|
স্টার্মার বনাম করবিনের জয়টিম মার্কসবাদী পথ |
|
ব্রিটেনের নির্বাচনে শতাব্দীর শোচনীয়তম পরাজয়ের মুখে পড়ল কনজারভেটিভ পার্টি (টোরি)। চোদ্দ-বছরের ভয়াবহ টোরি জমানার অবসান। ১৮৩৪ সালে পার্টির প্রতিষ্ঠার পর থেকে ব্রিটেনের সংসদে দলের এত কম প্রতিনিধিত্ব অতীতে কখনও দেখা যায়নি। রাতারাতি সাফ হয়ে গিয়েছে দুই-তৃতীয়াংশ সাংসদ। ২৪৪ জনকে হারিয়ে সদস্য সংখ্যা নেমে এসেছে একেবারে ১২১-এ। অন্যদিকে, ব্রিটিশ সংসদের নিম্নকক্ষ হাউস অফ কমন্সে কিয়ের স্টার্মারের লেবার পার্টির সাংসদের সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে হয়েছে ৪১২। ৬৫০-সদস্যের সংসদে নিরঙ্কুশ গরিষ্ঠতার চেয়েও ৮৬টি আসন বেশি। অনেকেই তুলনা টানছেন ১৯৯৭ সালের সঙ্গে। সেবার নির্বাচনে টোরি প্রধানমন্ত্রী জন মেজরকে ক্ষমতাচ্যুত করে যেভাবে ডাউনিং স্ট্রিটে প্রবেশ করেছিলেন লেবার পার্টির নেতা টনি ব্লেয়ার, এবারেও যেন ঠিক তেমনই, টোরি নেতা ঋষি সুনককে ধরাশায়ী করে প্রধানমন্ত্রী লেবার প্রধান স্টার্মার। লেবার জিতেছে ঠিকই, কিন্তু কতটা জনপ্রিয়? মাত্র ৩৩.৮ শতাংশের সমর্থনে দল পেয়েছে সংসদের প্রায় ৬৫ শতাংশ আসন। যেখানে ২০১৭-তে জেরেমি করবিনের নেতৃত্বে লেবার পেয়েছিল ৪০ শতাংশ ভোট। পরে ২০১৯-এ করবিনের নেতৃত্বে লেবারের হারের জন্য যখন জনপ্রিয়তা হ্রাসকে দায়ী করা হয়, তখন সমর্থনের হার ছিল এবারের চেয়ে দু’ শতাংশেরও কম, ৩২.২ শতাংশ। সেবারে ভোটদানের হার ছিল ৬৭ শতাংশ। এবারে রেকর্ড কম, ৬০ শতাংশ। তারপরেও, এবারে মাত্র ১.৬ শতাংশ ভোট বাড়িয়ে লেবার পেয়েছে অতিরিক্ত ২১১টি আসন! স্টার্মারের লেবার করবিনকে বহিষ্কার করলেও, নির্দল হিসেবে নর্থ ইসলিংটন থেকে দাঁড়িয়ে ৫০ শতাংশ ভোট পেয়ে জিতেছেন তিনি। হারিয়েছেন লেবারের চাপিয়ে দেওয়া প্রার্থীকে। ১৯৮৩-তে এই কেন্দ্র থেকে প্রথম জিতেছিলেন করবিন। তারপর থেকে টানা জিতে চলেছেন। একবারের জন্যও পরাজিত হননি। এবারে ৭,২৪৭ ভোটে হারিয়েছেন লেবারের ভারতীয় বংশোদ্ভূত প্রার্থী প্রফুল নারগুণ্ডকে। করবিন পেয়েছেন ২৪,১২০ ভোট, বিপরীতে লেবারের প্রার্থী পেয়েছেন ১৬,৮৭৩ ভোট। করবিনের এই জয় স্টার্মারের জন্য যেমন সতর্কবার্তা, তেমনই বামপন্থীদের জন্য একটি বড় শিক্ষা। মূলত টোরি-বিরোধী ভোট থেকেই লেবারের এই সাফল্য। পার্টির ইতিহাসে সর্বনিম্ন ২৪ শতাংশের সমর্থন নিয়ে সংসদে টোরির আসন ১৮ শতাংশ। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী লিজ ট্রাস-সহ ১১ জন মন্ত্রী হেরেছেন তাঁদের আসনে। মেগা শহরের কেন্দ্রগুলিতে গাজায় গণহত্যা ইস্যুতে লেবারের বিরোধিতা করে তাৎপর্যপূর্ণ জয় পেয়েছেন প্রার্থীরা। লেবারের প্রার্থীকে হারিয়ে জিতেছেন চারজন প্যালেস্তিনীয়পন্থী প্রার্থী। লেবার সবচেয়ে বেশি ফায়দা তুলেছে স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টি (এসএনপি)-র বিপর্যয় থেকে। স্কটল্যান্ডে দলের ভোট বেড়েছে ১৭ শতাংশ, যেখানে এসএনপি-র ভোট পড়েছে ১৫ শতাংশ। লেবারের কাছে হারিয়েছে প্রায় চল্লিশটি আসন। এসএনপি-র আসন সংখ্যা ৪৮ থেকে কমে হয়েছে ৯। এই প্রথম নির্বাচিত হয়েছেন কট্টরপন্থী দল রিফর্ম ইউকে’র প্রধান নাইজেল ফারাজে। সঙ্গে নির্বাচিত হয়েছে তাঁর দলের চারজন। সমর্থনের হার ১৪ শতাংশ। কনজারভেটিভ ভোটের একটি বড় অংশ কেটে নিয়েছে ফারাজের রিফর্ম পার্টি। যদি তা না হতো, তবে ফলাফল হতো অন্যরকম, রীতিমতো হাড্ডাহাড্ডি। এবারে ৯৮টি আসনে রিফর্ম পার্টি দ্বিতীয় স্থানে। টোরিকে হারিয়ে ফারাজের দল এভাবেই পুরস্কার তুলে দিয়েছে লেবারকে। ১২ শতাংশ ভোট পেয়ে লিবারেল ডেমোক্র্যাটদের আসন সংখ্যা এগারো থেকে ছ’গুণের বেশি বেড়ে হয়েছে ৭১। গ্রিনদের আসন সংখ্যা ১ থেকে বেড়ে হয়েছে চার। এই জনাদেশ সরকারের নীতির প্রতি এক জোরালো প্রত্যাখ্যান। বামপন্থীদের দৃষ্টি এখন অবধারিতভাবে হওয়ার উচিত সরকারি নীতির অভিমুখ পরিবর্তনের দিকে। জরুরি হলো ধর্মঘট-বিরোধী আইন, প্রতিবাদ-বিরোধী আইন-সহ কর্তৃত্ববাদী আইনগুলির পরিবর্তন, প্রকৃত আয় ২০০-বছরের নিচে নেমে যাওয়ার অধোগতির অবসান এবং মুখ থুবড়ে পড়া জনপরিষেবার পুনরুজ্জীবন। খুব বেশি না হলেও, এর মধ্যে কয়েকটি লেবারের কর্মসূচিতেও রয়েছে, যারা জিতে এসেছে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে। বামপন্থীদের তাই প্রথম দিন থেকেই সরকারের ওপর চাপ তৈরি করতে হবে। শুধু ইউনিয়ন-বিরোধী আইনের অবসান এবং শ্রমিকদের অধিকার বাড়ানোর জন্য ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি পূরণের জন্যই নয়, ভাঙতে হবে টোরির ব্যয়বরাদ্দের শৃঙ্খলাকে। যা স্বাস্থ্য পরিষেবা, শিক্ষা ও স্থানীয় প্রশাসন-সহ অন্যান্য অনেক ক্ষেত্রে সংকট সমাধানে মূল বাধা। ব্রিটেনের সাধারণ নির্বাচনে টোরিদের এই পরাজয় স্বাগত। কিন্তু স্টার্মারের দক্ষিণপন্থী লেবার সরকার সম্পর্কে শ্রমিকশ্রেণির কোনও মোহ থাকা উচিত নয়। ব্যয়সঙ্কোচ, বেসরকারিকরণ, অভিবাসন, প্যালেস্তাইন, ইউক্রেন এবং ক্রমবর্ধমান সমরবাদের মতো— শ্রমজীবী জনগণ যে মৌলিক প্রশ্নগুলির মুখোমুখি— সেব্যাপারে প্রতিষ্ঠানপন্থী রাজনৈতিক দল, রাষ্ট্র ও মনোপলি মিডিয়ার মধ্যে রয়েছে প্রায় সার্বিক ঐক্য। নির্বাচনের এই ফলাফল তেমন কোনও কিছুরই সমাধান করবে না। বহু ক্ষেত্রেই টোরি সরকারের কলঙ্কিত নীতির ধারাবাহিকতা জারি রাখবে স্টার্মারের দক্ষিণপন্থী লেবার সরকার। দুনিয়া জানে গাজার সঙ্কট নিয়ে কোনও পরিবর্তনের প্রস্তাব দেননি স্টার্মার। বরং, প্যালেস্তাইনের গণহত্যা শুরুর গত ন’মাসে প্রতিটি পর্যায়ে টোরিদের সঙ্গে লেবার নিয়েছে অভিন্ন অবস্থান। এমনকি ওয়াশিংটনের সবুজ সংকেত দেওয়ার আগে পর্যন্ত সংঘর্ষ বিরতির ডাক দিতে পর্যন্ত অস্বীকার করে। অস্বীকার করে ইজরায়েলকে সমরাস্ত্র বিক্রি বন্ধ করার দাবি তুলতে। ইজরায়েলের বিরুদ্ধে বয়কট বা নিষেধাজ্ঞার যে কোনও দাবির বিরোধিতা করে। বৃহৎ শিল্পের শক্তিশালী অংশের মদতে স্টার্মার সরকার এবার দ্রুততার সঙ্গে শিল্পে শ্রমিকদের জঙ্গিপনা, শ্রেণিসংগ্রামকে নিকেশ করার চেষ্টা করবে। পাশাপাশি, সম্প্রতি দেখা দেওয়া সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধিতাকে দমন করবে। শেষ ক’দিন স্টার্মারের লেবার পার্টি শুধু একটাই কথা বলেছে: পরিবর্তন। যে স্লোগান দিয়ে একসময় মার্কিন রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন বারাক ওবামা, যে স্লোগান দেওয়া হয়েছিল ২০১১-র বাংলায়! ব্রিটেনের কমিউনিস্ট পার্টির বোঝাপড়া স্পষ্ট: এই ‘পরিবর্তন’ হবে শুধু পুঁজিবাদ ও শাসকশ্রেণির সম্পদ রক্ষায় ‘প্রহরীর’ পরিবর্তন। সেকারণে স্টার্মারের জয় কোনওভাবেই শ্রমিকশ্রেণির জন্য অর্থপূর্ণ জয় হতে পারে না। ঠিক এই কারণেই কোনও মোহ না রেখে রাস্তায় নামা ছাড়া বামপন্থীদের সামনে অন্য কোনও বিকল্প নেই। আর মানুষের সঙ্গে গড়ে তুলতে হবে নিবিড় সংযোগ। যেমন নর্থ ইসলিংটনে গড়ে তুলেছেন জেরিমি করবিন। তাকে লালন করে চলেছেন।
প্রকাশের তারিখ: ০৬-জুলাই-২০২৪ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |