|
সিন্ধের ভগৎ সিং : জীবন ও জীবনের উত্তরপারে পাকিস্তানের হেমু কালানীরাজা নাঈম |
পীর আলী মুহম্মদ রাশদী তাঁর 'দোজ ডেজ, দোজ ওয়েজ' বইতে লিখেছেন যে হেমুর আত্মীয়রা অনেকেই ক্ষমাভিক্ষার আবেদন করেছিলেন কিন্তু হেমু তার একটিতেও স্বাক্ষর করেননি। এই সমস্ত অনুরোধের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সামরিক অধিকর্তা তার প্রতিনিধিদের হেমুর কাছে পাঠিয়েছিলেন যাতে তারা তাঁর সাথে দেখা করে জানতে পারে যে হেমু তাঁর কাজের জন্য অনুতপ্ত কি না। কিন্তু তিনি আগাগোড়া দৃঢ় থেকে জানিয়ে দেন বেঁচে থাকলে তিনি আবারও একই কাজ করবেন। |
শেষ পর্ব (একদিকে বিভাগোত্তর পাকিস্তানে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের ইতিহাসের সাম্প্রদায়িকীকরণ এবং তার অপর পক্ষে অবস্থান নিয়ে পাকিস্তানের বামপন্থীদের উদ্যোগে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের পক্ষপাতমুক্ত সামগ্রিক ইতিহাসকে জনসাধারণ্যে নিয়ে আসার লড়াই তার পরিপ্রেক্ষিতেই রচিত এই নিবন্ধ। এই নিবন্ধে একদিকে উঠে এসেছে স্বাধীনতা পূর্ব সিন্ধের বিপ্লবী হেমু কালানীর জীবনের প্রথম পর্ব, স্বাধীনতা আন্দোলনের অভিঘাতে কী করে তাঁকে বিপ্লবীতে রূপান্তরিত করে, ব্রিটিশের হাতে তাঁর ধরা পড়া, তাঁর বিচার, যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সাজা এবং সেই সাজার মৃত্যুদণ্ডে পরিবর্তিত হওয়া, কীভাবে তাঁর শীতল মরদেহ শ্রদ্ধাবনত জনতার মাঝখান দিয়ে জন্মভূমি সুক্কুরের মাটিতে পৌঁছয় তার কথা। আবার জীবনের উত্তর সময়ে দ্বিখণ্ডিত স্বদেশের স্বাধীনতায় কীভাবে তাঁর পরিবার অন্য সিন্ধিবাসী স্বজন পরিজনদের মত বাস্তুহারা হয়ে ভারতে আশ্রয় নেয়। হেমু কালানীর স্মৃতিও দ্বিখণ্ডিত হয়ে যায়। ভারতে সংসদ ভবনের সামনে স্থাপিত হয় তাঁর মূর্তি, কোথাও উদ্যান, কোথাও সড়কের নামকরণ হয় তাঁর নামে। অথচ জন্মভূমিতে হেমু চলে যান বিস্মৃতির অতলে। এমনকী তাঁর একমাত্র স্মারক হিসেবে থাকা সুক্কুরের উদ্যানটিও নামাঙ্কিত হয়ে যায় মহম্মদ বিন কাসেমের নামে। ২০২২ সালে স্বাধীনতার ৭৫তম বার্ষিকী এবং ২০২৩ সালে হেমু কালানীর জন্মশতবর্ষের মধ্যবর্তী সময়ে লিখিত এই নিবন্ধ পাকিস্তানের বামপন্থী আন্দোলনের তরফে অসাম্প্রদায়িক ইতিহাস রচনার উদ্যোগেরই একটি অংশ। বামপন্থায় গভীরভাবে বিশ্বাসী রাজা নাঈম একজন পাকিস্তানী সমাজ বিজ্ঞানী, গ্রন্থ সমালোচক ও পুরস্কার বিজয়ী অনুবাদক।। বর্তমানে লাহোর নিবাসী রাজা নাঈম লাহোরের প্রগতি লেখক সঙ্ঘের সভাপতি।)
হেমুর মামলা দায়ের করা হয়েছিল একটি বিশেষ আদালতে এবং পাকিস্তানের সংবিধান রচয়িতা আবদুল হাফিজ পীরজাদার পিতা আবদুল সাত্তার পীরজাদা, নন্দীরাম ওয়াধওয়ানি এবং সাধুরাম কালানী সহ চারজন আইনজীবী তাঁর হয়ে আদালতে দাঁড়ান। জেঠো লালওয়ানী 'দ্য ব্রেভারি অ্যান্ড স্পিরিট অফ হেমু' শিরোনামের নিবন্ধে লিখেছেন যে আইনজীবীরা হেমুকে আদালতে 'দোষ স্বীকার না করার' পরামর্শ দিয়েছিলেন। হেমুকে শৃঙ্খল পরা অবস্থায় আদালতে পেশ করা হয়। তিনি বলেন যে তাঁর কোনো অনুশোচনা নেই। আইনজীবীরা আদালতের কাছে অনুরোধ করেন, হেমু নিতান্তই তরুণ, তাই তার ভুলকে উপেক্ষা করে তাকে ক্ষমা করা হোক। যাবজ্জীবন কারাদণ্ড থেকে মৃত্যুদণ্ডে পরিবর্তন আদালত হেমুকে দশ বছরের কারাদণ্ড দেয় এবং মামলার কাগজপত্র হায়দ্রাবাদে অবস্থিত সিন্ধের সদর দফতরে পাঠিয়ে দেয়। সেখানে সামরিক আইন প্রশাসক মেজর-জেনারেল রিচার্ডসন সেই রায়কে মৃত্যুদণ্ডে পরিবর্তন করে দেন। অধ্যাপক লাইক জারদারি লিখেছেন যে হায়দ্রাবাদ সেন্ট্রাল জেলে গোপনে কোর্ট মার্শালের মামলা দায়ের করা হয়েছিল। পরবর্তীতে মেজর-জেনারেল রিচার্ডসনও পীর সিবগাতুল্লাহ শাহ রাশদীকে মৃত্যুদণ্ড দেন যা ১৯৪৩ সালের ২০ মার্চ কার্যকর করা হয়। করাচির তৎকালীন মেয়র জামশেদ মেহতা, সাধু-বেলার প্রধান-পুরোহিত স্বামী হরনামদাস, সাধু টি.এল.ভাসওয়ানী এবং আবদুল সাত্তার পীরজাদা বড়লাট সহ অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তি সামরিক আইন প্রশাসকের কাছে ক্ষমার আবেদন করেছিলেন যদিও এগুলোর কোনোটিতেই হেমুর স্বাক্ষর ছিল না। হেমু কালানীর ভাই টেকচাঁদ একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন যে তাদের মা-ও হেমুর সাথে দেখা করে বারবার তাঁকে ক্ষমাভিক্ষার আবেদনে স্বাক্ষর করার জন্য এবং ঘটনায় জড়িত সহযোগীদের নাম প্রকাশ করতে অনুরোধ করেছিলেন, কিন্তু তিনি প্রতিবারই তা প্রত্যাখ্যান করেন। পীর আলী মুহম্মদ রাশদী তাঁর 'দোজ ডেজ, দোজ ওয়েজ' বইতে লিখেছেন যে হেমুর আত্মীয়রা অনেকেই ক্ষমাভিক্ষার আবেদন করেছিলেন কিন্তু হেমু তার একটিতেও স্বাক্ষর করেননি। এই সমস্ত অনুরোধের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সামরিক অধিকর্তা তার প্রতিনিধিদের হেমুর কাছে পাঠিয়েছিলেন যাতে তারা তাঁর সাথে দেখা করে জানতে পারে যে হেমু তাঁর কাজের জন্য অনুতপ্ত কি না। কিন্তু তিনি আগাগোড়া দৃঢ় থেকে জানিয়ে দেন বেঁচে থাকলে তিনি আবারও একই কাজ করবেন। যে টেলিগ্রাম একদিন আগে এসে পৌঁছয় হেমু কালানীর ভাই টেকচাঁদ কালানী অত্যন্ত সাবধানে সেই টেলিগ্রামটি রক্ষিত করে রেখেছিলেন, যেখানে চার লাইনে হেমনদাসের মৃত্যুর কথা জানানো হয়েছিল। টেকচাঁদ বলেছিলেন যে তিনি ২০ জানুয়ারি একটি টেলিগ্রাম পান যে হেমুকে পরের দিন অর্থাৎ ২১ জানুয়ারি সকালে ফাঁসি দেওয়া হবে। টেকচাঁদ বলেছিলেন যে, হেমু তাঁর আত্মীয়দের সাথে শেষ সাক্ষাতের সময় বলেছিলেন, তোমরা কাঁদছো কেন? আমাকে আশীর্বাদ করো যাতে আমি আমার এই অসম্পূর্ণ কাজটা দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য আবার জন্ম নিতে পারি। টেকচাঁদ বলেছেন, হেমু লোহার গরাদের ভেতর থেকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলেন, আমি একটা কাজ অসম্পূর্ণ রেখে যাচ্ছি, তুমি সেটা শেষ করো। ফাঁসির দিন যখন হেমুর কাছে তার শেষ ইচ্ছা জানতে চাওয়া হয়, তখন তিনি বলেছিলেন যে আমি ফাঁসির মঞ্চে উঠব স্লোগান দিতে দিতে এবং আপনারা ‘সরকারি কর্তারা’ সেই স্লোগানের জবাব দেবেন। শীতল মরদেহের যাত্রা শিকারপুরের বাসিন্দা আমির আব্বাস সুমরো কয়েক বছর আগে ভারতে গিয়ে হেমুর ভাই টেকচাঁদের সঙ্গে দেখা করেন। তাঁর ভ্রমণকাহিনীতে এই সাক্ষাতের কথা উল্লেখ করে তিনি লিখেছেন, মরদেহ হস্তান্তরের জন্য এক হাজার টাকা দাবি করা হয়েছিল, যা তার পরিবারের পক্ষে দেওয়া সম্ভব হয়নি। পরে এক বিশিষ্ট ব্যক্তি মরদেহ পাওয়ার জন্যে এই অর্থ দান করেন। জেঠো লালওয়ানি লিখেছেন, হেমুর বাবা মা’কে লিখতে বলা হয়েছিল যে মৃতদেহ হস্তান্তরের পরে শহরে যদি অশান্তির সৃষ্টি হলে, তাহলে তার দায় তাঁরা গ্রহণ করবেন। খুব ভোরে হেমুকে ফাঁসি দেওয়া হয় এবং বিকেল সাড়ে চারটের সময় মরদেহ বাবা মায়ের হাতে তুলে দেওয়া হয়। শিক্ষার্থীরা সেদিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বয়কট করে এবং রাস্তায় হাজার হাজার মানুষের সমাগম হয়। শ্মশানে যাওয়ার পথে, বাড়ির জানালা থেকে মানুষ তাকে শেষবারের মতো দেখার জন্য অপেক্ষা করে এবং হেমুকে পুরানো শুক্কুরে দাহ করা হয়। নেহরু এবং সুভাষচন্দ্র বসুর শ্রদ্ধাজ্ঞাপন হেমুর মৃত্যুর পর সিন্ধের নানা শহরে প্রতিবাদ সভা হয়। করাচির স্বামীনারায়ণ মন্দিরে কালো পতাকা ওড়ানো হয় এবং সাধু বেলোতে হেমু কালানীর প্রতিকৃতি স্থাপন করা হয়। জওহরলাল নেহরু ২৬শে জানুয়ারী স্বাধীনতার উদযাপন উপলক্ষে ভাষণ দিতে গিয়ে বলেছিলেন, আমার মন চলে যাচ্ছে সিন্ধে যেখানে কয়েকদিন আগে হেমু কালানী এক যুবককে ফাঁসি দেওয়া হয়েছে। কিছুদিন আগেই সে ম্যাট্রিক পাশ করেছিল। আমি জানি না তার অপরাধের কোনো যথাযথ প্রমাণ পাওয়া গেছে কি না, তবে সামরিক আদালত তাকে একটি ছোট্ট প্রমাণের ভিত্তিতে ফাঁসির সাজা দিয়েছে যা আমাকে হতবাক করেছে। হেমু কালানীসহ যে তরুণরা দেশের স্বাধীনতার জন্য রক্ত দিয়েছেন, তা চিরকাল স্মরণে থাকবে। ১৯৪৩ সালে যখন নেহরু করাচিতে এলে প্রথমেই তিনি শুক্কুরে যান এবং হেমুর মা জেঠিবাইকে তাঁর সমবেদনা জানান। সুভাষচন্দ্র বসুর আজাদ হিন্দ ফৌজের ক্যাপ্টেন ধিলন হেমুর মাকে একটি স্বর্ণপদক দিয়েছিলেন এবং এইভাবে হেমু সিন্ধের 'ভগৎ সিং' হয়ে ওঠেন। হেমু কালানির পরিবারের দেশত্যাগ উপমহাদেশ ভাগ হয়ে যাওয়ার পর যখন হিন্দু জনগোষ্ঠী সিন্ধ থেকে ভারতে চলে যায়, তখন এই স্বাধীনতা সংগ্রামীর পরিবারও সেই স্বভূমি ত্যাগ করে যার জন্য তাঁদের সন্তান মহান আত্মত্যাগ করেছিলেন। মুম্বাইতে বসবাসকারী সিন্ধি কবি নন্দ জাভেরি বিবিসিকে বলেছেন যে মুম্বাইতে হেমুর বাবা-মায়ের বাড়ি ছিল তার বাড়ির পিছনে এবং হেমুর বাবা পেসুমলের একটি সিমেন্ট, বালি এবং নুড়ি পাথরের দোকান ছিল। ১৯৬৩ সালে আমি ওই এলাকা ছেড়ে চলে যাই এবং তারাও অন্য জায়গায় চলে যান। হেমুর ছোট ভাই টেকচাঁদ কিছুদিন আগে মারা যান। ১৯৬০ সালে সরকারের বরাদ্দ করা একটি জমিতে হেমুর সমস্ত বন্ধুরা হেমু কালানি ইয়াদগার মন্ডল (স্মৃতিচক্র) তৈরি করেছিলেন এবং এখন সেখানে একটি ছ’তলা ভবন রয়েছে যেখানে রয়েছেএকটি কম্পিউটার কলেজও এবং হেমুর শ্যালিকা কমলা তার একজন ট্রাস্টি। আমির আব্বাস লিখেছেন যে টেকচাঁদ কালানী তাঁকে বলেছিলেন যে চেম্বুর ক্যাম্পের লোকেরা জানে না হেমু কে। তারা প্রতি বছর তার মৃত্যুবার্ষিকী উদযাপন করতেন। তারপরই কোনওভাবে মানুষ জানতে পারে তাঁর কথা এবং বিষয়টি বিধানসভায় পৌঁছে দেওয়া হয়। 'ভগৎ সিং-এর চেয়েও বড় শহিদ' ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীও ১৯৮৩ সালে হেমু কালানীর স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করেছিলেন এবং ডাকটিকিট প্রকাশের অনুষ্ঠানে হেমুর মা জেঠিবাই সহ ভগৎ সিংয়ের মা-ও উপস্থিত ছিলেন। সংবাদপত্রে এই ছবি সিন্ধু মাতা (মা) এবং পাঞ্জাব মাতা নামে প্রকাশিত হয়েছিল। আমির আব্বাস বলেছেন, এই গল্পটি বর্ণনা করতে গিয়ে টেকচাঁদের চোখ ভিজে ওঠে এবং তিনি কাঁদতে শুরু করেন। আমি শুক্কুরে যাব এবং তাদের বাড়ির ছবি তুলে তাঁদের পাঠাব এই প্রতিশ্রুতিতে এই বৈঠক শেষ হয়েছিল। আমি এই প্রতিশ্রুতি পূরণ করেছিলাম কিন্তু শুক্কুরের মিরকি স্ট্রিটের এই বাড়িটি অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে তখন বিপজ্জনক অবস্থায় ছিল। ২১ আগস্ট, ২০০৩-এ, ভারতের সংসদে হেমু কালানীর একটি দশ থেকে বারো ফুট উঁচু মূর্তি স্থাপন করা হয়। প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী, এল.কে. আদবানী, জেঠমালানী এবং কংগ্রেস সভাপতি সোনিয়া গান্ধীও এই অনুষ্ঠানে অংশ নেন। উলহাসনগরে, ভেনাস চককে হেমুর নামে নামাঙ্কিত করা হয়েছে এবং ভারতের বিভিন্ন শহরে এক ডজনেরও বেশি রাস্তা এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হেমু কালানীর নামে নামাঙ্কিত রয়েছে। পাকিস্তানে, শুক্কুরের সিন্ধু নদীর তীরে অবস্থিত লুকাস পার্কটির নাম পরিবর্তন করে হেমু কালানী পার্ক রাখা হয়েছিল কিন্তু পরে এটি মুহাম্মদ বিন কাসিমের নামে নামাঙ্কিত করা হয়। বলা যায়, হেমু কালানী সিন্ধের কবিতা ও সাহিত্যে যথেষ্ট পরিমাণে যদিও উপস্থিত আছেন কিন্তু পাকিস্তানের স্বাধীনতার ৭৫তম বছরে এবং হেমু কালানীর জন্মশতবর্ষে তাঁর কোনো চিহ্ন তাঁর জন্মস্থানে নেই। অনুবাদ : সৃজনী গঙ্গোপাধ্যায়, অঙ্কিতা পাল প্রকাশের তারিখ: ১৪-আগস্ট-২০২৩ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |