|
সোভিয়েত সংস্কৃতির মালিককন্সটান্টাইন ফেদিন |
|
প্রায়ই এটা শুনতে এবং পড়তে হয় যে বিদেশী অতিথিরা আমাদের এখানে এসে দেশের উন্নতিতে স্তম্ভিত হয়ে যায়। কিন্তু কোন্ বিষয়টি তাদের সব থেকে বেশি স্তম্ভিত করে? ইস্নাইয়া পলিয়ানায় তলস্তয়ের খামার বাড়ির প্রবেশদ্বারের সেই পরিচিত মিনারগুলির সামনে বিদেশী পর্যটকদের নিয়ে আসা মোটরগাড়িগুলি এক-এক করে দাঁড়ায়। অতিথিরা সাদামাটা ঐ বাড়িটা ঘুরে ঘুরে দেখে। এই বাড়িতেই লেভ তলস্তয় তাঁর জীবনের অধিকাংশ সময় অতিবাহিত করেছেন। এখানেই তিনি রচনা করেছেন উপন্যাস “যুদ্ধ ও শান্তি” এবং চিরভাস্বর অন্যান্য রচনাবলী এবং এখান থেকেই এই শিল্প সৃষ্টির উজ্জ্বল বিকিরণ প্রজ্বলিত হয়ে সারা দুনিয়া ছড়িয়ে পড়েছে। বহু প্রাচীন জঙ্গলে ভরা বাগানের মধ্যে দিয়ে অতিথিরা মহান লেখকের সমাধির কাছে যায়। এটা আসলে কোনরকম সাজসজ্জা এবং চিহ্নবিহীন শান্ত, সাদাসিধে মাটির দৃঢ় একটা ঢিবি। অতিথিরা ফার গাছের নিচের বেঞ্চগুলিতে বিশ্রাম নেয়। যে পায়েচলা পথগুলি দিয়ে তলস্তয় বেড়াতে ভালবাসতেন সেগুলি পাইন গাছের সারির মধ্যে দিয়ে ঐ বসার জায়গাগুলির দিকে চলে গেছে। বলার কিছুই নেই, হয়তো কেবলমাত্র “যুদ্ধ ও শান্তি" উপন্যাসের মাধ্যমে এবং বিদেশী ভাষায় অনুবাদের মাধ্যমে তলস্তয়কে জেনেছে এমন লোককেও এই স্মরণীয় স্থান উদ্বেলিত করতে পারে। কিন্তু মহান ব্যক্তিদের স্মৃতি বিজড়িত স্থানসমূহ বিদেশীদের মাতৃভূমিতে তো আছে, যা আমাদের এখান থেকে অনেক দূরে অবস্থিত। ওখানে অত্যন্ত যত্নসহকারে, ঘর-বাড়ি, বাগান, আসবাবপত্র, ছবি, কাগজের স্তূপ সংরক্ষিত করা হয়— বিভিন্ন সময়ে ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপেও যেগুলি অক্ষত রয়ে গেছে এবং এগুলি তাঁদের কথা মনে করিয়ে দেয় যাঁরা নিজেদের প্রতিভা এবং স্বয়ং নিজেদেরকে মানবজাতির কাছে উৎসর্গ করে গেছেন। তথাপি ইস্নাইয়া পলিয়ালায় ভ্রমণরত বিদেশী পর্যটক বলে, “কখনো কল্পনাই করতে পারিনি যে, কোন একটা মিউজিয়ম মানুষকে এতো উদ্বেলিত, আলোড়িত করতে পারে। জীবনভর এই অভিজ্ঞতা মনে থাকবে"। কিন্তু কি সেই অভিজ্ঞতা? সোভিয়েত ভূমির অভ্যন্তরে অবস্থিত স্মরণীয় এই খামার বাড়ি জুড়ে অগুন্তি মানুষের জনস্রোত বিদেশী অতিথির চোখে এবং অনুভূমিতে বলতে গেলে অশ্রুতপূর্ব, অভূতপূর্ব। হাজারে হাজারে পুরুষ-মহিলা, ছেলে-বুড়োর দল বাড়িগুলি, প্রত্যেকটা ঘর, পার্কের প্রত্যেকটা রাস্তা পরিপূর্ণ করে রেখেছে। জানা শোনা আর স্মরণ করার এতো তীব্র আকাঙ্ক্ষা আর কোথায় দেখতে পাবে। ছাত্র, শিক্ষক, যৌথ খামারি, স্কুলের বাচ্চাদের দঙ্গল, সৈন্য আর নাবিক- কাকে না দেখতে পাবে তলস্তয়ের জন্মভূমিতে দর্শনার্থে আগত নিয়মিত, রোজগার এই জনসমাগমে। আমাদের জীবন সম্পর্কে, আমাদের সোভিয়েত জীবনযাত্রা সম্পর্কে অনভিজ্ঞ দূরদেশ থেকে আগত বিদেশীকে সর্বাগ্রে এবং সর্বোপরি বিস্মিত করে এই জনগণই। নিজের সংস্কৃতির প্রতি জনগণের এই যে সার্বজনীন আকর্ষণ তা কোথা থেকে এলো, কিভাবে জন্মালো, কিভাবে উন্নত এবং শক্তিশালী হলো ? জনগণের হৃদয়ের অন্তর্নিহিত জগৎটা কেমন? গতবছর আমি লন্ডনে হল্যাণ্ডের চিত্রকলার দারুণ এক প্রদর্শনীতে উপস্থিত ছিলাম। ইংল্যান্ডের রাজধানীর কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত রাজকীয় শিল্পকলা আকাদেমির এগারোটা হল জুড়ে সংগৃহীত হয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন প্রাস্ত থেকে প্রায় ৬৫০টি প্রথম শ্রেণীর চিত্র, যেগুলি হল্যাণ্ডের তিনশ বছর কালপর্বের (১৪৫০-১৭৫০) ১৭৮ জন বিশিষ্ট শিল্পীর রচনা। প্রদর্শনীটির ঐশ্বর্যশীলতা সম্পর্কে বিচার করতে গিয়ে এটুকু বললেই যথেষ্ট, যে ওতে রেমব্রান্তের ৪৯টি ক্যানভাস, ফ্রান্স হালের ২৬টি, রিয়োসদালের ১২টি এবং অন্যান্য শিল্পীদের আরও কিছু চিত্র প্রদর্শিত হয়েছে, যাদের নাম বিশ্ব চিত্রকলার জগতকে গৌরবান্বিত সেটা ছিল প্রদর্শনী খোলার ঠিক পরে পরেই, বেলা ১টার সময়, ছবি দেখার সব থেকে উপযুক্ত সময়, প্রত্যক্ষ করলাম, যে আকাদেমির অর্ধেকের বেশী হল পুরোপুরি লোকশূন্য, আর বাকীগুলোয় দু-তিনজন করে লোক হাতে ক্যাটালগ নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। একথা অবশ্যই আমি বলবো, যে আমাকে, একজন সোভিয়েত নাগরিককে এবং একজন সংস্কৃতি কর্মীকে এরকম একটা বিষয়ের প্রতি, যাকে সভ্যতার গর্ব ছাড়া অন্য কোন নামে অভিহিত করা যেতে পারে না, লণ্ডনবাসীদের এই ধরনের উন্নাসিকতা সত্যিকারের বিস্মিত করেছে। অথচ এই সভ্যতাকে নিয়েই তার আধুনিক পশ্চিমী পূজারীদের কত ভক্তি আর রক্ষণশীলতা (কার হাত থেকে?)। সোভিয়েত ইউনিয়নে বিদেশীদের যেটা অবাক করে তা হলো সংস্কৃতির সমস্ত সম্পদকে জনগণের কাছে হস্তান্তরিত করার ঐতিহাসিক বাস্তবতা। জনতার এই স্রোতধারা কেবলমাত্র ইস্নাইয়া পলিয়ানাতেই যে দেখা যায় তা তো নয়। ত্রেচ্চিয়াকফ গ্যালারির জাতীয় সংগ্রহের সামনে হাজার হাজার মানুষের সারি আমরা দেখে থাকি এবং আমরা বহুদিন ধরে সেই মূহুর্তটির অপেক্ষায় আছি, যখন সেই প্রাসাদটি গড়ে তোলা যাবে, যা স্থানসংকুলান করে দিতে সক্ষম হবে কি গ্যালারির সমস্ত চমৎকার সম্পদশালী উপকরণকে, কি এগুলি দর্শনে আগত লক্ষ লক্ষ দর্শনার্থীকে। আর লেনিনগ্রাদের এরমিতাশে এবং তৎসংলগ্ন শীত প্রাসাদের বিলাস বহুল হলগুলিতে কি ঘটে? চালু দিনগুলিতে এবং উৎসবে এগুলি ধীরে অগ্রসরমান সেই সব মানুষের সারি দ্বারা পরিপূর্ণ হয়ে যায়, যারা বিখ্যাত সেই সমস্ত শিল্পীদেরই কাজ দেখতে এসেছে, নিজেদের দেশে যাদের কাজ দর্শকেরা যেন জোর করে অনিচ্ছায় দেখতে আসে। কিয়েভে ইউক্রেনীয় চিত্র শিল্পীদের চমৎকার সংগ্রহই হোক, কিংবা সারাতভে রুশ প্রদেশের সবথেকে প্রাচীন রাদিশেভস্তি মিউজিয়মই হোক, অথবা যে কোন আঞ্চলিক শহরে যে কোন নবীন মিউজিয়মেই হোক— কোথায় না. স্বয়ং শিল্পকলার মতোই, সোভিয়েত জনগণের সাংস্কৃতিক জীবন, শিল্পজীবন বর্ণময়তায় উত্তাল হয়নি, উপচে পড়েনি। শিল্পের প্রতি, সাহিত্যের প্রতি, রুশ ও বহুজাতিক ইতিহাসের অতীতের প্রতি, বর্তমান কালের সৃষ্টিশীল কাজের সমস্ত ক্ষেত্রের প্রতি আমাদের জনগণের এই গণ আগ্রহের অবশ্যই একমাত্র কারণ – মহান অক্টোবর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব আমাদের জনগণকে সংস্কৃতির পুরো মালিক বানিয়েছে। সাক্ষরতা এবং শিক্ষার অধিকার জনগণ যে কেবলমাত্র আইনী অধিকার হিসাবেই পেয়েছে তাই নয়, বরং বাস্তব ক্ষেত্রে জনগণ কর্তৃক এই অধিকারগুলি অর্জিত হয়েছে। জনগণ এই অধিকারগুলি ভোগ করে এবং সেইজন্য সংস্কৃতির কল্যাণে এগুলি সত্যিকারের প্রয়োগ করতে সক্ষম হয়। মূল্যবান ব্যাপারটা হলো এই যে, ইস্নাইয়া পলিয়ানার দর্শনার্থীদের মধ্যে আদৌ এমন কোন লোক খুঁজে পাওয়া যাবে না, যে কিনা তলস্তয় সম্পর্কে কিছু না কিছু পড়েনি। স্কুলের একটা বাচ্চা- সেও ইতিমধ্যে তলস্তয়ের রূপকথাগুলো জেনে গেছে। স্কুলের প্রথম শ্রেণীতে ভর্তির আগেই সে এগুলো বাড়িতে পড়ে ফেলেছে বা তাকে পড়ে শোনানো হয়েছে। এবং এটা নিশ্চিত করে বলা যেতে পারে যে ত্রেচ্চিয়াকফের সামনে (ত্রেচ্চিয়াকফ গ্যালারিকে চলতি কথায় এরকম বলা হয়) মানুষের সারিতে এমন কোন লোক নেই যে রেপিন আর সুধিকভকে জানেইনা, -তা সে ডাকটিকিটের মাধ্যমেই জানুক বা ছবির জানুক, কিংবা যে হলগুলিতে ঢোকার জন্যে সে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে তাদের জনপ্রিয়তার কারণ সম্পর্কে যে কিছুই শোনেনি— এমন লোক সত্যিই বিরল। আমি শুরু করেছি আমাদের সংস্কৃতির স্মারকগুলির প্রতি অন্যের অর্থাৎ কোন বিদেশীর আগ্রহের উদাহরণ দিয়ে। এটা এজন্যে করেছি, যে একজন বিদেশীর চোখ এই সব ব্যাপার সমূহ নিখুঁতভাবে আলাদা করে দেখতে পারে, যে ব্যাপার সমূহ পুরানো জগতে প্রতিষ্ঠিত জীবনযাত্রার পক্ষে, যুগ যুগ ধরে সঞ্চিত ব্যবস্থার পক্ষে পুরোপুরি অসাধারণ। এই যে অন্য চোখ, অতিথির চোখ, প্রায়শঃ পুরোপুরি অনিচ্ছাকৃতভাবে আমাদের জীবনের সেই সব মূল বিষয়কে নজরে আনে, যা পরে তাকে সর্বাপেক্ষা অধিক মুগ্ধও করে। সমগ্র জনগণের কাছে সংস্কৃতির অধীনস্থ হওয়ার এই যে ঘটনা তা সোভিয়েত ইউনিয়নের অতিথির কাছে সারা জীবন এক বিরল অভিজ্ঞতা হয়ে থাকবে। আর এই বাস্তব ঘটনার মধ্যেই নিহিত। আমাদের সবকিছু সততা। অক্টোবর বিপ্লব খাতায়-কলমে জনগণকে প্রাসাদসমূহ হস্তান্তর করেনি, সাজানো গোছানো বাগাড়ম্বরপূর্ণ উদ্দেশ্যের জন্য নতুন সমাজ ব্যবস্থাকে গণতান্ত্রিক বলে নামকরণ করেনি; না মোটেই। তাই নয়! সবকিছু যার জন্য আমাদের দেশ গর্বিত এবং সমৃদ্ধ— পৃথিবীর উদর থেকে কলকারখানা থেকে শুরু করে বিজ্ঞান এবং শিল্প জগতের লোকজন পর্যন্ত — এই সবকিছুই একমাত্র মালিকের অধীন, সে হলো জনগণ। আর জনগণ এরজন্য কমিউনিস্ট পার্টি, রাষ্ট্র এবং অক্টোবর বিপ্লব দ্বারা সৃষ্ট সোভিয়েত সমূহকে ধন্যবাদ জানায়। প্রকাশের তারিখ: ০৮-নভেম্বর-২০২২ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |