শিশুটি ফেল করবে কেন?

কুমার রাণা
যে-প্রথা অবৈজ্ঞানিক বলে প্রমাণিত, এবং দীর্ঘ অনুশীলন ও চুলচেরা তর্কবিতর্কের মধ্য দিয়ে পরিত্যক্ত হয়েছে, তাঁর মনে হয়েছে সেই প্রথাটাই ঠিক। যুক্তিটা সরল: পাশ-ফেল প্রথা থাকলে বাচ্চারা ফেল করার ভয়ে লেখাপড়া করবে, নাহলে করবে না। এই যুক্তিটার মধ্যে যে গভীর অনৈতিকতা ও বিজ্ঞানবিরোধিতা আছে, তা ভাবার অবকাশ তাঁর নেই।

লোকে ভোট দিয়েছে, অতএব লোকে এটা মেনে নিয়েছে যে নির্বাচিত শাসক যা যা করবেন তার সবই মানুষের ইচ্ছা, অথবা তিনি সর্বশক্তিমান। এমনটা ভাবতে ট্যাক্স দিতে হয় না, কিন্তু ভাবনাটা যে নিতান্ত অর্বাচীন, গণতন্ত্রের জন্মলগ্ন থেকে চলে আসা অনুশীলনগুলোই তার প্রমাণ। ভোট আসলে কয়েক বছরের জন্য একটা দায়িত্ব অর্পণ — রাজ্য বা দেশ চালানোর দায়িত্ব; প্রতিটি প্রশ্নে মানুষের হয়ে ভেবে ফেলার, মানুষের হয়ে রায় দিয়ে দেবার ঢালাও ছাড়পত্র নয়। ভোটের দিন মানুষ একটা দল বা একজন নেতাকে বেছে নেন; প্রতিটি নীতিতে আলাদা করে সম্মতি দেন না।

শাসক সিদ্ধান্ত নেবার আগে বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞ এবং সাধারণ নাগরিকদের সঙ্গে পরামর্শ করবেন, তাঁদের সিদ্ধান্তই শাসকের সিদ্ধান্ত হিসেবে ঘোষিত হবে, এটাই বিধি। এ বিধি পুঁথির আদর্শ নয়, এর পেছনে আছে একটা সহজ বোধ: একজন মানুষ, তিনি যত বড় জনাদেশ নিয়েই আসুন, সব বিষয়ে সবচেয়ে বেশি জানেন না, জানা সম্ভবও নয়। জ্ঞান ছড়িয়ে থাকে সমাজের নানা কোণে — গবেষকের টেবিলে, শিক্ষকের ক্লাসঘরে, অভিভাবকের উঠোনে। গণতন্ত্রের কাজ সেই ছড়ানো জ্ঞানকে এক জায়গায় জড়ো করে সিদ্ধান্তে পৌঁছনো; শাসকের কাজ সেই সিদ্ধান্তকে রূপ দেওয়া।

অত্যাধুনিক ভারতে অবশ্য এই বিধি পরিত্যক্ত। শাসক নিজেকে সর্বশক্তিমান, মহাবীর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছেন। দেশ ও দেশবাসীর ভাল কিসে হবে, সেটা তিনি এবং একমাত্র তিনিই জানেন। পরামর্শ যদি বা হয়, তা নিছক নিয়মরক্ষা; রায়টা লেখা থাকে আগে থেকেই।

“তিনি”-র বিকেন্দ্রীকরণ ঘটেছে— দিল্লি থেকে নিয়ে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের নির্বাচিত প্রধানদের চেহারায়। উদাহরণ, পশ্চিমবাংলা। ক্ষমতারূঢ় হবার পর থেকে রাজ্যের শাসক একের পর এক হুকুম জারি করে চলেছেন। কে কী খাবে না খাবে থেকে নিয়ে কী পড়বে না পড়বে পর্যন্ত নানা কিছু নিয়ে ধ্বনিত হচ্ছে তাঁর আদেশ বা স্বপ্নাদেশ।

টাটকা খবর হল, ইশকুলে পাশ-ফেল প্রথা ফিরিয়ে আনার নিদান। সিলেবাস কমিটির বিশেষজ্ঞরা কী সুপারিশ করেন, সরকার নাকি তা-ই মানবে; কিন্তু সে সুপারিশ আসার আগেই শাসক জানিয়ে দিয়েছেন, তাঁর ব্যক্তিগত মত হল পাশ-ফেল ফেরানো দরকার। এর পর কমিটির সদস্যরা কতটা খোলা মনে ভাববেন, সে প্রশ্ন না-হয় তোলা থাক; পরামর্শের বিধি কীভাবে নিয়মরক্ষায় পর্যবসিত হয়, এ তার এক নিখুঁত নমুনা। দিল্লি অবশ্য বছর দুয়েক আগেই পথ দেখিয়ে রেখেছে, কেন্দ্রীয় সরকারের স্কুলগুলোতে পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে ফেল করিয়ে আটকে রাখার ব্যবস্থা ফিরিয়ে এনে। এ রাজ্যেও পাশ-ফেল নিয়ে দোলাচল নতুন নয়: ২০১০-এ তা তুলে দেওয়া হয়েছিল, ২০১৯-এ তৎকালীন সরকারও ফেরানোর কথা ঘোষণা করেছিল। অর্থাৎ ভাবনাটা কোনও এক দলের একচেটিয়া নয়; গদিতে যিনিই বসুন, শিশুর ঘাড়ে দায় চাপানোর সহজ রাস্তাটা সবার কাছেই লোভনীয়।

যে-প্রথা অবৈজ্ঞানিক বলে প্রমাণিত, এবং দীর্ঘ অনুশীলন ও চুলচেরা তর্কবিতর্কের মধ্য দিয়ে পরিত্যক্ত হয়েছে, তাঁর মনে হয়েছে সেই প্রথাটাই ঠিক। যুক্তিটা সরল: পাশ-ফেল প্রথা থাকলে বাচ্চারা ফেল করার ভয়ে লেখাপড়া করবে, নাহলে করবে না। এই যুক্তিটার মধ্যে যে গভীর অনৈতিকতা ও বিজ্ঞানবিরোধিতা আছে, তা ভাবার অবকাশ তাঁর নেই।

প্রথমত, শিক্ষা হচ্ছে মুক্তির সোপান; ভয়ের মতো একটা অমানবিকতা ও বন্ধনের দ্বারা তা অর্জন করা যায় না। ভয়ে-পড়া শিশু পড়া মুখস্থ করে, পরীক্ষার খাতায় উগরে দেয়, তারপর ভুলে যায়। বোঝার আনন্দ, প্রশ্ন করার সাহস — যা আসলে শিক্ষা — ভয়ের আবহে তার জন্মই হয় না। আর ভয় যদি কাজ করেও, করে কেবল তার বেলায়, চেষ্টা করলে যার পারার উপায় আছে: বাড়িতে পড়া দেখিয়ে দেবার লোক আছে, গৃহশিক্ষক রাখার পয়সা আছে। যে শিশু তার পরিবারে প্রথম প্রজন্মের পড়ুয়া, যার স্কুলে বিষয়ের শিক্ষকই নেই, ফেলের ভয় তাকে পড়তে শেখায় না, কেবল জানিয়ে দেয় যে সে “পারে না”। পাশ-ফেল তাই শেষ বিচারে সামাজিক অসাম্যকেই মেধার তকমা দিয়ে পাকা করে। তার ওপর, ফেল করিয়ে আটকে রাখা মানে একই ক্লাসে, একই পদ্ধতিতে আরও একটা বছর। যে পদ্ধতিতে শিশুটি প্রথমবার শেখেনি, দ্বিতীয়বার সেই পদ্ধতিই তাকে শিখিয়ে দেবে, এ ভরসার ভিত্তি কী? যেসব দেশে এ নিয়ে দীর্ঘ গবেষণা হয়েছে, সেখানেও আটকে রাখার টেকসই সুফলের প্রমাণ মেলে সামান্যই।

দ্বিতীয়, বাচ্চারা ফেল করলে তাদের দোষ, কিন্তু যাদের ওপর পাশ করাবার ভার, তাদের শাস্তি কী? ব্যর্থদের তালিকায় শাসকের নাম সবার ওপরে — আজকের শাসক হোন বা গতকালের, কারণ এ দায় শাসনক্ষমতার, ব্যক্তির নয়। শিক্ষার জন্য যে পরিকাঠামো আবশ্যিক — স্কুল, শিক্ষক, অন্যান্য ব্যবস্থাপনা — শাসক তা নিশ্চিত করেননি। সেই তালিকায় পরপর আসে শিক্ষা দপ্তরের আধিকারিক থেকে নিয়ে শিক্ষক পর্যন্ত এক দীর্ঘ শৃঙ্খলা। ক্লাসঘরে শিক্ষক নেই, থাকলেও হাজারো সরকারি ফরমায়েশ সামলে পড়ানোর সময় নেই, কিম্বা নিছক কাজের অনিচ্ছা থেকে পড়ানোতে ফাঁকি দেওয়া — এ ছবি কারও অজানা নয়। দোষীদের শাস্তি না দিয়ে নির্দোষ শিশুদের দণ্ড দেওয়াটা বিজ্ঞান ও মানবিকতা — কারও দ্বারা অনুমোদিত নয়।

সমস্যা হল, যাঁরা পাশ-ফেল প্রথার বিপক্ষে, তাঁরাও এর যুক্তির দিকটাতে স্পষ্ট নন। তাঁদের অনেকের বক্তব্য, পাশ-ফেল প্রথার ফলে বাচ্চারা স্কুলছুট হয়ে যায়, পড়া ছেড়ে দেয়। সেটা কিন্তু কথা নয়। এ যুক্তিতে পাশ-ফেল তুলে দেওয়াটা হয়ে দাঁড়ায় স্কুলের খাতায় নাম ধরে রাখার কৌশল মাত্র — শিশু শিখুক না শিখুক, ক্লাসে উঠুক। পাশ-ফেলের সমর্থকেরা ঠিক এই ফাঁকটাই ধরেন: পাশ-ফেল উঠে গেল, অথচ অষ্টম শ্রেণিতে উঠেও বহু ছেলেমেয়ে নিচু ক্লাসের সহজ পাঠ পড়তে পারে না, সমীক্ষার পর সমীক্ষায় তা ধরা পড়ছে। কিন্তু পাশ-ফেল তোলা হয়েছিল এই অঙ্গীকারে যে তার জায়গায় আসবে নিরন্তর মূল্যায়ন, প্রতিটি শিশুর অগ্রগতির রোজকার খোঁজ। সে অঙ্গীকার কাগজেই থেকে গেছে। শিক্ষকের হাতে না দেওয়া হল সময়, না প্রশিক্ষণ; মূল্যায়ন হয়ে দাঁড়াল আরও কয়েকটা খাতা ভরানোর কাজ। দোষ তাই পাশ-ফেল তুলে দেবার নয়; তুলে দিয়ে তার জায়গায় যা আসার কথা ছিল, তা না আনার।

কথা হচ্ছে, বাচ্চাটা ফেল করবে কেন? পৃথিবীর যে সমস্ত দেশ শিক্ষায় বিরাট প্রগতি অর্জন করেছে — ফিনল্যান্ড যার বহুচর্চিত উদাহরণ — সেসব দেশে পাশ-ফেলের খাঁড়া শিশুর মাথার ওপর ঝোলে না। কারণ, সেখানে স্কুলের কাজটা স্কুলেই হয়ে যায়; বাচ্চা কতটা শিখল না শিখল তা ক্লাসেই প্রতিদিন পরীক্ষিত হয়; সেই হিসেবে তার সংশোধনী ব্যবস্থা হয়। কেউ পিছিয়ে পড়লে বছর শেষের রায়ের অপেক্ষা নয়, তখনই তার জন্য বাড়তি সময়, বাড়তি মনোযোগ। স্কুলের বাইরে তার পড়বার দরকার হয় না। তা বলে স্কুলের বাইরে তারা পড়ে না তা নয় — কিন্তু সেগুলো তার ইচ্ছেমত বেছে নেওয়া পাঠ্য: বই, পত্রপত্রিকা, ইত্যাদি। শিক্ষাব্যবস্থা সেসব দেশে দায়িত্ব নিয়েছে প্রতিটি শিশুর লেখাপড়া নিশ্চিত করার; সে দায় বাচ্চাদের ছোট ঘাড়ের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়নি।

অতএব প্রশ্নটা পাশ-ফেল রাখা না-রাখার নয়; প্রশ্নটা হল দায় কার ঘাড়ে চাপবে। পাশ-ফেল ফিরিয়ে আনা মানে রাষ্ট্রের ব্যর্থতার বোঝা শিশুর কাঁধে নামিয়ে দিয়ে দায় ঝেড়ে ফেলা। আর এমন একটা সিদ্ধান্ত যখন বিশেষজ্ঞদের কথা শোনার আগেই শাসকের ব্যক্তিগত বিশ্বাস হিসেবে ঘোষিত হয়, তখন ক্ষতিটা কেবল শিক্ষার থাকে না, গণতন্ত্রেরও হয়। মানুষ ভোট দিয়ে শাসককে নিজের হয়ে কাজ করার ভার দিয়েছে; নিজের সন্তানের ভবিষ্যৎ তাঁর খেয়ালখুশির হাতে সঁপে দেয়নি।

মুশকিল হল, সমাজে যুক্তির শিকড়টা এতটাই দুর্বল যে শাসক সহজেই তার অযুক্তিকে সামাজিকভাবে বৈধ করে তোলে। যুক্তির দুর্বলতার একটা বড় কারণ আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে নিহিত। গোটা ব্যবস্থাটাতেই অবৈজ্ঞানিকতার দাপট (পড়া মুখস্থ করানো, দৈহিক শাস্তি, প্রশ্ন করতে না দেওয়া, এর কয়েকটি নিদর্শন)।   একে আবার পুষ্ট করে তোলে  বিজ্ঞানচর্চার সুযোগের প্রচণ্ড অভাব। শিক্ষায় পিছিয়ে থাকা অনেক রাজ্যের মতোই পশ্চিমবঙ্গেও উচ্চমাধ্যমিক স্তরে বিজ্ঞান পড়বার ব্যবস্থা নিতান্ত সংকীর্ণ – মোটামুটি প্রতি দশজনে একজন বিজ্ঞান পড়ে, বা পড়তে পারে (পাঠক তুলনা করুন: কেরালায় অনুপাতটা প্রায় প্রতি পাঁচ জন্মে একজন!) । কারণ, বেশির ভাগ ব্লকেই একটি বা বড়জোর দুটি স্কুলে বিজ্ঞান পরার ব্যবস্থা আছে। আবার সেগুলোতেও শিক্ষকের অভাব, ল্যাবরেটরির দুর্দশা, ইত্যাদি। সব মিলিয়ে যে ধারণা গড়ে উঠেছে তা হল প্রাইভেট মাস্টারের কাছে বা অনলাইন-সহ নানা কোচিং ছাড়া বিজ্ঞান পড়া যায় না। ফলে কতিপয় সুবিধাসম্পন্ন ছাত্রছাত্রী – যার মধ্যে ছাত্রের ভাগ বেশি – বিজ্ঞান পড়তে পারে। বছরের পর বছর নির্মিত হয়ে চলে লক্ষ লক্ষ বিজ্ঞান-বঞ্চিত নাগরিক। 

পাশ-ফেল বিষয়ক অবৈজ্ঞানিকতার বিরুদ্ধে সমবেত হওয়াটা আশুকর্তব্যের মধ্যে পড়ে। পাশাপাশি পুরো শিক্ষাব্যবস্থার অবৈজ্ঞানিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলাটাও এই কর্তব্যেরই অংশ। শাসককে মনে করিয়ে দেওয়া দরকার, তাঁর কাজ বাণী বা হুকুম দেওয়া নয়, ব্যবস্থাটাকে কার্যকর করে তোলা – যে পরীক্ষায় তিনি ফেল করার রেকর্ডের অধিকারী। আবার, তাঁকে  মনে করিয়ে দেওয়াটা নাগরিকদের পরীক্ষা – যে পরীক্ষায় পাশ করাটাই একমাত্র বিকল্প, ফেল করার বিলাসিতা দেখানোর পথ খোলা নেই। 


প্রকাশের তারিখ: ৩১-অক্টোবর-২০২৬

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org