবাদের সবচেয়ে বিশ্বস্ত মিত্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে এবং পশ্চিম এশিয়ায় সে হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য আঞ্চলিক মনসবদার। এই অঞ্চলে আধিপত্য কায়েম রাখার জন্য সাম্রাজ্যবাদ নানা কৌশল অবলম্বন করেছে যাতে দুনিয়ার এই গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে প্রগতিশীল-ধর্মনিরপেক্ষ, বামপন্থী ও কমিউনিষ্ট শক্তিগুলিকে সবসময়ে দুর্বল করে রাখা যায় (আরব বিশ্বে একদা কমিউনিজমের খুবই শক্ত ঘাঁটি ছিল)। সেইজন্য সাম্রাজবাদ অহরহ (হামাস সহ) ইসলামিক মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলিকে মদত দিয়ে গিয়েছে। কোনো কোনো সময়ে তারা এমনকি সশস্ত্র আগ্রাসন চালিয়েছে। এবং ইজরায়েলকে আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত করেছে। এই সব কৌশল সাম্রাজ্যবাদের আধিপত্য কায়েম রাখার অত্যন্ত শক্তিশালী হাতিয়ার। ফলে এটা কোন ব্যতিক্রমী ঘটনা নয় যে যখন রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ অধিবেশনে গাজায় অবিলম্বে বিনা শর্তে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব পেশ হ’ল, তখন আমেরিকা প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ভোট দিল। উপরন্তু শ্লেষাত্মকভাবে পাল্টা প্রস্তাব দিল যে ‘মানবিকতার’ খাতিরে গাজায় ইজরায়েলী গণহত্যায় ‘মাঝেমধ্যে’ বিরতি দেওয়া হোক! এই ‘মানবিকতার’ সারবস্তু হ’ল ইজরায়েল যত খুশি খুন জখম চালিয়ে যাক, কিন্তু মৃত ও জখমদের সরিয়ে ফেলার বিরতিটুকু মাঝে মধ্যে দেওয়া হোক! ইজরায়েলকে যদি এইভাবে যা খুশি তাই করার স্বাধীনতা দেওয়া হয়, তবে তার অনিবার্য পরিণতি হবে প্যালেস্টাইনী জনগণের এথনিক ক্লীনজিং। আমাদের মনে করিয়ে দেয় ভূমিপুত্র রেড-ইন্ডিয়ানদের (Amerindians) ইওরোপীয় পরিযায়ী স্থায়ী বসতকারীরা যে ভাবে ‘সংরক্ষিত’ অঞ্চলে আটক করে রেখেছিল, সেইরূপে প্যালেস্টাইনী জনগণকে মুক্ত কারাগারে আটক করে রাখা ইজরায়েলের ‘নিরাপত্তার’ পক্ষে বিপজ্জনক। এই ভয়াবহ পরিকল্পনার ইঙ্গিত পাওয়া যায় এই ঘটনায় যে ইজরায়েলী নির্মাণ কোম্পানীগুলি প্যালেস্টাইনী নিমাণ কর্মীদের হঠিয়ে দিয়ে সেই জায়গায় ভারতীয় নির্মাণকর্মীদের নিয়োগ করতে চাইছে। তৃতীয় বিশ্বের শ্রমের বিপুল মজুত বাহিনীর মধ্য থেকে ইজরায়েলী স্থায়ী বসতির উপনিবেশবাদ প্যালেস্টাইনী শ্রমিকদের ছেঁটে ফেলতে চাইছে। কেবল প্যালেস্টাইনের জনতার স্বার্থে নয়, বরং গোটা দুনিয়ার জনগণের স্বার্থেই এই স্থায়ী বসতির উপনিবেশবাদের আগ্রাসনকে বন্ধ করতে হবে, কারণ সাম্প্রতিক সাম্রাজ্যবাদের এই ভয়ংকর আগ্রাসী এবং নিষ্ঠুরতম বাহিনীটি অতীতের নিপীড়নের পবিত্র অবগুন্ঠনে নিজেকে আবৃত করে রেখে হীনতম স্পর্ধায় যাবতীয় দুষ্কর্মে ব্রতী। এই আগ্রাসন বন্ধ হতে পারে কেবল গোটা বিশ্বের জনগণের সম্মিলিত প্রতিবাদে। কলম্বিয়া, বলিভিয়া, দক্ষিণ-আফ্রিকা প্রভৃতি দেশ ইজরায়েলের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে। পাশ্চাত্যের বিভিন্ন দেশে এবং সারা দুনিয়াতেই বিভিন্ন শহরে বিশাল বিশাল জনবিক্ষোভ হচ্ছে যার বিশালত্ব সাম্প্রতিক বছরগুলিতে দেখা যায় নি। এই বিক্ষোভের অনেকগুলিই সেখানকার ইহুদী জনগণের দ্বারা সংগঠিত, যারা একাধারে গাজায় গণহত্যার বিরোধিতা করছে ,অন্যদিকে এন্টি সেমিতিস্ম বলে দাগিয়ে দেওয়ার বিরোধিতা করছে। দুনিয়ায় যেভাবে প্রতিরোধের অগ্নিশিখা দিকে দিকে প্রোজ্জ্বলিত হয়ে উঠছে তা-ই নির্ধারণ করবে প্যালেস্টাইন তথা দুনিয়ার জনগণের ভবিষ্যৎ।
ভাষান্তরঃ নন্দন রায়। প্রকাশের তারিখ: ০২-ডিসেম্বর-২০২৩ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |