সঘন গহন রাত্রি

সায়ন্তন সেন

তারপর একদিন সে পরেশবাবুকে বলবে, ‘আজ আমি এমন শুচি হয়ে উঠেছি যে চণ্ডালের ঘরেও আমার আর অপবিত্রতার ভয় রইল না।’ একেই গোরা ‘মুক্তিলাভ’ বলেছে। মুক্তি ছোটো-পরিচয় থেকে, ঘৃণা থেকেও— ‘গোরা কহিল, “মা, তুমিই আমার মা! যে মাকে খুঁজে বেড়াচ্ছিলুম তিনিই আমার ঘরের মধ্যে এসে বসে ছিলেন। তোমার জাত নেই, বিচার নেই, ঘৃণা নেই— শুধু তুমি কল্যাণের প্রতিমা! তুমিই আমার ভারতবর্ষ!...” গোরা তার ভারতবর্ষকে নিজেই আবিষ্কার করেছিল, তারপর এসেছিল পরেশবাবুর কাছে নিজেকে সমর্পণ করতে।

১.

রবীন্দ্র-উপন্যাসের পাতা ওলটাচ্ছিলাম, আর ভাবছিলাম: ওঁর নায়কেরা প্রায়শই দলে ভিড়েছে, কিন্তু বেশিদিন টিকতে পারেনি। গোরা, অতীন, শচীশ, অমিত— সকলেরই এক-একটা ‘দল’ ছিল। 

কারো-কারো একাধিক দল ছিল। শচীশের কথাই ধরা যাক। কলেজ পাশ করতে-না করতে তাকে ঘিরে একটা দল-মতো গড়ে উঠেছিল। এই দলের তত্ত্বগুরু ছিলেন শচীশের জ্যাঠামশায় আর শচীশ ছিল এর মধ্যমণি। কর্মসূচিরও কোনো অভাব ছিল না। তবু সে দল থেকে অবসর নিল। জ্যাঠামশায়ের মৃত্যুর পরে, শ্রীবিলাস বলেছে, ‘আমাদের দলটিকে লইয়া আমরা আরও জোরের সঙ্গে কাজ চালাইতে লাগিলাম।’ কিন্তু শচীশ আর তখন তাদের মধ্যে নেই। মুসাফির হয়ে সে তখন দেশে-দেশে ঘুরছে, একা। জানি না, কোন সংশয় তাকে পীড়িত করেছিল, সে অন্য দলে যোগ দিল। অন্য দলে শুধু নয়, একেবারে বিরুদ্ধ-শিবিরে! নাস্তিক-সংঘ বেজায় চটে গেল, শচীশকে ওসব কোনোদিনই ছুঁতে পারে না। নেচে-গেয়ে, গুরুর পদসেবা করে সে ভক্তিরসে ডুবে থাকল কিছুদিন। মাত্র কিছুদিন। আমরা জানি, এই রসাশ্রিত দলটিতেও শচীশ টিকতে পারেনি। দল ছেড়ে, বন্ধুদেরও ছেড়ে একদিন নদী পার হয়ে ওপারের বালুচরে চলে গেছে একা-একা, ‘অসীম, তুমি আমার’ বলতে-বলতে। 

সে যেতেই পারে, কত লোকেই তো দলত্যাগী হয়। কিন্তু দল ছাড়ার কারণ হিসেবে শচীশ যে কথাগুলো বলে, সেগুলো ভেবে দেখার মতো। শচীশের মতে, ‘আমার অন্তর্যামী কেবল আমার পথ দিয়াই আনাগোনা করেন, গুরুর পথ গুরুর আঙিনাতেই যাওয়ার পথ’, এবং ‘আর-সব জিনিস পরের হাত হইতে লওয়া যায়, কিন্তু ধর্ম যদি নিজের না-হয় তবে তাহা মারে, বাঁচায় না।’ কথাটা লীলানন্দ স্বামীর ক্ষেত্রে যেমন, জ্যাঠামশায়ের ক্ষেত্রেও খাটে। পরের হাত থেকে নেওয়া জিনিসে শচীশের ভরসা ছিল না। সংঘমুখী মানুষেরা প্রায়ই জীবনের মানে নিয়ে ভাবার ভারটা কোনো একজন হুজুরের কাঁধে চাপিয়ে দিয়ে নিজেরা চিন্তামুক্ত থাকতে চায়। হুজুর যা গেলান, ভালো-মন্দ সবই তারা গেলে। শচীশ সেভাবে বাঁচতে চায়নি। সত্যকে সে চেয়েছিল, ‘কঠিন সত্য’কে (যা রবীন্দ্রনাথও চেয়েছিলেন— আমরা জানি)। সে নিশ্চয় বুঝেছিল, সত্যকে যদি পেতে হয়, তাকে খুঁজতে হবে একা-একা, নিজস্ব চেতনার ভিতর। শচীশের কথা ভাবলে মনে হয়: ব্যক্তির চেতনায় সংশয় আর জিজ্ঞাসার মুহূর্তকে রবীন্দ্রনাথ খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন। শচীশ তার সত্যকে শেষ পর্যন্ত পেয়েছিল কি না জানি না, কিন্তু তার এই মুদ্রাদোষ রবীন্দ্রনাথের আরও নায়কের মধ্যে দেখতে পাই। 

২.

অতীন্দ্র গুপ্তসমিতিতে ভিড়েছিল এলার ডাকে, কিন্তু শুধু সেটুকু বললে আধখানা সত্যি বলা হয়। 

এলা যখন তাকে জিগ্যেস করে, ‘যে-পথ তোমার নয়, সে-পথ থেকে কেন তুমি জোর করে ফিরে আস নি?’, তখন অতীন্দ্র উত্তরে বলে, ‘একে একে এমন সব ছেলেকে কাছে দেখলুম, বয়সে যারা ছোটো না-হলে যাদের পায়ের ধুলো নিতুম। তারা চোখের সামনে কী দেখেছে, কী সয়েছে, কী অপমান হয়েছে তাদের, সে-সব দুর্বিষহ কথা কোথাও প্রকাশ হবে না। এরই অসহ্য ব্যথায় আমাকে খেপিয়ে তুলেছিল।’ অতীন্দ্র দলে শুধু এলার জন্য আসেনি, এলার আহ্বানে তারও সমর্থন ছিল, কারণ অপরের দুঃখে ‘অসহ্য ব্যথা’ পাওয়ার মতো একটা মন ছিল তার। কিন্তু দলে থেকেও সে একা। স্বদেশীর রথ ঠেলতে গিয়ে এত মানুষের হাড়-পাঁজর ভাঙল, অতীন দ্যাখে, তারা সব বাতিলের খাতায়, পথের ধুলোয় লুটোচ্ছে। সংঘে থাকতে-থাকতে মানুষেরা আর মানুষ থাকে না— ‘মানুষ-পুতুল’ হয়ে যায়, তারা সর্দারের দড়ির টানে একই নাচ নাচে, নিজে কিছু ভাবেও না, করেও না; “নাচনওয়ালা যেই একটু আলগা দেয়, বাতিল হয়ে যায় হাজার হাজার মানুষ-পুতুল”, এলাকে সে বলে। 

অতীন্দ্র পুতুল হয়ে দলের মধ্যে মিশে যায়নি। কিন্তু তার চেয়ে যেটা বড়ো কথা, গরিষ্ঠের বিরুদ্ধে তার মতামত সে সবসময় স্পষ্ট করে বলেছে: ‘পেট্রিয়টিজমের চেয়ে যা বড়ো তাকে যারা সর্বোচ্চ না-মানে তাদের পেট্রিয়টিজম কুমিরের পিঠে চড়ে পার হবার খেয়ানৌকো। মিথ্যাচরণ, নীচতা, পরস্পরকে অবিশ্বাস, ক্ষমতালোভের চক্রান্ত, গুপ্তচরবৃত্তি একদিন তাদের টেনে নিয়ে যাবে পাঁকের তলায়।… দেশের আত্মাকে মেরে দেশের প্রাণ বাঁচিয়ে তোলা যায় এই ভয়ংকর মিথ্যে কথা পৃথিবীসুদ্ধ ন্যাশনালিস্ট আজকাল পাশবগর্জনে ঘোষণা করতে বসেছে, তার প্রতিবাদ আমার বুকের মধ্যে অসহ্য আবেগে গুমরে গুমরে উঠছে’। সংঘের নীতি প্রসঙ্গে সে এলাকে বলেছে, ‘অন্যায়ে অন্যায়কারীর সমান হলেও তাতে হার, পরাজয়ের আগে মরবার আগে প্রমাণ করে যেতে হবে আমরা ওদের চেয়ে মানবধর্মে বড়ো— নইলে এত বড়ো বলিষ্ঠের সঙ্গে এমনতরো হারের খেলা খেলছি কেন?’ আবার ঐ মানবধর্মের খাতিরেই অতীন মতের অমিল সত্ত্বেও দলত্যাগ করেনি। জীবনের মূল্যে সে তার সত্য রক্ষা করেছে। একা হওয়াটা কখনো-কখনো বেশ সাহসের কাজ, অতীনের সেই সাহস ছিল। কারণ মেজরিটি তার ক্ষমতা দেখাতে ভালোবাসে। এই সাহস নিখিলেশেরও ছিল, যদিও সে নির্দিষ্ট কোনো দলে নাম লেখায়নি। স্বদেশীতে নিখিলেশ নিজের মতো করে অংশগ্রহণ করেছিল। অথচ মেজরিটির সঙ্গে যখনই ঠোকাঠুকি লেগেছে, নিখিলেশ নিজের অবস্থানে স্থির থেকেছে। জনমত তার বিরুদ্ধে গেছে, তবু ভয় পায়নি, বিচলিত হয়নি; যুক্তি দিয়ে, বিনয়ের সঙ্গে নিজের কথাটা বলে গেছে। রবীন্দ্রনাথের নায়কদের এটাও একটা গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। 

৩.

গোরাও শচীশের মতোই দল বদলেছিল, এবং দু-দুবার। গোরার শরীরে যে আইরিশ রক্ত ছিল— সেটা বড়ো কথা নয়, তারও বুকে যে খাঁটি দরদ ছিল। ঘোষপুর-চরে এক বৃদ্ধ নাপিতের সঙ্গে গোরার সাক্ষাৎ হয়, সে একটি সহায়হীন মুসলমান ছেলেকে নিজের বাড়িতে রেখে মানুষ করছে। প্রথমে অবশ্য ব্যাপারটা গোরার পছন্দ হয়নি। কিন্তু ঐ নাপিতের মুখে ছেলেটির গল্প শুনে সে এতখানি প্রভাবিত হল কেন? উত্তর: কমপ্যাশন। সংস্কার এর তোড়ে কুটোর মতো ভেসে যায়। গোরা ‘ভাবিল, পবিত্রতাকে বাহিরের জিনিস করিয়া তুলিয়া ভারতবর্ষে আমরা এ কী ভয়ংকর অধর্ম করিতেছি! উৎপাত ডাকিয়া আনিয়া মুসলমানকে যে লোক পীড়ন করিতেছে তাহারই ঘরে আমার জাত থাকিবে আর উৎপাত স্বীকার করিয়া মুসলমানের ছেলেকে যে রক্ষা করিতেছে এবং সমাজের নিন্দাও বহন করিতে প্রস্তুত হইয়াছে তাহারই ঘরে আমার জাত নষ্ট হইবে!’ মাধব চাটুজ্জের বাড়ি সে আর গেল না। রমাপতিকে বিদেয় করে ফিরে গেল নাপিতের ঘরে— ‘প্রথমে আসিয়া নাপিতের ঘটি নিজের হাতে ভালো করিয়া মাজিয়া কূপ হইতে জল তুলিয়া খাইল এবং কহিল— ঘরে যদি কিছু চাল ডাল থাকে তো দাও আমি রাঁধিয়া খাইব। নাপিত ব্যস্ত হইয়া রাঁধিবার জোগাড় করিয়া দিল। গোরা আহার সারিয়া কহিল, “আমি তোমার এখানে দু-চার দিন থাকব।” 

এই তার শুচি হওয়ার শুরু। তারপর একদিন সে পরেশবাবুকে বলবে, ‘আজ আমি এমন শুচি হয়ে উঠেছি যে চণ্ডালের ঘরেও আমার আর অপবিত্রতার ভয় রইল না।’ একেই গোরা ‘মুক্তিলাভ’ বলেছে। মুক্তি ছোটো-পরিচয় থেকে, ঘৃণা থেকেও— ‘গোরা কহিল, “মা, তুমিই আমার মা! যে মাকে খুঁজে বেড়াচ্ছিলুম তিনিই আমার ঘরের মধ্যে এসে বসে ছিলেন। তোমার জাত নেই, বিচার নেই, ঘৃণা নেই— শুধু তুমি কল্যাণের প্রতিমা! তুমিই আমার ভারতবর্ষ!...” গোরা তার ভারতবর্ষকে নিজেই আবিষ্কার করেছিল, তারপর এসেছিল পরেশবাবুর কাছে নিজেকে সমর্পণ করতে।

রবীন্দ্রনাথের কথা ভাবলেই এইসব দলছুট মানুষের কথা ভাবি, যারা সত্যান্বেষী, যারা মেজরিটির বিরুদ্ধে যায়, যারা নিজের কথাটা বলতে ভয় পায় না আর প্রাণের মূল্যে সত্য রক্ষা করে; যারা ক্ষমতা থাকলেই দখল করতে যায় না, যুক্তি দিয়ে তর্ক করে, আবার মতের অমিল হলেও স্বজনকে ত্যাগ করে না, যখন দুঃসময় আসে তখন যারা আগে হেঁটে যায়। ভারতবর্ষ একটা ল্যাপাপোঁছা মাংসের তাল হয়ে ওঠার আগে, আমি চাই, ‘রবি ঠাকুরের দল’ আরও ভারী হোক। 

(কৃতজ্ঞতা: ‘রবি ঠাকুরের দল’— অশীন দাশগুপ্ত) 

 


প্রকাশের তারিখ: ০৯-মে-২০২৬

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org