|
অশান্ত ইরানকে বোঝার ৬টি বিষয় (শেষ পর্ব)বিজয় প্রসাদ |
প্রথমে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদে নেমেছিলেন ব্যবসায়ীরা। খুব শিগগরিই তাকে বদলে দেওয়া হয়েছিল একটা হিংস্র, রাষ্ট্রের ওপর থেকে নীচ পর্যন্ত হামলা চালানো একটা আন্দোলনে। গোড়ায় ‘প্রতিবাদের’ রূপ ছিল শান্তিপূর্ণ জমায়েত। দ্রুত তা পরিণত হয়েছিল উচ্চমাত্রার শহরভিত্তিক অন্তর্ঘাতমূলক কার্যকলাপে। এর জেরে ১০০ জন নিরাপত্তা অফিসারের মৃত্যু হয়েছে। জানা যাচ্ছে যে, কয়েকজন অফিসারকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়েছে। একজন নিরাপত্তারক্ষীর মাথা কেটে ফেলা হয়েছে, একটি ক্লিনিক জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে, তাতে একজন নার্সের মৃত্যু হয়েছে। সাধারণ নাগরিকদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হয়েছে স্বল্পপাল্লার আগ্নেয়াস্ত্র থেকে। এ থেকেই স্পষ্ট যে, দেশের মধ্যেকার উত্তেজনা বাড়াতে সর্বোচ্চ প্রয়াস চালানো হয়েছিল এবং সেটাই ছিল বিদেশি হস্তক্ষেপের জমি তৈরি করার একটি অজুহাত। মার্কিন বিদেশ দপ্তর ও মোসাদ খোলাখুলি হিংসায় মদত দিচ্ছে। |
প্রথম পর্বের পর... ইসলামি প্রজাতন্ত্রের রূপান্তর কর্মসূচির সামাজিক অ্যাজেন্ডা ছিল সঙ্কীর্ণ। পুরোনো অভিজাতদের একাংশকে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছিল। তাদের সম্পত্তি কেড়ে নেওয়া হয়নি। স্তরবিভক্ত শ্রেণি ব্যবস্থা গড়ে উঠতে দেওয়া হয়েছিল। এতে পুরোনো সম্পত্তি মালিকদের একাংশের লাভ হয়েছিল। লাভ হয়েছিল বিকাশমান মধ্যবিত্ত শ্রেণির। ১৯৮৯ সালের জুনে আয়াতোল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেইনির মৃত্যুর পর এবং ইরাক-ইরান যুদ্ধের শেষে, ইরানের সরকার আইএমএফ-এর কাঠামোগত রদবদলের নীতির বড় অংশকেই কার্যকর করেছিল। এবং সেই নীতি কোনও না কোনও ভাবে কয়েক দশক ধরে জারি ছিল (এই নীতির পিছনে ছিলেন মোহসেন নোরুবক্স, যিনি ১৯৮৯ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত ছিলেন অর্থনীতি বিষয়ক দপ্তরের মন্ত্রী এবং ১৯৯৪ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের শীর্ষকর্তা)। ১৯৭৯ সালে অর্থনীতিকে আদৌ সমাজতান্ত্রিক ধাঁচে সাজানো হয়নি। তবে এমনভাবে অর্থনীতি গড়ে তোলা হয়েছিল যেখানে রাষ্ট্রের এবং সরকারি পরিকল্পনার জোরদার ভূমিকা ছিল। কারণ তখন যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতিকে উজ্জীবিত করার দরকার ছিল। তাছাড়া ছিল ইসলামি সমাজকল্যাণ মূলক কর্মসূচি রূপায়ণের প্রতিশ্রুতি। নোরুবক্স রাষ্ট্রটাকে পুরোপুরি ভেঙে ফেলতে পারেননি। তবে তিনি মুদ্রা ও ব্যাঙ্ক ব্যবস্থার সংস্কার করেছিলেন এবং খুবই সতর্কতার সঙ্গে বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে ইরানের সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন। এতে শ্রেণি বিভাজন বেড়েছিল। সংখ্যাগরিষ্ঠ ইরানিদের জীবনধারণ আরও কঠিন হয়ে উঠেছিল। এর পিছনে ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয়দের জারি করা অর্থনৈতিক অবরোধ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলিদের সামরিক হামলার ভীতি (এর জেরে ইরানকে সামরিক খাতে খরচ অনেক বেশি বাড়াতে হয়েছিল। এখন সামরিক খাতে ব্যয় হয় জিডিপির ২.৫ শতাংশ যা শাহের আমলের ১২ শতাংশের থেকে অনেক কম)। এছাড়া ছিল সরকারের নয়া উদারনৈতিক অর্থমন্ত্রীদের দ্বারা অনুসৃত ক্রমবর্ধমান হারে নয়া উদারনৈতিক নীতি সমূহের প্রয়োগ (যেমনটা ২০১৩ থেকে ২০১৭ পর্যন্ত করেছিলেন আলি তায়েবনিয়া এবং ২০২৫ থেকে আলি মাদানিজাহেদা)। ইসলামি প্রজাতন্ত্রের এই সীমাবদ্ধতার কারণেই বারে বারে চক্রাকারে ফিরে এসেছে অর্থনৈতিক প্রতিবাদ: ২০১৭-১৮ সালে (মুদ্রাস্ফীতি ও ভরতুকি ছাঁটাইয়ের বিরুদ্ধে), ২০১৯ সালে (জ্বালানির দামবৃদ্ধির প্রতিবাদে), ২০২৫ সালে (রুটির দাম বাড়িয়ে দেন বেকারি মালিকেরা) এবং ২০২৫-২৬ (চড়া হারে মুদ্রাস্ফীতি এবং ইরানের মুদ্রা রিয়ালে ধ্বসের কারণে)। ৫। এখনকার যে প্রতিবাদ তার প্রধান কারণ হল মার্কিন ডলারের তুলনায় রিয়ালের দাম রেকর্ড হারে কমে যাওয়া এবং খাদ্যপণ্যের দাম ৬০ শতাংশ হারে বৃদ্ধি। এর সঙ্গে সাউথ পারসের শ্রমিক ধর্মঘটকে সমন্বিত নাগরিক হিংসায় পরিণত করা হয়েছে। এবং সেজন্য আরও গভীরে গিয়ে কলকাঠি নাড়া হয়েছে। প্রশাসন আমদানি-রপ্তানি ক্ষেত্রের একাংশের প্রতি আনুকূল্য দেখিয়েছে। অর্থনৈতিক অবরোধের প্রেক্ষিতে এই আনুকূল্য পণ্য রপ্তানিকারীদের সুবিধা করে দিয়েছে এবং তার দাম চোকাতে হয়েছে আমদানিকারীদের। এই পরিস্থিতিকে ঠিক জায়গায় নিয়ে আসা খুব সহজ নয়। তবুও মুদ্রার দামে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পতন দেশের বাইরে থেকে অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টির একটা ক্ল্যাসিক উদাহরণ। তাহলে এখন বিষষয়টা স্পষ্ট হচ্ছে। প্রথমে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদে নেমেছিলেন ব্যবসায়ীরা। খুব শিগগরিই তাকে বদলে দেওয়া হয়েছিল একটা হিংস্র, রাষ্ট্রের ওপর থেকে নীচ পর্যন্ত হামলা চালানো একটা আন্দোলনে। গোড়ায় ‘প্রতিবাদের’ রূপ ছিল শান্তিপূর্ণ জমায়েত। দ্রুত তা পরিণত হয়েছিল উচ্চমাত্রার শহরভিত্তিক অন্তর্ঘাতমূলক কার্যকলাপে। এর জেরে ১০০ জন নিরাপত্তা অফিসারের মৃত্যু হয়েছে। জানা যাচ্ছে যে, কয়েকজন অফিসারকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়েছে। একজন নিরাপত্তারক্ষীর মাথা কেটে ফেলা হয়েছে, একটি ক্লিনিক জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে, তাতে একজন নার্সের মৃত্যু হয়েছে। সাধারণ নাগরিকদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হয়েছে স্বল্পপাল্লার আগ্নেয়াস্ত্র থেকে। এ থেকেই স্পষ্ট যে, দেশের মধ্যেকার উত্তেজনা বাড়াতে সর্বোচ্চ প্রয়াস চালানো হয়েছিল এবং সেটাই ছিল বিদেশি হস্তক্ষেপের জমি তৈরি করার একটি অজুহাত। মার্কিন বিদেশ দপ্তর ও মোসাদ খোলাখুলি হিংসায় মদত দিচ্ছে। এর জেরে বোঝা যায় ভূরাজনৈতিক অশান্তি পরিস্থিতিকে কতটা উত্তেজিত করে তুলতে পারে। যখন কর্তৃপক্ষ ইন্টারনেট বন্ধ করে দিল,তখনই দেখা গেল প্রতিবাদ স্তিমিত হয়ে আসছে। ফলে আন্দোলনের স্বতঃস্ফূর্ততা নিয়েই প্রশ্ন উঠে যাচ্ছে। এবং এই তত্ত্বের পক্ষে সমর্থন উঠে আসছে যে সবকিছুকে এলোমেলো করে দেওয়ার পক্ষে একটি শক্তি তৎপর হয়ে উঠেছে এবং এখনকার আন্তর্জাতিক সঙ্কটকালের সুযোগ নিতে চাইছে।
৬। বিরোধীরা রাস্তায় নেমেছে। কিন্তু তারা একথা স্বীকার করছে যে, তাদের ক্ষমতা দখল করার শক্তি নেই। মার্কিন ও ইজরায়েলি হস্তক্ষেপের রিপোর্ট পাওয়া যাচ্ছে। শাহর ছেলে যে বলে যাচ্ছেন এ সব প্রতিবাদ গড়ে তোলার কৃতিত্ব তারই এবং তিনি এর সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাবেন, এতে বিরোধীদের খুব বেশি লাভ হচ্ছে না। এখন হাইপার সাম্রাজ্যবাদের শীর্ষে রয়েছেন ট্রাম্প এবং ইজরায়েল মনে করছে তারা সীমাহীন বিজয়ের পর্বে রয়েছে। ফলে এই বিপজ্জনক চক্রটি ঠিক কী করে বসবে তা জানা অসম্ভব। এখন ইরানে প্রতিবাদ স্তিমিত হয়ে আসছে, এই সুযোগে আমেরিকা ও ইজরায়েল তেহরান সহ অন্য শহরগুলিতে হামলা চালাতে পারে এবং এই হামলা ২০২৫ এর জুনের চেয়ে আরও বেশি জোরদার হতে পারে। এটা শুধুই ইরানের জনগণের পক্ষে উদ্বেগের কারণই নয়, এবং সেদেশের মানুষের বিশাল অংশই অবশ্যেই এমন হামলা চান না। এই পরিস্থিতি সমগ্র দক্ষিণ গোলার্ধের পক্ষেই বিপজ্জনক- কারণ ভেনেজুয়েলা ও ইরানের পর তারাই এখন আমেরিকা ও ইজরায়েলের টার্গেট। সত্যিকারের সমস্যাগুলো মানুষকে হতবুদ্ধি করে দিয়েছে। তবে হাইপার সাম্রাজ্যাবাদী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েল যদি আকাশ থেকে বোমাবর্ষণ করে তাতেও এই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে না। ইরানের লোকেদের নিজেদের সমস্যা নিজেদেরই মেটাতে হবে। অথচ অর্থনৈতিক অবরোধ ও হামলার হুমকি এসব হতে দেবে না। ‘ইরানিদের প্রতি সংহতি জানাতে হবে’ – পশ্চিমে একথা গুলোও বলা সহজ নয়। কারণ সেখানে প্রতিবাদীদের রীতিমতো পেটানো হচ্ছে, এমনকী হত্যাও করা হচ্ছে। কারণ এই সব প্রতিবাদীরা প্যালেস্তিনীয়দের সমর্থন করছেন এবং অভিবাসী বিরোধী নীতির প্রতি তাঁদের ক্ষোভ ফেটে পড়ছে। ‘অর্থনৈতিক অবরোধ , নিষেধাজ্ঞা’ তুলে নাও, মনে হচ্ছে এটা বলা আরও কঠিন। এবং তার ফলে নিজেদের সুস্থ ভবিষ্যৎ বেছে নেওয়ার সুযোগ পাওয়াটা ইরানের মানুষের পক্ষে আরও কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রকাশের তারিখ: ২৫-জানুয়ারি-২০২৬ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |