সোশাল মিডিয়া: বিজেপির কৌশল ও সাংগঠনিক বিন্যাস

সুচিক্কণ দাস
২০২১ সালে এ মহম্মদ আল জামান একটি গবেষণা পত্র প্রকাশ করেন ‘‌সোশাল মিডিয়া ফেক নিউজ ইন ইন্ডিয়া’‌ শিরোনামে। প্রকাশিত হয়েছিল এশিয়ান জার্নাল ফর পাবলিক ওপিনিয়ন রিসার্চ–এ। সেখানে আল জামান দেখিয়েছেন স্বাস্থ্য, ধর্ম, রাজনীতি, অপরাধ, বিনোদন — এই পাঁচটি ক্ষেত্রকে কেন্দ্র করে ভারতে সোশাল মিডিয়ায় মিথ্যা ও ঘৃণা প্রচারে জোর দেওয়া হয়। এগুলির মধ্যে শীর্ষস্থানে রয়েছে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি। এই ধরনের প্রচারে হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করা হয় টেক্সট, ফটো, অডিও, ভিডিও, টেক্সট ও ফটো, টেক্সট ও ভিডিও, ফটো ও ভিডিও এবং টেক্সট, ফটো ও ভিডিও একসঙ্গে। এগুলো ছড়ানো হয় অনলাইনে এবং মেনস্ট্রিম মিডিয়ায়।

২০১৪র নির্বাচনে সাফল্য দুটি বিষয়ে বিজেপিকে আত্মবিশ্বাসী করে তুলল। এক, জনমতকে প্রভাবিত করার জন্য সোশাল মিডিয়ার ব্যবহারে স্থায়ী দক্ষতা অর্জন করতে হবে। এবং ভুয়ো প্রচার ও ঘৃণা প্রচারে এই মিডিয়াকে দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগাতে হবে। এবং দুটো বিষয়েই বিরোধীদের অনেক পিছনে ফেলে দিতে হবে। এই পরীক্ষিত লক্ষ্যকে সামনে রেখে সোশাল মিডিয়াকে সারা বছর ধরে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা —ক্রমশ এটাই বিজেপির রাজনৈতিক কার্যকলাপের অঙ্গ হয়ে উঠেছে। ২০১৪র কৌশলকে আরও পরিশীলিত করে ২০১৯ এর সফল প্রয়োগ পর্ব পেরিয়ে এখনই শুরু হয়ে গেছে ২০২৪এর নির্বাচনের জন্য বিজেপির আইটি সেলের প্রস্তুতি। 

ভারতে সোশাল মিডিয়ার ব্যাপ্তি

কেন বিজেপি তাদের আইটি সেলকে এত গুরুত্ব দেয়, তা বোঝা যাবে এদেশে ইন্টারনেট ও সোশাল মিডিয়ার ব্যাপ্তি কতদূর সেদিকে নজর দিলে। ২০২৩ সালের জানুয়ারি মাসের হিসেব অনুযায়ী, এদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৬৯ কোটি ২০ লক্ষ। মোট জনসংখ্যার বিচারে এরা হলেন ৪৮.‌৭ শতাংশ। জানুয়ারি ২০২৩ এর হিসাবে, এদেশে সোশাল মিডিয়া ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৪৬ কোটি ৭০ লক্ষ। মানে মোট জনসংখ্যার ৩২.‌৮ শতাংশ বা প্রায় এক তৃতীয়াংশ। তথ্য থেকে জানা যাচ্ছে, সোশাল মিডিয়া ব্যবহারকীরদের মধ্যে ৩৯ কোটি ৮০ লক্ষের বয়স ১৮ কিম্বা তার বেশি। এর মানে দেশে ওই বয়সের যত লোক রয়েছেন তাদের ৪০.‌২ শতাংশই সোশাল মিডিয়া ব্যবহার করেন। ভারতে সক্রিয় মোবাইল সংযোগের সংখ্যা ১০০ কোটি ১০ লক্ষ। এর মানে দেশের ৭৭ শতাংশ মানুষ মোবাইল ফোন (‌এর সবটাই স্মার্টফোন নয়)‌ ব্যবহার করেন। ভারতে যারা ইন্টারনেট ব্যবহার করেন তাঁদের ৬৭.‌৫ শতাংশই কোনও না কোনও সোশাল মিডিয়ায় যুক্ত। দেশে সোশাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের মধ্যে মহিলারা ২৬.‌৫ শতাংশ এবং পুরষেরা ৭৩.৫ শতাংশ। আর একটি সূত্রে জানা যাচ্ছে, ভারতে প্রতি মাসে ২০ কোটি লোক হোয়াটস অ্যাপ ব্যবহার করেন। এছাড়াও রয়েছেন ফেসবুক ও শেয়ার চ্যাট ব্যবহারকারীরা। এদের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। ভারতে দলিত জনসংখ্যার মাত্র ১৯ শতাংশ স্বচ্ছ পানীয় জল ব্যবহার করতে পারেন। অথচ তাঁদের ৬৫ শতাংশের কাছে পৌছে গেছে ইন্টারনেট সংযোগ। ২০১৪ সালে থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা বেড়েছে ৬৫ শতাংশ। এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের পর টুইটারে সবচেয়ে বেশি ফলোয়ার মোদির। 

এই সব টুকরো টুকরো তথ্যকে জুড়লে যে বৃহত্তর চালচ্চিত্রটা স্পষ্ট হয় তাতেই বোঝা যায় প্রথাগত মিডিয়াকে ছাপিয়ে ডিজিটাল মিডিয়া এদেশে কতটা ব্যাপ্তি লাভ করেছে। একদিকে বাজার হিসাবে এবং অন্যদিকে জনমতকে প্রভাবিত করার সুযোগের মঞ্চ হিসাবে এদেশে ডিজিটাল তথা সোশাল মিডিয়াকে কাজে লাগানোর সম্ভাবনা কতদূর প্রসারিত। যেহেতু নয়া উদারবাদী পুঁজি দক্ষিণপন্থাকেই চায়, তাই দক্ষিণপন্থী রাজনীতিক শক্তি ও ডিজিটাল ক্ষেত্রের পুঁজির জোট গড়ে ওঠে স্বাভাবিকভাবে। এদেশে মোদির আমলে, আমেরিকায় ট্রাম্পের আমলে এবং ব্রাজিলে বলসোনারোর আমলে তার চূড়ান্ত নজির দেখা গেছে যবা যাচ্ছে। এদেশে বিজেপি নেতৃত্ব তাদের পেশাদার পরামর্শদাতাদের দৌলতে অনেক আগে থেকেই জনমত প্রভাবিত করার এই পরিসরটিকে দখলের লক্ষ্যে এগিয়েছে। এবং ২০১৪ থেকে ২০২২, এই ৮ বছরে বিজেপির আইটি সেল এই পরিসরটিকে ব্যবহারকরার লক্ষ্যে ভালরকমই অগ্রগতি ঘটিয়েছে। উত্তরপ্রদেশে কোভিডের ভয়াবহ পরিস্থিতির পরেও বিজেপি যে বিধানসভা নির্বাচনে জিতে যায়, তার পিছনে ডিজিটাল তথা সোশাল মিডিয়ার অবদান খুব কম নয়।


সোশাল মিডিয়ায় বিজেপির কৌশল

২০২১ সালে এ মহম্মদ আল জামান একটি গবেষণা পত্র প্রকাশ করেন ‘‌সোশাল মিডিয়া ফেক নিউজ ইন ইন্ডিয়া’‌ শিরোনামে। প্রকাশিত হয়েছিল এশিয়ান জার্নাল ফর পাবলিক ওপিনিয়ন রিসার্চ–এ। সেখানে আল জামান দেখিয়েছেন স্বাস্থ্য, ধর্ম, রাজনীতি, অপরাধ, বিনোদন — এই পাঁচটি ক্ষেত্রকে কেন্দ্র করে ভারতে সোশাল মিডিয়ায় মিথ্যা ও ঘৃণা প্রচারে জোর দেওয়া হয়। এগুলির মধ্যে শীর্ষস্থানে রয়েছে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি। এই ধরনের প্রচারে হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করা হয় টেক্সট, ফটো, অডিও, ভিডিও, টেক্সট ও ফটো, টেক্সট ও ভিডিও, ফটো ও ভিডিও এবং টেক্সট, ফটো ও ভিডিও একসঙ্গে। এগুলো ছড়ানো হয় অনলাইনে এবং মেনস্ট্রিম মিডিয়ায়। 

আল জামানের গবেষণা পত্রে বলা হয়েছে,অনলাইনে ভারতে ভুয়ো খবর প্রধানত দুটি উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়, রাজনৈতিক ও ধর্মীয়। একাজটি করে থাকে বিজেপির ডিজিটাল আর্মি ও ডিজিটাল আর্কাইভ। কেন বিজেপি এই মিডিয়ার ব্যবহারে এত গুরুত্ব দেয়। কারণ,  ১)‌ সোশাল মিডিয়া পৌঁছে গেছে ভারতের জনসমাজের অনেক গভীরে, ২)‌ ইন্টারনেটের বিষয়ে কিছুই জানেন না অথচ সোশাল মিডিয়া ব্যবহার করেন এমন লোকের সংখ্যা বাড়ছে (‌এদেরকে প্রভাবিত করা সহজ)‌, ৩)‌ চলতি আইনে সহজে ভুয়ো খবরের উৎসকে সহজে চিহ্নিত করা যায় নাএবং ৪)‌ হিন্দুত্ব এবং ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের প্রচার সাহায্য করে শুধুমাত্র বিজেপি ও আরএসএসকে। 

এই কারণেই ২০২১ সালের অক্টোবরে বিবিসির একটি রিপোর্টে বলা হয়েছিল, ‘ভারতে সমস্যা অনেক বেশি:‌ এখানে ঘৃণা ভাষণ বেড়ে চলেছে, মুসলিম ও সংখ্যালঘুদের আক্রমণ করে বড় বড় হোয়াটস গ্রুপে উত্তেজক কনটেন্ট ছড়ানো হচ্ছে, এমনকী ভারতে বহু ভুয়ো অ্যাকাউন্ট চালু রয়েছে যার সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলির যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া যাবে। এদেশে ভুল তথ্য প্রচারটা খুবই সুসংগঠিত ও সযত্নে রচিত কৌশলের ফসল। বিশেষ করে নির্বাচন কিংবা করোনা অতিমারির মতো পর্বে বহু ভুয়ো খবর ছড়ানো হয়।’


সোশাল মিডিয়ায় বিজেপির সাংগঠনিক বিন্যাস

২০২২ সালের অক্টোবরে সাংবাদিক মনসুর হামিদ সিয়াসত ডট কম–এ বিজেপি সোশাল মিডিয়া কীভাবে কাজ করে সেবিষয়ে একটি নিবন্ধ লেখেন। তিনি জানিয়েছেন, বিজেপির রয়েছে নিজস্ব ২ থেকে ৩ লক্ষ হোয়াটস অ্যাপ গ্রুপ। ‘‌দ্য পলিটিসাইজেশন অফ সোশাল মিডিয়া ইন ইন্ডিয়া’‌ প্রবন্ধে (‌১৩ জুলাই ২০২১)‌ জেলভিন জোসে লিখেছেন, এছাড়াও বিজেপি গোপনে পরিচালনা করে ১৮ হাজার ভুয়ো টুইটার হ্যান্ডেল। গবেষণায় দেখা গেছে, ফেসবুক–হোয়াটস অ্যাপের কন্টেন্ট যত ব্যক্তিগত চরিত্রের হয় ততই তার আবেদন বেশি। এটা ভোটারদের ক্ষেত্রেও সত্যি। ভোটারদের ওপর সর্বোচ্চ প্রভাব সৃষ্টি করার লক্ষ্যে বিজেপি পেশাদার এজেন্সিগুলোর সহায়তা নিয়ে স্থানীয় ভাষায় ডিজিটাল কন্টেন্ট তৈরি করে তা ছড়িয়ে দেয়। জনপ্রিয় হিন্দি ছবি ও শোয়ের মিম ব্যবহর করে। প্রতি রাজ্যে আইটি সেল তৈরি করা, প্রযুক্তিবিদ নিয়োগ করা, এবং প্রচারের জন্য বেশাদার এজেন্সিগুলোকে ভাড়া করা —এসব কাজে বিনিয়োগ করা হয় বিপুল অর্থ। এসবের সঙ্গে যুক্ত হয় দলের বিস্তৃত সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক। 

বিজেপির কীভাবে আইটি সেলকে সাজানো হয় তার একটা উদাহরণ হতে পারে উত্তরপ্রদেশ। এই রাজ্যকে ৬টি জোনে ভাগ করে বিজেপি আইটি সেলের অধীনে প্রতিটি জোনে রয়েছে ১১ জনের সোশাল মিডিয়া টিম। মানে মোট ৬৬ জনের টিম। এদের নীচে প্রতিটি জেলায় রয়েছে ১১ জনের টিম, প্রতিটি মণ্ডলে ৫ জনের টিম, প্রতিটি ওয়ার্ডে ২ জনের টিম, সবশেষে বুথস্তরে ৫ জনের টিম। সবচেয়ে নীচের স্তরটাই ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে। 

এই সুসজ্জিত নেটওয়ার্ক কাজ করে এই ভাবে। ধরা যাক কোনও ব্যক্তি সরকারি স্কিমে কিছু পেলেন। সঙ্গে সঙ্গে নীচুতলার পাঁচজন ছবি ও ভিডিও তুলে প্রচার করে বিজেপি কাজ করছে বলেই লোকটি উফকৃত হল। এরপর পুরো কন্টেন তারা ওপরতলায় পাঠিয়ে দেয়ে। দলের পুরো হোয়াটস অ্যাপ গ্রুপ কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অধীনে থাকায় নীচুতলার টিম আবার দরকারে অন্য খবরের ফিড ব্যাক নিয়মিত পেয়ে যায়। এখানে কোনও ছাঁকনি নেই। ফলে ওপর থেকে নীচে, কিংবা নীচ থেকে ওপরে অবাধে চলতে পারে ভুয়ো খবরের প্রচার বা গৃণা প্রচার। একদল আলাদা করে রয়েছে বিজেপির টুইটার যোদ্ধা হিসাবে। তারাই অনলাইনে প্রচারের ন্যারেটিভ তৈরি করে। 

এই সব উদ্যোগে কত টাকা খরচ করে বিজেপি? ফেসবুক অ্যাড লাইব্রেরি জানিয়েছে, উত্তরপ্রদেশে বিধানসভা ভোটের আগে বিজেপি ফেসবুক বিজ্ঞাপনে খরচ করেছে ৩ কোটি টাকা। এই নির্বাচনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ফেসবুকে যত টাকার বিজ্ঞাপন দিয়েছিল তার অর্ধেকই এসেছে বিজেপির তহবিল থেকে। এত টাকা খরচ করা হয়েছিল মাত্র এক মাসের মধ্যে। এর মানে বিজেপির উত্তরপ্রদেশ শাখা ফেসবুক বিজ্ঞাপনে দৈনিক খরচ করেছিল ১০ লক্ষ টাকা, যখন এই খাতে কংগ্রেসের দৈনিক খরচ ছিল ২১ হাজার টাকা। 

এই হিসাব থেকেই আন্দাজ করা যায়, যখনই কোনও নির্বাচন এসে পড়ে তখনই কী বিপুল পরিমাণ টাকা সোশাল মিডিয়ার বিজ্ঞাপনে খরচ করে বিজেপি। এর লক্ষ্য একটাই সাময়িকভাবে হলেও বিজেপির প্রতি সমর্থন গড়ে তোলা। আর একথা বলে দিতে হয় না যে, যারা এত বিপুল টাকার বিজ্ঞাপন দেয় তাদের প্রতি সোশাল মিডিয়া কোম্পানিগুলির পক্ষপাতিত্ব থাকবেই স্রেফ ব্যবসায়িক কারণে। 

এভাবে প্রতিটি রাজ্যে নির্বাচনের সময় সোশাল মিডিয়ায় বিজেপির প্রচারের বহর যদি আলোচনা করা যায়, তাহলে এর বৃহত্তর চরিত্রটি আরও স্পষ্ট হবে। 

ওপরের আলোচনা থেকে অনুমান করা যায়, কর্ণাটক বিধানসভা নির্বাচন পর্বে সোশাল মিডিয়ায় কী ধরনের প্রচারের ঝড় তুলতে চলেছে বিজেপি। এবং ২০২৪ এর নির্বাচনে রাম মন্দির উদ্বোধনের ইস্যু কাজে লাগাতে কতটা তৈরি হচ্ছে বিজেপির আইটি সেল।

এর পরে আলোচনার আরও একটি পরিসর থাকে। সেটা হল ভুয়ো প্রচার ও ঘৃণা ভাষণ প্রচারের কৌশল। তবে তা পৃথক গুরুত্বের দাবি রাখে। 


প্রকাশের তারিখ: ২৩-মে-২০২৩

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org