রাষ্ট্র ও প্রতিবিপ্লব

রতন খাসনবিশ

বাম আমলে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ মারফৎ রাষ্ট্রকে যে অন্য ভাষায় কথা বলতে শেখানো হয়েছিল, ২০১১র প্রতিবিপ্লব সেটিকে সর্বপ্রথম সংশোধন করে নেয়। প্রতিবিপ্লব ঠিক করে দেয় যে, রাষ্ট্র কথা বলবে ডিজি, আইজির ভাষায়। নির্বাচিত সরকার বলতে বোঝাবে সর্বক্ষমতাসম্পন্না এক রাজনৈতিক নেত্রী।  কিছু আঞ্চলিক মাফিয়া আর পর্দার আড়ালে থাকা রাষ্ট্র যারা পরিচালনা করেন, তাদের ক্রমাগত ক্ষমতায়নের পথ প্রশস্ত করেছে এই প্রতিবিপ্লব।

২০১১ সালে এই রাজ্যে একটি প্রতিবিপ্লব ঘটে। এই প্রতিবিপ্লবের বর্শামুখে ছিল মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টি এবং অন্যান্য বাম দলগুলি, যাদেরকে কেন্দ্র করে এই রাজ্যে অন্তত তিন দশক সময় জুড়ে বাম মতাদর্শ কর্তৃত্বকারী ভূমিকা পালন করেছে। প্রতিবিপ্লব যা চেয়েছিল সেটা হল — জনগণের ক্ষমতায়ন, যেটিকে বাম মতাদর্শ পুষ্ট করেছিল, পশ্চিমবঙ্গকে সেখান থেকে ফিরিয়ে আনা। বিকেন্দ্রীকরণ মারফৎ রাষ্ট্রকে যে অন্য ভাষায় কথা বলতে শেখানো হয়েছিল, ২০১১র প্রতিবিপ্লব সেটিকে সর্বপ্রথম সংশোধন করে নেয়। — রাষ্ট্র কথা বলবে ডিজি, আইজির ভাষায়। নির্বাচিত সরকার বলতে বোঝাবে সর্বক্ষমতাসম্পন্না এক রাজনৈতিক নেত্র্রী।  আমরা রাইটার্স থেকে রাজ্য শাসন করব না, জ্যোতি বসুর এই যে অঙ্গীকার, প্রতিবিপ্লব সেটিকে ব্যঙ্গ করে গড়ে তুলল কিছু আঞ্চলিক মাফিয়া। আর রাষ্ট্র, অর্থাৎ পর্দার আড়ালে থাকা রাষ্ট্র যারা পরিচালনা করেন, তাদের ক্রমাগত ক্ষমতায়ন।

এই প্রতিবিপ্লব জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলার জন্য আনা হল এক ভালগার জনপ্রিয়তাবাদী রাজনীতি যার সারকথা দাঁড়ায়, সরকার প্রয়োজনে টাকা ধার করে রেউড়ি বিতরণের রাজনীতি করবেন। রাজ্যের জনগণ রাষ্ট্রের কাছ থেকে কোনও মৌলিক বিষয়ের সমস্যা সমাধানে কোনও সাহায্যই লাভ করবেন না। তার চাষে ফলনের সমস্যা,  ফসল বিপণনের সমস্যা, বীজ ও সারের সমস্যা, এগুলি যথাপূর্বং তথাপরং থেকে যাবে। সরকার এবিষয়ে কোনও সুস্থায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন না। নাগরিকের হাসপাতাল পরিষেবা ক্রমশ অধঃপাতে যাবে, স্কুলগুলি পর্যায়ক্রমে বন্ধ হতে থাকবে, সরকারি চাকরি দুর্লভতর হয়ে উঠবে, পাকা চাকরি বন্ধ হয়ে যাবে, বেতন কমিশন ইতিহাসের বিষয়ে রূপান্তরিত হবে, ডিয়ারনেস অ্যালাওয়েন্স দেবার দায় সরকারের ওপর ন্যস্ত করা যায় কিনা এনিয়ে বিতর্ক উঠবে। রেউড়ি গ্রহণে অভ্যস্ত সমাজ ধীরে ধীরে তার ন্যায্য অধিকারের সীমানা সঙ্কোচন শান্ত মনে গ্রহণ করবে। প্রতিবিপ্লব পশ্চিমবঙ্গে যে রাষ্ট্র তৈরি করল সেই রাষ্ট্র রেউড়ি বিতরণের রাষ্ট্র, সে রাষ্ট্র জনগণের ক্ষমতা হরণের রাষ্ট্র, সেই রাষ্ট্র মানুষের বড় ধরনের সমস্যাগুলির কোনওটিকেই নজরে আনবে না। নেত্রীর নামে জয়ধ্বনি উঠবে এবং বিপুল আড়ম্বরের সঙ্গে রাষ্ট্র তার মহিমা প্রকাশ করবে।

এই ব্যবস্থাটি যখন জনগণের ক্ষমতায়নের পথ অবরুদ্ধ করে, নিশ্চিতভাবেই সে সময় জনগণের ছেড়ে যাওয়া ক্ষমতার জমি রাষ্ট্র, বিশেষত প্রশাসন যেটা গ্রহণ করতে সক্ষম হয় না, সেটা দখল করে বিভিন্ন স্তরের মাফিয়ারা। সন্দেশখালির ২ নম্বর ব্লকের ব্লক সভাপতি শিবু হাজরা যার অন্যতম উদাহরণ। একটি হাজরার কথা শাজাহান শেখের সূত্রে সংবাদপত্রে বড় জায়গা দখল করেছে বটে, কিন্তু এটা ঘটনা যে এরাজ্যের প্রতিিট ব্লক, প্রতিটি গ্রাম পঞ্চায়েতে এই রকম এক বা একাধিক শিবু হাজরার আবির্ভাব ঘটেছে। বস্তুত যে প্রতিবিপ্লবের কথা আমরা বলছি এই প্রতিবিপ্লবের অন্যতম উপাদান এই শিবু হাজরা অথবা উত্তম সর্দার।

যে অর্থনৈতিক পটভূমিতে এই ধরনের স্থানীয় মাফিয়ারা কাজ করে, সেটার একটা বড় অংশ জুড়ে আছে সরকারি উন্নয়ন খাতের বরাদ্দকৃত অর্থ, প্রশাসনের নীরব সমর্থনে এই মাফিয়ারা প্রায় মসৃণ পথে এই অর্থ নিজ আয়ত্ত্বে আনার কাজে সক্ষমতা অর্জন করেছে। অভিযোগ অনুসারে, সন্দেশখালি ২ নম্বর ব্লকের সভাপতি শিবু হাজরা জব কার্ড হাতিয়ে অন্তত ৮০ লক্ষ টাকা আত্মস্যাৎ করেছে। একটি শিবু হাজরায় যখন ৮০ লক্ষ টাকা, রাজ্যের ৩১২টি ব্লক খুঁজলে জবকার্ড হাতিয়ে টাকা আত্মস্যাৎ করার অঙ্কটি কেন্দ্রীয় সরকার যা বলছে তার কাছাকাছি এসে যাবে, এই অনুমান করার সঙ্গত কারণ আছে।

শিবু হাজরা সন্দেশখালিতে বসেই সংবাদমাধ্যমকে ইন্টারভিউ দিচ্ছেন, পুলিশকে ডেকে সিপিআইএম নেতার বিরুদ্ধে মিথ্যা এফআইআর রুজু করছেন, ওই এলাকায় কেউ তার কেশাগ্র স্পর্শ করতে পারবে না। প্রশাসন এবং পুলিশ সিপিআইএম নেতা নিরাপদ সর্দারকে হেনস্থা করে প্রতিবিপ্লবের পৈশাচিক আনন্দ উপভোগ করছে। যোগ করা উচিত এই কথাটিও যে, শিবু হাজরাদের এই কুৎসিৎ নাটক এবং পাশাপাশি মহিলাদের প্রবল বিক্ষোভ, কোনওটিই রাজ্যের তথাকথিত বিদ্বজ্জনদের বিন্দুমাত্র বিচলিত করতে পারছে না। বিক্ষোভরত মহিলারা আদিবাসী কিনা তৃণমূলের জনৈক বিধায়ক এ প্রশ্ন তুলেও পার পেয়ে যাচ্ছেন এই রাজ্যে।

অন্যদিকে সুকান্ত মজুমদার টাকিতে বসে সরস্বতী পুজো করে সন্দেশখালির ঘটনার নিন্দা করছেন। বিজেপি কেন্দ্রে ক্ষমতায় আছে, কিন্তু শাজাহান শেখ বহাল তবিয়তেই ঘুরে বেড়াচ্ছেন। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের দিক থেকে কোনও হস্তক্ষেপ নেই। বিজেপি চায়, সন্দেশখালির রাজনীতির কোনও পরিসরেই যেন নিরাপদ সর্দারেরা ঢুকে পড়তে না পারেন। সরস্বতী পুজো থেকে হাসপাতাল ঘুরে সুকান্ত মজুমদার কবে ধামাখালি পৌঁছবেন সেটা আমরা জানি না। তবে মাফিয়াশাসিত পশ্চিমবঙ্গ মুক্ত করার সাধ কিংবা সাধ্য কোনওটাই এদের নেই। যারা পারবেন এই প্রতিবিপ্লব মোকাবিলা করে জনগণের ক্ষমতায়নের পশ্চিমবঙ্গ ফিরিয়ে আনতে, তাদের মিছিল দীর্ঘতর হচ্ছে। পরিস্থিতির এটিই হল ইতিবাচক দিক। ‌


প্রকাশের তারিখ: ১৭-ফেব্রুয়ারি-২০২৪

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org