শ্রীলঙ্কা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক যুবনীতি (শেষ পর্ব)

অশোক ভট্টাচার্য
একবিংশ শতাব্দীতে যে নগরায়ণ হচ্ছে তা উৎপাদনভিত্তিক শিল্পকে কেন্দ্র করে নয়। বরং তা পরিষেবাভিত্তিক। এই নগরায়ণ যত মানুষের রোজগারের ব্যবস্থা করতে পারে, প্রয়োজন তার থেকে অনেক অনেক বেশি। একবিংশ শতাব্দীর শিল্পায়ন বা নগরায়ন লক্ষ লক্ষ বেকারের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে না। দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার সমস্ত শহরগুলিতে একটি বড় অংশের বাসিন্দার বয়স ১৫ থেকে ২৪ বছর। শ্রীলঙ্কায় এই হার ১৯ শতাংশ, নেপালে জনসংখ্যার ২১ শতাংশ, বাংলাদেশে ৪০ শতাংশ। শ্রীলঙ্কার মোট শহুরে জনসংখ্যার ৫৫ শতাংশ বসবাস করে কলম্বো শহরে। বাংলাদেশের প্রায় ৩৩ শতাংশ শহুরে মানুষ বসবাস করে ঢাকায়, নেপালের শহুরে জনসংখ্যার ৪০ শতাংশ মানুষ বসবাস করে কাঠমাণ্ডু শহরে। এই অংশের ছাত্র-যুবদের প্রতিবাদ খুব সহজেই জাতীয় পর্যায়ে প্রতিধ্বনিত হয়।

প্রথম পর্বের পর... 

আজ শুধু দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশ মাত্র নয়, গত কয়েক বছরে লক্ষ লক্ষ ছাত্র-যুব বিক্ষোভে উত্তাল হয়েছে। তারা একীভূত হয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছে বা আজও প্রতিবাদ জানিয়ে যাচ্ছে শুধু শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ বা নেপালে নয়, প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছে কেনিয়া, হংকং, ইন্দোনেশিয়া, এমনকী আজ লাদাখে, আফ্রিকার মাদাগাস্কারে, মরক্কো বা দক্ষিণ আমেরিকার পেরুতে। তারা সোচ্চার হয়েছে অভয়ার ন্যায় বিচারের দাবিতে কলকাতায়। মাত্র ৪৮ ঘন্টার মধ্যে জেনারেশন জি (জেড) নেপালের সরকারের পতন ঘটিয়ে দিতে পেরেছে। বাংলাদেশেও একই পথে গেছে ছাত্ররা। শ্রীলঙ্কায় কিছুটা ব্যতিক্রমীভাবে নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন হয়েছে। তার আগে রাষ্ট্রপতিকে দেশছাড়া হতে বাধ্য করা হয়েছে। তা করেছে ছাত্র-যুবরা। বহু সমাজ বিজ্ঞানী বা সমাজ বিশেষজ্ঞ বলছেন, বেকারত্বই তরুণ সমাজের ক্ষোভের বড় কারণ। এর সাথে রয়েছে দুর্নীতি, অপশাসন, বৈষম্য। প্রাপ্ত বয়স্কদের তুলনায় তরুণ প্রজন্মই সহিংস ও অস্থিতিশীল কার্যকলাপের দিকে বেশি ভাবে আকৃষ্ট হয়ে পড়ছে। এই সংখ্যা ক্রমেই দ্রুত গতিতে বাড়ছে। তুলনায় কমছে প্রবীণ মানুষের সংখ্যা। অনুমান করা হচ্ছে ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী শহুরে যুব জনসংখ্যার ৬০ শতাংশের বয়স হবে ১৮ বছরের নিচে। শহর এলাকায় যুবদের একীভূত করতে না পারা গেলে সামাজিক সংহতি ও স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কর্মসংস্থানের সুযোগের অভাব কেবল একটি সামাজিক চ্যালেঞ্জ নয়, এটি একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা উদ্বেগের একটি। একবিংশ শতাব্দীকে বলা হয় নগরায়নের শতাব্দী। এই নগরায়ণ উন্নত বিশ্ব বা উত্তর গোলার্ধের নয়। তা উন্নয়নশীল বা দক্ষিণ গোলার্ধের দেশগুলিকে কেন্দ্র করে। ঊনবিংশ বা বিংশ শতাব্দীর নগরায়নকে মার্কস-এঙ্গেলস বলেছিলেন গ্রামীণ নির্বুদ্ধিতার অবসান এবং আলোকায়ন। গ্রাম থেকে উদ্বৃত্ত কৃষক বা কৃষিকর্মীরা শহরে আসত উৎপাদনভিত্তিক শিল্পে কর্মসংস্থানের আশায়। অনেক ক্ষেত্রে সেই কর্মসংস্থানের সুযোগ তারা পেতও। আজ তা কিন্তু হচ্ছে না। একবিংশ শতাব্দীতে যে নগরায়ণ হচ্ছে তা উৎপাদনভিত্তিক শিল্পকে কেন্দ্র করে নয়। বরং তা পরিষেবাভিত্তিক। এই নগরায়ণ যত মানুষের রোজগারের ব্যবস্থা করতে পারে, প্রয়োজন তার থেকে অনেক অনেক বেশি। একবিংশ শতাব্দীর শিল্পায়ন বা নগরায়ন লক্ষ লক্ষ বেকারের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে না। এর জন্যে দায়ী নব্য উদারীকরণের আর্থিক নীতি। উন্নয়নশীল দেশে ঘটছে দারিদ্রের নগরায়ণ। ২০০৬ সাল থেকে ২০১২ সালের মধ্যে শ্রীলঙ্কায় কর্মী সংখ্যা বেসরকারি ক্ষেত্রে যত ছিল, তার থেকে চারগুণ বেশি ছিল ক্যাজুয়াল বা দিন হাজিরার শ্রমিক। ৯২ শতাংশ ক্যাজুয়াল কর্মীই সে দেশে কাজ করেন বেসরকারি ক্ষেত্রে। শুধু শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ বা নেপাল নয়, শুধু দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলি নয়, ভারতসহ বহু উন্নয়নশীল দেশের প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ কর্মীই অনানুষ্ঠানিক। তাদের কাজের নেই কোনও নিরাপত্তা, নেই স্বাস্থ্য বিমা, অবসরকালীন সুযোগ সুবিধা। যারা অনানুষ্ঠানিক ক্ষেত্রে কাজ করে আর যারা স্থায়ী বেতনভুক্ কর্মী, তাদের বেতন বা মজুরির মধ্যে রয়েছে আকাশ পাতাল পার্থক্য। আজ এই সমস্ত অস্থায়ী বা ক্যাজুয়াল বা চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের নিযুক্ত করা হচ্ছে ঠিকাদারদের বা কোনও এজেন্সির মাধ্যমে। ফলে এক্ষেত্রে হায়ার এন্ড ফায়ারের সম্ভাবনা অনেক বেশি। বহু মানুষ পরিণত হচ্ছে পরিযায়ী শ্রমিকে। কাজ কতটা সম্মানজনক, কতটা অসম্মানজনক, আয়ের উৎস কতটা নৈতিক, কতটা অনৈতিক — এসব প্রশ্নে অনেকে যেতেই চাইছে না। তাদের রোজগার চাই। ভারতে বা পশ্চিমবঙ্গে যারা অনানুষ্ঠানিক ক্ষেত্রে বা আনুষ্ঠানিক ক্ষেত্রে বা চুক্তিভিত্তিক ক্যাজুয়াল বা সামান্য বেতনে কাজ করছে, তাদের মধ্যে ৯০ শতাংশই এই যুবছাত্ররা। যারা মধ্যবয়স্ক বা প্রবীণ তারাই সরকারি, রাষ্ট্রায়ত্ত বা বেসরকারি ক্ষেত্রে স্থায়ী বেতনের কাজ করছেন। এই চুক্তি বা ঠিকা বা অস্থায়ী কর্মীদের কাজ অসম্মানের। তাদের নেই মহার্ঘ ভাতা, কাজের নিরাপত্তা। নেই কোনও যৌথ দর কষাকষির ক্ষমতা। নেই ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকারও। বেতন বা মজুরি বৃদ্ধির দাবি করলে করা হয় চাকরি থেকে ছাটাই। অথচ এশিয়া মহাদেশের মধ্যে শ্রীলঙ্কাই ছিল এক সময়ে প্রথম দেশ যেখানে ট্রেড ইউনিয়ন গঠিত হয়েছিল। এসব কথা বলছিলেন শ্রীলঙ্কার বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী বালকৃষ্ণন স্কান্থা কুমার। শ্রীলঙ্কায় রয়েছে শক্তিশালী সোশাল সায়েনটিস্ট অ্যাসোসিয়েশন। তিনি আরও বলছিলেন,কর্মক্ষেত্রে এই বৈষম্য আজ দৃশ্যমান। এই বৈষম্য চলছে শিক্ষা ক্ষেত্রেও। উচ্চ শিক্ষার্থীদের জন্য বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নেই প্রয়োজনীয় সংখ্যক হস্টেল। তারা বাধ্য হয় পেয়িং গেস্ট হিসেবে থেকে পড়াশোনা করতে। অথচ এলিট পরিবারের ছেলেমেয়েদের পড়তে পাঠান হচ্ছে বিদেশে। তারা অনেকে বিদেশেই অনেক বেশি বেতনের চাকরি জুটিয়ে নিচ্ছে। বাকি যুবদের ক্ষোভ ও হতাশা বাড়ছে। এই সবই হলো ছাত্র-যুবদের মধ্যে ক্ষোভের আগুন সৃষ্টি হবার বড় কারণ। এক সময় শহরগুলিকে বলা হতো আর্থিক প্রবৃদ্ধির ইঞ্জিন। আজকের শহরগুলি পরিণত হচ্ছে প্রতিবাদের কেন্দ্রে। বড় বড় শহর বা নগরগুলি উচ্চ শিক্ষা বা কারিগরি, প্রযুক্তি, পেশা ভিত্তিক শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। আবার সমাজ মাধ্যমে যোগাযোগ ব্যবস্থা এই সমস্ত শহরগুলিতে অনেক উন্নত ও সহজ। তাকে কাজে লাগিয়েই ছাত্র-যুবরা নির্দিষ্ট একটি খোলামেলা স্থানকে বেছে নিচ্ছে তাদের প্রতিবাদের স্থান হিসেবে।



এই সমস্ত শহরগুলিতে বাসিন্দাদের একটি বড় অংশের বয়স ১৫ থেকে ২৪ বছর। শ্রীলঙ্কায় এই হার ১৯ শতাংশ, নেপালে জনসংখ্যার ২১ শতাংশ, বাংলাদেশে ৪০ শতাংশ। শ্রীলঙ্কার মোট শহুরে জনসংখ্যার ৫৫ শতাংশ বসবাস করে কলম্বো শহরে। বাংলাদেশের প্রায় ৩৩ শতাংশ শহুরে মানুষ বসবাস করে ঢাকায়, নেপালের শহুরে জনসংখ্যার ৪০ শতাংশ মানুষ বসবাস করে কাঠমাণ্ডু শহরে। এই অংশের ছাত্র-যুবদের প্রতিবাদ খুব সহজেই জাতীয় পর্যায়ে প্রতিধ্বনিত হয়। দেখা যাচ্ছে বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট ও অনিশ্চিত জীবিকার সংমিশ্রণ তরুণ প্রজন্মের ক্ষোভকে ইন্ধন জোগায়। দক্ষিণ এশিয়া বিশ্বের অন্যতম তরুণ অঞ্চল। এই সমস্ত দেশে নগরায়ণ দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। দ্রুত হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে তরুণ প্রজন্মের সংখ্যাও। ২০২২ থেকে ২০৪৭ সালের মধ্যে ভারতে যুবদের জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাবে আরও প্রায় ৩৩ কোটি। এর সাথে বর্তমানের ৪০ কোটি যোগ করলে সেই সময় তা মার্কিন যুক্ত রাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যার সমান হয়ে যাবে। ভারতে ২০২১ সালে ১৫-২৯ বছর বয়সী তরুণদের জনসংখ্যা ছিল ২৭.২ শতাংশ। এই জনসংখ্যার উল্লেখযোগ্য অংশ হবে নগরবাসী। বিশ্বে ভারতেই সব চাইতে বেশি সংখ্যক তরুণ বয়স্ক জনসংখ্যা বসবাস করে। যতগুলি অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমস্যা রয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার এই তিনটি দেশে, একই সমস্যাগুলি রয়েছে ভারতেও। একদিকে ভারতেও প্রসারিত হচ্ছে নগরায়ণ, বাড়ছে তরুণ বয়সীদের সংখ্যা। সরকার যদি অবিলম্বে তরুণদের আকাঙ্ক্ষা ও হতাশার প্রতি গুরুত্ব না দেয়, তাহলে ভারতেও হতে পারে দীর্ঘস্থায়ী অসেন্তাষের কেন্দ্র। প্রতিটি দেশে তরুণদের যুক্ত করতে হবে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ার সাথে। নগরগুলিকে সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে স্থিতিস্থাপক করতে হবে। বিশেষভাবে জোর দিতে হবে সবুজ শিল্প, ডিজিটাল অর্থনীতি ও সৃজনশীল ক্ষেত্রে তরুণদের প্রবেশের সুযোগ দেওয়ায়।  চাই যুব অন্তর্ভুক্তি-মূলক নগর নীতি। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে যুবদের সুযোগ দিতে হবে নেতৃত্বের পদের। বৈষম্য আজ কোনও আপ্ত বাক্য নয়। তা দৃশ্যমান সর্বত্র। ভারতসহ বিভিন্ন দেশের সরকার যদি যুব সমাজকে তাদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়া বা সিদ্ধান্ত গ্রহণে একীভূত না করে, তাহলে যে বহুল জনসংখ্যাকে এক সময় বলা হতো তাদের লভ্যাংশ, তা অচিরেই পরিণত হবে জনসংখ্যাগত বিপর্যয়ে। ভারত যে একদিন শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, নেপাল বা কেনিয়াতে পরিণত হবে না এই নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারবে না। শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, নেপালের তরুণ প্রজন্ম আওয়াজ তুলেছে — ফিরিয়ে দাও আমাদের লুটে নেওয়া ভবিষ্যৎকে। বেশিদিন নয়, শীঘ্রই একই আওয়াজ উঠবে ভারতেও। কলকাতার আর জি কর আন্দোলন ও লাদাখের ছাত্র-যুবদের আন্দোলন সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে।

📲 এখন এক ক্লিকেই মার্কসবাদী পথ আপনার হোয়াটস অ্যাপে

শ্রীলঙ্কায় আমার মাত্র কয়েকদিনে ভ্রমণ থেকে বেশ কিছু শিক্ষা লাভ হয়েছে। শ্রীলঙ্কা জাতিগত ভাবে একটি সভ্য দেশ। তারা যেভাবে শহরটিকে, বিভিন্ন বৌদ্ধ মন্দিরগুলিকে বা গণ শৌচালয়গুলিকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখে, রাস্তা পারাপারে অগ্রাধিকার পায় পথচারীরা,  তা অবশ্যই আমাদের কাছে শিক্ষণীয়। যে কদিন শ্রীলঙ্কায় ছিলাম, কাউকে রাস্তায় প্রকাশ্যে ধুমপান করতে দেখিনি। যার সাথেই কথা বলতে চেয়েছি, প্রত্যেকেই কথা বলেছে। প্রত্যেকের মধ্যে রয়েছে এক আত্মসম্মান ও মর্যাদাবোধ। মাত্র কয়েকমাস আগে একটি দেশের দুটি নির্বাচন হয়ে গেল। অথচ নব নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী কারোর কোনও প্রতিকৃতি বা কাট আউট দেখিনি রাস্তাঘাটে। এতবড় একটি অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে চলছে দেশটি অথচ রাস্তাঘাটে চলা ফেরা করতে গিয়ে তা এতটুকুও বুঝতে পরিনি। শাসক দল জে ভি পির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে গিয়েছি। যেখানে আমার আলোচনা ছিল পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও এন পি পি সরকারের বাণিজ্য, সমবায় ও খাদ্য নিরাপত্তা দপ্তরের মন্ত্রী কমরেড বসন্ত সমরসিংহের সাথে। পার্টি অফিসটি দেখে বোঝা যায় না এটি একটি সরকারি দলের পার্টি দপ্তর। একজন পুলিশকেও দেখিনি, দেখিনি কোনও জটলা। ওই মন্ত্রীর সাথে আমার আলোচনার মূল বিষয় ছিল নব গঠিত এনপিপি সরকারের কার্যকলাপ, কর্মসূচি ও নীতি ও তাদের কিছু রাজনৈতিক বিষয়ে জানা। যতগুলি প্রশ্ন করেছি প্রতিটি প্রশ্নের বিস্তারিত জবাব পেয়েছি। আলোচনা প্রসঙ্গেই তিনি জানালেন এন পি পি বা ন্যাশনাল পিপলস পাওয়ার তাদের সরকারের কিছু কর্মসূচি সম্পর্কে পুস্তিকা প্রকাশ করেছে। একটি অর্থনৈতিক নব জাগরণ সম্পর্কে, অন্যটি সমৃদ্ধ জাতি ও সুন্দর জীবন সম্পর্কে। তাতে তারা বলেছেন, এই পরিবর্তন কোনও শাসনতান্ত্রিক পরিবর্তন শুধু নয়, এই পরিবর্তন একটি ব্যবস্থাগত বা সিস্টেমিক পরিবর্তন। এই পরিবর্তন একটি ব্যাপকতর সামাজিক রূপান্তর। স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে শ্রীলঙ্কার সরকার বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশেষ করে বিভিন্ন পরিকাঠামো উন্নয়নে, মানবাধিকার উন্নয়ন ও সৃষ্টিশীল শিল্পে বেশ কিছু সাফল্য দেখিয়েছিল। পরবর্তীকালের সরকারগুলির ব্যাপক দুর্নীতি ও অপশাসন শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক ভিত্তিকে ধ্বংস করে দিয়েছে। এন পি পির লক্ষ্য দেশে একটি নবজাগরণ ঘটানো। নারীদের উন্নয়ন ঘটাতে তারা বিশেষভাবে উদ্যোগী হবে। কারণ দেশের ৫২ শতাংশ মানুষ মহিলা। মহিলারা পাবেন সমান অধিকার ও সম্মান, ৫০ শতাংশের বেশি মহিলাদের যে কোনও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত করা হবে। সংসদে ও স্থানীয় সরকারে ৫০ ভাগ আসন সংরক্ষিত থাকবে মহিলাদের জন্যে। দেশে সৃষ্টি করা হবে এক নৈতিক রাজনৈতিক পরিবেশ। দুর্নীতি নির্মূল করা হবে। সরকার বিশেষ কয়েকটি উচ্চশ্রেণির জন্যে হবে না। এন পি .পি সরকার হবে শ্রীলঙ্কার সমস্ত স্তরের মানুষের সরকার। তারা সমাজকে করবে সভ্য ও দায়িত্বশীল। এর জন্যে শিক্ষার মান উন্নয়নে সবচাইতে বেশি গুরুত্ব দেবে। দেশে থাকবে একটি সম্মিলিত পরিচিতি। জাতি, ধর্ম, ভাষা নির্বিশেষে সকলেই পাবে সমান অধিকার, সম্মান ও মর্যাদা। বসন্ত সমরসিংহের সাথে আলোচনা থেকে এ সব বিষয় জানা গেল। আরাগালায়া সিংহলি বৌদ্ধ থেকে হিন্দু তামিল, খৃষ্টান, হিন্দু-মুসলমান — সব ধর্ম, জাতি, উপজাতিদের একটা জায়গায় নিয়ে আসার কাজটা অনেকটা এগিয়ে দিয়েছে। বাকি কাজটা করবে এন পি পি সরকার। ন্যাশানাল পিপলস্ পাওয়ার বা এনপিপি হলো সমাজের বিভিন্ন অংশের মানুষের প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত একটি ব্যাপকতর মঞ্চ। যাদেরকে বলা যেতে পারে বৃত্তের বাইরের বা নন ট্র্যাডিশনাল। এটিও শিক্ষণীয়। অল্প কয়েকদিনের শ্রীলঙ্কা ভ্রমণ থেকে, যেমন একটি ব্যাপকতর মঞ্চ কেমন করে গঠন করে নির্বাচনে লড়াই করে জয় অর্জন সম্ভব হয়েছে ,তা যেমন বুঝতে পেরেছি, তেমনি বুঝেছি আরাগালায়া বা জনতার সংগ্রামকে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে বা দেশের রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ ও তাকে দেশছাড়া করবার ব্যাপকতর যে আন্দোলন চলছে তাতে অংশ গ্রহণ করছে সমাজের সব অংশের মানুষ। অথচ সেই আন্দোলনের নেতৃত্ব থেকে নিজেদের বাইরে রেখেছে সেই সময়ের মূল বিরোধী শক্তি জেভিপি বা এনপিপি। অবশ্যই এটা শিক্ষণীয়।


রাষ্ট্রপতি অনুরা কুমার দিশানায়কে

আরও শিক্ষণীয়, পরপর দুটো নির্বাচনে জয়লাভ করেও শাসক দলের নেতৃত্বের মধ্যে কোন ঔদ্ধত্য বা মাতব্বরির মনোভাব দেখতে পাইনি। বরং দেখেছি বা বুঝেছি তাদের বিনয়।

শ্রীলঙ্কা ভ্রমণ থেকে আমার আর একটি অনুভবও হয়েছে। তা হল, দক্ষিণ এশিয়ার তিনটি দেশ, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও নেপালের পরিবর্তন বা গণ অভ্যুত্থানকে একই ধারাতে মেলান উচিত নয়। কারণ শ্রীলঙ্কায় রাষ্ট্রপতিকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করানো হলেও সে দেশের শাসনতন্ত্রের পরিবর্তন হয়েছে গণতান্ত্রিক পথে, নির্বাচনের মাধ্যমে। তা হয়েছিল নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অবাধ ভাবে। সে দেশে হস্তক্ষেপ করতে হয় নি সেনাবাহিনীকে। এই কারণে শ্রীলঙ্কার জনতার সংগ্রামকে বলা হচ্ছে একটি নাগরিক অভ্যুত্থান, গণ অভ্যুত্থান নয়। গণ অভ্যুত্থান বলা হচ্ছে বাংলাদেশ ও নেপালের ক্ষেত্রে। দুটি দেশেই সেনাবাহিনীকে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে, শ্রীলঙ্কায় নয়। অন্যেরা সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর আস্থা রাখতে পারছে না। আস্থা রাখতে চাইছে রাজতন্ত্র ও মৌলবাদীদের ওপর। এখানেই শ্রীলঙ্কা ব্যতিক্রমী। শ্রীলঙ্কা ভ্রমণ থেকে এমনই অনেক কিছু জানতে পারলাম।


প্রকাশের তারিখ: ১২-ডিসেম্বর-২০২৫

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org