সামন্ততান্ত্রিক আইন ও প্রথার বিরুদ্ধে লড়াই

রেণু চক্রবর্তী
কমিউনিস্ট মহিলারা এই বিষয়ে গণপ্রচার চালিয়েছিলেন। বিবাহ, উত্তরাধিকার ইত্যাদির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত হিন্দু আইনের পরিবর্তনের পক্ষে সর্বভারতীয় মহিলা কনফারেন্স (AIWC) এবং কিছু অন্যান্য সংগঠনও সমর্থন জানায়। ১৯৪১ সালে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে রাও কমিটিকে নিযুক্ত করা হয়, এবং এই কমিটি ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন সাক্ষ্য প্রমাণ জোগাড় করার পর ১৯৪৩ সালে তাদের সুপারিশগুলো জানায়। সর্বভারতীয় মহিলা কনফারেন্স রাও কমিটির সুপারিশে তাদের পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছিল এবং গোঁড়া হিন্দু সমাজের আক্রমণের বিরোধিতা করেছিল।

ভারতীয় সমাজব্যবস্থায়, বিশেষত এদেশে সামন্ততান্ত্রিক আইন ও প্রথাগুলি যেভাবে মেয়েদের পুরুষদের অধীনস্থ ও পুরুষদের তুলনায় নিকৃষ্ট হিসেবে গণ্য করেছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে কমিউনিস্ট মহিলারা দীর্ঘদিন ধরে সামন্ততন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন এবং করে চলেছেন এখনও।

সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থায় মেয়েদের শৃঙ্খলিত ও আবদ্ধ করে রাখার হাজারটা উপায় ছিল এবং ক্রমাগত প্রচার করা হত তারা পুরুষের সমকক্ষ নয়। এই সব চিন্তাভাবনাকে মান্যতা দেওয়ার জন্য সংহিতা, প্রধানত মনু সংহিতা থেকে বিভিন্ন ধর্মীয় ফরমান উদ্ধৃত করা হত। যেমন, ‘একজন নারী শৈশবকালে পিতার অধীন, যৌবনকালে স্বামীর অধীন, এবং বার্ধক্যে পুত্রের অধীন’- প্রায়শই উদ্ধৃত এই বক্তব্য আসলে যুগ যুগ ধরে প্রচলিত সামাজিক ব্যবস্থায় মহিলাদের মর্যাদাহীন অবস্থানের প্রতিচ্ছবি। এইসব শৃঙ্খল ছিন্ন করে ফেলতে না পারলে নারীর সামাজিক সমানাধিকার অর্জন বা নারীর ক্ষমতায়ন কোনোটাই কোনোদিন সম্ভবপর হত না। 

তাই, কমিউনিস্ট মহিলারা লড়াই করেছেন পর্দাপ্রথা আর মেয়েদের অন্দরমহলে আটকে রাখার বিরুদ্ধে, কারণ সমাজে সর্বসাধারণের জীবনস্রোতের মধ্যে মিশে যাওয়ার ক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবে সবচেয়ে বড়ো অন্তরায় ছিল এই প্রথাগুলি। উনিশ শতক থেকেই রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বীরসা লিঙ্গম পানতুলু, রানাডে এবং আরও অনেক মহৎ সমাজ সংস্কারক এই সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন। কমিউনিস্ট মহিলারা এই সংগ্রামী ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার বহন করেছিলেন। আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন সাধন এবং সামন্তপ্রথার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হওয়ার লড়াইয়ে মেয়েদের সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করার জন্য উদ্বুদ্ধ করেছিলেন তাঁরা। 

এই কাজ করতে গিয়ে কমিউনিস্ট মহিলাদের যাবতীয় নিন্দা আর অপবাদের সম্মুখীন হতে হয়েছিল, কারণ তাঁরা বাড়ি বাড়ি ঘুরে প্রচারের মাধ্যমে মেয়েদের বোঝাতেন কেন নিজেদের দারিদ্র, দুঃখকষ্ট আর নানান মানসিক সমস্যার কারণ নির্দেশ করতে পারার জন্য বিভিন্ন রাজনৈতিক ঘটনাবলী এবং অর্থনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকা জরুরি। সামাজিক পরিবর্তনের নানা আন্দোলনে সাধারণ মানুষের কাজকর্মে তাঁরা সাধারণ মহিলাদের যুক্ত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। কেবলমাত্র পর্দাপ্রথাই নয়, অজ্ঞতার অন্ধকার, কুসংস্কার, শিক্ষার অভাব, আর্থিকভাবে সম্পূর্ণরূপে পুরুষের অধীন হয়ে থাকা এবং বিবাহ, উত্তরাধিকার কিংবা ভয়ঙ্কর অভিশাপ পণপ্রথার মতো সামাজিক নানা ব্যবস্থায় মেয়েদের নিকৃষ্টতম অবস্থান - এই সবকিছুর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর জন্য প্রয়োজন ছিল এক বৈপ্লবিক উদ্দীপনা, কারণ এই গোঁড়ামি এবং সামন্ততান্ত্রিক ধ্যানধারণা শুধুমাত্র পুরুষদেরই নয়, নারীদের নিজস্ব চেতনাতেও শক্তভাবে প্রোথিত হয়ে গিয়েছিলো। এইসব রীতিনীতির বিরুদ্ধাচরণ করার জন্য প্রয়োজন ছিল অপরিসীম সাহস। কমিউনিস্ট মহিলাদের এবং তখনকার প্রগতিশীল ভারতীয় পুরুষ ও সাধারণ মহিলাদের যৌথভাবে যে প্রচণ্ড সংগ্রাম করতে হয়েছিল রাও কমিটির সিভিল আইন বিধিবদ্ধ করার সাফল্য ও ব্যর্থতার ইতিহাসই তার যথেষ্ট প্রমাণ। সেই লড়াই এখনও শেষ হয়নি।

কমিউনিস্ট মহিলারা বরাবরই ভারতবর্ষের সর্বত্র একটি সর্বজনীন সিভিল কোড প্রচলনের পক্ষে ছিলেন । এর উল্টোদিকে চূড়ান্ত বিরোধিতা শুরু হয়েছিলো। অগত্যা, শুরুতেই এই বক্তব্য থেকে সরে এসে, বিভিন্ন ইস্যুভিত্তিক পদক্ষেপের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। বিবাহ, উত্তরাধিকার ইত্যাদি বিষয়ক যে হিন্দু কোড ছিল তাকে প্রথমে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে দেখা শুরু হল। আইনের অভিন্নতার যে চেতনা, পরবর্তীতেও তার ধাপে ধাপে প্রসার ঘটানো সম্ভবপর ছিল। হিন্দু নিয়ম ও অনুশাসন দ্বারা পরিচালিত মেয়েদের অভিজ্ঞতা থেকে স্পষ্ট বোঝা গিয়েছিল তৎকালীন পরিস্থিতিতে এই নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত স্বতন্ত্র একজন মহিলার যদি ধর্মীয় শ্লোক আর শাস্ত্রীয় ফরমান দ্বারা পরিচালিত গোঁড়া সামন্ততান্ত্রিক রীতিনীতি, যা ক্রমাগত অনগ্রসর ভাবনাচিন্তাকে শক্তিশালী করে, তার বিরুদ্ধে লড়াই করার অদম্য জেদ ও সাহস না থাকে, তাহলে আইনের ক্ষেত্রে শুধু নয়, বাস্তব সমাজকাঠামোতেও সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা অসম্ভব। এই লড়াইতে নারী জাতিকে উদ্ধুদ্ধ করা প্রয়োজন ছিলো। সামন্ততন্ত্রের ছাতার নীচে, যে সুবিশাল অংশের স্বতন্ত্র মানুষ চাপা পড়ে যাচ্ছিল, তাদের এই মধ্যযুগীয় বন্ধন থেকে মুক্তির প্রয়োজন এবং মুক্তির সম্ভাবনা সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠা অত্যন্ত জরুরি ছিল।

কমিউনিস্ট মহিলারা এই বিষয়ে গণপ্রচার চালিয়েছিলেন। বিবাহ, উত্তরাধিকার ইত্যাদির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত হিন্দু আইনের পরিবর্তনের পক্ষে সর্বভারতীয় মহিলা কনফারেন্স (AIWC) এবং কিছু অন্যান্য সংগঠনও সমর্থন জানায়। ১৯৪১ সালে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে রাও কমিটিকে নিযুক্ত করা হয়, এবং এই কমিটি ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন সাক্ষ্য প্রমাণ জোগাড় করার পর ১৯৪৩ সালে তাদের সুপারিশগুলো জানায়। সর্বভারতীয় মহিলা কনফারেন্স রাও কমিটির সুপারিশে তাদের পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছিল এবং গোঁড়া হিন্দু সমাজের আক্রমণের বিরোধিতা করেছিল। কিন্তু গ্রাম এবং শহরের সাধারণ গরিব মহিলাদের হিন্দু কোড বিলের পক্ষে আনার জন্য কমিউনিস্ট মহিলারা, বিভিন্ন গণসংগঠন মারফত, সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেন এবং এই সামাজিক পরিবর্তন ঘটানোর পক্ষে সর্বসাধারণের সম্মতি আদায়ে সক্ষম হন। সামান্য কিছু উদাহরণের মাধ্যমেই এই পরিস্থিতি বর্ণনা করা সম্ভব। 

মহিলাদের সংগঠন ‘মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি’ (MARS) বাংলায়, প্রায় প্রতিটি জেলার প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে এই প্রচার চালানোর কাজ শুরু করে। কেন্দ্রীয় পরিষদ দ্বারা হিন্দু মহিলাদের সম্পত্তি বিল (Property Bill) দ্রুত আইন হিসেবে পাস করাতে হবে এই দাবী নিয়ে ১৯৪৩ সালের, ২৭শে আগস্ট নিখিল বঙ্গ মহিলা আত্মপ্রকাশ সমিতি, সর্বভারতীয় মহিলা কনফারেন্স (AIWC) এবং মহারাষ্ট্র ভগিনী সমাজ কলকাতার মহাবোধি সোসাইটি হলে একত্রিত হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভ্রাতুষ্পুত্রী এবং একবারে গোড়ার দিকের নারী স্বাধীনতা সংগ্রামীদের  অন্যতম, সরলাদেবী চৌধুরানি এই সভায় সভাপতিত্ব করেন। 

বাংলার গ্রামে এবং শহরাঞ্চলের বস্তিগুলিতে মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি এই গোটা বিষয়কে কেন্দ্র করে মহিলাদের মধ্যে সই সংগ্রহ অভিযান চালায়। ১৯৪৩ সালের ২৭শে আগস্টের মধ্যে তাঁরা প্রায় ২০০০ সই সংগ্রহে সক্ষম হন। সর্বত্র বিভিন্ন সভা সংগঠিত হচ্ছিল। বিলের বিপরীতে যারা ছিলেন তাঁরা রাও কমিটির প্রমাণ সংগ্রহের ক্ষেত্রে নানান সমস্যা তৈরি করছিলেন।  হিন্দু ধর্মে বহুবিবাহের প্রতি সমর্থন, বিবাহবিচ্ছেদের অস্বীকৃতি, কিংবা পিতার সম্পত্তিতে মহিলাদের অধিকার আদতে হিন্দুদের সমাজকাঠামোকে নষ্ট করবে ইত্যাদি অপপ্রচারের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে বোঝাবার জন্য কমিউনিস্ট মহিলাদের সঙ্গে সাধারণ মহিলারাও একটি বড় প্রচারসভার আয়োজন করেন।

ময়মনসিংহ জেলায় উনিশটি মহিলা সমিতি কেন্দ্র স্থাপিত হয়, এবং ১৯৪৩ সালের ২৫ শে আগস্টের মধ্যে প্রায় প্রতিটি মহকুমায় এই কেন্দ্রগুলি গড়ে ওঠে। মহিলা সংগঠকরা ছোট ছোট বাহিনী গড়ে তোলেন যারা গ্রামে গ্রামে গিয়ে মহিলাদের এ বিষয়ে আলোচনা করার জন্য আহ্বান জানাতেন। যেরকম, নালিতাবাড়ি অঞ্চলের মহিলা সমিতির কর্মীরা নিয়মিত বৈঠকী সভার আয়োজন করতেন এবং সপ্তাহে দুদিন তারা একত্র হয়ে বিভিন্ন গুরুতর সমস্যা বিষয়ে গল্পচ্ছলে আলোচনা করতেন। এই বৈঠকগুলির আলোচনায় অনেক সময় উঠে আসত মহিলাদের অধিকার, কিংবা বিবাহ সম্পর্কিত ‘হিন্দু কোড বিল'-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই বিষয়গুলি আলোচনার পরেই রাও কমিটির সমর্থনে স্বাক্ষর সংগ্রহ সম্ভবপর হয়েছিল। এভাবেই সমাজের বিভিন্ন স্তরের নারীদের মধ্যে মহিলা সমিতি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলো। যে গ্রামাঞ্চল ছিল সামন্ততন্ত্রের ঘাঁটি সেখান থেকেই বিবাহ এবং উত্তরাধিকার সম্পর্কিত আইন বদলের আন্দোলন সংগঠিত হতে শুরু করেছিল। 

১৯৪৪ সালে বাংলায়, মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি এবং AIWC একত্রে একটি  যৌথ কমিটি গঠন করে। এই কমিটির মূল উদ্দেশ্য ছিলো রাও কমিটির  সুপারিশের সমর্থনে ব্যাপক প্রচারমূলক কর্মসূচি নেওয়া। এই পরিকল্পনা সফল করার জন্য নারী-পুরুষ উভয়ের সঙ্গেই যোগাযোগ করা এবং তাদের সমর্থন আদায় করার জন্য আলোচনা চালানো ছিল অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। রাও কমিটির সুপারিশকে আরও উপযুক্ত প্রমাণ করতে, একটি বৃহত্তর স্বাক্ষর সংগ্রহ অভিযান আয়োজনও করা হয়েছিল। কলকাতায় বিভিন্ন সভা সংগঠিত হল। বিখ্যাত সাংবাদিক সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদারের সভাপতিত্বে মূলত বুদ্ধিজীবীদের অংশগ্রহণে দক্ষিণ কলকাতার তীর্থপতি স্কুলে একটি সভা সংগঠিত হল। প্রখ্যাত আইনজীবী শরৎ জানা বিলটি বিশ্লেষণ করে তার সমর্থনে বক্তব্য রাখলেন। সভায় উপস্থিত নারী - পুরুষ মিলিয়ে প্রায় একশোজন বিলটি সম্পর্কে বিশেষভাবে আগ্রহ প্রকাশ করেন। উত্তর কলকাতায় প্রয়াত জে. এন. বসুর বাড়িতে সরলাবালা সরকারের সভাপতিত্বে আরেকটি সভা আয়োজিত হয়। কংগ্রেস নেতা ক্ষিতীশ চক্রবর্তী সবরকম গোঁড়ামির বিরুদ্ধে যথাযথ যুক্তি দিয়ে এই বিলকে সমর্থন করেন। অভিজ্ঞ সাংবাদিক বিবেকানন্দ মুখার্জ্জিও এই বিল বর্ণনা করে, তাঁর সমর্থন জানান। AIWC-এর তরফ থেকে সব প্রশ্নের উত্তর দেন রেণুকা রায়। উত্তর কলকাতার গোঁড়া ও রক্ষণশীল পরিবেশের মধ্যে সর্বভারতীয় মহিলা কনফারেন্স এবং মহিলা আত্মরক্ষা সমিতির যৌথ উদ্যোগে সংগঠিত এই সভাটা ছিল একটা বড়সড় সাফল্য। 

রক্ষণশীল গোঁড়া হিন্দুত্ববাদের যুক্তিগুলোকে খণ্ডন করার জন্য একটা ছোট পুস্তিকা প্রকাশিত হয়, যেখানে কাত্যায়ণ, নারদ, বশিষ্ঠ প্রমুখ যাঁরা ‘শাস্ত্রবিদ’ হিসেবে হিন্দু ধর্মে স্বীকৃত, তাঁদের উদ্ধৃতি তুলে ধরে দেখানো হয় সেখানে পরিষ্কার ভাবে লেখা রয়েছে যদি কোনও হিন্দু মহিলার স্বামী যৌনরোগে আক্রান্ত হন, যৌনসঙ্গমে অপারগ হন, অসৎ হন অথবা চিকিৎসার অযোগ্য কোনও রোগে আক্রান্ত হন, তাহলে সেই মহিলা যথাবিধি সমারোহ পূর্বক পুনরায় অন্য পুরুষের সঙ্গে বিবাহের সম্পর্কে আবদ্ধ হতে পারেন। প্রসঙ্গত, নারদ মনু'র অন্যতম প্রধান ব্যাখ্যাকার হিসেবে স্বীকৃত। কিছু পণ্ডিত পরাশরকে মনুর পূর্ববর্তী বলে মনে করেন। তিনি স্পষ্টতই বলেছেন, যে স্বামী বিপথগামী হয়েছেন, বিকলাঙ্গ অথবা নিরুদ্দেশ হয়েছেন কিংবা সন্ন্যাস গ্রহণ করেছেন, তাঁর স্ত্রীর পুনর্বিবাহের সম্পূর্ণ অধিকার রয়েছে। কমিউনিস্ট মেয়েরা, বিশেষত কমলা মুখার্জ্জি স্মৃতি ও শ্রুতি বিষয়ে পণ্ডিত ব্যক্তিদের সহায়তায় এই পুস্তিকা রচনা করেন। হিন্দু বিবাহ আইন পরিবর্তনের ক্ষেত্রে, ধর্মনাশ হ‌ওয়ার কথা বলে বারংবার যে উপদ্রব ধেয়ে আসছিল ধর্মান্ধ হিন্দুদের তরফ থেকে, তার জন্য বিভিন্ন শ্রুতিকারদের বক্তব্য তুলে এনে, ধর্মের নামে যা চলে আসছে তাই সর্বোচ্চ সত্য নয়, তা প্রমাণ করা প্রয়োজন ছিল। তাদের উদ্ধৃত বক্তব্যের বিপরীতেও নানান ব্যখ্যা ছিল। সামন্ততন্ত্রের গভীর প্রভাবে আচ্ছন্ন, প্রাচীন চিন্তাভাবনায় অভ্যস্ত একটি দেশে কমিউনিস্ট মেয়েদের মতপ্রচারের জন্য নতুন নতুন উপায় উদ্ভাবন ও কৌশল অবলম্বন করতে হত। এই পুস্তিকা দুই কমিটির মিলিত উদ্যোগে প্রকাশিত হয়। 

গ্রামের মহিলারা চিন্তাভাবনার দিক থেকে অতটা অগ্রসর ছিলেন না, তাই কমিউনিস্ট মহিলারা তাদের বিবাহ ও উত্তরাধিকার সম্পর্কিত আইন পরিবর্তনের আসল প্রয়োজন এবং উদ্দেশ্য বোঝানোর ভার নিয়েছিলেন নিজেদের কাঁধে। কিন্তু শহরের ধর্মীয় নিষ্ঠাবান মহিলাদের মধ্যে এইসব রক্ষণশীল ধারণা আরও বদ্ধমূল ছিল। বহু অভিজাত মহিলাদেরকেও বোঝানো হয়েছিল রাও কমিটি হিন্দু ধর্মের পবিত্রতা নষ্ট করতে উদ্যত হয়েছে। বিষয়টা এছাড়া আর কিছুই নয়।

এই কারণেই কলকাতার বিভিন্ন প্রান্তে ছোট বা বড় বিভিন্ন সভা  অনুষ্ঠিত হ‌ওয়া দরকার ছিল । রাজকুমার বসুর সভাপতিত্বে মধ্য কলকাতার কুমার সিংহ হলে একটি সভা আয়োজিত হয়েছিল যেখানে পি.সি.চ্যাটার্জ্জি, নীলিমা চৌধুরী, অনিল রায় এই বিলের সমর্থনে বক্তব্য রাখেন। যেহেতু এই বিলের বিরুদ্ধে প্রধান প্রস্তাবক ছিলেন কিছু পুরুষ, তাই উল্টোদিকেও এই বিলের সমর্থনে কয়েকজন পুরুষের বক্তব্য রাখা অত্যন্ত দরকারি হয়ে পড়েছিল।

রাসবিহারী অ্যাভিনিউয়ের বাসিন্দা গোবিন্দ ঘোষের বাড়িতে একটি সভার আয়োজন করা হয় যেখানে বিভিন্ন প্রাচীন সামন্ততান্ত্রিক এবং অভিজাত পরিবারের সদস্যরা তাদের বাড়ির মহিলাদের নিয়ে উপস্থিত ছিলেন। সেই সভায় প্রফেসর নির্মল ভট্টাচার্য বহু প্রশ্ন ও সংশয়ের উত্তর দেন এবং বিলের সমর্থনে তাঁর যুক্তি উপস্থাপন করেন।

শহরের পুরনো বাসিন্দাদের এলাকা উত্তর কলকাতার মানিকতলায় রামমোহন লাইব্রেরিতে একটি সভা আয়োজিত হয়। এখানে সনাতনপন্থী পণ্ডিত বসন্ত চ্যাটার্জ্জি বিলের বিরুদ্ধতা করেন। বিবেকানন্দ মুখার্জ্জি এবং ইলা মিত্র প্রত্যুত্তর ও পাল্টা যুক্তি দেন। 

বাঙালি মহিলারা ব্যতীত, কলকাতার কেরালা ক্লাব, সাউথ ইন্ডিয়ান লেডিজ ক্লাব, মহারাষ্ট্র ভগিনী সমাজের মহিলাদের মধ্যেও এই বিল নিয়ে উৎসাহপূর্ণ আলোচনা চলছিল।  

তৎকালীন কলকাতার সর্ববৃহৎ হল, ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটি ইন্সটিটিউট হলে একটি সভার আয়োজন করা হল। সেই সভায় বক্তব্য রাখার কথা ছিল সরোজিনী নাইডুর। তিনি আগে থাকতেই অবগত ছিলেন যে বিরোধীরা হিন্দু কোডের বিরুদ্ধাচরণ করবেন। তাঁকে জানানো হয়েছিল এই বিরোধীদের নেতৃত্ব দিচ্ছে হিন্দু মহাসভা। কিন্তু সরোজিনী নাইডু'কে সতর্ক করা হলেও, কী ধরণের আক্রমণের তাঁরা সম্মুখীন হতে পারেন সে বিষয়ে কোনও পূর্বাভাস ছিল না। যখন তিনি পৌঁছলেন হলে তখন ভিড়ের চাপে দমবন্ধ হওয়ার মতো অবস্থা, এমনকি হলের প্রবেশ পথগুলিও ভিড়ে বন্ধ। আশাতীত মানুষের ভিড় সেদিন উপচে পড়েছিল। কোন‌ওক্রমে বহু কষ্ট করে সরোজিনী নাইডু'র প্রবেশের জন্য একটু রাস্তা পাওয়া গেলো। মণিকুন্তলা সেন সরোজিনী নাইডুকে নিয়ে গেলেন মঞ্চের ওপর। তাঁরা মঞ্চে পৌঁছে অবাক হয়ে দেখলেন  সমস্ত মঞ্চ জুড়ে  ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জ্জি, হিন্দু মহাসভা-খ্যাত রামপ্রসাদ মুখার্জ্জি, অনুরূপা দেবী ( তীব্র রক্ষণশীল মতাবলম্বী সাহিত্যিক) প্রমুখ ব্যক্তিরা মঞ্চের দখল নিয়ে বসে রয়েছেন। একটা বড়ো অংশের মানুষ ছিলেন অবাঙালি, এবং উপরের ব্যালকনির সমস্তটা জুড়ে শুধু অবাঙালিরাই ছিলেন। পরবর্তীকালে জানা যায়, তাঁদেরকে আনা হয়েছিল বড়বাজার থেকে, যে অঞ্চল মূলত মারোয়াড়ি এবং অন্যান্য প্রদেশের বহু ব্যবসায়ীদের কর্মস্থান এবং আবাসস্থল। বেশ কিছু সংখ্যক রক্ষণশীল বাঙালি মহিলাও সেখানে ছিলেন। 

সরোজিনী নাইডুকে বসার জন্য কেউ একটা চেয়ার‌ পর্যন্ত দিলেন না। কোনওমতে তাঁর জন্য একটা চেয়ার আনানোর ব্যবস্থা হল। মণিকুন্তলা সেন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে বললেন শ্রীমতী নাইডু বক্তব্য রাখবেন। সরোজিনী নাইডু ততক্ষণে ধরতে পেরেছিলেন সভা ভণ্ডুল করার জন্য‌ই একটা অন্তর্নিহিত প্রচেষ্টা চলছে। তিনি উত্তেজিত হয়ে একটা বিক্ষুব্ধ ভাষণ দিলেন। কিন্তু মঞ্চে উপবিষ্ট পুরুষরা তাঁকে উত্যক্ত করতে করতে বিপর্যস্ত করে তুললেন এবং ব্যালকনিতে উপস্থিত মহিলারা তারস্বরে চিৎকার করতে শুরু করলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁরা সবাই হল ছেড়ে বেরিয়ে যেতে শুরু করলেন এবং সভা ভেঙে গেল। যেসব মহিলা চিৎকার করছিলেন, তাঁদের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাঁরা উত্তর কলকাতার পাথুরিয়াঘাটার বাসিন্দা, যেখানে একসময় কলকাতার অভিজাতদের বাস ছিল। এইসব হিন্দু মহিলাদের বোঝানো হয়েছিল নতুন আইন আরোপ করে সরকার তাঁদের জোর করে ধর্মান্তরিত করে মুসলমান বানিয়ে ফেলবে এবং এই বুঝিয়ে তাঁদের লরিতে করে আনা হয়েছিল সভাটিতে। এইরকম নিম্নমানের মিথ্যা প্রচার, সমাজের একদল নামজাদা মানুষদের থেকে কোনওভাবেই প্রত্যাশিত ছিল না। এর থেকেই বোঝা যায় হিন্দু কোড পাস করানোর জন্য কী প্রচণ্ড বিরুদ্ধতার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। আমাদের দেশে সামন্ততন্ত্রের দখল কত জোরদার তা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল এই ঘটনা থেকে। কমিউনিস্ট মহিলারা এটাকেই একটা চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। 

 

রেণু চক্রবর্তীর বই Communists in Indian Women’s Movement-এর ত্রয়োদশ অধ্যায় 'FIGHT AGAINST FEUDAL LAWS AND CUSTOMS’–এর বাংলা তর্জমা করেছেন কৌশিকী ভট্টাচার্য


প্রকাশের তারিখ: ০৪-জানুয়ারি-২০২৩

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org