চীনের অগ্রগতির লক্ষ‍্যে শক্তিশালী করা হচ্ছে সেদেশের পার্টিকে

এম এ বেবি
আমাদের প্রতিনিধিদের সুযোগ হয়েছিল দারিদ্র দূরীকরণ কর্মসূচি কী, তা সরাসরি বুঝে নেওয়ার। এগুলির একেবারে নিখুঁতভাবে পরিকল্পনা করা হয় এবং তারপর কার্যকর করা হয়। গ্রামগুলিকে পর্যটন কেন্দ্র হিসাবে উন্নীত করা হয়েছে, কৃষকদের ও প্রান্তিক গোষ্ঠীর লোকজনদের আর্থিক অবস্থার উন্নতি ঘটানো হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন এলাকায় এ ধরনের বৈচিত্রসম্পন্ন উদ্যোগ কার্যকর করা হয়েছে। এগুলি করার সময় নজরে রাখা হয়েছে স্থানীয় স্তরে উন্নয়নের ওপরে। সিপিআই (এম)-এর নেতৃত্বাধীন কেরলের এলডিএফ সরকার একই ধরনের গ্রামীণ পর্যটন উন্নয়ন উদ্যোগ কার্যকর করার চেষ্টা চালাচ্ছে।

আমরা যে চীনের হুবেই প্রদেশে গিয়েছিলাম, সেই সফর থেকে আমরা অনেক কিছু শিখেছি। বিশ্বের বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র, থ্রি গর্জেস ড্যাম তৈরি করা হয়েছে হুবেই প্রদেশে ইয়াংসে নদীর ওপর। নদীর ধারের এলাকাগুলিতে থাকা লোকজন নিয়মিত বন্যা কবলিত হতেন এই নদীর কারণে। তাই এই বাঁধ তৈরির মূল লক্ষ্য ছিল বন্যা ঠেকানো। একইসঙ্গে লক্ষ্য ছিল বিপুল হারে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা এবং ইয়াংসে নদী দিয়ে বড় বড় জাহাজ চলাচলের পথ সুগম করা। এছাড়াও এই প্রকল্প থেকে আরও অনেক সুবিধা মিলেছে। বিপুলায়তন মালবাহী জাহাজ এবং যাত্রীবাহী জাহাজ এই বাঁধ পার হয়ে যাচ্ছে, এমন দৃশ্য প্রত্যক্ষ করাটা সত্যিই নজরকাড়া। এই দৃশ্য দেখতে আসেন বিশ্বের সব প্রান্তের পর্যটকেরা। এই বাঁধ নির্মাণকে মনে করা হয় ইঞ্জিনিয়ারিং-এর এক আশ্চর্য কীর্তি। এখানে জাহাজ আটকে রাখার এবং জাহাজ যাওয়ার জন্য জলতল বাড়িয়ে তোলার একটি অসাধারণ ব্যবস্থা রয়েছে। এই ব্যবস্থার সাহায্যে একেবারে নীচুতলা থেকে ওপরতলা, এভাবে মোট পাঁচটি স্তরে জাহাজগুলোর জলতল বাড়িয়ে তুলে পারাপার করা যায়। এটা করা হয় বাঁধের জলের উচ্চতা বাড়িয়ে দেওয়ার সাহায্যে। আরেকটি উল্লেখযোগ্য সাফল্যের কথাও বলতে হবে। এখানকার বহু জমিকে জলাধারে পরিণত করা হয়েছে। এর ফলে সরাতে হয়েছিল ১০ লক্ষ মানুষকে। বড়সড় কোনও অভিযোগ ছাড়াই এই ১০ লক্ষ মানুষকে ভালভাবে পুনর্বাসন দেওয়ার কাজ সুসম্পন্ন করা হয়েছে। পুনর্বাসিত এই সব গ্রামের কয়েকটিতে আমরা যেতে পেরেছি এবং স্থানীয়দের সঙ্গে কথাও বলেছি। এই ধরনের চিত্তাকর্ষক ও শিক্ষামূলক অভিজ্ঞতার পর হাই স্পিড ট্রেনে চেপে আমরা গেলাম হুবেই প্রদেশের রাজধানী উহানে। 

ঐতিহাসিক উহান

উহানের উচাঙ জেলায় রয়েছে সেন্ট্রাল পেজান্টস মুভমেন্ট ট্রেনিং ইনস্টিটিউট। চীনের ঐতিহাসিক বিপ্লবী আন্দোলনের প্রতীক হিসাবে দাঁড়িয়ে রয়েছে এই প্রতিষ্ঠানটি। এর সঙ্গে বেজিংয়ে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির মিউজিয়ামের তুলনা করাই যায়। ওই মিউজিয়ামটি চীনের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) শততম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষ্যে উদ্বোধন করা হয়েছিল। এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বেজিং-এর মিউজিয়ামের পার্থক্য হল, বেজিং-এর মিউজিয়াম গড়ে তোলার কাজে আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে ব্যাপকভাবে কাজে লাগানো হয়েছে। উহান রিভলিউশন মিউজিয়াম রয়েছে কিং রাজবংশের আমালের একটি স্কুল বাড়িতে। এই মিউজিয়ামটি চীনের বিপ্লবী ইতিহাসের একটি নির্ধারক সময়ের স্মারক। 

কমিউনিস্ট পার্টি ও কুওমিনতাং-এর সহযোগিতার পর্বে, দুপক্ষের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠাটি গড়ে তোলা হয়েছিল। এখানে কমরেড মাও জেদঙ ছিলেন সিপিসি-র ফারমার্স কমিটির সেক্রেটারি পদে। এখানে যৌথভাবে প্রশিক্ষণ ও শিক্ষা কর্মসূচি চালানো হত, যার লক্ষ্য ছিল নতুন ক্যাডার তৈরি করা এবং কৃষক আন্দোলন গড়ে তোলা। এই কেন্দ্রের শৃঙ্খলা ছিল কঠোর। নিয়ম ভাঙলে শাস্তির সাত রকম ব্যবস্থা চালু ছিল: সতর্ক করা, ভর্ৎসনা করা, রাইফেল নিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা, রবিবারের ছুটি বাতিল, বাধ্যতামূলক শারীরিক শ্রম, বাধ্যতামূলক গার্ড ডিউটি, পড়াশোনার কর্মসূচি ও পার্টির সদস্যপদ থেকে বহিষ্কার। এ থেকে বোঝা যায় বিপ্লবী অভ্যুত্থানের ওই দিনগুলিতে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচি কতটা গুরুত্ব সহকারে কার্যকর করা হত। এবং সেখানে শৃঙ্খলা কত কঠোর ছিল। 

এই পর্বেই মাও জেদঙ লিখেছিলেন তাঁর সেই বিখ্যাত থিসিস: ‌‘‌হুনানের কৃষক আন্দোলনের তদন্ত রিপোর্ট।’‌ এই ইনস্টিটিউট-এর কাছেই একটি বাড়িতে মাও থাকতেন। কখনও একাই থাকতেন। কখনও থাকতেন সপরিবারে।

১৯২৭ সালের ২৭ এপ্রিল থেকে ৯ মে, চীনের কমিউনিস্ট পার্টির ঐতিহাসিক পঞ্চম কংগ্রেস উহানের কাছাকাছি একটি জায়গায় অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তবে কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হওয়ার কয়েক সপ্তাহ আগে ১২ এপ্রিল কুওমিনতাং-এর জেনারেল চিয়াং কাই-শেক ও তাঁর জাতীয় (প্রতি)বিপ্লবী সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে দক্ষিণপন্থী গোষ্ঠী প্রায় ১০ হাজার কমরেড ও কমিউনিস্ট দরদীকে হত্যা করে। পরে এই ঘটনা শাংহাই গণহত্যা নামে পরিচিত হয়েছিল। এই ঘটনার জেরে কুওমিনতাঙের বাম ও দক্ষিণপন্থীদের মধ্যে ফাটল আরও বাড়ে। এর পরের পর্বে কুওমিনতাং-এর প্রতিবিপ্লবী নীতিসমূহের বিরুদ্ধে কমিউনিস্ট পার্টির সংগ্রাম, যার মধ্যে পড়ে লং মার্চের মতো ঘটনা, এসবই সারা বিশ্বের বিপ্লবী আন্দোলনের ইতিহাসের সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে রয়েছে। 

আমরা একটি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধান, অত্যাধুনিক অটোমোবাইল এগজিবিশন সেন্টারও দেখেছি। সেখানে ছিল এম-হিরো ৯৭-এর মতো বিশেষ ধরনের গাড়ি — পূর্ণ আয়তনের বিলাসবহুল এসএইভি— যাতে রয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। এই গাড়ি হল অটোমোবাইল ক্ষেত্রে চীনের প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং উৎকর্ষের নিদর্শন। গাড়িটির বৈশিষ্ট্য হল, চার চাকাতেই ইন্ডিপেন্ডেন্ট স্টিয়ারিং এবং কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ঝড়ের গতিতে চলতে পারে। এসব দেখে আমাদের মনে পড়ল চীনের ব্যস্তসমস্ত সরকারি রাস্তা দিয়ে চালকহীন গাড়িতে চড়ে যাওয়ার চিত্তাকর্ষক অভিজ্ঞতার কথা।  

দারিদ্র দূরীকরণ

আমাদের সফরের শেষ পর্বে আমরা গেলাম ঝেজিয়াং প্রদেশে। জায়গাটা শাংহাই ও জিয়াংশির কাছে। ঝেজিয়াং জেলা বিখ্যাত জ্যাক মা-র মতো  উদ্যোগপতি এবং ডিপসিক-এর মতো কোম্পানিগুলির জন্য। চীনের বর্তমান প্রেসিডেন্ট এহং সিপিসি-র সেক্রেটারি, শি জিনপিং এখানে ২০০২ সাল থেকে ২০০৭ পর্যন্ত ছিলেন প্রাদেশিক সেক্রেটারি। এই পদে থাকার সময় তিনি সকলের সমৃদ্ধির ধারণাটিকে আলোচনায় এনেছিলেন এবং পরে তা পার্টিতে গৃহীত হয়েছিল। 

আমরা বেশ কয়েকটি কেন্দ্র ঘুরে দেখলাম যেগুলি সাধারণ মানুষকে জন পরিষেবা দেয়। সেগুলির মধ্যে অন্যতম উল্লেখযোগ্য ছিল শাংচেঙ জেলায়। এখান থেকে পার্টি পরিষেবা, এলাকাগত পরিষেবা, সরকারি পরিষেবা এবং জন-পরিষেবা সব কিছুই সময়ে ও অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে দেওয়া হয়। পরিষেবা পাওয়া  ছাড়াও, এখানে জড়ো হয়ে লোকেরা গল্পগুজব করতে পারেন এবং বিনোদনে সময় কাটাতে পারেন। এই কেন্দ্রে চুল কাটা, দর্জি পরিষেবা, ছাতা সারানো, বাড়ির জিনিসপত্র সারানো — সব ধরনের পরিষেবাই পাওয়া যায়। 

আমাদের প্রতিনিধিদের সুযোগ হয়েছিল দারিদ্র দূরীকরণ কর্মসূচি কী, তা সরাসরি বুঝে নেওয়ার। এগুলির একেবারে নিখুঁতভাবে পরিকল্পনা করা হয় এবং তারপর কার্যকর করা হয়। গ্রামগুলিকে পর্যটন কেন্দ্র হিসাবে উন্নীত করা হয়েছে, কৃষকদের ও প্রান্তিক গোষ্ঠীর লোকজনদের আর্থিক অবস্থার উন্নতি ঘটানো হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন এলাকায় এ ধরনের বৈচিত্রসম্পন্ন উদ্যোগ কার্যকর করা হয়েছে। এগুলি করার সময় নজরে রাখা হয়েছে স্থানীয় উন্নয়নের ওপরে। সিপিআই (এম)-এর নেতৃত্বাধীন কেরলের এলডিএফ সরকার একই ধরনের গ্রামীণ পর্যটন উন্নয়ন উদ্যোগ কার্যকর করার চেষ্টা চালাচ্ছে।

অর্থনৈতিক বিকাশ

চীনের অর্থনীতি এখন কাজ করছে বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ইঞ্জিন হিসাবে। এই ধারাবাহিক বিশিষ্টতার পিছনে প্রধান কারণ হিসাবে কাজ করছে চীনের অনুসরণ করা স্বতন্ত্র অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নীতিসমূহ। ২০২২ সালে সিপিসি-র ২০তম কংগ্রেসের অনুষ্ঠিত হয়। সে বছর চীনের গ্রস ডোমেস্টিক প্রোডাক্ট বা জিডিপি-র পরিমাণ ছিল ১১৪ লক্ষ কোটি ইউয়ান। ২০২৫ সালে সংখ্যাটা বেড়ে হয়েছে ১৩৭.৩৬ লক্ষ কোটি ইউয়ান। শস্য উৎপাদনে চীন বিশ্বের মধ্যে প্রথম, ম্যানুফ্যাকচারিং-এও চীন রয়েছে প্রথম সারিতে, যার ফলে চীনকে এখন বলা হয় ‘‌সারা বিশ্বের ফ্যাক্টরি’‌। চীনের মাথাপিছু বার্ষিক আয় ১৩৩০৩.৩ মার্কিন ডলার, ভারতের মাথাপিছু বার্ষিক আয় ২৬৯৬.৭ মার্কিন ডলার।

এক ক্লিকেই ফলো করুন মার্কসবাদী পথের হোয়াটস্যাপ চ্যানেল  

চীনের যে এত অগ্রগতি ঘটছে তার অন্যতম কারণ শিক্ষায় গুরুত্ব, বিশেষ করে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষায় গুরুত্ব। এর আগে, জার্মানিকে মনে করা হত উদ্ভাবনের জগতের নায়ক। সম্প্রতি ওয়ার্লড ইনটেকলেচুয়াল প্রপার্টি অর্গানাইজেসন  (‌ডব্লিউআইপিও)‌ যে ১৩৯টি দেশের বিশ্ব রাঙ্কিং প্রকাশ করেছে, তাতে বিশ্বের প্রথম দশটি সবচেয়ে বেশি উদ্ভাবক দেশের তালিকায় জার্মানি নেই। জার্মানিকে সরিয়ে উঠে এসেছে চীন এবং এটা এখন সুপ্রতিষ্ঠিত প্রবণতা। ২০২৩ সালে, চীনে কার্যকর পেটেন্টের সংখ্যা ছিল ৫০ লক্ষ — যা অন্য যে কোনও দেশের চেয়ে বেশি। আগের বছরের তুলনায় চীনের পেটেন্ট সংক্রান্ত কাজকর্ম এবছর বেড়েছে ১৮.৫ শতাংশ। পরিমাণের নিরিখে চীনকে এখন বিবেচনা করা হয় বিশ্বের সবচেয়ে উদ্ভাবনশীল দেশগুলির অন্যতম হিসাবে। এটা সম্ভব হয়েছে গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের ফলে।

চীনে বেসরকারি ক্ষেত্র কাজ করে রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রের জোরদার নজরদারির অধীনে। যারা উদ্যোগপতি তাঁদের কাছ থেকে আশা করা হয় যে তাঁরা কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করবেন এবং রাষ্ট্রীয় কোষাগারে কর বাবদ অর্থ দেবেন। আবার দেশের সার্বিক উন্নয়নকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রেও তারা সক্রিয় ভূমিকা পালন করবেন। চীনের প্রেসিডেন্ট ও সিপিসি-র সাধারণ সম্পাদক শি জিনপিং এই বিষয়ে জোর দিয়ে বলেছেন যে, এই দৃষ্টিভঙ্গী সমাজতন্ত্রের প্রাথমিক স্তরের নির্দিষ্ট পরিস্থিতির সঙ্গে মিলে যায়। এই বিষয়টাও উল্লেখযোগ্য যে, স্বাধীন মার্কসবাদী চিন্তাবিদ ডেভিড হার্ভে, যিনি এক সময়ে চীনের নীতির কড়া সমালোচক ছিলেন, তিনি চীনের এই নতুন দিশার দারুণ প্রশংসা করেছেন। 

মার্কসবাদী-লেনিনবাদী পার্টি হিসাবে সিপিসি তিনটি বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ করেছে। প্রথমত, সিপিসি চেষ্টা করছে দেশের অঞ্চলগুলির মধ্যে ও নাগরিকদের মধ্যে আর্থিক বৈষম্য কমিয়ে আনতে। দ্বিতীয়ত, সরকার, পার্টি ও সাধারণভাবে সমাজে দুর্নীতি দমনে বিশেষভাবে জোর দিয়েছে সিপিসি। তৃতীয়ত, সিপিসি একনিষ্ঠভাবে নজর দিয়েছে বাস্তুসংস্থানের ভারসাম্য এবং পরিবেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর। একথা ঘোষণা করা হয়েছে যে, সমাজে অসাম্য দূরীকরণে জোরদার হস্তক্ষেপ চালিয়ে যাওয়া হবে এবং আসন্ন পঞ্চদশ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় এবিষয়ে আরও জোর দেওয়া হবে। 

দু ধাপের স্ট্র্যাটেজিক পরিকল্পনা

সিপিসি এবার যাত্রা শুরু করেছে তাদের দ্বিশতবার্ষিকীর পথে। সেজন্য তারা তৈরি করেছে দুই ধাপের স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান। প্রথম পর্ব ২০২০ থেকে ২০৩৫। এই পর্বের লক্ষ্য হল সমাজতান্ত্রিক আধুনিকীকরণ সম্পূর্ণ করা। দ্বিতীয় পর্বের বিস্তার ২০৩৫ থেকে ২০৪৯ সাল। সেই বছরটা হবে গণ-প্রজাতন্ত্রী চীনের শতবার্ষিকী। এই পর্বে চীন হতে চায় বিরাট আধুনিক সমাজতান্ত্রিক দেশ। চূড়ান্ত বিচারে, আসল লক্ষ্য হল সমৃদ্ধ, শক্তিশালী, গণতান্ত্রিক, সাংস্কৃতিকভাবে উন্নত, সঙ্গতিপূর্ণ এবং সুন্দর চীন গড়ে তোলা।

দুর্নীতি দমনে সিপিসি অস্বাভাবিকভাবে কঠোর সংশোধনী ব্যবস্থা নিয়েছে। যখন আমরা চীন সফর করছি, তখন পার্টির আন্তর্জাতিক দপ্তরের প্রধানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে তদন্ত চলছিল। এর জেরে তাঁকে পদ থেকে সরে দাঁড়াতে হয়। ফিরে আসার পর জানতে পেরেছি, তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের প্রমাণ মিলেছে, এবং তাঁর বিরুদ্ধে শৃঙ্খলাভঙ্গের জন্য পদক্ষেপ করা হয়েছে। দুটি পার্টি কংগ্রেসের মধ্যে, সেন্ট্রাল কমিশন ফর ডিসিপ্লিন ইন্সপেকশন-এর হস্তক্ষেপের ফলে বিভিন্ন স্তরে ৭৪ হাজার ব্যক্তি পার্টি সদস্যকে দুর্নীতির অভিযোগে শাস্তি দেওয়া হয়েেছ। ২০১৫ সাল থেকে একই ধরনের পদক্ষেপ করা হয়েছে ৪৭০০ ব্যক্তি পার্টি আধিকারিকদের আত্মীয়দের পরিচালিত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। 

কাজ, ব্যবহার ও শৃঙ্খলাবোধের উন্নতি ঘটাতে হবে

পার্টি ও সরকারে কাজ, ব্যবহার ও শৃঙ্খলাবোধের উন্নতি ঘটাতে পলিট ব্যুরো এবং কেন্দ্রীয় কমিটি আটটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশিকা জারি করেছে:

১। তৃণমূল স্তরে বিশদে গবেষণা চালান যাতে প্রকৃত পরিস্থিতি বোঝা যায়
২। সভার আগে যাতে ভালভাবে প্রস্তুতি নেওয়া হয় এবং দক্ষতার সঙ্গে সভা সংগঠিত করা হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
৩। আনুষ্ঠানিক নথি ও রিপোর্ট লিখুন সংক্ষেপে ও স্পষ্টভাবে
৪। বিদেশ ভ্রমণের সময় আগাম নির্ধারিত পদ্ধতিগুলি মেনে চলুন
৫। নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করুন এবং জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ আরও উন্নত করুন
৬। যখন সংবাদ সংক্রান্ত রিপোর্ট পরিবেশন করছেন তখন সেগুলির গুণমান ও উপস্থাপনা যাতে ভাল হয় তা দেখুন
৭। নিবন্ধ প্রকাশ করার সময় কঠোর নিয়মকানুন মেনে চলা নিশ্চিত করুন
৮। পার্টি ও সরকারের বিষয়ে সততা ও সারল্য রক্ষা করে চলুন, দুর্নীতি ও অপব্যয় এড়িয়ে চলুন

জাঁকজমকপূর্ণ জীবনযাত্রা ও প্রকাশ্যে মদ খাওয়ার বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান নিয়েছে চীনের কমিউনিস্ট পার্টি। অতীতে বিভিন্ন প্রতিনিধি দলের জন্য আয়োজন করা ভোজসভায় ভাষণ এবং উদযাপনের অংশ হিসাবে প্রায়ই ওয়াইন বা স্পিরিট দেওয়া হত। এই প্রথা এখন পুরোপুরি তুলে দেওয়া হয়েছে। মদ খাওয়ার অভ্যাসকে একেবারেই প্রশ্রয় দেয় না সিপিসি। এর ফলে জনগণের বৃহত্তর অংশের মধ্যে পার্টির অনুকূল ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছে। চীনের কমরেডদের সঙ্গে এ সব নিয়ে আলোচনা করার সময় তাঁরা বললেন যে, সোভিয়েত ইউনিয়নের ক্ষয় ও সোভিয়েত ভেঙে যাওয়ার পিছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল ব্যাপক হারে ভোদকার প্রতি আসক্তি।

নিউ ইয়র্কে রাষ্ট্রসঙ্ঘের জলবায়ু শীর্ষ সম্মেলনে তাঁর অনলাইন ভাষণে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এব্যাপারে জোর দিয়েছেন যে, জলবায়ু বদল ঠেকাতে যে যৌথ প্রয়াস চলছে তাতে আন্তরিকভাবে এবং সক্রিয় অংশগ্রহণ করতে হবে। অন্য অনেক দেশের তুলনায় চীনের শহরের ও গ্রামীণ পরিবেশ মনে হল ভালরকম উন্নত — ঘন সবুজে ঢাকা শহর ও আবাসিক এলাকা সর্বত্রই চোখে পড়েছে। পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্য সচেতনতা জনজীবনের একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য। সাধারণ জনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি একেবারে আদর্শ এবং কোথাও একটা রাস্তার কুকুরেরও দেখা মেলেনি। 

চীনের পার্টির শিক্ষাগত কর্মসূচি রীতিমতো কঠোরতার সঙ্গে কার্যকর করা হয় এবং এটা এমন একটা অভিজ্ঞতা যা অনেক কিছু জানতে সাহায্য করে। প্রযুক্তি, শিল্প, কৃষি, পরিকাঠামো উন্নয়ন — নানা ক্ষেত্রে চীন বিপুল প্রগতির পথে এগিয়ে গেছে। জনজীবনের সর্বাঙ্গীন উন্নতির দিকেও নজর রাখা হয়েছে যাতে চীন একটা শক্তিশালী ও সুসঙ্গত উন্নত সমাজতান্ত্রিক দেশ হিসাবে এগিয়ে যেতে পারে। যখন ২০৪৯ সালে চীনের গণ প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার শতবার্ষিকী উদযাপন করা হবে, যাতে ব্যক্তিগতভাবে তার অভিজ্ঞতা পাওয়া যায়। 

যাঁরা এই চীন সফরে গিয়েছিলেন সেই প্রতিনিধিদলে ছিলেন কমরেড মহম্মদ সেলিম, কমরেড জিতেন্দ্র চৌধুরী, কমরেড আর অরুণ কুমার, কমরেড কে হেমলতা এবং কমরেড সি এস সুজাতা। পুরো সফরের সময় জুড়ে যে আতিথেয়তা আমরা পেয়েছি তা তুলনাহীন। সংক্ষেপে, এই প্রতিনিধি দলের ৮ দিনের সফর আমাদের সাহায্য করেছে দুই দেশ, দুই দেশের জনগণ ও দুই পার্টির মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও জোরদার করতে। 

ভাষান্তর: সুচিক্কণ দাস 
সূত্র: পিপলস ডেমোক্রেসি


প্রকাশের তারিখ: ২০-অক্টোবর-২০২৫

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org