|
হেজিমনি নির্মাণের লড়াইরতন খাসনবিশ |
|
লোকসভা নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, বিজেপি-র প্রচারের অভিমুখ তত বেশি করে ‘হিন্দু মেজরিটি’ এবং ‘মোদী সরকার গ্যারান্টি’-নির্ভর সমাজকল্যাণ কর্মসূচির ওপর জোর বাড়াচ্ছে। এটা এখন স্পষ্ট যে, রাম লালার প্রাণ প্রতিষ্ঠা নিয়ে যে আবেগ সঞ্চারিত হয়েছিল, সেটা এখন নির্লজ্জ হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠতার দিকে ঘুরে যাচ্ছে। সেটাই প্রত্যাশিত ছিল। নির্বাচনে তা থেকে কী পরিমাণ ডিভিডেন্ড পাওয়া যাবে তা নিয়ে কিছু সংশয় অবশ্যই আছে। সেকারণে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জনকল্যাণ কর্মসূচি– মোদী সরকারের গ্যারান্টি-নির্ভর কর্মসূচি। জনকল্যাণমূলক কর্মসূচিতে কীভাবে সরকার কিংবা রাষ্ট্রের গ্যারান্টি আদায় করতে হয়, এদেশে তা নিয়ে ইতিপূর্বেই পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে। ১০০ দিনের কাজের যে আইনি অধিকার, যে অধিকার সংবিধান স্বীকৃত, যে অধিকারে বঞ্চিত হলে সরকারের বিরুদ্ধে মামলা করা যায়, সেটি এরকমই একটি গ্যারান্টিপ্রাপ্ত কর্মসূচি। এই কর্মসূচিই রেগা বা মনরেগা নামে পরিচিত। এই কর্মসূচি রূপায়ণের জন্য সংবিধানে প্রয়োজনীয় সংশোধন এনে ১০০ দিনের কাজের অধিকারকে সাংবিধানিক অধিকারে রূপান্তরিত করতে হয়েছিল। এর ফলে এই কর্মসূচিটি সোনিয়া গান্ধী কিংবা ডক্টর মনমোহন সিংয়ের ইচ্ছানির্ভর কর্মসূচি হিসেবে রূপায়িত হয়নি। কর্মসূচিটি ছিল অধিকার-ভিত্তিক। বস্তুত, ভারতে এটিই একমাত্র জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি যেটি রাষ্ট্রের গ্যারান্টিপ্রাপ্ত। তীব্র অনিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও মোদী সরকার যে ১০০ দিনের কাজ বন্ধ করে দেওয়ার সাহস দেখাতে পারেনি, তার কারণ কর্মসূচিটির পিছনে রয়েছে রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টি। লক্ষণীয় যে, এই কর্মসূচিটিকে এদেশের কায়েমি স্বার্থ নানা দিক থেকে আক্রমণ করছে। মমতা ব্যানার্জির ভুয়ো জবকার্ড থেকে নরেন্দ্র মোদীর মনরেগায় বরাদ্দ ছাঁটাই– এসবকিছুই আসছে দক্ষিণপন্থী প্রতিক্রিয়ার আক্রমণের সরণি বেয়েই। এই আক্রমণ চলবে। কিন্তু মনরেগা বন্ধ করার জন্য লাগবে সংবিধান সংশোধন। যে পর্যন্ত পৌঁছনোর সাহস মোদী সরকারের নেই। এরাজ্যে একটি মনরেগা ধরনের কর্মসংস্থান কর্মসূচি শ্রীমতি মমতা ব্যানার্জি চালু করার কথা ঘোষণা করেছেন। বলা বাহুল্য, এটি অধিকার-ভিত্তিক কর্মসংস্থান কর্মসূচি নয়, এটি মমতা ব্যানার্জির গ্যারান্টি দেওয়া কর্মসূচি যা আর পাঁচটি জনকল্যাণমূলক কর্মসূচির মতোই সরকার-নির্ভর কর্মসূচি। এই ধরনের কর্মসূচি মনরেগার মূল যে স্পিরিট অধিকার-ভিত্তিক কর্মসংস্থানের স্পিরিট– সেটির বিপরীতে কাজ করে। সে যাই হোক, ভারতে মনরেগা ছাড়া কোনও রাষ্ট্রীয় জনকল্যাণ কর্মসূচি নেই, যার পিছনে কোনও গ্যারান্টি আছে। নির্বাচনের আগে মোদী যে এক দফা গ্যারান্টিড কর্মসূচির কথা বলছেন, যার বিপরীতে তৃণমূল সরকার অন্য এক দফা কর্মসূচি ঘোষণা করছেন, এগুলি সবই এসেছে অতীতের সব সরকারের পুরনো মডেল অনুসরণ করে। রাষ্ট্রীয় নিশ্চয়তা যে প্রকল্পে আছে, যেটি মোদী, মমতা কিংবা সোনিয়া গান্ধী নির্ভর নয়, সেটি একমাত্র মনরেগা। মনরেগা রূপায়িত করেছিল ইউপিএ-১ সরকার। একে অধিকার-ভিত্তিক কর্মসূচিতে রূপায়ণে প্রধান ভূমিকা পালন করেছিলেন বামপন্থীরা। জনকল্যাণ কর্মসূচি রূপায়ণে গ্যারান্টি আনার সহজ কোনও বিকল্প নেই। একথাটা মোদীও জানেন, মমতাও জানেন। নির্বাচনের আগে দু’পক্ষই এই গ্যারান্টিকে আসলে জুমলা হিসাবে কাজে লাগাচ্ছেন ভোটদাতাদের বিভ্রান্ত করার জন্য। সমস্যা হল, বিষয়টি অত সহজে নিষ্পত্তি হবে এরকম কোনও লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ইন্ডিয়া টুডে পত্রিকায় সম্প্রতি মুড অফ দ্য নেশন নামে একটি সমীক্ষা রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছ, এই গ্যারান্টির কোনওটিতেই মানুষ আর আগের মতো উদ্দীপ্ত হচ্ছেন না। জনকল্যাণমূলক কর্মসূচির গ্যারান্টি যতটুকু পাওয়া গেছে তাতে গৃহস্থের কতটুকু সুবিধা হয়েছে? সমীক্ষা অন্তর্ভুক্ত উত্তরদাতাদের ৬২ শতাংশ বলেছেন, তাদের ক্ষেত্রে জীবনযাপন কঠিনতর হয়েছে। মোদী রাজত্ব ফিরে এলে তাদের কি জীবনযাপনের মানে উন্নতি ঘটবে? সমীক্ষাভুক্ত উত্তরদাতাদের এক-চতুর্থাংশ মনে করেন, এরকমই ঘটবে। অর্থাৎ তাঁরা ভাল থাকবেন। বিপরীতে তিন-চতুর্থাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, তাঁদের অবস্থা একরকমই থাকবে। কিংবা আরও খারাপ হবে। বস্তুত, উত্তরদাতাদের ৩০ শতাংশ মনে করেন, ভবিষ্যতে তাঁদের আয় কমবে। মুড অফ দ্য নেশন সমীক্ষায় একটি প্রশ্ন করা হয়েছিল– মোদী সরকারের কর্মসূচিতে কাদের বেশি লাভ হয়েছে? উত্তর যা পাওয়া গেছে মোদীর পক্ষে তা খুব আশাব্যঞ্জক নয়। উত্তরদাতাদের ৫২ শতাংশ বলেছেন, মোদীর কর্মসূচি সবচেয়ে বেশি উপকার করেছে বড় ব্যবসায়ীদের। ৯ শতাংশ বলেছেন, চাষিরা উপকার পেয়েছেন মোদী সরকারের কর্মসূচি থেকে। ৮ শতাংশ বলেছেন, উপকৃত হয়েছেন নিয়মিত চাকুরিজীবীরা। আর মাত্র ৬ শতাংশ বলেছেন, দিনমজুরেরা উপকার পেয়েছেন এই মোদী কর্মসূচি থেকে। তবুও মোদীপন্থী হিন্দু হেজিমনিবাদীরা দাবি করছেন, আগামী নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদীই জিতে আসবেন, ৪০০’র বেশি লোকসভা আসন থাকবে এনডিএ-র দখলে। মোদী-বিরোধী যে কোয়লিশন, হিন্দু হেজিমনিবাদীদের মতে, কোথাও সেটি সুবিধে করে উঠতে পারবে না। এদের প্রত্যয়ের ভিত্তি কি? ভিত্তি হল এই বিশ্বাস যে মোদীর যা কিছু জুমলা তা কয়েকবার সরযূ নদীতে ডুব দেওয়ার ফলে মানুষের স্মৃতি থেকে ক্রমশ সরে গেছে। এদের বিশ্বাস, একটি চরম আয়-বৈষম্যের সমাজ হিন্দু হেজিমনিবাদের মন্ত্রে মোদীর পিছনেই দাঁড়িয়ে যাবে। মোদী গ্যারান্টির জুমলা নিয়ে মানুষ অত বেশি চিন্তিত হবেন না। আসলে ভারতে যেটা চলেছে সেটা হল হেজিমনি (প্রভাব বলয়) তৈরির লড়াই। আবেগবর্জিত যুক্তি এবং তথ্যের ভূমিকা এখানে দুর্বল। বস্তুত, সেটাই মোদীর জোরের জায়গা। হেজিমনি তৈরির লড়াইয়ে মোদী নিশ্চয়ই এগিয়ে আছেন। তবে মনে রাখতে হবে, এই ভারতে, বিশেষত উত্তর ভারতে, আরেকটা হেজিমনি তৈরির লড়াইও জারি আছে। পিছিয়ে থাকা জাতি, শ্রমবিক্রেতা, প্রান্তিক কৃষক, সামাজিকভাবে যারা সংখ্যালঘু এবং মহিলা– এমন বিপুল সংখ্যক মানুষ আছেন যাঁরা এই কোয়ালিশনের স্বাভাবিক সদস্য। ইন্ডিয়া টুডে-র মুড অফ দ্য নেশন সমীক্ষায় বর্তমান সমাজ নিয়ে উদ্বেগ যাদের উত্তরে ধরা পড়েছে, হেজিমনি গড়ার লড়াইয়ে তাঁরা কতটা এগিয়ে আসবেন সেটা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে পাটনার গান্ধী ময়দান ছাপিয়ে যাওয়া মানুষের ভিড় আর লোহিয়ার উত্তরপুরুষ অখিলেশ যাদবের আঞ্চলিক সভাগুলিতে বিপুল জনসমাবেশ প্রমাণ করছে পালটা হেজিমনি গড়ার যুদ্ধ উত্তর ভারতে ভালরকমই জারি আছে। ২০১৫ সালে এনডিএ-কে বিহার নির্বাচনে হারিয়েছিল এই পালটা কোয়ালিশন। কর্ণাটক ও তেলেঙ্গানার নির্বাচনেও এনডিএ বুঝতে বাধ্য হয়েছে, আরেকটা হেজিমনি তৈরির লড়াইও ভারতে জারি আছে। মোদী সরকারের গ্যারান্টি কতটা টেকসই, এই হেজিমনি গড়ার যুদ্ধে তা প্রমাণ হবে। প্রকাশের তারিখ: ১০-মার্চ-২০২৪ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |