|
সামাজিক বিভাজন, বামপন্থা ও আত্মপরিচয়ের স্বাধীনতাঅমিয় কুমার বাগচী |
|
১৮৪৩ সালের শরৎকালে পঁচিশ বছরের যুবক কার্ল মার্কস লেখেন অপেক্ষাকৃত অবহেলিত একটি প্রবন্ধ, ‘On the Jewish Question’। সেটি Bruno Bauer লিখিত The Jewish Question (Braunschweig, 1843) বইটির দীর্ঘ সমালোচনা। এই প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয়েছিল Deutsch Franzosische Jahrbucher-এর ১৮৪৪-এর ফেব্রুয়ারি সংখ্যায়। মার্কস-এর অন্য অনেক দীর্ঘ সমালোচনার মতোই এটিও মৌলিক রচনা। আজও এই প্রবন্ধ আমাদের পক্ষে প্রাসঙ্গিক কারণ মার্কসের মতে যে বুর্জোয়া রাজনৈতিক স্বাধীনতার ফলে Civil Society অথবা ভব্য সমাজ রাষ্ট্রিক সংগঠনের থেকে বিযুক্ত হয় তারই ফলে প্রতিটি ব্যক্তি অন্যের মুখোমুখি হয় প্রতিযোগী হিসেবে এবং পূর্বেকার সমষ্টিবিধৃত পার্থক্যগুলি আলাদাভাবে মানুষে মানুষে বিভেদের সৃষ্টি করে। স্বাধীন ভারতের আধাসামন্ততান্ত্রিক বুর্জোয়া সমাজ ব্যবস্থায় জাতপাতের তফাৎ, সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ে তফাৎ কেন প্রকট হলো তা বুঝতে মার্কসের এই প্রবন্ধ আমাদের সহায়ক হতে পারে। মার্কসের মতে ব্রুনো বাওয়ারের আলোচনার অনেক ত্রুটির মধ্যে একটি হলো যে তিনি শুধু খ্রীষ্টানধর্মকেন্দ্রিক রাষ্ট্রের সমালোচনা করেছেন, কিন্তু রাজনৈতিক স্বাধীনতার সঙ্গে মানব মুক্তির সম্পর্ক আলোচনা করেননি। রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও মানবমুক্তিকে বাওয়ার সমার্থক বলে ধরে নিয়েছেন। যে রাষ্ট্র মানুষকে রাজনৈতিক স্বাধীনতা দেয় তার মধ্যেও, মানুষ প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মাবলম্বী হয়ে থাকতে পারে, কিন্তু বাওয়ার যদি ধর্মবিশ্বাস থেকেই মানুষের মুক্তি চান, তাহলে রাজনৈতিক স্বাধীনতা থেকে এগিয়ে মানুষের সর্বাঙ্গীন মুক্তিতে উত্তরণের কথা ভাবতে হবে। যে রাষ্ট্রে মানুষ স্বাধীনতা পায় এইভাবে যে, জন্ম, সামাজিক স্তর, বিত্ত, শিক্ষা, বৃত্তি নির্বিশেষে সেই রাজনৈতিক অধিকার পাবে, সেই রাষ্ট্র মানবমুক্তি আনতে পারে না। কারণ সেখানে ধরেই নেওয়া হচ্ছে যে ব্যক্তিগত সম্পত্তি, শিক্ষা, বৃত্তি ইত্যাদির পার্থক্য মানুষে মানুষে থেকেই যাবে এবং সত্যিকারের মানবমুক্তির পক্ষে তারা অন্তরায় হিসেবে কাজ করবে। যে রাষ্ট্র শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতা দেয়, সেখানে মানুষ রাষ্ট্রিক ক্ষেত্রে নিজেকে সমষ্টিবদ্ধ জীব বলে ভাবতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্রবিযুক্ত ভব্য সমাজে সে শুধু একজন সমাজ বিশ্লিষ্ট ব্যক্তি, সে অন্য মানুষকেও যেমন শুধু তার ব্যক্তিগত স্বার্থ সাধনের হাতিয়ার মনে করে, নিজেকেও সে, শুধু একটি স্বার্থসাধনের যন্ত্রে পর্যবসিত করতে বাধ্য হয়, এবং তার ভাগ্য নির্ধারিত হয় তার সঙ্গে সম্পর্করহিত বহিঃশক্তির দ্বারা। তরুণ মার্কসের মতে স্বাধীন সমাজে একজন বিশেষ ধর্মাবলম্বী মানুষ তার স্বাধীন নাগরিকত্বের সত্তার সঙ্গে নিজেকে সম্পূর্ণ মিলিয়ে ফেলতে পারে না। এবং রাষ্ট্রিক সমাজের সভ্য হিসেবে অন্য সমস্ত মানুষকে সমদৃষ্টিতে দেখতে পারে না। রাজনৈতিক স্বাধীনতার রাষ্ট্রিক ক্ষেত্র এবং বিশ্লিষ্ট ব্যক্তিসমূহের ভব্য সমাজের মধ্যে সঙ্ঘাত প্রায় অনিবার্য হয়ে ওঠে। বুর্জোয়া এবং ইহুদী শুধু নৈয়ায়িক যুক্তির বাক্যজালে স্বাধীন নাগরিক হিসেবে প্রতীয়মান হয়, যেমন স্বাধীন নাগরিকও শুধু সেই ন্যায়পণ্ডিতের বাক্যবিন্যাসে বুর্জোয়া অথবা ইহুদী হিসেবে দেখা দেয়। যে কোনও একজন বিশেষ ধর্মাবলম্বী লোক এবং বুর্জোয়া তার নাগরিক অস্তিত্বের সঙ্গে ধর্ম ও শ্রেণী-অবস্থানের অন্তর্দ্বন্দ্বে বিদীর্ণ হতে থাকে। সুতরাং শুধু বুর্জোয়া স্বাধীনতার প্যাঁচে পড়ে সমষ্টি বিশ্লিষ্ট ব্যক্তির সমাজে সঙ্ঘাতে ব্যক্তিমানস প্রায়শই ধর্মের পার্থক্যকে রথধ্বজ করে স্বার্থান্বেষণে লিপ্ত হয়। মার্কসের যুগে তকভিল, হ্যামিলটন ইত্যাদি লেখক মার্কিনী রাজনৈতিক স্বাধীনতার প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন। যদিও তকভিল তার অনেক অসদর্থক দিকেও অঙ্গুলি নির্দেশ করেছিলেন। তকভিলের বর্ণনা পড়েই মার্কস লক্ষ্য করেছিলেন যে, কীভাবে সমাজবিশ্লিষ্ট ব্যক্তির ভব্য সমাজে নিত্য নতুন ধর্ম সম্প্রদায়ের জন্ম হয়েছিল। তরুণ কার্ল মার্কসের স্বভাবপ্রবণতা তাঁর চিন্তাকে একেবারে চরম পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া। যদি রাষ্ট্রসংশ্লিষ্ট ভব্য সমাজ (Civil Society) বুর্জোয়া স্বাধীনতা দিয়ে বিপর্যস্ত হয়, তাহলে শুধু থাকবে সমাজ বিশ্লিষ্ট ব্যক্তির পারস্পরিক প্রতিযোগিতা, অন্য মানুষকে শুধু প্রতিযোগিতার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা। সুতরাং সমাধান হবে নতুনভাবে সমষ্টিবদ্ধ ভব্য সমাজের নির্মাণের মাধ্যমে যেখানে ধর্ম, সম্পত্তি, আয়, শিক্ষা, বৃত্তি কোনও কিছুরই তফাৎ মানুষে মানুষে থাকবে না। এই চিন্তারই আরও বিস্তৃত রূপায়ণ হলো German Ideology-তে যেখানে আত্মবিশ্লিষ্ট মানুষ (Alienated human beings) নিজের সঙ্গে, অন্য মানুষের সঙ্গে, সমাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হয়ে চূড়ান্ত মুক্তির আলোয় উত্তরণের স্বপ্ন দেখে। কিন্তু বুর্জোয়া স্বাধীনতা আসার সঙ্গে সঙ্গেই শিক্ষা, বৃত্তি, ধর্ম বা জাতপাত, আদিবাসী এবং বৃহত্তর বর্গের অংশ হিসেবে পরিচয় শেষ হয়ে যায় না। শ্রেণী বিভাজনও অন্যতর ঐসব বিভাজনকে আশ্রয় করে নতুন নতুন রূপ লাভ করে। বুর্জোয়া শ্রেণী শ্বেতাঙ্গ পরিচয় দিয়ে, প্রোটেস্টান্ট পরিচয় দিয়ে, জৈন অথবা বৈষ্ণব পরিচয় দিয়ে নিজেদের মধ্যে সংযোগ দৃঢ়ীভূত করে এবং সমাজের অন্য অংশকে নিজেদের গণ্ডির বাইরে ঠেলে রাখে। তার উলটো মেরুতে শ্রমিক শুধু শ্রমজীবী হিসেবে নিজেকে ভাবে না, সে নিজেকে ভাবে আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গ সভ্যতার উত্তরাধিকারী হিসাবে, ত্রিনিদাদ বা ফিজিতে সে নিজের পরিচয় দেয় উর্দু বা হিন্দুস্তানীভাষী ভারতীয় হিন্দু বা মুসলমান হিসেবে, বিংশ শতকের গোড়ায় নিউ ইয়র্কের কাপড় বানানোর গোলামখানায় পরিচয় দেয় ইদ্দিশ (Yiddish) ভাষী ইহুদী হিসেবে। অন্যের আরোপিত আত্মপরিচয় এবং নিজের উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া আত্মনির্দেশ হয়ে দাঁড়ায় সংগ্রামের হাতিয়ার। ১৯৯৪ সালের শেষমাসে, যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মেক্সিকোর অত্যাচারী, দুর্নীতি জর্জরিত সরকারের সহায়তায় উত্তর আমেরিকার মুক্ত বাণিজ্যচুক্তি সই করল, ঠিক সেই সময়েই মেক্সিকোর দক্ষিণের প্রদেশ চিয়াপাস থেকে আগুয়ান হয়ে জাপাতিস্তা বাহিনীর নেতৃত্বে সেই অঞ্চলের মায়াজাতীয় আমেরিকান ইন্ডিয়ানরা একের পর এক শহর দখল করতে থাকল। মেক্সিকো স্পেনীয় শাসন থেকে স্বাধীনতা পেয়েছিল উনিশ শতকের গোড়াতে। মেক্সিকোর অধিকাংশ লোক আমেরিকান ইন্ডিয়ান অথবা আফ্রিকা থেকে জোর করে দাস করে নিয়ে আসা কৃষ্ণাঙ্গদের বংশধর, অথবা তারা স্পেনীয় এবং আদিবাসী বা কৃষ্ণাঙ্গদের মিশ্রণে উদ্ভূত। কিন্তু মেক্সিকোর শাসকশ্রেণী এসেছে প্রধানত সেইসব গোষ্ঠী থেকে যারা মনে করে তাদের ধমনীতে ‘বিশুদ্ধ’ ইয়োরোপীয় রক্ত বইছে। (এই ধরনের ধারণা সম্পূর্ণ অবৈজ্ঞানিক, কিন্তু আমাদের দেশে এদের সমদর্শী লোক আছে যারা মনে করে তাদের ধমনীতে বশিষ্ঠ, মনু, প্রতাপাদিত্য বা বাহাদুর শাহের পবিত্র রক্ত বইছে)। এই মায়াজাতীয় ইন্ডিয়ানদের শোষণের পরিমাণ একটা পরিসংখ্যানেই বোঝানো যায়: মেক্সিকোর গড় আয়ু যেখানে ৭৪ বৎসর, সেখানে মায়াদের গড় আয়ু পঞ্চাশ বছরেরও কম। তাদের শতকরা ৮০ ভাগ লোক অপুষ্টিতে ভোগে। তাদের শিশুরা শয়ে শয়ে মৃত্যুমুখে পতিত হয় প্রথম পাঁচ বছরের মধ্যেই। তারা শিক্ষা থেকে বঞ্চিত, তাদের জমি কেড়ে নেওয়া হয়েছে, তাদের ভাষায় তারা লেখাপড়া শিখতে পারে না, বিচার ব্যবস্থার সুযোগ পায় না। এই অন্যায়, অবিচার, শোষণ ও স্বাধীনতা হরণের বিরুদ্ধে চিয়াপাস থেকে জাপাতিস্তাদের আন্দোলন প্রায় সারা মেক্সিকোতে ছড়িয়ে পড়েছে। আমাদের দেশেও স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতারা উপলব্ধি করেছিলেন যে, এখানে তথাকথিত অস্পৃশ্য জাতি এবং যাদেরকে ভুলভাবে উপজাতি (Tribe) বলা হয় (আসলে আমরা সকলেই কোন না কোন উপজাতির অঙ্গীভূত), তারা সবচেয়ে বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে পড়ে। তাদের শুধু জমি বা উৎপাদন সামগ্রী শ্রেণীবিন্যস্ত সমাজে অন্যরা দখল করেছে তাই নয়, তাদের মুখের ভাষার অপমান করেছে সংস্কৃত, ফার্সী, ইংরাজী শিক্ষিত পণ্ডিত, উলেমা, বাদামি সাহেবের দল। স্বাধীন দেশের বিচার ব্যবস্থা প্রায়ই তাদের কাছে অবিচারের অস্ত্র হিসেবে দেখা দিয়েছে। সেই জন্যে আমাদের সংবিধানে আলাদা তফসিলে যাঁদের আজ দলিত বলা হয় এবং যাঁরা’ আজ আদিবাসী বলে আখ্যায়িত, তাঁদের তালিকা দিয়ে তাঁদের জন্য শিক্ষা ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিশেষ সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। আমাদের দেশের সত্যিকারের বামপন্থীরা— যাঁদের মধ্যে কমিউনিস্টরা অগ্রগণ্য, উপলব্ধি করেছিলেন যে ভূমি সংস্কার করে, শিক্ষাবিস্তার করে দলিত এবং আদিবাসী ও অন্যান্য অবহেলিত জনগোষ্ঠীর স্বাধীনতা ও সাম্য সুদৃঢ় করতে হবে। কিন্তু ভারতবর্ষের জাতপাতের উত্তরাধিকারে কী স্বাধীনতা সংগ্রামে, কী বামপন্থী আন্দোলনে উচ্চ কোটির মানুষের নেতৃত্ব অবধারিত হয়ে গেল। এর সবচেয়ে ব্যঙ্গাত্মক প্রকাশ লীলাময় রায়ের (প্রয়াত অন্নদাশঙ্কর রায়ের ছদ্মনাম) ১৯৪৫ নাগাদ লেখা ‘সাত ভাই চম্পা’ নামের একটি ছড়াতে পাই: চটি ফট ফট চটরজী মুখ মক মক মুখরজী সেনগুপ্ত দাশগুপ্ত ঘোষ বোস আর বানরজী। গবরমেন্টো এঁরাই চালান, রায় বাহাদুর রায় সাহেব এঁরাই আবার কঙ্গরসে গর্জে ওঠেন ‘যাও সাহেব’। জেলখানাতে বন্দী এঁরা, এঁরাই আবার মিনিস্টর ফাঁসিকাঠে এঁরাই ঝোলেন, এঁরাই নাকি গুপ্তচর। পশ্চিমবঙ্গে বামপন্থী আন্দোলন এবং সরকারী প্রচেষ্টার ফলে অনেক স্তরে অবহেলিত মানুষের সম্ভ্রম ও স্বাধীনতার প্রসার ঘটলেও এখনও সবচেয়ে অবহেলিত রয়ে গেছে কলকাতা থেকে দূরের গ্রামের অধিবাসী এবং বিশেষ করে আদিবাসী সম্প্রদায়। আমাদের সর্বদা স্মর্তব্য যে ভারতবর্ষ এখনও সমাজতন্ত্রী দেশ নয়, পশ্চিমবঙ্গও এই আধাসামন্ততান্ত্রিক, আগ্রাসী ধনতন্ত্রী দেশের অংশ। সেইখানে দাঁড়িয়ে আজকে যে টোটোদের মধ্যে লেখাপড়া ছড়িয়েছে, রানীবাঁধ, বান্দোয়ান থেকে আদিবাসী ছেলে-মেয়েরা মাধ্যমিকে ভালো ফল করছে, মাদ্রাসা স্কুলের ছাত্ররা সত্যিকারের ধর্মনির্লিপ্ত শিক্ষায় দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে, এসব এরাজ্যের বামপন্থী আন্দোলনের, বিদ্যাসাগর রবীন্দ্রনাথ নজরুলের ঐতিহ্যবাহী জনগণের সংগ্রামের ফল। এই বৎসর বামফ্রন্ট মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণের সময় দেবলীনা হেমব্রম যখন তাঁর মাতৃভাষায় শপথ গ্রহণ করলেন, তখন সমস্ত সভামণ্ডপ হাততালিতে মন্দ্রিত হয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গে শুধু ধর্মাচরণের স্বাধীনতা বা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সুরক্ষিত হয়নি, মাতৃভাষায় কথা বলার অধিকারও যে স্বীকৃত হয়েছে এটা তার একটা ছোট প্রমাণ। কিন্তু এই যথেষ্ট নয়। এখনও যে পরিমাণ মুখমকমক মুখরজী, অথবা ক্রমবকবক বাগরচীরা নিজেদের কথা, অথবা বামপন্থী হলে, আমজনতার কথা বলতে পারেন, সেই ভাবেই কী হাঁসদা, টোটো, বাউরিরা পারেন? এখনও কেন কোনও রাজবংশী নিজেকে রাজবংশী বলতে সঙ্কোচ বোধ করবেন, এখনও কেন আমার মুর্শিদাবাদের গ্রামের ভাষা মুখ থেকে বেরিয়ে গেলে লজ্জিত হব? অন্যদিকে কেনই বা শুধু শুধু গৌরববোধ করব রবীন্দ্রনাথের কবিতা পড়তে পারি বলে, অথবা মিথ্যাকুলজি দিয়ে নিজেকে কংসরাজার বংশধর বলে? গৌরব বা লজ্জা আসবে শুধু নিজের কর্মের গুণে বা দোষে, জন্মের আপতিকতায় নয়। সেই সমতায় পৌঁছনোর জন্য তরুণ মার্কসের সাবধানবাণী আজও স্মর্তব্য : সামন্ততান্ত্রিক বহু কোটি বিভক্ত সমাজ থেকে মুক্ত হয়ে যেন বিশ্লিষ্ট ব্যক্তিতে পরিণত না হই। সব মানুষকে সমদৃষ্টিতে দেখলেও আমাদের প্রত্যেকের অনেকগুলি পরিচয় আছে, আমি আড্ডাপ্রিয় বাঙালী, আমি শিক্ষক, আমি রবীন্দ্রভক্ত, বিভূতিভূষণের সাহিত্যের অনুরাগী, রেমব্র্যান্ট, ভ্যান গখ, সেজানের ছবির, তাজমহলের স্থাপত্যের মুগ্ধ দর্শক। আমি দিনের বিভিন্ন ক্ষণে বিভিন্ন আমিত্বে নিমগ্ন থাকি। কিন্তু বহু আমিত্বের মধ্যে বাছার ক্ষমতা যে টোটো মেয়েটি আজ জন্মাল, তার থাকবে? আত্মপ্রকাশের স্বাধীনতার আরেক অর্থ হলো অনেকগুলি আমিত্বের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন বাতাবরণে স্থানকালানুগ, মরজিমাফিক আমিত্ব বেছে নিতে পারার স্বাধীনতা। যেদিন পশ্চিম মেদিনীপুর, উত্তর দিনাজপুর, দুমকা, বস্তার, শ্রীকাকুলাম, খাম্মামের সমস্ত মেয়ে-পুরুষ স্বাধীনভাবে নিজের আমিত্বকে প্রকাশ করতে পারবে এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে অন্য সমস্ত মানুষের সঙ্গে রুচির ভিত্তিতে সমতা বোধ করবে, শুধু দারিদ্র্য অথবা ধনগৌরবের ভিত্তিতে নয়, তখন আমরা মানুষের স্ববিশ্লেষ থেকে মুক্তির কাছাকাছি পৌঁছতে পারব। যাঁরা 'পরিচয়ের রাজনীতি' করেন, তাঁরা অন্যারোপিত পরিচয়ের বন্ধন দেখতে পান না, আর যাঁরা কোনও রকমের রুচি বা স্থানবিধৃত বিশিষ্ট পরিচয়কে অস্বীকার করতে চান, তাঁরা বুঝতে পারেন না, আমিত্ব বাছার স্বাধীনতা এখনও কত কম লোকের আয়ত্তের মধ্যে। প্রথম প্রকাশ মার্কসবাদী পথ ২০০৬, ভলিউম ২৫, সংখ্যা ৪
প্রকাশের তারিখ: ২৯-নভেম্বর-২০২৪ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |