ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার সাদৃশ্য ও রেষারেষি

এমির সাদের

দীর্ঘ সময় পর, প্রথমবারের মতো দেশ দু’টি আজ সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিস্থিতির মুখোমুখি। যেখানে ব্রাজিলে অর্থনীতির বিকাশ ঘটছে, পূর্ণ কর্মসংস্থান বজায় রয়েছে, নিয়ন্ত্রণে রয়েছে মুদ্রাস্ফীতি— সেখানে আর্জেন্টিনার অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন।

ঐতিহাসিকভাবেই, ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার মধ্যে রেষারেষি প্রতিফলিত হয়ে আসছে মূলত তাদের ফুটবল-কেন্দ্রিক সম্পর্ক দিয়ে— যা কখনোই মধুর ছিল না। বরাবরই ছিল তিক্ত। আর ফুটবলকে ঘিরে এই বৈরিতার রেশ— দেশ দু’টির পারস্পরিক সম্পর্কের অন্যান্য ক্ষেত্রেও ছড়িয়ে পড়েছে।

আপাতদৃষ্টিতে স্ববিরোধী মনে হলেও, দেশ দু’টির রাজনৈতিক ইতিহাস ছিল লক্ষণীয়ভাবে সমান্তরাল। গেতুলিও ভার্গাসের আন্দোলন এবং পেরোনবাদ ছিল লাতিন আমেরিকার দু’টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জাতীয়তাবাদী আন্দোলন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যথারীতি এই রেষারেষিকে কাজে লাগিয়েছে। এবং এর বিরোধিতা করেছে। গণমাধ্যমের বিভিন্ন অংশের ওপর নির্ভর করে তারা দেশ দু’টির মধ্যে ছড়িয়েছে বিভেদের বিষ। উসকে দিয়েছে সংঘাতকে।

জাতিগত ও সাংস্কৃতিকভাবে এদের মধ্যে পার্থক্য সবসময়ই ছিল চোখে পড়ার মতো। ব্রাজিলে কৃষ্ণাঙ্গ সংস্কৃতির যে প্রবল উপস্থিতি ও প্রভাব রয়েছে, তার চেয়ে আর্জেন্টিনায় ইউরোপীয় শিকড় ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। এছাড়া, উভয় দেশেই ছিল জনপ্রিয় সঙ্গীতের স্বতন্ত্র সব ধারা। ফুটবলের ক্ষেত্রেও উভয় দেশই ছিল এক অনন্য উচ্চতায়— পেলের অপ্রতিদ্বন্দ্বী অনিন্দ্যসুন্দর প্রতিভা আর মারাদোনা, মেসির অসাধারণ দুরন্ত প্রতিভার সুবাদে।

উভয় দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সমান্তরাল গতিপথ কেবল ভার্গাস ও পেরোনবাদের নীতির কারণেই তৈরি হয়নি। যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই মহাদেশে আবারও প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ শুরু করে, তখন তারা প্রকাশ্যে এমন সব আন্দোলনকে উসকে দেয় ও সমর্থন জোগায়— যার ফলে ভার্গাস আত্মহত্যা করতে বাধ্য হন। এবং পেরোনের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান ঘটে। এর ফলাফল ছিল প্রায় একই রকম। উভয় দেশেই এমন সব সরকার ক্ষমতায় আসে— যারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল বিনিয়োগকে স্বাগত জানায়। বিশেষ করে মার্কিন গাড়ি শিল্পের প্রসারের ক্ষেত্রে একই সব ব্র্যান্ডের আধিপত্য দেখা যায়। এর ফলে মার্কিন পুঁজির ব্যাপক অনুপ্রবেশ উভয় দেশের শিল্প-উন্নয়নের এই পর্যায়টিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।

📲 এখন এক ক্লিকেই মার্কসবাদী পথ আপনার হোয়াটস অ্যাপে

ভার্গাসের আত্মহত্যা এবং পেরোনের নির্বাসন ছিল এক রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণ। ভার্গাসের নীতিগুলি এক বড় ধরনের ধাক্কা খায়। নির্বাসন থেকে ফিরে লিওনেল ব্রিজোলা নিজেকে ‘ব্রাজিলীয় জনগণের হৃদয়ের গোপন আকর্ষণ’ বলে মনে করতেন। তাঁর ধারণা ছিল, যেহেতু তিনি ভার্গাসের নীতির ধারাবাহিকতা বহন করছেন, তাই তাঁকে বিপুল উদ্দীপনার সঙ্গে বরণ করে নেওয়া হবে।

কিন্তু, তিনি সম্পূর্ণ ভুল ছিলেন। তিনি নির্বাসনে থাকার সময়ই ব্রাজিলের অর্থনৈতিক উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু রিও ডি জেনিরো— এবং সেখানকার রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার শ্রমিকরা— সরে আসেন সাও পাওলোর দিকে— বিশেষ করে মোটরগাড়ি শিল্পের দিকে। আর এই প্রক্রিয়ায় উঠে আসে শ্রমিকদের এক নতুন প্রজন্ম— যার অংশ ছিলেন লুলা, তার ওয়ার্কার্স পার্টি (পিটি) এবং ট্রেড ইউনিয়ন ইউনিফাইড ওয়ার্কার্স সেন্ট্রাল (সিইউটি)।

পরবর্তীতে, সমগ্র ব্রাজিলের রাজনৈতিক ইতিহাসে আধিপত্য বিস্তারকারী এই নতুন প্রজন্ম এমনকি ভার্গাসেরও বিরোধী ছিল। তারা রাষ্ট্রব্যবস্থার কাছে শ্রমিক আন্দোলনের যে অধীনতা— যা ছিল ভার্গাসের শাসনের একটি বৈশিষ্ট্য— তার ছিল কড়া সমালোচক।

একই সময়ে রাজনৈতিক মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু সরে যায় লুলা ও পিটি-র দিকে। তারা ব্রিজোলার বিরোধিতা করে। এবং শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়। ব্রিজোলা নিজে তার সরল দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মনে করতেন যে, পিটি ও লুলার আন্দোলন ছিল তাঁর প্রকল্পের বিরুদ্ধে সাও পাওলোর বুর্জোয়া শ্রেণি ও ব্রাজিলের দক্ষিণপন্থীদের দ্বারা পরিকল্পিত একটি প্রক্রিয়া।

ইতিমধ্যে, নির্বাসন থেকে পেরোনের কর্মকাণ্ডে উৎসাহিত হয়ে পেরোনবাদ নিজেকে পুনর্গঠিত ও সুসংহত করে। এবং তার সমস্ত ঐতিহাসিক শক্তিকে পুনরুদ্ধার করে। একই সঙ্গে, আর্জেন্টিনার দক্ষিণপন্থী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে পেরোনবাদ-বিরোধিতার বিষয়টিও অব্যাহত থাকে।

দেশ দু’টির মধ্যে এই বিশেষ সম্পর্কের গতিধারায় একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সন্ধিক্ষণের মুহূর্ত ছিল আর্জেন্টিনায় লুলা ও নেস্তর কির্চনারের মধ্যে সেই ঐতিহাসিক আলিঙ্গন। এই ঘটনাটি উরুগুয়েতে ‘ব্রড ফ্রন্ট’-এর ক্ষমতায় আসার পথ প্রশস্ত করে। এবং এর মাধ্যমেই এই শতাব্দীর শুরুর দিকে মহাদেশজুড়ে জনমুখী সরকার গঠনের এক অসাধারণ প্রক্রিয়ার সূচনা হয়।

এর ফলে উভয় দেশের মধ্যে— শুধু লুলা ও কির্চনারের মধ্যেই নয়— বরং দিলমা রুসেফ ও ক্রিস্টিনা কির্চনারের সরকারের মধ্যেও— অভূতপূর্ব সব সাদৃশ্যের এক নতুন অধ্যায়ের সূচিত হয়।

পরে বিভিন্নভাবে এই প্রক্রিয়াগুলো বাধাগ্রস্ত হয়। ব্রাজিলে দিলমা রুসেফকে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে অপসারণ এবং লুলাকে কারাবন্দি করার জন্য এক নতুন ধরনের দক্ষিণপন্থী অভ্যুত্থান— যাকে ‘আইনি যুদ্ধ’ বা বিচার বিভাগের রাজনীতিকরণ বলা হয়— প্রয়োজন হয়। যদিও, পরে খোদ বিচার বিভাগ-ই এই পদক্ষেপগুলিকে অন্যায্য বলে স্বীকৃতি দেয়। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছয় যে, লুলা ফের ব্রাজিলের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। এবং দিলমা ব্রিকস ব্যাংকের সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

আর্জেন্টিনায় এই প্রক্রিয়ার সূচনা হয় হাভিয়ের মিলেইয়ের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। তিনি ‘অ্যান্টি-পেরোনিজম’ বা পেরোনবাদ-বিরোধী মনোভাবকে কাজে লাগান। এবং এখনও লাগাচ্ছেন— যা ব্রাজিলের পরিস্থিতির চেয়ে ভিন্ন (ব্রাজিলে ‘অ্যান্টি-পিটি’ বা পিটি-বিরোধী মনোভাব থাকলেও, তা এতটা প্রবল নয়)।

🔍আরও পড়ুন:  ফকল‍্যান্ড, আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ড, কাবো ভার্দে, ফিদেল এবং চে 

পরিস্থিতি এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, দীর্ঘ সময় পর প্রথমবারের মতো দেশ দু’টি সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিস্থিতির মুখোমুখি। যেখানে ব্রাজিলে অর্থনীতির বিকাশ ঘটছে, পূর্ণ কর্মসংস্থান বজায় রয়েছে এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে— সেখানে আর্জেন্টিনার অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন।

আর্জেন্টিনার এই পরিস্থিতি নিয়ে ব্রাজিলে লুলা যতটা উদ্বিগ্ন ও ব্যথিত— আর কেউ ততটা নন। তিনি ইতিমধ্যেই বুয়েনস আয়ার্সের গভর্নর অ্যাক্সেল কিসিলফের সঙ্গে দেখা করেছেন। লুলার আশা আর্জেন্টিনা দ্রুত তার বর্তমান সংকট কাটিয়ে উঠবে, যাতে তিনি বুয়েনস আয়ার্সে ফিরে আবারও প্লাজা রোসাদায় ভাষণ দিতে পারেন।

দুই ভ্রাতৃপ্রতিম দেশ আবারও একই ধরনের পরিস্থিতির অভিজ্ঞতা লাভ করবে। এবং কোনও রেষারেষি ছাড়াই— শুধুমাত্র পারস্পরিক মৈত্রী-সহযোগিতার ভিত্তিই— দুই দেশের ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আবারও নতুন করে গড়ে তুলতে পারে।

এমির সাদের: বামপন্থী, ব্রাজিলের অগ্রণী সমাজতাত্ত্বিক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী।
বৃহস্পতিবার লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে বুয়েনস আয়ার্স থেকে প্রকাশিত দৈনিকে।


প্রকাশের তারিখ: ১৭-জুলাই-২০২৬

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org