|
জাতীয় সংহতির জন্য সংগ্রামই এম এস নাম্বুদিরিপাদ |
|
১৯৪৭ সালে যখন ব্রিটিশ সরকার ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস এবং মুসলিম লিগের মধ্যে দীর্ঘ আলোচনার মাধ্যমে দুটি শত্রুভাবাপন্ন রাষ্ট্র (ভারতীয় ইউনিয়ন এবং পাকিস্তান) সৃষ্টি করা হল, তখন থেকেই জাতীয় সংহতি রক্ষা করা এবং শক্তিশালী করার প্রশ্নটি সম্মুখে এসে গেল। দেশ বিভাজনের সাথে সাথে এমন বলগাহীন হিংস্র হানাহানি, খুন, লুঠ, ধর্ষণ ঘটে গেল যাতে ব্যাপক হারে উৎখাত হয়ে পাকিস্তান থেকে হিন্দুদের এবং ভারতীয় ইউনিয়ন থেকে মুসলিমদের পরস্পর দেশ বদল করতে হল। ফলস্বরূপ যেমন পাকিস্তানে ইসলামিক মৌলবাদ ও বিচ্ছিন্নতাবাদ সংহত হল, তেমনই ভারতীয় ইউনিয়নে হিন্দু মৌলবাদ একটি রাজনৈতিক শক্তি হিসাবে মাথা তোলা শুরু করল। স্বাধীনতা লাভের পাঁচ বছর পরে ভারতে নতুন প্রজাতান্ত্রিক সংবিধানের ভিত্তিতে প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হল এবং এই নির্বাচনে একদিকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করল শাসকদল ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস, অপরদিকে ছিল বেশ কিছু সংখ্যক বিরোধী পার্টি। এই সব বিরোধী পার্টিগুলির মধ্যে ছিল খোলাখুলিভাবে হিন্দু মৌলবাদী সংগঠন হিন্দু মহাসভা এবং রাম রাজ্য পরিষদ, যারা পরবর্তীকালে একত্রিত হয় এবং জনসংঘ নামের নতুন হিন্দু পার্টিতে সংহত হয়। এই জনসংঘের আধ্যাত্মিক রসদ জোগাতে এগিয়ে আসে আধা-ফ্যাসিস্ত সংগঠন আরএসএস যারা পূর্ববর্তী পঁচিশ বছর ধরে মুসলিম বিরোধী ঘৃণার মনোভাব চাগিয়ে তোলা এবং দাঙ্গা সংঘটনের কাজ করে এসেছে। এই সংগঠনেরই সক্রিয় কর্মী ছিলেন নাথুরাম গডসে যিনি মহাত্মা গান্ধীকে গুলি করে হত্যা করেন কারণ মহাত্মা নিজে ধর্মপরায়ণ হিন্দু হলেও সর্বদাই হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের উৎসাহী প্রবক্তা ছিলেন। জঙ্গী আরএসএস ক্যাডারদের নেতৃত্বে সংসদীয় রাজনৈতিক দল হিসাবে জনসংঘের উত্থান ভারতীয় রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করল। যারা গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং সমাজতন্ত্রের পক্ষে লড়াই করছিল সেই বামপন্থী দলগুলি এবং যারা চাইছিল স্বাধীন ভারতকে একটি সাধারণ বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রে পরিণত করতে সেই মধ্যপন্থী কংগ্রেস— এই দুই শক্তিরই বিরোধিতা করে হিন্দু মৌলবাদীরা (জনসংঘ এবং আরএসএস) মানুষের সামনে স্বাধীন ভারতকে হিন্দু রাষ্ট্রে পরিণত করার ধারণা উপস্থিত করল। এই পরিস্থিতি স্বভাবতই মুসলিম, শিখ এবং খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মতো অহিন্দু ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের আতঙ্কিত করল এবং তাঁরা স্ব স্ব রাজনৈতিক দল গঠন করলেন। এইভাবে সংখ্যাগুরু এবং সংখ্যালঘু মৌলবাদের লড়াই আরম্ভ হল। গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রের আদর্শে গঠিত কর্মসূচীর ভিত্তিতে এই সমস্ত শক্তিগুলির বিরুদ্ধে লড়াই করেই ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি স্বাধীনতা-উত্তর ভারতের প্রথম সাধারণ নির্বাচনের পর সংসদে প্রধান বিরোধী পার্টির মর্যাদা লাভ করে। পাঁচ বছর পর রাজ্যের নির্বাচনে কমিউনিস্ট পার্টি গরিষ্ঠতা অজর্ন করে কেরালায় একক শক্তিতে নিজস্ব সরকার গঠন করতে সমর্থ হয়। তখন থেকে কমিউনিস্ট ও তাদের বামপন্থী সহযোগীরা একাধারে কংগ্রেসের একচেটিয়া ক্ষমতা এবং সমস্ত ধরনের সাম্প্রদায়িকতাবাদের বিরুদ্ধে নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম করে আসছে। যেখানে দেশের রাজনৈতিক জীবনে কোনো-না-কোনো রকমের নির্বাচনী আঁতাতের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে, এমন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে প্রচণ্ড ক্ষমতাশালী কংগ্রেসের বিরুদ্ধে লড়াই চালাতে গিয়ে যদিও কমিউনিস্টদের কখনো কখনো কোনো কোনো সাম্প্রদায়িক দলের সাথে সাময়িকভাবে বোঝাপড়া করতে হয়েছে, যেমন হয়েছে কেরালায় ১৯৬৭ সালে মুসলিম লিগ এবং সর্বভারতীয় স্তরে ১৯৭৭ সালে জনসংঘের সাথে, তবুও কমিউনিস্ট ও তাদের বামপন্থী সহযোগীরা কখনোই মুসলিম লিগ বা জনসংঘের সাথে কোনো রকম স্হায়ী রাজনৈতিক সমঝোতা করেনি। ৭০-এর দশকের শেষার্ধ এবং ৮০-এর প্রথমার্ধে কংগ্রেসের একচেটিয়া ক্ষমতার অবসান হওয়ার সাথে সাথে এঁরা কেরালায় মুসলিম লিগ এবং সর্বভারতীয় স্তরে জনসংঘ বিজেপি-র সংস্রব থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে নিতে থাকেন। বর্তমানে কেন্দ্র বা কোনো রাজ্য যেখানেই বামপন্থীরা বৃহৎ রাজনৈতিক শক্তি হিসাবে আবির্ভূত হয়েছে সে-রকম কোনোখানেই তারা সংখ্যাগুরু বা সংখ্যালঘু কোন শ্রেণির কোনো সাম্প্রদায়িক দলের সাথেই জড়িত নেই। জাতীয় সংহতির পক্ষে বিপদ শুধু যে সংখ্যাগুরু বা সংখ্যালঘুদের সাম্প্রদায়িকতাবাদের দিক থেকেই এসেছে তা নয়। এই বিপদ জাতপাতের সূত্র ধরেও আসছে; যেমন একদিকে ‘উচ্চ বর্ণ’-এর লোকেরা 'নিম্ন বর্ণ’-এর মানুষের ওপর এতাবৎ কাল চলে আসা প্রাধান্য বজায় রাখার চেষ্টা চালাচ্ছে, অপরদিকে 'নিম্ন' বর্ণের জনসাধারণের মধ্যেও দেশের সাধারণ গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মূলধারা হতে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে রাখার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। সামন্ততান্ত্রিক আর্থ-সামাজিক ব্যবস্হাকেই শক্তিশালী করে তুলবার যে জোর প্রবণতা সেখান থেকেই 'উচ্চ' ও 'নিম্ন' বর্ণের জাতপাত ভিত্তিক আন্দোলনের উদ্ভব বলে কমিউনিস্টরা মনে করছেন। সে কারণে তাঁরা সামাজিক সাম্যস্হাপন ও উচ্চ বর্ণের সুবিধাভোগের বিলোপ সাধনের সংগ্রামকে সামন্ততান্ত্রিক আধিপত্যের সমস্ত রকম প্রকটিত রূপের বিরুদ্ধে সংগ্রামের সাথে যুক্ত করেছেন। বর্ণগত সুবিধা ভোগের বিলোপ সাধনের সংগ্রাম পরিচালনার সাথে সাথে তাঁরা সামন্ততন্ত্রের বিরুদ্ধে এবং গণতন্ত্রের সপক্ষে সংগ্রামে তথাকথিত উচ্চ ও নিম্নবর্ণের সমস্ত শ্রমজীবী মানুষকে একত্রিত করার প্রচেষ্টা চালিয়ে আসছেন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সরকারি চাকুরির ক্ষেত্রে যেমন 'নিম্ন' বর্ণের মানুষদের সংরক্ষণের দাবির প্রতি তাঁরা সমর্থন জানাচ্ছেন, তেমনই, পূর্ণগণতন্ত্র ও সর্বাঙ্গীন সমাজ-সাংস্কৃতিক প্রগতির পক্ষে সংগ্রামরত 'উচ্চ’ বর্ণের ভাইদের সাথে যুক্ত হওয়ার জন্য এই 'নিম্ন' বর্ণের লক্ষ-কোটি মানুষের কাছে তারা আহ্বান জানাচ্ছেন। এছাড়াও জাতীয় সংহতির আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে দেশের বিভিন্ন অংশে নানা ধরনের ভাষা ও সংস্কৃতিগত জনগোষ্ঠীর অবস্হান। এই ব্যাপারটির বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে ভাষা ভিত্তিক রাজ্য গঠনের দাবি উত্থিত হয় এবং কয়েক দশকের সংগ্রামের পর অবশেষে ১৯৫০-৬০ সালে তা সাফল্যমন্ডিত হয়। এই দাবির সাথে সাথেই ভারতের ঐক্যবদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে সম্ভাব্য ব্যাপকতম রাজ্য ভিত্তিক স্বায়ত্তশাসনের ভিত্তিতে সঠিক কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের দাবি উত্থিত হয়। কমিউনিস্টরা গণতান্ত্রিক আন্দোলনের এই মৌলিক দাবির সপক্ষে সবচেয়ে লড়াকু যোদ্ধা হিসাবে, একদিকে যারা জাতীয় সংহতির নামে রাজ্যের সমস্ত স্বায়ত্তশাসনের অধিকার খর্ব করে নিরঙ্কুশ কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা সম্পন্ন রাষ্ট্র গঠন করতে চায় এবং অন্যদিকে, যারা রাজ্যের স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে লড়াই করার নামে সংহত ও শক্তিশালী ভারতের গুরুত্বকে নস্যাৎ করতে চায়, এদের উভয়ের বিরুদ্ধেই লড়াই চালিয়ে আসছে। এর সাথেই যুক্ত রয়েছে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রচলিত বিভিন্ন ভাষার প্রশ্নটি। এখানেও একদিকে আছে, যারা জাতীয় সংহতির নামে সমস্ত অ-হিন্দি ভাষাগুলিকে নস্যাৎ করতে চায়। অন্যদিকে, যারা তারা আবার 'হিন্দি সাম্রাজ্যবাদের’ বিরুদ্ধে লড়াইয়ের নামে সংখ্যার দিক থেকে ভারতের সর্ববৃহৎ ভাষা- সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী কর্তৃক ব্যবহৃত ভাষা হিসাবে হিন্দির মর্যাদাকে অস্বীকার করতে চায়। কমিউনিস্ট ও অন্যান্য বামদলগুলি প্রকৃত পক্ষে প্রশাসনিক, সংসদীয় ও আইন বিষয়ক কাজকর্ম এবং শিক্ষা ক্ষেত্র সহ সকল বিষয়ে সমস্ত ভারতীয় ভাষার ব্যবহার ও সম-মর্যাদার দাবিতে লড়াই করে চলেছে। 'বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য' এই সদামান্য নীতিই একমাত্র ভারতের ভাষা সমস্যার সমাধান করতে পারে। শেষ করার আগে ভারতের বিভিন্ন অংশে বসবাসকারী বিভিন্ন উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর সমস্যা প্রসঙ্গেও কিছু উল্লেখ করা প্রয়োজন। বিভিন্ন ধরনের জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতির মধ্যে বসবাসকারী সমস্ত উপজাতীয় জনগোষ্ঠীই তাদের স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখার ন্যায়সঙ্গত অধিকার আছে। সেই কারণে কমিউনিস্ট ও অন্যান্য বামদলগুলি দাবি করে যে, যে-অঞ্চলে জনগোষ্ঠীগুলি বসবাস করে, ঐ রাজ্যের মধ্যেই সেই সব এলাকাতে তাদের স্ব-শাসিত অঞ্চল গঠন করার অধিকার স্বীকৃত হোক। এই সমস্ত সমস্যা স্বাধীনতা-উত্তরকালে দেশের বিভিন্ন অংশে বিক্ষোভের সঞ্চার করেছে এবং বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। এই সব সমস্যা সমাধানে গণতান্ত্রিক নীতি প্রয়োগ করার ক্ষেত্রে শাসক শ্রেণির ব্যর্থতা পরিস্হিতিকে গুরুতর সঙ্কটের দিকে ঠেলে নিয়ে গেছে। ধর্মীয় সম্প্রদায়, বর্ণভেদপ্রথা, কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক, ভাষা এবং উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন সমস্যার গণতান্ত্রিক সমাধানের মধ্য দিয়েই একমাত্র জাতীয় সংহতিকে রক্ষা করা সম্ভব। প্রথম প্রকাশ— ৩১/৭/৯০ প্রকাশের তারিখ: ০১-নভেম্বর-২০২৩ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |