সোমনাথ হোরের তেভাগার ডায়েরি

শমীক বন্দ্যোপাধ্যায়
৪ জানুয়ারি ১৯৪৭ তারিখে দিনাজপুর জেলার ছিরিরবন্দর-এর অন্তর্গত তালপুকুর গ্রামে একটি কৃষক সমাবেশের উপরে পুলিশ গুলি চালায়। সঙ্গে সঙ্গেই মারা গেলেন শিবরাম নামে একজন ভূমিহীন সাঁওতাল চাষি আর সমিরুদ্দিন নামে আর-একজন ভূমিহীন চাষি। আরও অনেকেই গুলিবিদ্ধ হলেন।... ছিরিরবন্দরে গুলি চালানোর পরের দিনই ভূমি-রাজস্ব মন্ত্রী ফজলুর রহমান সিরাজগঞ্জে একটি জনসভায় ঘোষণা করলেন, অচিরে বাংলা সরকার বর্গাদারদের জমি থেকে উৎখাত রোধ এবং ফসলের তিনভাগের দুইভাগ বর্গাদার ও একভাগ জোতদার পাবে এই মর্মে একটি বিল আনবেন। কোলকাতা গেজেটে ২২ জানুয়ারি ১৯৪৭ তারিখে ‘দি বেঙ্গল বর্গাদারস টেমপোরারি রেগুলেশন বিল’ প্রকাশিত হল।’

ডি. এন. নাগরে বিবরণে ১৯৪৬-৪৭-এ বাংলার তেভাগা আন্দোলনকে বর্ণনা করেছেন, ‘গ্রামীণ জনতার বামপন্থী আন্দোলনেরই এক পরিণতি... ভারতের ইতিহাসে রাজনীতিসচেতন কৃষকদের প্রথম সচেতন বিদ্রোহ প্রচেষ্টা’ বলে। এ বিদ্রোহের প্রকৃতি ব্যাখ্যায় তিনি বলেছেন, ‘এ ছিল কৃষি-উৎপাদনের তিনভাগের দুইভাগ নিজেদের দখলে পাবার জন্য ভাগচাষিদের সংগ্রাম- যাতে জোতদারকে খাজনা হিশেবে দেয় ফসলের আধাআধি ভাগ কমিয়ে এক-তৃতীয়াংশ করা যায়’ (D.N.Dhanagare, Peasant Movements in India, 1920-50, Delhi 1983, p. 155)বিদ্রোহের এই সাধারণ বিবরণের পশ্চাৎপটে আছে ১৭৯৩-এর চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের জেরে শোষণের এক সুদীর্ঘ ইতিহাস। জমির মালিকানা ক্রমাগত ভাগ হয়ে যাওয়ায় ‘জমির স্বত্বাধিকারী’ আদি জমিদারদের ক্ষমতা হ্রাস পেল, তাঁরা জমি ইজারা দিলেন জোতদারদের এবং তার পরের নানান উপস্বত্বভোগীদের। এরা জমি চাষ করাবে বর্গাদারদের দিয়ে যাদের জমির উপরে কোনো স্বত্বই নেই, একই জমি বছরের পর বছর চাষ করার অধিকারেও নেই। কিন্তু প্রকৃত চাষি এই বর্গাদাররাই যোগাবে বীজ, বলদ, চাষের যন্ত্রপাতি, সার। ‘এইটুকু সুযোগের জন্য’ উৎপন্ন ফসলের অর্ধেক খাজনা হিশেবে দিতে হবে জোতদারকে। অবিভক্ত বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে এই বর্গাদারদের বিভিন্ন নামে উল্লেখ করা হত। উত্তরবঙ্গে সাধারণত বলা হত আধিয়ার (‘আধি’- ফসলের অর্ধেক ভাগ)। অন্যত্র এদের বলা হত ‘ভাগচাষি’গোটা ব্যবস্থাপনায় নিহিত অবিচার জমির মালিক আর প্রকৃত চাষিদের মধ্যে যে ফারাক বাড়িয়ে তুলেছিল সহজেই তা বোঝা যায়। কিন্তু এই ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার আর একটি প্রবল উপসর্গ ছিল গ্রামীণ ঋণগ্রস্ততার ব্যাপকতা। প্রায়ই জোতদাররাই মহাজন হওয়ায় তারা দ্বিগুণ কর্তৃত্বের অধিকারী হিশেবে ছোটো ছোটো জমির মালিক আর বর্গাদারদের সম্পূর্ণ করায়ত্ত করে রাখত।

১৯২০-র দশকে বাংলার প্রগতিশীল রাজনীতি কৃষি সমস্যার দিকে মোড় নেবার আগেই ১৯২৫-২৭-এর মধ্যে কুৎসিত সাম্প্রদায়িকতা মাথা তোলে। ফলে ধনী কৃষক-মহাজন-ব্যবসায়ী শ্রেণির নিমর্ম শোষণের বিরুদ্ধে গরিব চাষি-ভাগচাষি-কৃষিমজুরদের নিজেদের আন্দোলন বা তাদের জন্য সংঘবদ্ধ আন্দোলনের সম্ভাবনায় বাধা পড়ল। বাংলার ফজলুল হক সরকার নিযুক্ত ১৯৩৮-এ ‘ল্যান্ড রেভেনিউ কমিশন’ রাজ্যের কৃষি-পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে সুপারিশ করে, বর্গাদারদের প্রজাস্বত্ব সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে এবং তাদের কাছ থেকে আইন মোতাবেক ফসল আদায় অর্ধেক থেকে কমিয়ে এক-তৃতীয়াংশ করতে হবে। ফজলুল হকের কোয়ালিশন সরকার এ সুপারিশ কার্যকর করতে না পারায় তাঁরই কৃষক প্রজা পার্টির আক্রোশের মুখে পড়ল-পার্টির প্রগতিশীল অংশ এই সরকারকে বলল ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদ আর বাংলার জমিদারতন্ত্রের মোসাহেব। তবুও অন্যায় অবিচার-এর প্রথম সরকারি স্বীকৃতি এবং একটা সন্তোষজনক প্রতিকারের পরামর্শ সদ্যোত্থিত কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে এবং উদ্যোগে কৃষিক্ষেত্রে শ্রেণিসংগ্রাম তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠার মূলে কাজ করেছিল।

কমিউনিস্ট কর্মীদের নেতৃত্বে পরিচালিত তেভাগা আন্দোলনে সাম্প্রদায়িক প্রবণতার ছায়াপাত যাতে ক্রমবর্ধমান দারিদ্র্যে নিমজ্জিত ভাগচাষিদের সংহতিকে কোনোভাবে ক্ষুণ্ণ করতে না পারে, সেদিকে প্রখর সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়েছিল। আন্দোলনের কমিউনিস্ট নেতাদের মধ্যে স্থানীয় মানুষের সঙ্গে মিশে ছিলেন বাইরে থেকে আসা অনেকে- যাঁরা জোরালো আন্দোলনের এলাকাগুলিতে বসতি গেড়েছিলেন। এঁদের অনেকে ১৯৩৭-৩৮-এ জেল থেকে মুক্তি পাওয়া বিপ্লবী। সন্ত্রাসবাদী বৈপ্লবিক আন্দোলনে যুক্ত থাকার জন্য যাঁরা গ্রেপ্তার হয়েছিলেন, জেলে তাঁদের অনেকে মার্কসবাদ গ্রহণ করেন এবং ছাড়া পাবার পর কৃষকদের মধ্যে কাজ করা ও কৃষকদের জাতীয় সংগঠন কিসান-সভার কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার জন্য গ্রামে চলে যান। কিসান-সভা তখন কমিউনিস্টদের দখলে। ১৯৪৬-এর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পটভূমিতেই বঙ্গীয় প্রাদেশিক কিসান সভা সেপ্টেম্বর মাসে তেভাগা আন্দোলনের ডাক দেয়।

এ প্রসঙ্গে পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের সিদ্ধান্ত, ‘কমিউনিস্ট কর্মীদের উপস্থিতি সত্ত্বেও বর্ধমান বা মেদিনীপুরে (এক তমলুকের নন্দীগ্রাম অঞ্চল ভিন্ন) আন্দোলন তেমন তীব্র হয়নি, কিন্তু উত্তরবঙ্গের এবং দক্ষিণবঙ্গের সুন্দরবন অঞ্চলের যেসব জায়গায় বহুকাল ধরে ব্যাপকভাবে যৎসামান্য অধিকারে ভাগচাষ করানোর প্রথা প্রচলিত ছিল সেখানে জোরালো আন্দোলন গড়ে উঠল।’ (Bengal 1920-47: The Land Question, Calcutta, 1984, p. 203).

১৯৪৬-এর নভেম্বরে তেভাগা আন্দোলন শুরুর সময়ে বাংলায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সদ্য থেমে গেলেও উত্তেজনা ছিলই। কোলকাতার দমবন্ধ দশার ১৯৪৬-এর ১৭ ডিসেম্বর রাতে তরুণ শিল্পী সোমনাথ হোর নর্থবেঙ্গল এক্সপ্রেসের এক তৃতীয় শ্রেণির কামরায় চড়ে উত্তরবঙ্গের রংপুরের উদ্দেশে যাত্রা করলেন। ‘এক্ষণ’ বার্ষিক সংখ্যা ১৯৮১ পত্রিকায় ‘তেভাগার ডায়েরি’ মূল বাংলায় প্রথম প্রকাশের সময়ে ভূমিকায় সোমনাথ হোর স্মরণ করেছিলেন, ‘ডিসেম্বর ১৯৪৬-এ আমি কোলকাতার গভর্নমেন্ট আর্ট স্কুলে দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। শ্রদ্ধেয় সোমনাথ লাহিড়ী এবং নৃপেন চক্রবর্তী আমাকে বলেন, তেভাগা আন্দোলন দেখতে চাও তো রংপুরে যাও।’

সোমনাথ হোরের ডায়েরি মাত্র বারো দিনের বৃত্তান্ত এবং এতে ধরা আছে এক প্রগতিশীল তরুণের চোখে দেখা কৃষকদের বৈপ্লবিক উদ্দীপনা ও সংহতির সপ্রশংস বিবরণ যা এত ঘনিষ্ঠভাবে দেখার সুযোগ আগে হয়নি। অবশ্য পার্থ চট্টোপাধ্যায় সরকারের সরাসরি প্রচণ্ড দমননীতির সঙ্গে যুক্ত জোতদার শ্রেণির অস্ত্রশক্তি’র যে আস্ফালন লক্ষ করেছেন, তাতে যে এ আন্দোলন ভেঙে পড়তে পারে সোমনাথের বিবরণে তেমন কোনো পূর্বাভাস নেই।

এই আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ঐতিহাসিক সুনীল সেন রংপুরের তেভাগা আন্দোলনের আরও বস্তুনিষ্ঠ বিবরণে লিখেছেন: ‘রংপুরের আন্দোলন ১৯৪৩-এর মহামন্বন্তরে ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত নীলফামারি মহকুমাতেই সীমিত ছিল। রাজবংশী এবং মুসলমান বর্গাদারেরা ঠাকুরগাঁওয়ের মতো এখানেও ঘনসন্নিবিষ্ট ছিল। এক মাসের মধ্যে ছয়টি থানা এলাকায় আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে, নেতৃত্বে ছিলেন মোহি বাগচী, মণিকৃষ্ণ সেন ও মন্টু মজুমদার- এঁরা গ্রেফতার এড়ানোর জন্য আত্মগোপন করে আন্দোলন পরিচালনা করেন। শত শত স্বেচ্ছাসেবক খেতে গিয়ে বর্গাদারদের খামারে ফসল তুলে আনেন। দ্বিতীয় সপ্তাহে একটা সংঘর্ষ ঘটল। ডিমলার জনাকয়েক সশস্ত্র মুসলমান জোতদার একজন বর্গাদারের বাড়ি আক্রমণ করে ফসল কেড়ে নেয়। বাচ্চা মহম্মদ আর তৎনারায়ণ রায় আক্রমণে বাধা দেন। জোতদাররা চাষিদের উপরে গুলি চালায়। তৎনারায়ণ মারা যান, বাচ্চা প্রচণ্ডভাবে আহত হন। তৎনারায়ণের মৃত্যুর খবর দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। লাঠি-সড়কি নিয়ে জড়ো হয় প্রায় হাজার তিনেক চাষি। জোতদার একজন মুসলমান। তাই নেতারা মারমুখি চাষিদের তার বাড়ি আক্রমণ থেকে নিরস্ত করেন। তাঁদের ভয় ছিল, একজন মুসলমান জোতদারের বাড়ি আক্রমণ করলে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বেধে যেতে পারে। চাষিরা জোতদারকে সামাজিকভাবে একঘরে করেন এবং প্রতিবাদ মিছিল করে গ্রামের পর গ্রাম পেরিয়ে নীলফামারি শহরে পৌঁছন। জোতদাররা গ্রাম থেকে পালিয়ে গিয়ে সুযোগের অপেক্ষায় থাকে।’ (Agrarian Struggle in Bengal 1946-47)

সমগ্র রাজ্যের আন্দোলনের প্রসঙ্গে সুনীল সেন লিখেছেন:

‘ডিসেম্বরের মাঝামাঝি এগারোটি জেলায় কৃষি আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছিল এবং লক্ষ লক্ষ বর্গাদার মাঠের ফসল নিজেদের খামারে তুলে নিয়ে গিয়েছিল। এটাকে আংশিক জয় বলা যায়, কারণ ধান চাষিদের খামারে জমা থাকায় জোতদারদের পক্ষে জবরদস্তি বা প্রতারণা, কিংবা দুই উপায়েই চাষিদের প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত করা সম্ভব হল না। এরমধ্যে চাষিদের উপরে দমন-পীড়নের মাত্রা বাড়তেই থাকল। ৪ জানুয়ারি ১৯৪৭ তারিখে দিনাজপুর জেলার ছিরিরবন্দর-এর অন্তর্গত তালপুকুর গ্রামে একটি কৃষক সমাবেশের উপরে পুলিশ গুলি চালায়। সঙ্গে সঙ্গেই মারা গেলেন শিবরাম নামে একজন ভূমিহীন সাঁওতাল চাষি আর সমিরুদ্দিন নামে আর-একজন ভূমিহীন চাষি। আরও অনেকেই গুলিবিদ্ধ হলেন।... ছিরিরবন্দরে গুলি চালানোর পরের দিনই ভূমি-রাজস্ব মন্ত্রী ফজলুর রহমান সিরাজগঞ্জে একটি জনসভায় ঘোষণা করলেন, অচিরে বাংলা সরকার বর্গাদারদের জমি থেকে উৎখাত রোধ এবং ফসলের তিনভাগের দুইভাগ বর্গাদার ও একভাগ জোতদার পাবে এই মর্মে একটি বিল আনবেন। কোলকাতা গেজেটে ২২ জানুয়ারি ১৯৪৭ তারিখে ‘দি বেঙ্গল বর্গাদারস টেমপোরারি রেগুলেশন বিল’ প্রকাশিত হল।’ (আগের সূত্র, পৃ.৪৪-৭)

অচিরেই স্পষ্ট হয়ে গেল:

‘সরকার আদৌ বর্গাদার বিল পাশ করানোয় আন্তরিক ছিল না, বরং দমননীতিই অনুসরণ করল। ... স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনের পর্ব শেষ হল। পুলিশি পীড়নের মুখে চাষিদের, বিশেষ করে মুসলমান চাষিদের মধ্যে দেখা দিল দ্বিধা। শুধু হাজং আর সাঁওতালরা আগের মতোই সংগ্রামী রয়ে গেল, কিন্তু তারা তো গ্রামের মানুষের একটা ছোটো অংশ। প্রাদেশিক কিসান কাউন্সিল জানুয়ারি ১৯৪৭-এর দ্বিতীয় সপ্তাহের সভায় সংগ্রামের পদ্ধতি নির্ণয়ে ব্যর্থতা মেনে নিল। ... ফেব্রুয়ারির তৃতীয় সপ্তাহ থেকে পুলিশ পুরো দস্তুর অত্যাচার শুরু করল, এবং সরকার স্পষ্টই বুঝিয়ে দিল মোক্ষম আঘাত হানাই তার উদ্দেশ্য।' (আগের সূত্র, পৃ. ৬১-৬৩)।

সুনীল সেন তাঁর বিবরণ শেষ করেন তিক্ত মন্তব্যে, ‘শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের পথে একমাত্র বাধা দাঁড়াচ্ছিল কৃষিক্ষেত্রের অশান্তি।’ তাই কোনো ঘটা না করেই আন্দোলন তুলে নেওয়া হল। সোমনাথ হোরের বিবরণে এই নোংরা দিকটি আসেনি। কারণ, আন্দোলনের সেই গৌরবের সময়ে তলে তলে যে গোপন খেলাটা চলছিল কারও পক্ষে তা চোখে পড়ার কোনো উপায় ছিল না।

চল্লিশের দশকের গোড়ায় ফ্যাশিবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সারা পৃথিবীর লেখক ও শিল্পীদের মধ্যে প্রগতিশীল সংহতি গড়ে উঠছিল। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি, সেই সূত্রে, লেখক-শিল্পী এবং বিদ্রোহী কৃষক-মজুরদের মধ্যে সংযোগ গড়ে তুলতে আন্তরিক আগ্রহ দেখিয়েছিল। শিল্পীদের এই প্রগতিশীল বিবেকায়নের প্রক্রিয়ার উৎস খুঁজে পাওয়া যাবে বিশের দশকের জর্মানিতে, গেঅর্গ গ্রোস্‌ৎস্-এর লেখায়:

‘তোমার ছবিতে বিষয়বস্তু যোগাতে কী করবে?

‘কোনো সর্বহারাদের সভায় যাও। দেখ এবং শোনো সেখানে তোমারই মতো সব মানুষ, নিজেদের ভাগ্যের সামান্য উন্নতির জন্য কীভাবে আলোচনা করে।

‘বুঝতে চেষ্টা করো- এই জনগণই হল সেই মানুষ যারা জগৎটাকে নতুন করে গড়ছে। সে কিন্তু তুমি নও! কিন্তু তুমি এদের সঙ্গে কাজ করতে পারো। চাইলে তুমি এদের সাহায্যও করতে পারো। এইভাবেই তুমি তোমার শিল্পকাজে মজুরদের বিপ্লবী চেতনায় পুষ্ট বিষয়বস্তু আনাটা শিখতে পারো।’ ('On My Next Paintings', reproduced in Dore Ashton ed. Twentieth Century Artists on Art, New York 1985, p. 64)

তেভাগার অভিজ্ঞতা নিয়ে সোমনাথ হোরের লেখায় এবং আঁকায় এই একই মানসিকতার প্রকাশ। তিনি আন্দোলনটি নথিভুক্ত করছেন, অবচ্ছিন্ন বা বিকৃত না করে। তাঁর বয়ানে তিনি কৃষক আন্দোলনের খুব তাৎপর্যময় দিক ধরে দিয়েছেন যা অন্যরাও লক্ষ করেছিলেন। সুনীল সেন স্টেটসম্যান পত্রিকার এক বিশেষ প্রতিবেদকের লেখা উদ্ধৃত করেছেন যিনি সোমনাথ হোরের মতোই লাঠির শক্তি এবং আত্মপ্রত্যয় দেখেছিলেন:

‘অতীতে বহু শতাব্দী ধরে যে মুক, আজ সে স্লোগানে মুখর এবং রূপান্তরিত। দেখে উদ্দীপনা জাগে, সে তার সহযোগীদের সঙ্গে মাঠ পেরিয়ে চলেছে, প্রত্যেকের কাঁধে রাইফেলের মতো করে ধরা লাঠি, মিছিলের মাথায় লাল ঝান্ডা। বাঁশবনের নির্জনে শক্তমুঠি বাঁ-হাত কপালে তুলে পরস্পরকে তারা নিচুস্বরে স্বাগত জানায় ইনক্লাব কমরেড, শুনে ভয় করে।

‘লাঠি বহন করা বাধ্যতামূলক- এ তো স্পষ্ট। আদিবাসীদের মতো দেখতে একজন কৃষক আমাকে বলেছিল, পার্টির নির্দেশ আমাদের লাল ঝান্ডা আর লাঠি বহন করতে হবে। এ আমাদের সংহতির নিদর্শন। একজন শহরবাসী কৃষক দরদি বলছিলেন, পুরুষানুক্রমে যারা দলিত লাঠি তাদের সাহস যোগায়। (Sen, Agrarian Struggle in Bengal, p. 38)

ছবিতে ঘনমান আনতে, মুখে ব্যক্তিত্বের প্রকাশ ঘটাতে সোমনাথ রেখাকে ব্যবহার করেন আলোকচিত্রবৎ নৈর্ব্যক্তিকতায়। সমসাময়িক অন্য শিল্পী, চিত্তপ্রসাদ (১৯১৩-৭৮) ও দেবব্রত মুখোপাধ্যায়ের (১৯১৮-?) তেভাগার ছবিতে শৈলীসচেতনতার নজির আছে।

সংগ্রামী চাষিদের শক্তি বোঝাতে চিত্তপ্রসাদ ভর ও ভার ব্যবহার করেছেন, অন্যপক্ষে দেবব্রত মুখোপাধ্যায় একই উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেছেন তরঙ্গিত রেখার ছন্দ। এরা এঁদের চিত্রকল্প অর্থময়তায় ভরে তোলেন। অনুদ্‌বেজিত বস্তুনিষ্ঠা, সাক্ষাৎ বাস্তব অভিজ্ঞতায় পাওয়া সত্যে অবিচল দায়বদ্ধতা নিয়ে সোমনাথ হোরের অবস্থান ছিল ভিন্ন। তেভাগার বিষয় নিয়ে বছর ছয়েক পরের কাজে প্রকাশ পেয়েছে তাঁর পৃথক দৃষ্টিভঙ্গি। কারণ, ততদিনে ওই আন্দোলন সম্পর্কে স্পষ্টতর ঐতিহাসিক ধারণা তৈরি হয়ে গেছে, রাজনৈতিকভাবেও বিষয়টি হয়ে উঠেছে দূরের। আর শান্তিনিকেতনে বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়ের সান্নিধ্যে তাঁর শিল্পদৃষ্টিতেও পরিবর্তন এসেছে।

১৯৪৬ থেকে ৫০-এর প্রথম দিক পর্যন্ত যে সময়ে তিনি এই বইয়ে (Tebhaga/An Artist's Diary and Sketchbook 1990) ছাপা কাঠখোদাইয়ের কাজগুলি করেছেন, সে সময়ে বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাস ধারাবাহিক বিপর্যয়ের ভেতর দিয়ে গেছে। সোমনাথ হোরের কমিউনিস্ট পার্টি, শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরে নেহরুর কংগ্রেসের পাশেই থেকেছে। তার কিছু পরেই পার্টি নতুন সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করল, বে-আইনি ঘোষিত হল, নির্মম রাষ্ট্রীয় নিষ্পেষণের শিকার হল। বাধ্য হল আত্মগোপন করতে। ১৯৫১-য় প্রথম সাধারণ নির্বাচনের আগে সংসদীয় বিরোধী দল হিশেবে কমিউনিস্ট পার্টির আত্মপ্রকাশ ঘটে। এই সময়টায় কৃষক-মজুর এমনকী মধ্যবিত্তদের উপরেও গুলি চলেছে, গুলি চলেছে জেলের মধ্যে যেখানে হাজার হাজার মানুষ বিনাবিচারে বন্দি ছিল। সোমনাথ নিজেও আন্ডারগ্রাউন্ডে যান। পার্টি চল্লিশের দশকের শেষ দিকের সংগ্রামী পন্থা ছেড়ে আইনসিদ্ধ রাজনীতির পথ ধরায় যাঁরা পার্টির সদস্য পদ ছেড়ে দেন, সোমনাথ তাঁদের অন্যতম। গণ-আন্দোলন পর্বে উদ্দীপনা জাগানো প্রচারমূলক ছবির জন্য সমাদৃত যে চিত্তপ্রসাদের কাজ নিয়মিত পার্টির পত্রিকায় প্রকাশিত হত, তিনিও নিজেকে এক অদ্ভুত বিবিক্ত নিঃসঙ্গতায় সরিয়ে নিলেন এবং তাঁর ছবির সেই বিশালত্বের অভিব্যক্তি এবং সুস্পষ্ট দিঘল চোখ- সে সব যেন ফিরে গেল এর আদি উৎস স্নিগ্ধ অলংকরণময় পট-এর শৈলীতে। তিনজনের মধ্যে সবচেয়ে বাউন্ডুলে আর অহংবাদী দেবব্রত মুখোপাধ্যায় কিন্তু পার্টির রাজনীতির ধার ধারেননি। সাম্যবাদে পৌঁছবার চরম লক্ষ্যে দায়বদ্ধ থেকেছেন এবং নির্দ্বিধায় সেই আদর্শের অভিমুখে কাজের ধারায় তাঁর ছন্দোময় রেখাশৈলী আরও স্বচ্ছন্দ ও সাবলীল করে তুলেছেন।

পার্টিকর্মী হওয়ায় সোমনাথ হোরকে ১৯৪৯-এ আর্ট স্কুল ছেড়ে আন্ডারগ্রাউন্ডে যেতে হয়েছিল। বেরিয়ে এসে তিনি নতুন করে শিল্প প্রেরণার আকাঙ্ক্ষায় বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে দেখা করেন। বিনোদবিহারী ছবিতে চিত্র-ক্ষেত্রের, চিত্রল স্পেসের অশেষ গুরুত্ব সম্পর্কে তাঁকে অবহিত করেন এবং বলেন, এই স্পেস কখনও বাস্তব প্রাকৃত-ক্ষেত্রের (স্পেস) প্রতিরূপ হিশেবে ব্যবহার করা যায় না। বিনোদবিহারীর এইটুকুমাত্র উপদেশ সোমনাথের কাজে ভবিষ্যৎ বিকাশের বীজ স্বরূপ প্রমাণিত হয়েছিল (Pranabranjan Roy, Somnath Hore, New Delhi, n.d., p.4)

স্পেস এবং কাজের উপকরণ সম্পর্কে অনেক বেশি আগ্রহ নিয়ে সোমনাথ পঞ্চাশের গোড়ায় কাঠখোদাইয়ের কাজে আবার সেই তেভাগার অভিজ্ঞতায় ফিরলেন। এবারের চিত্ররূপগুলিতে অনেক বেশি দূরকল্পতা এল। কাঠ নিয়ে কাজে কাগজে কালি দিয়ে আঁকার চেয়ে করণ-কৌশলে গভীরতর অনুধ্যান প্রয়োজন হয়। আর তাতেই যেন অভিজ্ঞতার আরো গভীরে অনুপ্রবেশের তাগিদ এসে যায়। এই বইয়ের ১৬ ও ৩০ পৃষ্ঠায় কাঠখোদাই ছবি দুটিই সেই অসমাপ্ত এবং পরিত্যক্ত আন্দোলনকে তাৎপর্যময় করে তুলছে। সাদা কালোর তীব্র বৈপরীত্যময় এই ছবিতে সাদা এক ধরনের দীপ্তি আনে, আলোয় প্রজ্জ্বলন্ত মুখ, যেন অন্ধকার থেকে কুঁদে তোলা। দুটিই সভার ছবি, ডায়েরিতে সেসব সভার আরো বাস্তব বিবরণ নথিভূক্ত করা হয়েছে। কিন্তু এবারে নৈশ সভার অভিজ্ঞতায় তিনি যোগ করেন চৈতন্যোদয় ও বিশ্বাসের সেই দ্যুতি তিনি ১৯৪৬-এ তাঁর গ্রাম পরিক্রমায় প্রত্যক্ষ করেছিলেন। চিত্তপ্রসাদ যেমন এক বিশ্বাসভঙ্গের বোধ নিয়ে সব কিছু থেকে সরে গিয়েছিলেন, সোমনাথ সে পথে গেলেন না। মানুষের প্রতি মানুষের অমানবিক আচরণে, ক্ষমতাবানের নির্মম কষাঘাতে দীর্ণ, বিধ্বস্ত যে মানবসমাজ কোনো নব সংঘসংহতির আশামাত্র লালন করে না, তারাই হয়ে ওঠে সেই বাস্তব যা সোমনাথ সিদ্ধ করে উন্মোচিত করতে অটল সংকল্পে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। নিজের কাজে সোমনাথ উপকরণের দুরূহতা আরোপ করলেন যার মধ্যে ঢুকতে হয় ভেঙেচুরে (যেমন তাঁর প্রথম পর্বের 'ক্ষত' এর কাজে নিলেন কাঠ, তারপরে কাগজের মণ্ড, কিংবা ছাঁচ-নির্মাণ, যেমন, ব্রোঞ্জের কাজে যা এখন নতুন পর্যায়ের 'ক্ষত'-এর উপকরণ)। তাঁর 'ক্ষত'-এর কাজে জের রয়েছে সেই তেভাগা আন্দোলনের, যা অতীতে বিলীন হয়ে স্মৃতির বস্তু হয়ে গেছে, শুধু রেখে গেছে এক বিরাট ক্ষতচিহ্ন। সে ক্ষতের সৃষ্টি এক বিশ্বাসভঙ্গে, শুধু রাজনৈতিক নয়, গভীরতম অর্থেনৈতিক বিশ্বাসহননে। গ্রামজীবনে মানুষের হঠাৎ উদ্‌বেলিত ক্ষমতার এবং চরিতার্থতার বোধে উজ্জ্বল রেখাচিত্রের সময় থেকে সোমনাথ অনেক দূরে সরে এসেছেন। সেই অভিজ্ঞতারই হতাশাময় পরিণতি, যা চিরতরে হারিয়েই গেছে, তাকে রূপায়িত করছেন কাঠখোদাই ছবিতে, সাদা কাগজের মণ্ডের উপরে ছুরি বা কোনো ধাতব বস্তুর আঘাতে হাঁ-মুখ ক্ষতের যাতনা এবং ভয়ালতায়। 

সোমনাথ হোর প্রথম যখন আমাকে তেভাগার ডায়েরিটি দেখান, আমি এটি বই করে ছাপার প্রস্তাব করি। তেভাগার এই স্কেচগুলি সম্পর্কে তাঁর 'দুর্বলতা' আমি অনুভব করতে পেরেছিলাম। 'এক্ষণ' পত্রিকায় প্রকাশের সময়ে তাঁর মন্তব্যে নিজেও এই 'দুর্বলতার' কথা বলেছেন। 'দুর্বলতা' কথাটা এ প্রসঙ্গে অনেককিছু বোঝায়। কারণ সংবেদনশীল কোনো শিল্পী যখন বেদনায় দুঃখে, অসহায়ভাবে দুর্গত মানুষের জন্য সংগ্রাম থেকে সরে আসেন, সে তো অন্তরে দুর্বলতার বোধ বহন করেই।

এই লেখাটা আমি লিখছি যখন বইটি প্রায় তৈরি হয়ে এসেছে, বইটি গড়ে তোলায় যুক্ত থাকতে পারার জন্য আমি গর্বই বোধ করছি, ডায়েরিটি মূল স্কেচ এবং পরের কাজ- কাঠখোদাই ছবি- যা সেই মূল স্কেচ থেকেই সৃষ্টি হয়েছে, সেসব নিয়ে অনূদিত হয়ে প্রকাশিত হচ্ছে। দেবব্রত মুখোপাধ্যায় যিনি এখনও একজন কমিউনিস্ট শিল্পী বলে গর্ব বোধ করেন এবং তেভাগার অভিজ্ঞতা লালন করেন, তিনি অনুগ্রহ করে তাঁর তেভাগার কাজ আমাকে দেখতে দিয়েছেন যা এখানে ছাপা হল, চিত্তপ্রসাদের ভাগিনেয় স্মরণ ঘোষাল যিনি একজন শিল্প অনুরাগী মানুষ, আমাদের চিত্তপ্রসাদের কাজ দেখতে দিয়েছেন। এঁদের দুজনকে ধন্যবাদ জানিয়ে এ লেখা শেষ করি।

[সীগাল বুক্স্-এর পক্ষ থেকে প্রথম যখন বইটি প্রকাশ করতে চাই, সোমনাথ-দা রাজি হননি; বলেছিলেন, 'তোমরা তো ভালো করে ছেপে দামি বই করবে। আমার মনে হবে, আমি যেন আমার তেভাগার সহযোগী কৃষক বিদ্রোহীদের অভিজ্ঞতা বেচে দিলাম। সে আমি পারব না।' এক্ষণ-এ যখন তেভাগার ডায়েরি প্রকাশিত হল, তাঁর অসামান্য ছবিগুলির অযত্ন মুদ্রণে আহত হয়েই তিনি আবার স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে প্রস্তাব করলেন, 'এবার তো সাধারণ পাঠকেরা বইটা পেয়েই গেছেন। এবার ছবিগুলোর একটা গতি হোক।' তখনই সীগাল থেকে ইংরেজি অনুবাদের আয়োজন। তারই ভূমিকার এই বাংলা অনুবাদটি আমি সামান্য সংস্কার করে দিলাম- শমীক বন্দ্যোপাধ্যায় গত রবিবার ১৩ এপ্রিল ছিল সোমনাথ হোরের জন্মদিন।]

সূত্র- বঙ্গদর্শন, সোমনাথ হোড় স্মরণ-সমীক্ষণ সংখ্যা, ১৪ জুলাই, ২০১১, নৈহাটি।


প্রকাশের তারিখ: ১৪-এপ্রিল-২০২৫

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org