মিডিয়া সোশ্যাল, মালিকানা প্রাইভেট

শুদ্ধসত্ত্ব গুপ্ত
আপনি কৃষক আত্মহত্যা নিয়ে খবর দিলেন। ফেসবুকের কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ড আপনাকে রিপোর্ট পাঠাতে পারে। পুলিশের সঙ্গে জনতার খণ্ডযুদ্ধের ভিডিও দেওয়ায় ইউটিউব, গুগলেরই প্ল্যাটফর্ম, আপনার আপলোড বন্ধ রাখতে পারে। অথচ তাদেরই চ্যানেলে অজস্র ঘৃণাভাষণ ছড়াতে পারে। চালাচালি হতে পারে ভুয়ো ভিডিও।

আপনি কি গুগলকে কোনো পয়সা দেন? অথবা ফেসবুককে?

দেন না।

অথচ গুগলের সম্পদের অর্থমূল্য আমাদের ভারতের মোট জাতীয় উৎপাদনের প্রায় অর্ধেক।
ন্যাসডাকের তথ্য জানাচ্ছে, গুগলের মোট সম্পদ ১.২১ লক্ষ কোটি ডলার।
অর্থনৈতিক সমীক্ষা অনুযায়ী ভারতের মোট জাতীয় উৎপাদন, ৩.১৮ লক্ষ কোটি ডলার।
গুগল সোশাল মিডিয়া নয়। কিন্তু সোশাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে পৌঁছতে হয় গুগলকে ধরেই।
সোশাল মিডিয়া, ধরুন ফেসবুক, তাকে আমরা ব্যবহার করার জন্য পয়সা দিই না। কিন্তু ফেসবুকের বিপুল সম্পদ কেন? মার্কিন শেয়ার বাজার ন্যাসডাকের তথ্যই জানাচ্ছে, ফেসবুকের সম্পদের বাজারমূল্য, মানে শেয়ার বাজারে, ৫০ হাজার ৩০০ কোটি ডলার।
সোশাল মিডিয়া টুইটার, পরিভাষায় মাইক্রো ব্লগিং সাইট, ৪ হাজার ১০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে।
শেয়ার বাজারে ওঠানামার সঙ্গে আর্থিক মূল্য বাড়ে কমে। তবে সাম্রাজ্য কতটা বিপুল এমন অঙ্কে চোখ বোলালে টের পাওয়া যায়। 


প্রশ্ন হল, আমরা পয়সা দিয়ে যদি না কিনি, লাভ লোকসান বা সম্পদমূল্য নিয়ে মাথা ঘামাব কেন? 


কারণ ক্ষমতার এবং প্রতিস্পর্ধী চিন্তার, দু’য়ের কাছেই, সোশাল মিডিয়া গুরুত্বপূর্ণ। জনমনে প্রভাব খাটাতে পুরো আলাদা লক্ষ্যে তাকে ব্যবহার করবে এবং করতে চাইবে দু’পক্ষই। ‘সোশাল’ বলে আলগোছে বেড় দেওয়া হোক যতই, এই মিডিয়াও পুঁজি নিয়ন্ত্রিত, মুনাফার দৌড়ে থাকা উপাদান। বস্তুত গণমাধ্যমেরই অংশ।

সোশাল মিডিয়ায় পণ্য তাহলে কে?

আমরা, যারা ব্যবহার করি। আমরাই পণ্য। আমাদের পছন্দ অপছন্দের প্রতিটি ধরন, ডিজিটাল প্রযুক্তির বন্দোবস্তে ধরা, আমাদের প্রতিটি তথ্যই পণ্য।

ব্যবসা হয় কীভাবে?

নতুন প্রযুক্তি, কিন্তু মডেলটা পুরনো। সংবাদপত্র বা টেলিভিশন চ্যানেল, তাদের মতই আয়ের প্রধান ক্ষেত্র সেই বিজ্ঞাপন।

গুগলের মোট আয়ের ৮১ শতাংশ আসে বিজ্ঞাপন থেকে, ফেসবুকের ৯৭.৪ শতাংশ।
সোশাল মিডিয়া এবং তার বাইরে ডিজিটাল একচেটিয়া ব্যবসার দিকে ঝুঁকে পড়ছে বিজ্ঞাপনের ব্যয়।
২০১৫’তে সংবাদপত্র এবং টিভির হাতে ছিল বিজ্ঞাপনের মোট আয়ের অর্ধেক। মাত্র সাত বছরে, ২০২২-এ আয় চার ভাগের এক ভাগে।

কেন পণ্য বা পরিষেবা উৎপাদকরা বেশি বেছে নিচ্ছেন ডিজিটাল মিডিয়াকে- যার মধ্যে রয়েছে সোশাল মিডিয়া? 

কারণ, নির্দিষ্ট ক্রেতার কাছে পৌঁছানো যায় অনেক সহজে। সুগন্ধী হারবাল সাবানের বিজ্ঞাপন কাগজে বা টিভি-তে দিলে সবার জন্য। আর ডিজিটাল মিডিয়ায় সবচেয়ে সম্ভাব্য ক্রেতার কাছে নির্দিষ্ট করে পৌঁছাবে সেই বিজ্ঞাপন। কার কী পছন্দ, বয়স বা খোঁজের ধরন, বিচার করে বের করবে প্রযুক্তি বন্দোবস্ত।

অর্থ রয়েছে, নিয়ন্ত্রণ বাজারে একচেটিয়া। 

তথ্য বা সংবাদ কি নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকবে? 

ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল দেখিয়েছে নিয়ন্ত্রণ রয়েছে, তথ্য প্রবাহ এবং তার প্রসার নিরপেক্ষ নয় ফেসবুক বা গুগলে। 

আপনি কৃষক আত্মহত্যা নিয়ে খবর দিলেন। ফেসবুকের কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ড আপনাকে রিপোর্ট পাঠাতে পারে। পুলিশের সঙ্গে জনতার খণ্ডযুদ্ধের ভিডিও দেওয়ায় ইউটিউব, গুগলেরই প্ল্যাটফর্ম, আপনার আপলোড বন্ধ রাখতে পারে। অথচ তাদেরই চ্যানেলে অজস্র ঘৃণাভাষণ ছড়াতে পারে। চালাচালি হতে পারে ভুয়ো ভিডিও।

ক’দিন আগের দুটো ঘটনা পরপর দেখে নিতে পারেন।  

তামিলনাডুতে একগুচ্ছ ভিডিও ছড়ায় এই মার্চের গোড়ায়। দেখানো হয়, হিন্দিভাষী শ্রমিক, যাঁরা বাইরের রাজ্য থেকে কাজ করতে গিয়েছেন, হামলা হচ্ছে তাঁদের ওপর।
খবরগুলো যে ভুয়ো, তা ধরে ফেলেন, প্রচারও করেন সত্য অনুসন্ধানীরা। ‘অল্ট নিউজ’-এর মহম্মদ জুবেরও দেখিয়েছিলেন প্রচার চালাচ্ছে আসলে আরএসএস এবং বিজেপি, পরিচয় জানিয়ে অথবা সাধারণ মানুষ সেজে।

এ রাজ্যে গত বিধানসভা নির্বাচনে ভাড়া করে ভোট বিশারদ এনে সেই কৌশল নিয়েছিল তৃণমূল কংগ্রেস। দ্রুত অসত্য প্রচার চালানোর সংগঠিত বাহিনী সক্রিয়।

এর পরই চলতে থাকে জুবেরকে লক্ষ্য করে মারাত্মক ট্রোলিং, হত্যার হুমকি পর্যন্ত চলে। এই প্রথম নয়, ফেসবুক, টুইটারের কমিউনিটি গাইডলাইন সত্ত্বেও এ জিনিস বারবার হয়েছে। বহু ট্রোলারের ফলোয়ারের তালিকায় প্রধানমন্ত্রীর নাম পাওয়া গিয়েছে। 

সোশাল মিডিয়া নিরপেক্ষ নয়, থাকার কথাই নয়। অর্থের বিনিময়ে প্রসার বাড়ানো যায়, বাড়ানো হয়। ‘পেইড প্রোমোশন’ বা ‘বুস্ট প্যাকেজের’ প্রস্তাব থাকে খোলাখুলি।
এটি পুরোদস্তুর একটি মিডিয়া-বাণিজ্য। সামাজিক নয় সম্পদের মালিকানার পুরোটাই ব্যক্তিগত।

প্রতিবাদী আন্দোলন কি তবে কোনো সুবিধা পাচ্ছে না। সরাসরি সংযোগের সঙ্গে ডিজিটাল পৌঁছে সমন্বয় ঘটাবে না?

অভিজ্ঞতা এবং তথ্য বলছে এই সমন্বয় জরুরি। তথ্য হল, ভারতে ২০১৫-তে সোশাল মিডিয়া ব্যবহার করতেন ১৪ কোটি ২০ লক্ষ মানুষ। স্ট্যাটিস্টা’র তথ্য, ২০২২-এ এই সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৭৫ কোটি ৫০ লক্ষ ৪৭ হাজার। তাক লাগিয়ে দেওয়া পূর্বাভাস: ২০৪০-এ সংখ্যা পৌঁছাবে ১৫২ কোটি ৯০ লক্ষে।

বিশ্বে, বা এদেশে সোশাল মিডিয়া ঘিরে প্রতিরোধের লড়াইও বাড়তি মাত্রা পেয়েছে। বিদ্বেষ এবং ঘৃণাভাষণের জন্য এই মাধ্যমকে কাজে লাগাচ্ছে ফ্যাসিস্ট লক্ষণসম্পন্ন আরএসএস, আর তার রাজনৈতিক শাখা বিজেপি।

কর্পোরেট হিন্দুত্ব জোট টাকার জোগান অবাধ করেছে। ‘মিথ্যা চেতনা’, আমাদের এখানে যেমন ‘গর্বিত হিন্দু’, তার প্রচারে হাতিয়ার সোশাল মিডিয়া।

আবার পালটাও আছে। কৃষকদের লঙ মার্চ বা সিএএ এনআরসি-বিরোধী লড়াইয়ে পালটা যুক্তি, মিথ্যাকে হারানোর লড়াইয়ে এই মাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ হয়েছে অবশ্যই। দিল্লির কৃষক আন্দোলনের সময়েও তা হয়েছে। দেখা যাচ্ছে, সাংগঠনিক প্রচার কাঠামোকে ব্যবহার করে ডিজিটাল প্রচার কাজ করছে, ব্যক্তিগত প্রচারের তুলনায় বেশি।


প্রকাশের তারিখ: ১৯-মার্চ-২০২৩

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org