|
শ্রীলঙ্কায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বামপন্থীদের জয়অতুল চন্দ্র, বিজয় প্রসাদ |
২০২২ সালে শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বোকে ঝাঁকিয়ে দিয়েছিল আরাগালয়া (প্রতিবাদ) যার পরিণতিতে রাষ্ট্রপতির প্রাসাদ দখল হয়ে যায় এবং রাষ্ট্রপতি গোতাবায়া রাজাপক্ষেকে তড়িঘড়ি দেশ ছেড়ে পালাতে হয়। এই প্রতিবাদের কারণ ছিল দেশের-মানুষের অর্থনৈতিক সম্বলহীনতা; জ্বালানি, খাদ্য ও ওষুধের মতো নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের অভাব তাদের রাস্তায় নামতে বাধ্য করে। শ্রীলঙ্কা বৈদেশিক ঋণ মেটাতে ব্যর্থ হয়ে দেউলিয়া হয়ে যায়। প্রতিবাদী মানুষের আয়ের রাস্তা প্রশস্ত না-করে; নয়া-উদারবাদী ও পাশ্চাত্য ঘেঁষা বিক্রমসিংঘে রাষ্ট্রপতির পদ দখল করেন রাজাপক্ষের ৬ বছরের মেয়াদ সম্পূর্ণ করার জন্য। রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিক্রমসিংঘের অপদার্থ শাসনকাল ওই বিক্ষোভ ও প্রতিবাদের অন্তর্নিহিত কারণগুলির কোনও সমাধান করেনি। |
এক ক্লিকে ফলো করুন মার্কসবাদী পথের হোয়াটসঅ্যাপ দেশের নবম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দিশানায়েকের বিজয় একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। এবারই প্রথম দেশের মার্কসবাদী ধারার একটি দল রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জয়লাভ করল। ১৯৬৮ সালে জন্ম ‘একেডি’ নামে পরিচিত দিশানায়েকে কলম্বো থেকে অনেক দূরের উত্তর-মধ্য শ্রীলঙ্কার শ্রমিক পরিবারের সন্তান। শ্রীলঙ্কার ছাত্র আন্দোলনে নেতৃত্ব ও জেভিপি-র একজন কর্মী হিসেবে কর্মরত থাকার মধ্য দিয়ে তাঁর বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠেছে। বিশ্বের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী সিরিমাভো বন্দরনায়েকের কন্যা চন্দ্রিকা কুমারাতুঙ্গের ১৯৯৪ থেকে ২০০৫ অবধি রাষ্ট্রপতি থাকার সময়ে জেভিপি-র সাথে আঁতাত গড়ে উঠলে দিশানায়েকে সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। কুমারাতুঙ্গের মন্ত্রীসভায় দিশানায়েকে ছিলেন কৃষি, ভূমি এবং পশুসম্পদ দপ্তরের মন্ত্রী যে-পদে থাকার সুবাদে প্রশাসক হিসেবে নিজের যোগ্যতা প্রমাণের পাশাপাশি কৃষি-সংস্কার নিয়ে বিতর্কে জনগনকে শামিল করতে সমর্থ হন (রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর আবার এটি মুখ্য বিষয় হিসেবে বিবেচিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে)। ২০১৯ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তিনি আরেকবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিফল হয়েছিলেন, কিন্তু তার জন্যে দিশানায়েকে বা এনপিপি দমে যায়নি। আমাদের বিজয় সমাবেশের অঙ্গ হিসেবে গতকাল রিদিগামা সমাবেশে (১৭) যোগ দিলাম। দেশকে এক নতুন নবজাগরণ ও ‘সমৃদ্ধ দেশ, সুন্দর জীবন’ আদর্শের পথে চালিত করার লক্ষ্যে আপনাদের উপস্থিতি ও ২০২৪-এর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সমর্থন সত্যিই প্রশংসনীয়! —অরুণা কুমারা দিশানায়েকে (@anuradisanayake) ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৪ অর্থনৈতিক অস্থিরতা ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বোকে ঝাঁকিয়ে দিয়েছিল আরাগালয়া (প্রতিবাদ) যার পরিণতিতে রাষ্ট্রপতির প্রাসাদ দখল হয়ে যায় এবং রাষ্ট্রপতি গোতাবায়া রাজাপক্ষেকে তড়িঘড়ি দেশ ছেড়ে পালাতে হয়। এই প্রতিবাদের কারণ ছিল দেশের-মানুষের অর্থনৈতিক সম্বলহীনতা; জ্বালানি, খাদ্য ও ওষুধের মতো নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের অভাব তাদের রাস্তায় নামতে বাধ্য করে। শ্রীলঙ্কা বৈদেশিক ঋণ মেটাতে ব্যর্থ হয়ে দেউলিয়া হয়ে যায়। প্রতিবাদী মানুষের আয়ের রাস্তা প্রশস্ত না-করে; নয়া-উদারবাদী ও পাশ্চাত্য ঘেঁষা বিক্রমসিংঘে রাষ্ট্রপতির পদ দখল করেন রাজাপক্ষের ৬ বছরের মেয়াদ সম্পূর্ণ করার জন্য। রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিক্রমসিংঘের অপদার্থ শাসনকাল ওই বিক্ষোভ ও প্রতিবাদের অন্তর্নিহিত কারণগুলির কোনও সমাধান করেনি। ২০০৩ সালে শ্রীলঙ্কাকে আন্তর্জাতিক অর্থ ভাণ্ডারের দুয়ারে দাঁড় করিয়েছে ২.৯ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা অনুদানের জন্যে (১৯৬৫ সাল থেকে আন্তর্জাতিক অর্থ ভাণ্ডারের কাছ থেকে নেওয়া এটা ১৭ নম্বর অনুদান) যার জেরে বিদ্যুতের মতো সামগ্রীর উপর থেকে ভরতুকি প্রত্যাহার করা হয় এবং ১৮%-র ওপর দ্বিগুন হারে বাড়তি মূল্যযুক্ত কর যোগ করা হয়। এই ঋণের বোঝা বইতে হচ্ছে কোনও বাইরের ঋণদাতাকে নয়, শ্রীলঙ্কার শ্রমিক শ্রেণিকেই। দিশানায়েকে বলেছেন তিনি এই বন্দোবস্ত উল্টে দেবেন এবং চুক্তির পর্যালোচনার মাধ্যমে বাইরের ঋণদাতাদের ওপর অধিকতর দায়িত্ব চাপাবেন, আয়করের সীমা বৃদ্ধি করবেন এবং একাধিক নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যকে (খাদ্য ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার) বাড়তি করের আওতার বাইরে নিয়ে আসবেন। দিশানায়েকে যদি সত্যিই এই কাজ করতে পারেন এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি দমনে হস্তক্ষেপ করেন, তবে গৃহযুদ্ধ-ক্লান্ত ও রাজনীতির কুলীন কূলের বিশ্বাসঘাতকতার শিকার শ্রীলঙ্কার রাজনীতিতে একটি উল্লেখযোগ্য ছাপ রাখতে সমর্থ হবেন। রাষ্ট্রপতি ভবনে এখন একটি মার্কসবাদী দল ১৯৬৫ সালে একটি মার্কবাদী লেনিনবাদী দল হিসেবে জেভিপি বা গণমুক্তি ফ্রন্টের প্রতিষ্ঠা। রোহানা উইজেউইরার (১৯৪৩-১৯৮৯) নেতৃত্বে এই দল ১৯৭১ ও ১৯৮৭ থেকে ১৯৮৯-এ দু-বার অন্যায়, দুর্নীতিগ্রস্ত ও নিয়ন্ত্রণাতীত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সশস্ত্র অভ্যুত্থানের চেষ্টা করে। দুটি অভ্যুত্থানই নৃশংসভাবে দমন করে রাষ্ট্র যার ফলে উইজেউইরা সহ হাজার হাজার সদস্যের হত্যার ঘটনা ঘটে। ১৯৮৯ সালের পর জেভিপি সশ্রস্ত্র অভ্যুত্থানের পথ পরিহার করে গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে প্রবেশ করে। জেভিপিতে দিশানায়েকের পূর্বসূরী নেতা সোমাওয়ানসা আমেরাসিংঘে (১৯৪৩-২০১৬) আটের দশকের শেষে দলের প্রধান নেতৃবৃন্দের হত্যার ঘটনার পর দলকে পুনর্গঠন করেন। নির্বাচনী সংগ্রাম ও সামাজিক ক্ষেত্রের লড়াইয়ে সমাজতান্ত্রিক নীতির স্বপক্ষে দলকে একটি বামপন্থী দল হিসেবে গড়ার কাজটি এরপর গ্রহণ করেন দিশানায়েকে। জেভিপি-র এই চমকপ্রদ অগ্রগতিটি দিশানায়েকের প্রজন্মের অবদান; যারা বয়সে দলের প্রতিষ্ঠাতাদের চেয়ে অন্তত কুড়ি বছরের ছোটো এবং যারা শ্রীলঙ্কার শ্রমজীবী জনগণ ও দরিদ্রতর মানুষের মধ্যে দলের আদর্শগত ভিত্তি প্রোথিত করতে সমর্থ হয়েছেন। তবে দলের কিছু কিছু নেতার সিংহলী জাতীয়তাবাদের দিকে ঝুঁকে পড়ার (বিশেষ করে যখন এলটিটিই-র জঙ্গি কর্মতৎপরতার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণের প্রশ্ন এসেছে) প্রবণতার প্রেক্ষিতে তামিল সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর সাথে দলের সম্পর্কের প্রশ্নটি থেকেই যাচ্ছে। স্বজনপোষণে ডুবে থাকা দুর্নীতিগ্রস্ত অভিজাত শাসকবর্গের সম্পূর্ণ বিপরীতে দিশানায়েকের ব্যক্তিগত সততা ও জাতিগত বিভাজনের দৃষ্টির ঊর্ধ্বে উঠে শ্রীলঙ্কার রাজনীতিকে পরিচালনা করতে চাওয়ার মানসিকতাই ব্যক্তি হিসেবে তাঁর এই উত্থানের প্রধান কারণ। বাম সংকীর্ণতাবাদের প্রত্যাখানও জেভিপির পুনঃপ্রতিষ্ঠার অংশত একটি কারণ। একুশটি বাম ও মধ্য-বাম সংগঠনকে নিয়ে পার্টি ন্যাশনাল পিপলস পাওয়ার (এনপিপি) জোটটি গঠন করেছে যাদের অভিন্ন কর্মসূচি হচ্ছে শ্রীলঙ্কার জনগনের বৃহত্তর অংশের স্বার্থে দুর্নীতি ও আইএমএফ-এর ঋণ ও ব্যয় সংকোচের নীতির মোকাবিলা করা। এনপিপি-র কিছু কিছু অংশীদারদের মধ্যে তীব্র নীতিগত মতপার্থক্য থাকলেও রাজনীতি ও কর্মসূচির ক্ষেত্রে অভিন্ন কর্মসূচির প্রতি দায়বদ্ধতা ব্যক্ত করা হয়েছে। এই কর্মসূচিটি স্বনির্ভরতা, শিল্পায়ন ও কৃষি সংস্কারের অর্থনৈতিক আদর্শের ভিত্তিতে রচিত হয়েছে। এনপিপি-র প্রধান শক্তি হিসেবে জেভিপি দেশের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলির (বিশেষ করে জ্বালানি ব্যবস্থাপনার মতো জরুরি ক্ষেত্র) জাতীয়করণ ও প্রগতিবাদী করারোপ ও সামাজিক খাতে ব্যয় বৃদ্ধির মাধ্যমে সম্পদের পুনর্বন্টনের স্বপক্ষে অবস্থান গ্রহণ করেছে। জাতিগত সংঘাতে বিদীর্ণ শ্রীলঙ্কার সমাজে অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বের এই বার্তাটি সাদরে গৃহীত হয়েছে। অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বের এই কর্মসূচিটি কতটা বাস্তবায়িত করতে পারবেন দিশানায়েকে সেটাই আগামী দিনে দেখার। তবে তাঁর বিজয় নিশ্চিতভাবেই নতুন প্রজন্মের মধ্যে নতুন প্রাণের সঞ্চার করতে পেরেছে যারা অনুভব করতে পারছে যে আন্তর্জাতিক অর্থ ভাণ্ডারের অবসন্ন প্রকল্প ছাড়াও দেশ এগোতে পারে এবং শ্রীলঙ্কাকে এমন একটি পথে পুনর্গঠিত করার প্রচেষ্টাটি দক্ষিণ গোলার্ধের রাজনীতিতে একটি আদর্শ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। লেখকদের দু'জনেই ট্রাইকন্টিনেন্টাল: ইনস্টিট্যুট ফর সোসাল রিসার্চের সাথে যুক্ত।
প্রকাশের তারিখ: ২৪-সেপ্টেম্বর-২০২৪ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |