সংহতির মহানগর: বার্লিন

সমন্বয় রাহা

এরাল্পের নির্বাচনী ভাষ্যের কেন্দ্রে রয়েছে একটি সহজ ধারণা— কেউ একা নয়: যে মানুষটি বাড়িভাড়া দিতে হিমশিম খাচ্ছেন, যে অভিবাসী পরিবারটি এখনও পূর্ণ নাগরিকের মর্যাদার জন্য লড়ছেন, যে শ্রমিকটি প্রতিদিন শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে দৌড়ে বেরাচ্ছেন, যে তরুণ নিজের শহরেই খুঁজে পাচ্ছেন না থাকার জায়গা, কাজের জন্য হাহাকার করছেন— তাদের সমস্যাগুলি যদি আলাদা আলাদা করে না দেখে একটি অভিন্ন সামাজিক বাস্তবতার অংশ হিসেবে দেখা যায়— তখনই ‘সংহতি’ শব্দটি পায় রাজনৈতিক তাৎপর্য। এখানেই উঠে এসেছে নতুন স্লোগান: ‘অন্য একটি বার্লিন সম্ভব’, ‘সবসময় একসঙ্গে, কখনও একা নয়।’

বার্লিনের নির্বাচনে বামপন্থীদের জয় এক বিরাট আশাবাদের জন্ম দিয়েছে। বার্লিনের সবচেয়ে বেশি ভোট পাওয়া বামপন্থী দল ডি লিংকে-র রাজনৈতিক আহ্বান ছিল, বার্লিনকে আবার ‘সবার সাধ্যের মধ্যে’ ফিরিয়ে আনতে হবে। দলের নির্বাচনী ইশ্‌তেহারের জার্মান শিরোনামই ছিল: ‘Berlin bezahlbar machen’, অর্থাৎ ‘সাশ্রয়ী করে তোলো বার্লিনকে’। যেখানে বলা হয়েছে, যারা এই শহরে জন্মেছে, বা অন্য জায়গা থেকে এসে বসবাস শুরু করেছে, বার্লিন তাদের সকলের ঘর। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে বাড়িভাড়া বৃদ্ধি এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির ফলে বহু মানুষের কাছে এই শহরে থাকা ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠেছে।

এই ইশ্‌তেহারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দু’টি দিক হল: আবাসন আর গণপরিবহণ। ডি লিংকে অবৈধ বা অতিরিক্ত ভাড়া নিয়ন্ত্রণে সদর্থক প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহনের কথা বলেছে। রাজ্যের মালিকানাধীন আবাসনের ভাড়া একটা নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে সীমিত রাখার কথা জানিয়েছে। সেইসঙ্গেই বড় আবাসন কর্পোরেশনের মালিকানাধীন বিপুল সংখ্যক বাড়িকে সামাজিক মালিকানায় আনার দাবি তুলেছে। গণপরিবহণের ক্ষেত্রে টিকিটের দাম স্থির রাখার সঙ্গেই ছিল কম আয়ের মানুষের জন্য কম খরচে টিকিট আনার প্রতিশ্রুতি।

নির্বাচনী ইশ্‌তেহারের কেন্দ্রীয় প্রশ্নটি ছিল: গরিব মানুষ, যাঁরা সংখ্যায় বেশি তাঁরা কি এই শহরে আর থাকতে পারবেন? এবং সেখান থেকেই শুরু বার্লিনের ২০২৬-এর নির্বাচনী সফর।

অবশ্য, ৪৫-বছর বয়সে ডি লিংকে-র মুখ হয়ে ওঠা এলিফ এরাল্পের রাজনৈতিক জীবনের গল্প আবাসন আন্দোলন বা বার্লিনের মেয়র নির্বাচন থেকে শুরু হয়নি। তার শিকড় রয়েছে জার্মানিতে আসা একটি রাজনৈতিক উদ্বাস্তু পরিবারের ইতিহাসে। এরাল্প ১৯৮১-তে মিউনিখে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা মা তুরস্কে সমাজতান্ত্রিক ও ট্রেড ইউনিয়ন রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯৮০-তে তুরষ্কে সামরিক অভ্যুত্থানের পর তাঁরা সপরিবারে জার্মানিতে আশ্রয় নেন। পরিবারের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে ছোটবেলা থেকেই তিনি জার্মানিতে রাজনৈতিক মিছিল ও আন্দোলনের সঙ্গে পরিচিত হন। মিউনিখের পর তাঁর পরিবার পোঁছায় ডর্টমুন্ডে। পরে এরাল্পের বয়স যখন আট, তখন তারা হামবুর্গে চলে আসেন।

এই পারিবারিক ইতিহাসই তাঁর পরবর্তী রাজনীতির একমাত্র কারণ হিসেবে দেখলে আমাদের ভুল করব। কিন্তু এটুকু বলা যায় যে রাজনীতি, অভিবাসন এবং সামাজিক বৈষম্যের অভিজ্ঞতা তাঁর জীবনের খুব প্রাথমিক পর্যায়েই উপস্থিত হয়েছিল।

পরে তিনি আইন নিয়ে পড়াশোনা করেন। এবং অভিবাসন, আশ্রয়, মানবাধিকার ও সামাজিক ন্যায়ের জন্য লড়াই এর সঙ্গে যুক্ত হন। ২০২১ সাল থেকে তিনি বার্লিনের হাউস অফ রিপ্রেজেনটেটিভ Abgeordnetenhaus-এর সদস্য। ২০২৫ সালের মে মাস থেকে তিনি ডি লিংকের সহ সভাপতিও বটে।

বার্লিনের রাজনীতিতে এরাল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হল ‘Solidarity City’ অর্থাৎ সংহতির শহর তৈরি করা। ওয়েবসাইটে তিনি এই বার্লিন শহরকে নিয়ে স্বপ্নের কথা জানিয়েছেন। যেখানে তিনি বলছেন, এমন একটি শহর দরকার যে শহর উদ্বাস্তুদের গ্রহণ করবে। যে শহরে সামাজিক উন্নিয়নের ক্ষেত্রে অভিবাসী পরিবারগুলির অংশগ্রহণ বাড়বে এবং অতিরিক্ত ভাড়ার কারণে মানুষকে নিজেদের জায়গা থেকে আর উৎখাত হতে হবে না। 

এখানেই তাঁর রাজনীতির সঙ্গে আবাসনের প্রশ্নটি মিলেমিশে যায়। বার্লিনের আবাসন সংকটকে বোঝার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হল ২০২১ সালের গণভোট। সেই বছর বার্লিনের ৫৮ শতাংশ মানুষ বড় বেসরকারি আবাসন সংস্থার মালিকানাধীন বাড়িগুলিকে সামাজিক মালিকানায় নেওয়ার পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন। সেই জনমত তখনকার সরকার বাস্তবায়ন করেনি। ফলে ‘Deutsche Wohnen & Co enteignen’-এর মতো বড়ো আবাসন সংস্থার সম্পত্তি সামাজিকীকরণের দাবি, পরবর্তী বছরগুলিতেও বার্লিনের রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে থাকে।

২০২৬-এর নির্বাচনে ডি লিংকে সেই প্রশ্নকে আবার সামনে আনে। দলটি বড় আবাসন সংস্থা গুলির মালিকানাধীন প্রায় ২ লক্ষ ২০ হাজার আবাসনকে সামাজিক মালিকানায় আনার পক্ষে প্রচার চালায়। এলিফ এরাল্প নির্বাচনী প্রচারে এই দাবিকে নিজের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক অঙ্গীকার হিসেবে তুলে ধরেন।

আর এখানেই বামপন্থী রাজনীতির একটি পুরনো প্রশ্ন নতুন করে ফিরে আসে: মাথার উপর ছাদ, অর্থাৎ ঘরবাড়ি কি কেবলমাত্র বিনিয়োগের জায়গা, মুনাফার জায়গা, নাকি মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার?

পুঁজিবাদী যুক্তিতে বাড়ি বা আবাসন একটি মুনাফা অর্জনের জায়গা। তার মূল্য বাড়লে মালিক লাভবান হন। কিন্তু একজন সাধারণ ছাপোষা মানুষের কাছে বাড়ি কোনও বিনিয়োগ নয়। এটি তাঁর ঘর, সন্তানের বড়ো হয়ে ওঠার ঠিকানা। আদতে এক বিরাট সামাজিক সম্পর্ক গড়ে ওঠার মূল কেন্দ্র।

এই দুই দৃষ্টিভঙ্গির সংঘাতই বার্লিনের আবাসন রাজনীতিকে এত তীব্র করেছে। এরাল্প নির্বাচনী প্রচারে এই সংকটকে শহরের ‘সবচেয়ে বড় সামাজিক সমস্যা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। নির্বাচনের জয়ের পরে তাঁর বক্তব্যও একই দিকে ইঙ্গিত করে। ভাড়া বৃদ্ধির ক্রমবর্ধমান চাপকে তিনি শহরের কেন্দ্রীয় সামাজিক সমস্যা হিসেবে দেখছেন।

আবাসনের সংকটকে শুধু বাড়ির দামের সমস্যা হিসেবে দেখলে বিষয়টি অসম্পূর্ণ থাকে। শহরের এক প্রান্তে সস্তা বাড়ি পাওয়া গেলেও যদি কর্মস্থলে পৌঁছতে প্রতিদিন বেশি সময় ও বেশি অর্থ লাগে, তাহলে জীবন ধারণের মোট খরচ বেড়ে যায়। অর্থাৎ বার্লিনের ব্যয়বহুল গণপরিবহন। 

ডি লিংকের নির্বাচনী ইশ্‌তেহারে তাই গণপরিবহণও আবাসনের সঙ্গে একই সামাজিক প্রশ্নের অংশ হয়ে ওঠে। তারা বলছে, অনেক মানুষের কাছে স্থানীয় গণপরিবহণের খরচ ইতিমধ্যেই বেশি। তাই টিকিটের দামের একটি নির্দিষ্ট কাঠামো তৈরি করা এবং যথা সম্ভব টিকিটের দাম কমানো। একটি নির্দিষ্ট মূল্যের মধ্যে টিকিটের পাশাপাশি সামাজিক সুবিধাভোগীদের জন্য টিকিটের দাম কমানোর প্রস্তাবও কর্মসূচিতে ছিল।

এরাল্পের নির্বাচনী প্রচারে যেমন বার্লিনের রেল ব্যবস্থা (S-Bahn), মেট্রো রেল পরিষেবা (U-Bahn) থেকে সরকারি স্কুলের কথা উঠে এসেছে, তেমনই গুরুত্ব পেয়েছে মিউনিসিপালিটির পরিষেবার জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা এবং বাড়িভাড়া বৃদ্ধির জরুরি ইস্যু। সবমিলিয়ে প্রচারের কেন্দ্রে উঠে এসেছে শহরের সামাজিক সংকটের ছবি। এই নির্বাচনের রাজনৈতিক তাৎপর্য এখানেই— জীবনযাত্রার খরচকে একটি আলাদা সমস্যা হিসেবে না দেখে, সামগ্রিক সামাজিক প্রশ্ন হিসেবে দেখা। 

আবাসনের ভাড়া বেশি। 

যাতায়াতের খরচ বেশি। 

নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের মূল্যবৃদ্ধি। 

শিশুর বড়ো হয়ে ওঠা থেকে শিক্ষার খরচ ক্রমশ ধরাছোঁয়ার বাইরে। 

দুর্বিষহ অবসর-উত্তর জীবন। 

সেকারণে, ‘সাশ্রয়ী শহর’ কথাটি কেবল কম ভাড়ার কথা নয়। এটি আসলেই শহরের সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক কাঠামোকে নিয়ে প্রশ্ন তোলা।

এরাল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল নির্বাচনী প্রচারে শব্দের ব্যবহার। তাঁর প্রচারে একটি কথা বারবার এসেছে, ‘Ein anderes Berlin ist möglich.’ যার বাংলা করলে দাঁড়ায় ‘অন্য একটি বার্লিন সম্ভব।’ এর সঙ্গে ছিল আরও একটি কথা ‘Immer zusammen. Niemals allein’, অর্থাৎ ‘সবসময় একসঙ্গে। কখনও একা নয়।’

এগুলি নিছক প্রচারের স্লোগান হিসেবে দেখলে মৌলিক জায়গাটা আমরা ছুঁতে পারব না। আদতে এগুলির মধ্যে একটি রাজনৈতিক অবস্থানও স্পষ্ট। শহরের সংকট অর্থাৎ আরও বৃহৎ অর্থে বললে সামাজিক সংকটের উত্তর কোনও ব্যক্তি একা খুঁজবে না। সেখানে অবশ্যই সামাজিক প্রতিষ্ঠান, পৌর প্রশাসন এবং সমষ্টিগত রাজনৈতিক শক্তির ভূমিকা থাকতে হবে। এই ভাষ্য বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ এমন এক সময়ে, যখন জার্মানির রাজনীতিতে অভিবাসন, নিরাপত্তা এবং জাতীয় পরিচয়ের প্রশ্ন ক্রমশ তীব্র হয়ে উঠেছে।

এই জায়গাতেই জোহরান মামদানির নিউ ইয়র্ক প্রচারের সঙ্গে বার্লিনের একটি আকর্ষণীয় মিল খুঁজে পাওয়া সম্ভব।

২০২৬ সালের আগেই ডি লিংকে রাজনীতিতে মামদানির প্রচারের প্রতি আগ্রহ দেখা গিয়েছিল। বেশ কিছু জার্মান সংবাদমাধ্যমও এরাল্পের প্রচারকে নিউ ইয়র্কের মামদানির সঙ্গে তুলনা করেছে। বিশেষত তরুণ ভোটারদের কাছে পৌঁছনো, বাড়ি বাড়ি প্রচার এবং জীবনযাত্রার খরচকে প্রচারের কেন্দ্রে রাখার ক্ষেত্রে স্পষ্টতই মামদানির প্রচারের মৌলিক বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল পাওয়া যায়। 

তবে দুই শহরের রাজনৈতিক কাঠামো এক নয়, এবং এরাল্পের প্রচারকে মামদানির প্রচারের সরাসরি অনুকরণ বলা ঠিক হবে না। বরং বলা যায়, দুজনের প্রচারে একটি সাধারণ রাজনৈতিক প্রবণতা দেখা যায়। বাম রাজনীতিকে এলিট একাডেমিশিয়ার চার দেওয়ালের মধ্যে আবদ্ধ না রেখে, মানুষের দৈনন্দিন যাপনের ভাষায় প্রকাশ করা। এখানেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে শ্রেণির প্রশ্ন। 

‘পুঁজিবাদ খারাপ’, এই সাধারণ বক্তব্যের বদলে প্রশ্ন করা, প্রতিদিনের যাতায়াত ভাড়া কত? বাসের টিকিটের দাম কত? মেট্রো রেল, ট্রেনে যাতায়াতের খরচ কেমন? শিশুর দেখাশোনা অর্থাৎ বড়ো হয়ে ওঠার খরচ কেমন? মাসের শেষে হাতে কতটুকু সাশ্রয় করা যায়? আদতে এই ধরনের প্রশ্ন বাম রাজনীতিকে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করে।

বার্লিনের বাম রাজনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র প্যালেস্তাইন সংকট। জার্মানির ক্ষেত্রে এই প্রশ্নটি বিশেষ ঐতিহাসিক তাৎপর্য বহন করে। হলোকাস্টের স্মৃতি এবং ইহুদি জনগণের নিরাপত্তার প্রশ্ন জার্মান রাজনৈতিক সংস্কৃতির গভীরে রয়েছে। একই সময়ে ডি লিংকের বার্লিন শাখার নথিতে প্যালেস্তিনীয় জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার, উদ্বাস্তু ও অভিবাসীদের অধিকার এবং ইজরায়েল ও প্যালেস্তাইনের মানুষের সমান অধিকার ও নিরাপত্তার কথা বলা হয়েছে। দলটি একই নথিতে ইহুদি বিদ্বেষ এবং রাজনৈতিক আগ্রাসনেরও বিরোধিতা করেছে। এই অবস্থান নিয়ে জার্মান বাম রাজনীতির ভিতরেও বিতর্ক রয়েছে। নির্বাচনের পর সম্ভাব্য জোটসঙ্গীদের পক্ষ থেকে ডি লিংকে কিছু স্থানীয় শাখার বিরুদ্ধে ইহুদী বিদ্বেষ-সংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে অবস্থান স্পষ্ট করার দাবিও উঠেছে। তাই প্যালেস্তাইন প্রশ্নকে বার্লিনের বাম রাজনীতির একটি সরল বা একরৈখিক অংশ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। বরং এখানে তিনটি রাজনৈতিক দাবি পাশাপাশি রয়েছে। ইহুদি নিরাপত্তা, ইহুদি বিদ্বেষ অর্থাৎ antisemitism-এর বিরোধিতা এবং প্যালেস্তিনীয়দের অধিকার ও আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন। এগুলিকে কীভাবে একসঙ্গে রাজনৈতিকভাবে ধারণ করা যায়, সেটিই এখন ডি লিংকের সামনে বড়ো চ্যালেঞ্জ।

বার্লিনে ডি লিংকে ২০২৬-এর নির্বাচনে প্রথম হলেও একই নির্বাচনে হিটলারের নাৎসী মতাদর্শের প্রতি আস্থাশীল অভিবাসন-বিরোধী দল অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি (এএফডি) জার্মানিতে আগের তুলনায় শক্তিশালী হয়েছে। প্রাথমিক ফল অনুযায়ী ডি লিংকে পেয়েছে ২৫.৭ শতাংশ, চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ মেয়ার্ৎসের রক্ষণশীল দল ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্র্যাটিক ইউনিয়ন (সিডিইউ) ১৮.৮ শতাংশ, এএফডি ১৬.৩ শতাংশ, গ্রিন-রা ১৪.৩ শতাংশ এবং সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটস (এসপিডি) ১২.১ শতাংশ ভোট। ডি লিংকের ফল ২০২৩ সালের ১২.২ শতাংশ থেকে দ্বিগুণেরও বেশি। অন্যদিকে এএফডি-ও ২০২৩ এর ৯.১ শতাংশ থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অতএব ২০২৬-এর বার্লিনকে শুধু ‘বামপন্থার প্রত্যাবর্তন’ হিসেবে দেখা অসম্পূর্ণ হবে। একই সময়ে জার্মান রাজনীতিতে উগ্র দক্ষিণপন্থী শক্তির উপস্থিতিও বেড়েছে।

কেন এএফডি-র ভোট বাড়ছে? তার একমাত্র কারণ হিসেবে কোনও একটি সামাজিক গোষ্ঠী বা একটি ইস্যুকে চিহ্নিত করা কঠিন। অভিবাসন, নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, জাতীয় পরিচয় এবং প্রতিষ্ঠিত দলগুলির প্রতি অসন্তোষ। এই বিষয়গুলিকে কাজে লাগিয়েই সাধারণত পৃথিবীর সর্বত্র উগ্র দক্ষিণপন্থার উদ্ভব হয়। আমেরিকায় ট্রাম্প, ইতালিতে মেলোনি, ইজরায়েলে নেতানিয়াহু, ভারতবর্ষে মোদী। সবার মৌলিক জায়গা এক। এরা প্রত্যেকেই উগ্র জাতীয়তাবাদী। তীব্র অভিবাসন, উদ্বাস্তু বিরোধী। সবসময়ই এক কাল্পনিক প্রতিপক্ষ তৈরি করে জনসাধারণের মধ্যে ঘৃণার রাজনীতিকে প্রচার করে অর্থাৎ Politics of otherisation. এখানেই বাম রাজনীতির সামনে আসল পরীক্ষা। যখন মানুষ বাড়ি ভাড়া দিতে পারছে না, তখন তাকে বলা হয় ‘তোমার সমস্যার কারণ ওরা’, ওই অভিবাসীরা। বলা হয় না উদার নীতির কারণেই এই সংকট। এই ভাষ্যের সঙ্গে ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের মিল পাওয়া যাবে। আমাদের সাধরণ জীবনে কোনও সংকট হলেই ‘ওরা’কে দায়ী করা হয়। প্রতিবেশী দেশের দিকে আঙুল তোলা হয়। কখনও সেই দেশের নাম পাকিস্তান, কখনওবা বাংলাদেশ হয়ে যায়। যেমন পশ্চিমবঙ্গে শুভেন্দু অধিকারী চাকরি দূর্নীতি, সামাজিক প্রকল্পের অর্থ নয়ছয়, তীব্র বেকারত্ব সহ সামগ্রিকভাবে তৃণমূল-বিরোধী ব্যপক ক্ষোভকে মুসলমান বিদ্বেষ এবং বাংলাদেশী ঘুষপেটিয়া দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখানোর চেষ্টা করেন। কখনও উষ্কে দেওয়া হয় বাংলা ভাগের স্মৃতি, ভয়াবহ দাঙ্গার সামাজিক স্মৃতিকে। অথচ নিশ্চুপে ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয় সেই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আরএসএস বা হিন্দু মহাসভার মতো গোষ্ঠীগুলির ভূমিকা। 

তথ্য বলছে বার্লিন দেওয়াল ভাঙার পরে জার্মানি এক হওয়ার পরে কোনও বামপন্থী পার্টির এরকম ফলাফল কেবল চমকপ্রদ নয় বরং ঐতিহাসিক। কিন্তু প্রথম হওয়া আর সরকার গঠন করা এক জিনিস নয়।

বার্লিনের নতুন সরকার গঠনের জন্য সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন। ডি লিংকে একা সেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। গ্রিন এবং এসপিডি-র সঙ্গে সম্ভাব্য জোট নিয়ে আলোচনা তাই পরবর্তী রাজনৈতিক পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এবং এখানেই নির্বাচনী স্লোগান বাস্তব প্রশাসনের পরীক্ষার মুখে পড়বে।

বড় আবাসন সংস্থার বাড়ি সামাজিক মালিকানায় নেওয়া হবে কীভাবে? এর অর্থনৈতিক ও আইনি কাঠামো কী হবে? ভাড়া নিয়ন্ত্রণ কতটা কার্যকর করা সম্ভব? ৯ ইউরোর টিকিটের অর্থ আসবে কোথা থেকে? জোটসঙ্গীরা কতটা সমর্থন করবে?

প্যালেস্তাইন ও ইহুদি বিদ্বেষের মতো সংবেদনশীল প্রশ্নে, বিভিন্ন অবস্থানের মধ্যে কীভাবে রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরি করা সম্ভব হবে? এই প্রশ্নগুলির উত্তর এখনও পুরোপুরি জানা নেই।

তবু বার্লিনের নির্বাচনের রাজনৈতিক তাৎপর্য এখানেই যে, একটি বড় শহরের নির্বাচনী বিতর্কে আবারও শ্রেণি, আবাসন, গণপরিবহণ, সামাজিক অধিকার এবং সম্পত্তির মালিকানার প্রশ্ন সামনে এসেছে। শহরকে শুধু ‘বিনিয়োগের বাজার’ হিসেবে দেখা হবে, নাকি মানুষের বসবাসের জায়গা হিসেবে, এই পুরনো দ্বন্দ্ব নতুন রাজনৈতিক ভাষ্যে ফিরে এসেছে।

আর সেই ভাষার কেন্দ্রে রয়েছে একটি সহজ ধারণা— কেউ একা নয়: যে মানুষটি বাড়িভাড়া দিতে হিমশিম খাচ্ছেন, যে অভিবাসী পরিবারটি এখনও পূর্ণ নাগরিকের মর্যাদার জন্য লড়ছেন, যে শ্রমিকটি প্রতিদিন শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে দৌড়ে বেরাচ্ছেন, যে তরুণ নিজের শহরেই খুঁজে পাচ্ছেন না থাকার জায়গা, কাজের জন্য হাহাকার করছেন— তাদের সমস্যাগুলি যদি আলাদা আলাদা করে না দেখে একটি অভিন্ন সামাজিক বাস্তবতার অংশ হিসেবে দেখা যায়— তখনই ‘সংহতি’ শব্দটি পায় রাজনৈতিক তাৎপর্য।

বার্লিনের ২০২৬-এর নির্বাচন যে সম্ভাবনাটিকে সামনে এনেছে, তা হল, সংহতির মহানগর: বার্লিন। গুগল বলছে একটা সোজা লাইন কলকাতা থেকে বার্লিন অব্দি টানলে তার দৈর্ঘ্য দাঁড়ায় ৭,০৩০ থেকে ৭,০৬৭ কিলোমিটার। এই ৭ হাজার কিলোমিটার দূরে বসে যখন বার্লিনের কথা ভাবতে ভাবতে কলকাতাকে দেখছি, আমার দেশকে দেখছি, তখন সামাজিক সংকটের প্রায় একই রকম দৃশ্য দেখতে পাচ্ছি। তাই নিশ্চিত ভাবে বার্লিনে বামপন্থীদের জয়, আশাব্যঞ্জক। আর কে না জানে শ্রেণির প্রতি সৎ থেকে লড়াই এবং আশাবাদ ছাড়া, বর্তমান ভারসাম্য পরিবর্তন করা অসম্ভব।


প্রকাশের তারিখ: ২৩-সেপ্টেম্বর-২০২৬

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org