উপনিবেশবাদের শৃঙ্খল ভাঙার কাজ যেখানে থমকে ছিল

প্রভাত পট্টনায়েক
পয়লা সেপ্টেম্বর। আন্তর্জাতিক যুদ্ধ-বিরোধী শান্তি সংহতি দিবস। ১৯৩৯ সালের এই দিনটিতেই জার্মান নাৎসি বাহিনী আক্রমণ করে পোল্যান্ড। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরু। পুরোনো ধরনের উপনিবেশবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের চেহারা আজ নেই। এখন সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যকে ফেরানোর চেষ্টা হচ্ছে নয়া উদারবাদের পথে। তবে বিশ্বের একটি অংশে পুরনো ধরনের উপনিবেশবাদকে ধ্বংস করার প্রক্রিয়া এতদিন থমকে ছিল। সম্প্রতি তার বিরুদ্ধে নতুন করে সংগ্রাম শুরু হয়েছে ফরাসিভাষী আফ্রিকার দেশগুলিতে। এবছরের সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী দিবসে ওই দেশগুলিতে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রাম কীভাবে বিকশিত হচ্ছে, এই নিবন্ধে সেটাই তুলে ধরা হয়েছে।

[ছবিঃ সামরিক হস্তক্ষেপের হুমকির প্রতিবাদে নাইজারের রাজধানী নিয়ামেতে বিক্ষোভ সমাবেশ।]

পূর্বতন উপনিবেশগুলির বেশিরভাগ অংশই গড়ে তুলেছিল এমন এক শাসন ব্যবস্থা যেখানে সমাজ ও অর্থনীতিতে  সরকারের নিয়ন্ত্রণ অনেক দূর পর্যন্ত কায়েম করা হয়েছিল। এই নিয়ন্ত্রণ কায়েম করা হয়েছিল সাম্রাজ্যবাদী (‌মেট্রোপলিস) পুঁজির হাত থেকে দেশের প্রাকৃতিক সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেওয়ার জন্য এবং সংরক্ষণবাদী নীতির বেড়া তুলে দেশজ শিল্প গড়ে তোলার জন্য। 

নয়া উদারবাদী বিশ্ব ব্যবস্থার মধ্যে দিয়ে পূর্বতন উপনিবেশগুলিকে ফের সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যের জোয়ালে জুড়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে বিশ্বের একটা অংশে উপনিবেশবাদী জোয়াল ভেঙে ফেলার প্রক্রিয়া কখনই সম্পূর্ণ হয়নি। এই ক্ষেত্রটি হল পশ্চিম আফ্রিকার পূর্বতন ফরাসি উপনিবেশগুলি। যদিও এসব দেশে ফরাসি প্রশাসকদের বদলে স্থানীয় লোকজনই প্রশাসনের শীর্ষে জায়গা করে নিয়েছিল, তবে তারা ফরাসি আধিপত্যের শৃঙ্খল কার্যকরভাবে ভেঙে ফেলতে পারেনি। এর মানে দাঁড়ায় মূল সাম্রাজ্যবাদী দেশের আধিপত্যের নিগড় এমনকি সাময়িকভাবেও দুর্বল করা যায়নি।

ফরাসি সেনাবাহিনী এই সব দেশগুলোতে এখনও ঘাঁটি গেড়ে রয়েছে। এই সব দেশগুলিকে একটি মুদ্রার মাধ্যমে ফ্রান্সের সঙ্গে বেঁধে ফেলা হয়েছে। এই সব দেশগুলির মুদ্রা হল সিএফএ ফ্রাঁ (‌যা চালু হয় ১৯৪৫ সালে)‌। পুরনো ফরাসি মুদ্রা ফ্রাঁ (‌এবং তারপরে ইউরো)‌-র সঙ্গে সিএফএ ফ্রাঁ-র বিনিময় হার ছিল একেবারে স্থির। সেই বিনিময় হারে আবার সব সময়ই সিএফএ ফ্রাঁ-র দাম কিছুটা বাড়িয়ে রাখা হত। এর মানে  সিএফএ ফ্রাঁ-র তুলনায় ইউরোর দাম কম রাখা হয়েছিল। যখন দুটি মুদ্রার মধ্যে এধরনের বোঝাপড়া তৈরি করা হয়, তখন যে মুদ্রার দাম আসল মূল্যের চেয়ে কিছুটা বাড়িয়ে রাখা হচ্ছে সেটা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে। এর ফলে যে দেশের মুদ্রার দাম প্রকৃত মূল্যের চেয়ে বাড়িয়ে রাখা হচ্ছে, সেই দেশটির বি–শিল্পকরণ ঘটে এবং বেকারি বাড়ে। জার্মানির সঙ্গে ‘‌পুনরৈক্যের’‌ পর ঠিক এমনটাই ঘটেছিল পূর্ব জার্মানির ক্ষেত্রে। ফরাসিভাষী আফ্রিকার ক্ষেত্রেও ইউরোর তুলনায়  সিএফএ ফ্রাঁর বিনিময় হার প্রকৃত মূল্যের চেয়ে বেশি রাখার ফলে ওই দেশগুলি একেবারে ডুবে গিয়েছিল। কারণ এর ফলে কখনই ওই সব দেশের নিজস্ব শিল্প গড়ে ওঠেনি: এই দেশগুলির ‌কোনওটাতেই দেশজভাবে কোনও শিল্প দ্রব্য উৎপাদন করা যায়নি কারণ মুদ্রার বিনিময় হারের কারণে নিজের দেশে শিল্পপণ্য তৈরির চেয়ে তা ফ্রান্স থেকে আমদানি করলে বরং শস্তা পড়ত (‌এর ফলে ফ্রান্স সবসময়ই তাদের শিল্পপণ্যের এমন একটা স্থায়ী বাজার পেয়ে যেত যেখানে শুধু ফরাসি মাল ছাড়া অন্য কোনও দেশের মাল কেনার সুযোগ নেই)‌। অন্যদিকে, এই সব দেশ থেকে যে সব প্রাথমিক পণ্য রপ্তানি করা হত সেগুলো আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রি করতে হত আগে থেকে নির্ধারিত বা স্থির ডলারের দামে (‌ অতএব ফ্রাঁ–তেও)‌। এক্ষেত্রে সিএফএ ফ্রাঁর দাম যেহেতু বাড়িয়ে রাখা হয়েছে তাই তার সহজ মানে হল, রপ্তানিকারী দেশের শ্রমিকদের মজুরি প্রয়োজন মতো কমাতে হবে যাতে প্রাথমিক পণ্যের বাজারে এই সব দেশের রপ্তানি করা পণ্য প্রতিযোগিতায় টিকতে পারেসুতরাং এসবের নীট ফল দাঁড়াত, মজুরির হারের বিচারে স্থানীয় লোকজনের কোনও লাভ হত না, উল্টে কর্মসংস্থানের নিরিখে তাদের ক্ষতি হত (‌যার দ্বিতীয় দফার প্রভাবও গিয়ে পড়ত মজুরির হারের ওপর)‌। সংক্ষেপে এই সব দেশগুলির কপালে লেখা হয়ে গিয়েছিল স্থায়ী অনুন্নয়ন ও চরম দারিদ্র।

তবে এটাই সব নয়। এই সব দেশের বিদেশি মুদ্রা ভাণ্ডারের একটা বড় অংশ (‌অন্ততপক্ষে ৫০ শতাংশ)‌ রাখা থাকত ফ্রান্সে, ঠিক যেমনটা ছিল ঔপনিবেশিক ভারতে, ফলে ফ্রান্সের বিদেশি মুদ্রার ভাণ্ডার ছিল দারুন সুবিধাজনক অবস্থায়। এবং ফরাসি মুদ্রার সঙ্গে স্থির বিনিময় হার বজায় রাখতে গিয়ে এই সব দেশের আর্থিক নীতিকে (‌মানিটরি পলিসি)‌ ফ্রাসের আর্থিক নীতির সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ রাখাটাও প্রয়োজন বলে মনে করা হত। অর্থাৎ শেষ বিচারে এই সব দেশের আর্থিক নীতি নিয়ন্ত্রণ করত ফরাসি আর্থিক কর্তৃপক্ষই। এর ফলে এই সব দেশের হাতে নিজস্ব অর্থনৈতিক উন্নয়নের যে হাতিয়ারগুলি ছিল তা থেকে বাদ পড়ে গিয়েছিল একটা সম্ভাব্য হাতিয়ার এবং সেটা হল নিজস্ব আর্থিক নীতি।

এই উদ্ভট পরিস্থিতি রাজনৈতিক ভাবে টিকিয়ে রাখা হত একগুচ্ছ পদক্ষেপের সাহায্যে, গণতন্ত্রের পর্দার আড়ালে রিগিং করা নির্বাচন থেকে শুরু করে, ক্যুদেতা এবং এমনকী গুপ্তহত্যা পর্যন্ত। এসবের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা হল থমাস সাংকারার পরিণতি। সাংকারা ছিলেন বুরকিনার সামরিক অফিসার এবং মার্কসবাদী বিপ্লবী ও প্যান-আফ্রিকাপন্থী। ১৯৮৩ সালে তিনি বুরকিনা ফাসোর ক্ষমতায় আসেন এবং তিনি চেয়েছিলেন স্বদেশ থেকে সব ফরাসি সেনা হঠিয়ে দিতে। সাংকারা এখন গোটা আফ্রিকায় একজন স্মরণীয় ব্যত্তিত্ব। তাঁর নিজের ঘনিষ্ঠ এক সহযোগীই তাঁকে গোপনে হত্যা করে। সেই সহকারী সাম্রাজ্যবাদের হয়ে কাজ করছিলেন বলে অভিযোগ এবং সেই খুনিই পরে দেশের প্রেসিডেন্ট হন। তখন ইসিওডব্লিউএএস (‌ইকনমিক কমিউনিটি অফ ওয়েস্ট আফ্রিকান স্টেটস)‌ নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলা হয়। সেখানে ছড়ি ঘোরাতেন পশ্চিম আফ্রিকার সেই সব নেতারা যারা চলতেন পশ্চিমী সাম্রাজ্যবাদী দুনিয়ার নেতাদের অঙ্গুলিহেলনে। ইসিওডব্লিউএএস-ই ওই অঞ্চলের স্থিতাবস্থা বজায় রাখার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেয় এবং সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থবাহীর ভূমিকা পালন করে।

সম্প্রতি ফরাসিভাষী আফ্রিকার কয়েকটি দেশে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী অভ্যুত্থান হয়েছে। গিনি, মালি, চাদ, বুরকিনা ফাসো— এই সব দেশে গত কয়েক বছরে নতুন সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সরকার ক্ষমতায় এসেছে যারা ফরাসি সেনাকে তাদের দেশ থেকে হঠাতে চায়। এবং দেশ থেকে ফরাসি সেনাকে সরিয়ে দিতে সফলও হয়েছে মালি।

এই গোষ্ঠীতে সম্প্রতি যোগ দিয়েছে নাইজার। এই গোষ্ঠীভুক্ত দেশগুলির সরকার ক্ষমতায় এসেছে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে। এবং নাইজারে অভ্যুত্থান হয়েছে এক নির্বাচিত সরকারের বিরুদ্ধে। এর দরুন সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলি ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত নতুন সরকারগুলিকে ‘‌গণতন্ত্র বিরোধী’‌ হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণা তৈরি করছে। যদিও কোনও দেশে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দক্ষিণপন্থী তথা সাম্রাজ্যবাদের সমর্থক সরকারকে ক্ষমতায় বসানো হলে সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলি কখনই তাদের সম্পর্কে একই অবস্থান নেয় না।

সাম্রাজ্যবাদের এই দ্বিচারিতার পরিহাস সম্প্রতি খুব স্পষ্টভাবে সামনে এসেছে। নাইজারে যে নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেছে, তাকে প্রতিষ্ঠা করতে অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দিয়েছে প্রেসিডেন্টের রক্ষী বাহিনী। এরা দেশের সেনাবাহিনীর একটা এলিট অংশ। এরা বিদ্রোহ করেছে প্রেসিডেন্ট বাজুমের নির্বাচিত সরকারের বিরুদ্ধে। প্রেসিডেন্টে বাজুমের সরকার আসলে পশ্চিমী দেশগুলির ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ধ্বজাধারী। এই সরকার এমনকি নাইজারে মোতায়েন রাখা ফরাসি সেনার সংখ্যা আরও বাড়ানোর পক্ষে ওকালতি করে। মার্কিন নিও কন উপ–বিদেশ সচিব ভিক্টোরিয়া নিউল্যান্ড অভ্যুত্থানের নেতাদের একজনের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন, যে ব্যক্তিটি সামরিক প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন আমেরিকায়। নিউল্যান্ড তাকে বোঝাতে গিয়েছিলেন নাইজারের নতুন সরকার যেন গণতন্ত্রকে মান্যতা দেয় এবং প্রেসিডেন্ট বাজুমকে ক্ষমতায় ফেরায়। এই একই ভিক্টোরিয়া নিউল্যান্ড সরাসরি দায়ী ২০১৪ সালে ইউক্রেনে অভ্যুত্থান সংগঠিত করার কাজে। সেই অভ্যুত্থানেই ইউক্রেনের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট  ভিক্টর ইয়ানুকোভিচ ক্ষমতাচ্যুত হন। এটা ছিল এমন এক ঘটনা যা থেকে আরও বহু ঘটনা ঘটে যার পরিণতিতে আজকের ইউক্রেনে ট্র্যাজিক যুদ্ধ শুরু হয়েছে। অন্যভাবে বললে, গণতন্ত্রের জন্য সাম্রাজ্যবাদীদের আদৌ কোনও মাথাব্যথা নেই। তাদের আসল লক্ষ্য হল সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্য টিকিয়ে রাখা।

ফরাসিভাষী আফ্রিকায় নির্বাচিত সরকারগুলিকে মান্যতা দেওয়ার জন্য যে যুক্তি পেশ করা হয় তা ততটা ব্যতিক্রমী নয় বলেই আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তব ঘটনা হল, সাম্রাজ্যবাদের ধ্বজাধারী পশ্চিম আফ্রিকার বহু রাজনীতিবিদ বিপুল ব্যক্তিগত সম্পদ কুক্ষিগত করেছেন ফরাসি সরকার ও ফরাসি ব্যবসায়িক স্বার্থের অংশীদার হয়ে।

তাঁরা ফরাসি ব্যবসায়ীদের তাদের দেশের মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ লুঠ করতে দিয়েছেন, (‌উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, নাইজার সমৃদ্ধ তাদের ইউরেনিয়ামের ভাণ্ডারের কারণে এবং ফ্রান্সের সেই ইউরেনিয়াম দরকার বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য)‌। এভাবে অন্যায়ভাবে অর্জিত বিপুল সম্পদের একাংশ দিয়ে রাজনীতিকরা ভোট কেনে, এর সঙ্গে অতিরিক্ত বিষয় হিসাবে যুক্ত হয় রিগিং, এবং তাতে ভোটে জেতার পথ প্রশস্ত হয়। সংক্ষেপে, নির্বাচিত সরকারগুলি মোটেই সাধারণ মানুষের সমর্থনের ওপর দাঁড়িয়ে নেই। এই সব সরকার তৈরি করেছে দুর্নীতিবাজ রাজনীতিকরা, তৈরি করেছে যাতে তারা ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারে।

অন্যদিকে, এই সব দেশগুলির সেনাবাহিনীর একটা অংশের মধ্যে রয়েছে বিপ্লবী ও দেশপ্রেমিক ভাবনার সত্যিকারের আধার। সুতরাং এটা মোটেই আশ্চর্যের নয় যে, নাইজারের অভ্যুত্থানকে ব্যাপকভাবে স্বাগত জানিয়েছেন স্থানীয় জনসাধারণ, এমনকী পশ্চিমী জনমত সমীক্ষার হিসাবেও যাদের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ চান যে, ফরাসিরা তাদের দেশ থেকে চলে যাক।

নির্বাচনী প্রক্রিয়ার সঙ্গে যে দুর্নীতি জড়িয়ে রয়েছে তা একেবারে জলের মতো স্পষ্ট হয়ে যায় সমসাময়িক নাইজেরিয়ায়। সেদেশে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট, বোলা টিনুবুর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি বিপুল সম্পদ কুক্ষিগত করেছেন

একদল মাদক চোরাচালানকারীদের হয়ে ব্যাপক অর্থ নয়ছয় করে। যখন টিনুবু আমেরিকায় ছিলেন তখনই এই ড্রাগ চালানকারীদের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্বের সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল (‌এম আর অনলাইন, ১২ আগস্ট)‌। নাইজিরিয়ায় ফিরে আসার পর  তিনি দেশের সবচেয়ে ধনী রাজনীতিকদের বৃত্তে এসে পড়েন এবং অভিযোগ যে তিনি দেশের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার জন্য টাকা ছড়িয়ে ভোট কিনেছিলেন। নাইজিরিয়ার মার্কিন দূতাবাসের সঙ্গে তাঁর সবসময়ই ঘনিষ্ঠ যোগ রয়েছে এবং নাইজারে অভ্যুত্থানের পর একতরফা নিষেধাজ্ঞা জারি করে তিনি নাইজিরিয়া থেকে নাইজারে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করার সিদ্ধান্ত দেন। তাছাড়া, টিনুবুই এখন ইসিওডব্লিউএএস-এর চেয়ারম্যান। ফলে এই সংগঠনটিকে তিনি নাইজারের এখনকার সাম্রাজ্যবাদ–বিরোধী সরকারের বিরুদ্ধে সক্রিয় করে তুলতে চাইছেন। চেয়ারম্যান হিসাবে তিনি ঘোষণা করেছেন যে, যদি নাইজারের পদচ্যুত প্রাক্তন প্রেসিডেন্টকে তাঁর স্বপদে ফেরানো না হয়, তাহলে তাঁকে ক্ষমতায় ফেরাতে ইসিওডব্লিউএএস সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ করবে।

ফরাসিভাষী আফ্রিকায় এটা টিনুবুর দুর্ভাগ্য এবং সাম্রাজ্যবাদ–বিরোধী শক্তির সৌভাগ্য যে, টিনুবুর নিজের দেশের সেনেটই নাইজারে সামরিক হস্তক্ষেপে সম্মতি দেয়নি। এবং গিনি, বুরকিনা ফাসো এবং মালি ইতিমধ্যেই ঘোষণা করেছে যে, যদি নাইজারের বিরুদ্ধে সামরিক আগ্রাসন হয় তাহলে নাইজারে ক্ষমতাসীন নতুন সরকারকে রক্ষা করার জন্য তারাও সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ করবে।

এসব কিছু সত্ত্বেও ইসিওডব্লিউএএস তাদের সামরিক হস্তক্ষেপের পরিকল্পনা বাতিল করেনি এবং রিপোর্ট পাওয়া যাচ্ছে যে নাইজারের সীমান্তে সেনা সমাবেশ করা হচ্ছে। অতএব ফরাসিভাষী আফ্রিকা এখন যুদ্ধের মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে। যদি যুদ্ধ হয় তাহলে সেটা হবে নাইজার, গিনি, বুরকিনা ফাসো এবং মালির বিরুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদীদের ছায়াযুদ্ধ। এই দেশগুলি বি–উপনিবেশীকিকরণের প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিতে যেতে চায়, যে  প্রক্রিয়া  একেবারে শুরু থেকেই থমকে রয়েছে। এই বিষয়টাও গুরুত্বপূর্ণ যে, সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলি খুবই অল্প সময়ের জন্য নিজেরাই নাইজারের বিরুদ্ধে সামরিক হস্তক্ষেপের কথা ভাবলেও পরে সেই ভাবনা থেকে পিছিয়ে আসে এবং তাদের হয়ে সামরিক হস্তক্ষেপের পরিকল্পনা কার্যকর করার জন্য ইসিওডব্লিউএএস-কে এগিয়ে দেয়।

এটাও খুবই তাপর্যপূর্ণ যে ফরাসিভাষী আফ্রিকার নতুন সরকারগুলি সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে তাদের লড়াইয়ে সাহায্যের জন্য রাশিয়ার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। এবং তৃতীয় বিশ্বের সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রামে সোভিয়েত ইউনিয়ন যে ভূমিকা পালন করেছিল এই দেশগুলি রাশিয়াকে প্রায় সেভাবেই চাইছে। তবে এখন আর সোভিয়েত ইউনিয়নের অস্তিত্ব নেই এবং এখনকার রাশিয়া আদৌ সোভিয়েতের আদর্শের উত্তরাধিকারী নয়। তবু অন্য একটা মঞ্চে রাশিয়া নিজে এখন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালাচ্ছে এবং সেকারণেই রাশিয়া এখনও বিশ্বাসযোগ্য।


ভাষান্তর: সুচ্চিকণ দাস

পিপলস ডেমোক্রেসি, ২০ আগস্ট, ২০২৩


প্রকাশের তারিখ: ০১-সেপ্টেম্বর-২০২৩

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org