স্তালিন এবং ‘হু ওয়ান্টেড স্তালিন টু ডাই?’

হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়
গোড়া থেকে শেষ পর্যন্ত লেখায় স্তালিন তাঁর চিন্তাধারা ও বিপ্লবী কাজকর্ম চালানোর চেষ্টা করেছেন লেনিন, একমাত্র লেনিনেরই আদর্শ অনুযায়ী। তাতে খুঁজে পাওয়া যাবে না ট্রটস্কির নির্ভীক বুদ্ধিদীপ্ত ও অলঙ্কারপূর্ণ রচনার কণামাত্র বিচ্ছুরণ। যিনি ছিলেন তাঁরই একদা বুদ্ধিদীপ্ত প্রতিদ্বন্দ্বী, নিজের গৌরবময় ছায়া অনুসরণ করতে গিয়ে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছিলেন, এমনকি যখন বাহ্যত পেরেস্ত্রৈকার সুবাদে প্রতিবিপ্লব জাঁকিয়ে বসেছে তখনও ট্রটস্কির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে কোনো অভাজনকে দেখা যায়নি।

কমিউনিস্ট পার্টিতে যুক্ত না হলে আমাদের দেশে সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণনের মতোই তিনিও ভারতের দার্শনিক ঐতিহ্যের উজ্জ্বলতম উত্তরাধিকারী হিসাবে চিহ্নিত হতেন। তিনি হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়। ইন্ডোলজিস্ট শব্দের বাংলা হয় না, ব্যুৎপত্তি অনুসারে দাঁড়ায় এমন একজন যার মাধ্যমে ভারতীয় সভ্যতার নাগাল পাওয়া যায়। ৬ই মার্চ, ১৯৯৪, জে ভি স্তালিনের ৪০-তম প্রয়াণ বার্ষিকীতে প্রকাশিত হয় The Stalin Legacy: Ivory Flawed But Ivory Still, প্রকাশক ন্যাশনাল বুক এজেন্সি। এই বই বস্তুত এক দলিল, এক পুনরুজ্জীবন বিশেষ। বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলনে ঘুন পোকার মতো ভাঙন ধরিয়ে দিতে নিকিতা ক্রুশ্চেভ থেকে মিখাইল গর্বাচভ অবধি যে বিশ্বাসঘাতকতার ইতিহাস কেউ চাইলেও মুছে দিতে পারবে না তার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এই বই আসলে মূর্তিমান প্রতিরোধ, স্তালিনের মতোই। প্রবল বাধার সামনে যখন আর কেউ মাথা তুলছেন না তখনই তো স্তালিন- হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় কার্যত সেই জরুরি কথাই আমাদের মনে করিয়ে দেন এ লেখায়। ইতিহাস নির্দিষ্ট কর্তব্য সমাধায় স্তালিনের ভুলভ্রান্তি ছিল না এমন না, কিন্তু ঐতিহাসিক মূল্যায়নের সময় বিবেচনায় রাখতে হয় ঐ অবস্থায় কোনটি অপরিহার্য ছিল আর কোনটি অনভিপ্রেত। দ্বান্দ্বিক-বস্তুবাদের যে হাতিয়ার মার্কসবাদীদের উত্তরাধিকার তাকেই প্রয়োগ করে এগিয়ে যেতে হয়। পার্টির কাজে যুক্ত নিত্য নতুন প্রজন্মেরা যেন শিখে নেয় কোন উত্তরাধিকার তাদের কাঁধে এই প্রত্যাশায় আজ স্তালিনের জন্মদিবসে আমরা সে লেখারই অংশবিশেষ ওয়েবসাইটে সাজিয়ে দিলাম। ২০০৪ সালে বাংলায় সেই বইয়েরই ভাষান্তর করেন কমরেড দীপেন ঘোষ।   
-টিম মার্কসবাদী পথ


১৯৫৩ সালের মার্চ থেকে বিশেষ সমাধিক্ষেত্রে সংরক্ষিত স্তালিনের মমিকৃত দেহকে অপসারিত করার মধ্য দিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির ২২তম কংগ্রেস (১৯৬১) তথাকথিত স্তালিনবাদকে সম্পূর্ণ পরিহার করে। তখন আবার বিশ্বজুড়ে স্তালিনের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা শুরু হয় এবং ইন্দোনেশিয়ার কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্রে (হারিয়ান রাকজত, ২১শে ডিসেম্বর ১৯৬১) একটি উল্লেখযোগ্য সম্পাদকীয় নিবন্ধ প্রকাশিত হয়, যার শিরোনাম ছিল ‘হাতির দাঁতে খুঁত, তবু হাতির দাঁত’। ত্রুটি সত্ত্বেও স্তালিনের ঐতিহ্যের ইতিবাচক দিকগুলি তুলে ধরার প্রয়োজনে এই প্রাচীন ইন্দোনেশীয় প্রবচনকে ব্যবহার করা হয়েছিল।

অনেকেরই হয়তো মনে নেই, ইন্দোনেশিয়ার পার্টিই তখন চীনের পার্টির পরেই, এশিয়ায় সবচেয়ে শক্তিশালী পার্টি ছিল। খুব কম ব্যক্তিই হয়তো মনে করতে পারবেন, ১৯৬৫-৬৬ সালে, পুরনো পরস্পর ধ্বংসকর দুর্বলতার পরিণামে (বিশ্বশক্তির ভারসাম্য বুর্জোয়াদের অনুকূলে থাকায়) ইন্দোনেশিয়ার এই বিশাল পার্টির উপর হিংস্রভাবে আঘাত হানা হয়েছিল এবং হিংস্র মনুষ্য-শিকারে পাঁচ লক্ষেরও বেশি কমিউনিস্ট ও তাদের সমর্থকদের খুন করা হয়েছিল, প্রদর্শিত হয়েছিল (যেমন এর আগে ও পরে বহু জায়গায় হয়েছিল) এক ভয়ানক "বুর্জোয়া মানবতার নগ্ন রূপ”। এমনকি, এখনও সেই ভয়ঙ্কর কাহিনী সচেতনভাবে গোপন রাখা হয়, যাতে নৈতিক উৎকর্ষসম্পন্ন গর্বাচভ-অনুপ্রাণিত "সর্বজনীন মূল্যবোধ"-এর প্রচার সর্বত্র ‘গণতান্ত্রিক’ বিজয় উদযাপন করতে পারে।

ইন্দোনেশিয়ার পার্টি কর্তৃক স্তালিনের এই মূল্যায়ন বোধহয় আজও স্মরণ করা যেতে পারে, বিশেষত কারণ এর সঙ্গে ১৯৫৬ সালে তৎকালীন অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির মূল্যায়নের মূলগত মিল ছিল। ক্রুশ্চভের পুরনো অভিযোগের সঙ্গে নতুন বিষয়বস্তুগতভাবে প্রকৃতই গ্রহণযোগ্য এবং মতাদর্শগতভাবে প্রাসঙ্গিক কোনো কিছু যুক্ত করতে পারেনি গর্বাচভ অ্যান্ড কোং, যদিও স্পষ্ট, বিশ্বাসঘাতক কথাবার্তা, বক্রোক্তি এবং সেই ডাহা মিথ্যাচার শেষোক্তদের স্তালিন-বিরোধী আক্রমণের লক্ষণ হয়ে দেখা দিয়েছে। যাই হোক, যেহেতু বস্তুতপক্ষে প্রতিবিপ্লব গ্রাস করেছে বেশিরভাগ প্রাক্তন 'সমাজতান্ত্রিক' দেশগুলিকে এবং তার ফলে, যেহেতু তৃতীয় বিশ্ব ছন্নছাড়া হয়ে গেছে, সেহেতু কমিউনিস্ট ও তার মিত্রশক্তির পুনরায় জোটবদ্ধ হওয়ার কাজ সর্বত্রই দীর্ঘ ও কঠিন হয়ে পড়েছে। আমাদের মতো দেশগুলিতে যা করণীয় তার চেয়ে ভিন্নভাবে পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হবে প্রাক্তন সমাজতান্ত্রিক দেশগুলিকে। ইতিমধ্যে প্রত্যেকেরই একটা অপরিহার্য দায়িত্ব আছে এবং তা হলো ইতিহাস রচনায় মার্কসবাদ-লেনিনবাদের ক্ষমতার উপর আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং প্রসঙ্গক্রমে, লেনিন ও সেই সঙ্গে স্তালিনের সৃজনশীল উত্তরাধিকারকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরা। উভয়েরই স্মৃতি, বিশেষত গ্লাসনস্তের নামে স্তালিনকে নিন্দিত ও খণ্ডিত করার দরুন, আজ পালন করার দাবি রাখে।

জে বি এস হলডেন, বিখ্যাত ব্রিটিশ বিজ্ঞানী, যিনি কিছুকাল গ্রেট ব্রিটেনের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য এবং তার দৈনিক মুখপত্রের প্রধান সম্পাদক ছিলেন, তাঁর শেষ জীবনটা ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগ করে ভারতীয় নাগরিক হয়ে এদেশে কাটিয়েছেন। বিশাল বৌদ্ধিক গুণ ছাড়াও অপরিসীম মানবতার জন্য তাঁকে স্মরণ করতে হয়। তাঁর জীবনীকার রোনাল্ড ক্লার্ক ('দ্য লাইফ অ্যান্ড ওয়ার্কস অব জে বি এস হলডেন', লন্ডন, ১৯৬১), হলডেনের নিজের কথা উদ্ধৃত করে বলেছেন, স্তালিনের প্রতি "তাঁর রূঢ় নির্মমতাকে তিনি তখনকার ঘটনাবলীর স্বাভাবিক পরিণতি হিসাবে দেখলেও তাঁর (হলডেনের) নরম মনোভাব ছিল"। একসময় তিনি তাঁর এক বন্ধুকে লিখেছিলেন: "স্তালিনের জীবনকালে তাঁর কিছু কাজের আমি বিরোধিতা করেছি। কিন্তু আমি ভেবেছি এবং মনেও করি তিনি এক মহান পুরুষ ছিলেন যিনি খুবই ভালো কাজ করেছেন। এবং তখন যেমন আমি তাঁর নিন্দা করিনি, তেমনই এখনও আমি তা করছি না"। কেউ হয়তো তাঁর যুক্তির মধ্যে সহজেই খুঁত ধরতে পারেন, কিন্তু আধুনিক সময়ের ইতিহাস রচয়িতাদের একজন সম্পর্কে এটাই ছিল এক মার্জিত বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন মনোভাবের স্বাভাবিক অভিব্যক্তি। স্তালিন ছিলেন সন্দেহাতীতভাবে সেইরকমই, তাঁর 'নেতিবাচক' দিকগুলি সম্পর্কে অবিরাম প্রচার সত্ত্বেও।

জন স্ট্র্যাচি, সাম্যবাদ-বিরোধী বিশ্বশক্তির, যাদের কাছে ‘ঈশ্বরের (সাম্যবাদের) পতন’ ঘটেছে তাদের মধ্যে অবশ্যই যথেষ্ঠ যোগ্য ছিলেন, কয়েক দশক যাবৎ উল্লেখযোগ্য ব্রিটিশ ব্যক্তিত্ব যিনি কমিউনিস্ট পার্টিতে ঢুকেছেন আবার কখনও বেরিয়ে গেছেন (কিছুকাল অসওয়াল্ড মোসলের ব্রিটিশ ফ্যাসিবাদী দলের সঙ্গে ছিলেন)। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সুস্থতার সময় তিনি কয়েকটি মূল্যবান গ্রন্থ লিখেছিলেন, যেমন ‘ক্ষমতার জন্য আসন্ন সংগ্রাম’ এবং ‘সমাজতন্ত্রের তত্ত্ব ও প্রয়োগ’। সম্ভবত শেষোক্ত গ্রন্থে, যদি ঠিক মতো স্মরণে থাকে, তিনি ‘মার্কসবাদ-লেনিনবাদ’ কথাটায় একটু মৃদু আপত্তি জানিয়েছিলেন, কারণ ‘মার্কসবাদ’-ই যথেষ্ট অথবা বোধহয় ‘মার্কসবাদ-এঙ্গেলসবাদ-লেনিনবাদ-স্তালিনবাদ’, একটু বিদঘুটে লম্বা হলেও, আরো সঠিক। মার্কসবাদকে বিকশিত করার লক্ষ্যে স্তালিনের ভূমিকা সম্পর্কে স্ট্র্যাচি-র এই উপলব্ধি খুবই অর্থবহ, যদিও অন্য অনেক প্রতিভাবান দলত্যাগীদের মতো তিনি তাঁর এই আনুগত্যের জন্য প্রশংসার দাবি করতে পারেন না। এই গ্রন্থের লেখক মনে করেন ‘স্তালিনবাদ’ কথাটা এক অনাবশ্যক সংযোজন এবং মার্কসবাদ-লেনিনবাদই হলো যথেষ্ট বোধগম্য সংজ্ঞা। স্তালিনকে মূল্যায়ন ও প্রশংসা করার জন্য কাউকে ‘স্তালিনবাদী’ লেবেল সাঁটার দরকার হয় না। এতদসত্ত্বেও, বলতে কী, তিনি মার্কস, এঙ্গেলস ও লেনিনের সমপর্যায়ভুক্ত ছিলেন না।

এই প্রসঙ্গে ১৮৮৬ সালে উচ্চারিত এঙ্গেলস-এর কয়েকটি কথা শিক্ষণীয়: ‘মার্কস যা সমাধা করেছেন, আমি তা অর্জন করতে পারতাম না। মার্কস-এর আসন ছিল আরো উঁচুতে, তিনি ছিলেন অনেক দূরদর্শী এবং আমাদের বাকি সকলের তুলনায় তাঁর দৃষ্টি ছিল আরো দ্রুত ও বিস্তৃত। মার্কস ছিলেন এক সৃজনশীল প্রতিভাধর, আমরা অন্যরা বড়জোর নিজেদের বিশেষ যোগ্যতাসম্পন্ন বলতে পারি’। মার্কসের যখন জীবনাবসান ঘটে (১৮৮৩) এঙ্গেলস তখন বলেছিলেন: “মানবসমাজ এমন একজনকে হারালো যিনি ছিলেন আমাদের যুগের সর্বশ্রেষ্ঠ একজন"। মার্কস যে প্রকৃতই সেরা মানুষ ছিলেন তা নিয়ে কোনো প্রশ্ন উঠতে পারে না, কিন্তু সেইসঙ্গে এটাও প্রশ্নাতীত যে, বিশ্বব্যাপী সমাজ বিপ্লবের তত্ত্ব ও প্রয়োগ প্রসঙ্গে মার্কস ও এঙ্গেলস নিরবচ্ছিন্নভাবে পরস্পরের সৃজনী শক্তি সমন্বয় করে এক মহৎ যুগলমূর্তির প্রকাশ ঘটিয়েছেন। সৌভাগ্যবশত তার পরে লেনিন তাঁদের অনুসরণ করেছেন (এবং সবকিছু জানার জন্য মার্কস-এর মতো আকুল আকাঙ্খা নিয়ে তিনি অস্বাভাবিক রকম পরিশ্রম করেছেন 'মেটিরিয়ালিজম অ্যান্ড এমপিরিও-ক্রিটিসিজম'-এর মতো গ্রন্থ রচনায়, যে সম্পর্কে ঐতিহাসিক পক্রোভস্কির মতো তাঁর সহযাত্রী বলশেভিকরা সময় অপচয় করতে বারণ করেছিলেন!)। সাম্রাজ্যবাদ এবং প্রলেতারীয় বিপ্লবের যুগে মার্কসবাদকে শক্তিশালী করা ও ব্যাখ্যা করা ছিল লেনিনের সাফল্য। যে কারণে মার্কসবাদ-লেনিনবাদ সূত্রায়ন মতাদর্শগত ও রাজনীতিগতভাবে অর্থবহ হয়েছে। লেনিনের উত্তরাধিকারীদের মধ্যে স্তালিনকে অগ্রগণ্য বলে ভাবাটা অপ্রাসঙ্গিক নয়। কিন্তু তাঁদের উভয়ের ভূমিকা একই সূত্রে গ্রথিত করার কথা ভাবা যায় না এবং যা স্পষ্টতই ভ্রান্ত। স্তালিনের সর্বোচ্চ দাবি হতে পারে এবং প্রকৃতই ছিল (তাঁর নিজের ভাষায়) লেনিনের "একান্ত বিশ্বস্ত শিষ্য ও তাঁর কর্মকাণ্ডের অনুসারী"।

গোড়া থেকে শেষ পর্যন্ত লেখায় স্তালিন তাঁর চিন্তাধারা ও বিপ্লবী কাজকর্ম চালানোর চেষ্টা করেছেন লেনিন, একমাত্র লেনিনেরই আদর্শ অনুযায়ী। তাতে খুঁজে পাওয়া যাবে না ট্রটস্কির নির্ভীক বুদ্ধিদীপ্ত ও অলঙ্কারপূর্ণ রচনার কণামাত্র বিচ্ছুরণ। যিনি ছিলেন তাঁরই একদা বুদ্ধিদীপ্ত প্রতিদ্বন্দ্বী, নিজের গৌরবময় ছায়া অনুসরণ করতে গিয়ে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছিলেন, এমনকি যখন বাহ্যত পেরেস্ত্রৈকার সুবাদে প্রতিবিপ্লব জাঁকিয়ে বসেছে তখনও ট্রটস্কির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে কোনো অভাজনকে দেখা যায়নি।

এটাও অস্বীকার করা যায় না যে, স্তালিনের বিষয়টা ছিল 'হাতির দাঁত' কিন্তু তাতে 'খুঁত' দেখা দিয়েছে, বিশেষত কঠোরভাবে বাড়াবাড়ি, এমনকি নির্মমতা ও হিংস্রতার কারণে যখন তিনি সোভিয়েত ইতিহাসে সমস্ত রকম বাধা বিপত্তিকে অতিক্রম করে বিশ্বের এক ষষ্টাংশ, পশ্চিম ইউরোপ থেকে একশ বছরেরও বেশি পশ্চাৎপদ দেশকে এক নতুন সমাজের দুর্গে পরিণত করার কাজ পরিচালনা করছিলেন। বলশেভিক 'আত্ম-সমালোচনা'র সুবাদে বিংশতিতম কংগ্রেসে 'সমাজতান্ত্রিক ন্যায়নীতি' থেকে বিচ্যুতি ও অন্যান্য ভ্রান্তি ও অপরাধের নির্দয় উন্মোচন লক্ষ্য করা গিয়েছিল, নিঃসন্দেহে অন্তত আংশিকভাবে সোভিয়েত রাষ্ট্রের কাছে সময়টাই সবচেয়ে বিপজ্জনক হওয়ার কারণে। এটাই ছিল সকল রকম ভয়ঙ্কর ইতর কাজকর্ম ও চতুরতাকে ঢাকা দেওয়ার বুর্জোয়া অভ্যাসের স্পষ্ট বৈপরীত্য, তবু তা করা হয়েছিল।

১৯৫৬ সালের পর কিছুকাল স্তালিনের সময়কার ভালো কাজকে সচেতনভাবে নস্যাৎ করতে এবং মন্দ কাজকে ঘরে ও বাইরের সমাজতন্ত্র-বিরোধী শক্তিদের দ্বারা এক অদ্ভুত বিদ্বেষের সঙ্গে কুৎসা রটনা করতে দেখা গিয়েছিল। দুর্ভাগ্যবশত, পুনর্গঠন কাজের জটিল সমস্যাগুলির গভীরে প্রবেশ করে বিবেকবুদ্ধি দিয়ে উপলব্ধি করার মতো বিচার বিবেচনা করা হয়নি। নিকিতা ক্রুশ্চভের নেতৃত্বকালে (প্রথম দিকে মস্কোর বুদ্ধিজীবী মহলে প্রায়শই তাকে বলা হতো "কী বিস্ময়কর এক রুশ কৃষক!") ইতিপূর্বে প্রতিশ্রুত তদন্ত আর করা হয়নি এবং অভূতপূর্ব সাফল্য (বিশেষত মহাকাশ গবেষণায়) সোভিয়েত বিবেকের কাছে যে নতুন গর্ব এনে দিয়েছিল, দশকের পর দশক সোভিয়েতের জনগণকে যা বহন করতে হয়েছিল তার বিবেচনায় তা যথেষ্ট আনন্দদায়ক ছিল। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, তা এক অদ্ভুত আত্মসন্তুষ্টির জন্ম দিয়েছিল (স্তালিন মনে হয় তাতে বাধা দিতেন) যার পরিণতিতেই প্রকাশ পেয়েছিল ক্রুশ্চভের দম্ভের প্রকাশ যে সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রায় সাম্যবাদে পৌঁছে গেছে এবং আগামী এক বা দুই দশকের মধ্যেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ব শ্রেষ্ঠত্বকে 'সমাহিত' করতে সক্ষম হবে। লক্ষ্য করার মতো, বাস্তব জীবনে নিহিত স্তালিনের চিন্তাধারার স্বতঃসিদ্ধ নীতির সঙ্গে কী প্রভেদ। হয়তো ব্যাজস্তুতি বলে কেউ মনে করতে পারেন, কিন্তু স্তালিন- সবাইকে ছাড়িয়ে! - ১৯২৪ সালেই তাঁর 'লেনিনবাদের ভিত্তি' গ্রন্থে (ইংরাজি সংস্করণ, ১৯৪৫, পৃষ্ঠা ৯২-৯৩) লেনিনবাদের মর্মবস্তু হিসাবে সোভিয়েত জনগণের 'কাজের ধারায়' অপরিহার্য 'মার্কিন দক্ষতার' সঙ্গে 'রুশ বৈপ্লবিক গতি'র যোগসাধনের আহ্বান জানিয়েছিলেন।

সর্বজ্ঞ নন, আবার সর্বশক্তিমানও নন, স্তালিনের, অন্য সব মানুষের মতোই যেমন কেবল শক্তিমত্তাই ছিল না, তেমনই ছিল তার সীমাবদ্ধতা। যাই হোক না কেন বিংশতিতম কংগ্রেসে উদঘাটিত অধঃপতন প্রতিক্রিয়ার তিনি, "তিনি একাই এবং একমাত্র রচয়িতা ও অভিনেতা" ছিলেন না। সর্বদাই নাকাল ও বিধ্বস্ত হওয়া সোভিয়েত ইউনিয়নে কেবল সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্র সম্পর্কেই নয়, সেইসঙ্গে পুঁজিবাদী বিশ্বে অর্থনৈতিক ঘটনাবলীর বিশ্লেষণ এবং সমাজতন্ত্রের অভিমুখে নতুন ও প্রকৃত পথের সম্ভাবনা সম্পর্কেও (কিছু ক্ষতি অবশ্য হয়েছিল, জ্ঞানত বা অন্যভাবে, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও গাণিতিক যুক্তি-বিদ্যা পঠন-পাঠন 'মার্কসবাদের সঙ্গে পরস্পর বিরোধী' বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছিল) যে যথেষ্ট সৃজনশীল গবেষণা হয়নি তা কেবল একজন ব্যক্তি অথবা তার নিয়ন্ত্রিত একমাত্র একটি চক্রের জন্য অথবা একজন ব্যক্তির বিচ্যুতি ও বিকৃতির দরুন নয়। ঐতিহাসিকভাবে অবরুদ্ধ ও বিধ্বস্ত সোভিয়েতের প্রেক্ষাপটে এই ধরনের ঘটনাবলীর যোগ্য সামাজিক বিশ্লেষণের প্রয়োজন যা ১৯৮৭-৮৮ সালে পেরেস্ত্রৈকার সাহসিক ঘোষণা সত্ত্বেও যথাযথভাবে করা হয়নি। ইতিমধ্যে স্তালিন নিন্দা শুরু হয়ে যায় এমন কাণ্ডজ্ঞানহীনভাবে যা স্মরণ করিয়ে দেয় স্পেনের দ্বিতীয় ফিলিপের বিরুদ্ধে প্রাচীন ঐতিহাসিক মোটলে'র অভিযোগ: "এমন অনৈতিকতা যদি থাকে যা থেকে তিনি মুক্ত ছিলেন তাহলে তার কারণ অনৈতিকতায় উৎকর্ষলাভ মনুষ্যচরিত্র অনুমোদন করে না!" যাই হোক, ই এইচ কার তাঁর "ইতিহাস কী?” শীর্ষক ধ্রুপদী গ্রন্থে সহযাত্রী-পণ্ডিত সি এম নোয়েলস-এর অনুমোদনক্রমে উদ্ধৃত করেছেন তাঁর অনুশাসন-বাক্য যে, "ঐতিহাসিকরা বিচারক নন, আনতশির বিচারক তো নয়ই।” যেখানে এক অসম পরিস্থিতিতে একটি পশ্চাৎপদ দেশে সদ্যজাত সমাজতন্ত্র এবং দৃঢ়মূল শক্তিশালী পুঁজিবাদের মধ্যে নিবদ্ধ প্রতিযোগিতার মতো বিশালকায় ঐতিহাসিক বিষয়গুলির পর্যালোচনায় দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রয়োজন কিছু বিনম্রতা এবং সুষম, যথানুপাতিক ও সঙ্গতিপূর্ণ প্রকৃত উপলব্ধির।

উন্নাসিক 'মার্কসবাদীরা' অবশ্য বহুকাল যাবত স্তালিন ও তাঁর সোভিয়েত ইউনিয়নকে ‘অপরিপক্ক বাইজানটাইন রূপ’ হিসাবে অবজ্ঞা করেছেন। কিন্তু কেন যে এইসব সুযোগ্য ব্যক্তি সর্বদাই উৎকর্ষসম্পন্ন ‘পশ্চিমী দুনিয়ায়’ ‘খাঁটি’ সমাজতন্ত্রের অগ্রগতি ঘটাতে পারেননি তার কোনো সদুত্তর মেলেনি। মিনারবাসী হয়ে মর্ত্যের লড়াইয়ে ক্ষত বিক্ষত ও জর্জরিত মরণশীল মানুষদের সম্পর্কে রায় দেওয়া খুবই সহজ। সোভিয়েত ইতিহাসের যুক্তিগ্রাহ্য নিয়মে, আইজাক ডয়েটশার-এর প্রামাণ্য গ্রন্থ 'স্তালিন' (১৯৪৮ ও ১৯৬৭ সংস্করণ) অনুসারে লেনিনের মৃত্যুর পর স্তালিনের উত্তরণ এবং আরো ক্রমবিকাশ, যা একসময় অসম্ভব মনে হয়েছিল, আদৌ আকস্মিক ছিল না। যদিও একটি সমষ্টিগত নেতৃত্ব অপরিহার্য বলে ধরা হয়েছিল, কিন্তু পরস্পর দ্বন্দ্বরত ব্যক্তিত্ব ও তাদের ইচ্ছা থেকে, ত্বত্ত্ব ও প্রয়োগের ক্ষেত্রে মতাদর্শই বৈচিত্র্যের জননী হওয়ায়, বেরিয়ে আসা যায়নি (প্রয়োজনীয় যদিও শত্রুতামূলক রচনা 'ডাইভারসিটি ইন ইন্টারন্যাশনাল কমিউনিজম'- এ ডালিন সম্পাদিত, কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৬৩, দ্রষ্টব্য)। এখানে এটা আলোচনা করার বিষয় নয়, তবুও ব্যক্তিত্বজনিত কিছু সমস্যা উল্লেখ করা হলো।

জিনোভিয়েভ, যিনিই সম্ভবত প্রথম 'লেনিনবাদ' কথাটা ব্যবহার করেছিলেন, তাঁর কিছু চারিত্রিক অস্থিরতা সত্ত্বেও, ছিলেন কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনালের এক শ্রদ্ধেয় নেতা এবং এক দুর্দান্ত বিপ্লবী জনপ্রিয় রাজনৈতিক বক্তা। কামেনেভ, একজন সুশিক্ষিত চিন্তাশীল ব্যক্তি ও যোগ্য প্রশাসক, যার প্রবণতা ছিল রাষ্ট্রনেতার জায়গায় গুপ্ত চক্রান্তের ভ্রান্ত ধারণা করার। লিয় ট্রটস্কির দ্বারা এই ত্রয়ী দর্শনীয়ভাবে পূর্ণতা লাভ করেছিল এবং (পরে প্রায়শই ভাঙনও ধরেছিল) যাঁর প্রকৃতই প্রচণ্ড প্রতিভা এবং আত্ম-অহঙ্কারী গতিবেগ (যা তিনি খানিকটা বিয়োগান্তক মহিমায় টেনে নিয়ে গিয়েছিলেন) তাঁর নিজের এবং বিপ্লবের পক্ষে অত্যধিক বলে প্রমাণিত হয়েছিল। তারপরে ছিলেন নিকোলাই বুখারিন, যার মহান শিক্ষা ক্রমশ এমনভাবে এসেছিল যাকে বলা যায় সোভিয়েতের দেবদত্ত দায়িত্বের বোঝা বহনের এক মেরুদণ্ডহীন অক্ষমতার সঙ্গে। যুদ্ধের সময়কার উইনস্টন চার্চিলের একটা ঠাট্টার কথা স্মরণ করা যেতে পারে, তেহরান ও ইয়াল্টায় রুশ ভালুক ও মার্কিন মোষের মধ্যে তিনি (চার্চিল) ছিলেন হতভাগা এক ছোট্ট ইংরেজ গাধা যে নিজেই কেবলমাত্র বাড়ি ফেরার সঠিক পথটা জানতো। স্তালিনকে তাঁর পার্টির সহকর্মীদের মধ্যে হয়তো ভাবা হতো এশিয়া ও ইউরোপের সন্ধিস্থলের এক ককেশীয় অজ্ঞাতকুলশীল- অবিচলিত কিন্তু প্রায়শই অনুচ্চারিত, তাঁর প্রতিভা (যা নিয়ে ট্রটস্কি একদা হাসাহাসি করতেন) ধূসর বিন্দুর চেয়ে একটু বেশি বলশেভিক মেধার আলোকচ্ছটার মধ্যে কুহেলির মতো উবে গেছে। ঐতিহাসিক ইউরোপীয় ক্ষয়-ক্ষতির জন্য স্তালিনকে এক ধরনের এশীয় প্রতিহিংসার চক্রান্তকারী হিসাবে সন্দেহ করা হতো (যে মানুষটা সবসময়েই এশীয় বেশভূষায় সজ্জিত থাকতেন!), যদিও লেনিনের প্রতি তাঁর আনুগত্যের প্রশ্নে অন্য কেউই সমকক্ষ হতে পারেননি। এক অসাধারণ ভঙ্গিমায় ও অসীম ধৈর্য্যের সঙ্গে তিনি নিজেকে তৈরি করেছিলেন সীমাহীন ও কঠোর বৈপ্লবিক দায়িত্ব পালনের উপযোগী হতে যা আরো সংবেদনশীল অন্য ব্যক্তিদের অবসন্ন করে দিয়েছিল। এবং এর মধ্য দিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন নিরন্তর শক্রমনোভাবাপন্ন বিশ্বে সমাজতন্ত্র গঠনের জন্য স্নায়ুর ওপর চাপ সৃষ্টিকারী এক বিশাল কর্মকাণ্ডের প্রধান কর্মকর্তার নিখুঁত, হয়তো কিছুটা ভীতিপ্রদত্ত, ছাঁচ।

এতে বিস্ময়ের কিছু ছিল না, লেনিনের অকাল জীবনাবসানের পর (জানুয়ারি, ১৯২৪) উল্লিখিত শক্রমনোভাবাপন্ন বিশ্বের সমস্ত বিদ্বেষ ও ক্রোধ স্তালিনের ওপরে কেন্দ্রীভূত হয়েছিল, একমাত্র একজন ব্যক্তির ওপর, যেহেতু তিনি পৃথিবীর একমাত্র সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের কর্ণধার হয়েছিলেন। সমস্ত প্রচার মাধ্যম, সঙ্গত ও অসঙ্গত, প্রধানত স্তালিনের উদ্দেশেই চালিত হয়েছিল যেমন একসময়ে হয়েছিল লেনিনের বিরুদ্ধে (কখনও কিছুকাল, ট্রটস্কির সঙ্গে), আক্রমণ প্রায়শই ছিল নোংরা ও অমার্জিত।

Jay Gould এর অশ্লীল ছড়া: "There was a great revolutionary called Lenin/Who did one or two million men in/That was a lot to have done in/But where we did one or two million in/The Great Revolutionary Stalin, did ten in!" তার নজির। গরবাচভের "ঐতিহাসিক' সহকারী এ মেডভেডভকে অতো পরিশ্রম করে স্তালিনের 'অপরাধ' ও তার 'প্রতিহিংসার বলি'-র স্ফীতকায় তালিকা তৈরির কোনো প্রয়োজন ছিল না, যা একটি 'বামপন্থী' দিল্লী সাপ্তাহিক উৎকট আনন্দে ১৯৮৯ সালে প্রকাশ করেছিল। বিপ্লবের মূল্য বস্তুতপক্ষে সর্বদাই খুব বেশি এবং কোনো বিপ্লবই মহান অক্টোবর বিপ্লবের মতো এত গভীর ও ব্যাপক হয়ে দেখা দেয়নি। শত্রু সূত্রে হলেও 'লাল সন্ত্রাস' সম্পর্কে লেখালেখির অন্ত নেই, কিন্তু সিডনি ও বিয়েত্রিচ ওয়েবের প্রকৃতই চমৎকার রচনার মতো সর্বোৎকৃষ্ট বুর্জোয়া পাণ্ডিত্য যে সত্যকে প্রকাশ করে দিয়েছে তাকে কোনো নব্য গর্বাচভীয় বিজ্ঞতা দিয়ে বিকৃত করা যাবে না। স্তালিন এবং তাঁর কাজে বিদ্যমান ‘হাতির দাঁতে’ অবশ্যই ‘খুঁত’ ছিল, কিন্তু তবু তা ছিল ‘হাতির দাঁত’।


প্রকাশের তারিখ: ২১-ডিসেম্বর-২০২৩

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org