|
ইজরায়েলে কমিউনিস্টদের সংগ্রামটিম মার্কসবাদী পথ |
৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পরেই ইজরায়েলের কমিউনিস্ট পার্টি এবং হাদাস এক যৌথ বিবেতিতে বলে, আজ ‘এই বিপজ্জনক পরিস্থিতির তৈরির জন্য সম্পূর্ণ দায়ী নেতানিয়াহুর ফ্যাসিস্ত সরকার।’ যোগ করে, ‘ফ্যাসিস্ত দক্ষিণপন্থী সরকার দখলদারিকে চিরস্থায়ী করার জন্য পরিস্থিতিকে যে আঞ্চলিক যুদ্ধের দিকে নিয়ে যাচ্ছে, তা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। এমনকি এই কঠিন সময়েও আমরা নিরপরাধ সাধারণ মানুষের উপর যে কোনও ক্ষয়ক্ষতিকে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় নিন্দা জানাচ্ছি। |
গাজায় নির্বিচারে বোমাবর্ষণ, অধিকৃত ওয়েস্টব্যাঙ্কে ইজরায়েলি অভিযানের সময় ইজরায়েলের ভিতরে থাকা প্যালেস্তিনীয়দের কথা মনে না আসাই সম্ভবত স্বাভাবিক। অথচ, দেশটির জনসংখ্যার ২০ শতাংশকে সরকারি ভাষ্যে উল্লেখ করা হয় ‘ইজরায়েলি আরব’ হিসেবে। ইজরায়েল প্রতিষ্ঠার সময়, যাঁরা পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন, তাঁদের থেকে আলাদা করার জন্য তাঁরা প্রায়শই নিজেদের পরিচয় দেন ‘১৯৪৮ প্যালেস্তিনীয়’ হিসেবে। ১৯৪৮ সালের সীমানা ধরে ইজরায়েলে থাকা প্যালেস্তিনীয়দের মধ্যে অন্যতম প্রভাবশালী শক্তি ইজরায়েলের কমিউনিস্ট পার্টি। ১৯১৯, যখন এই ভূখণ্ডে কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠা, তখন তাতে ছিলেন না কোনও আরব সদস্য। ইহুদি অভিবাসীরাই এই ভূখণ্ডে নিয়ে আসেন মার্কসবাদকে। মস্কোয় কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল থেকে তাঁদের পরামর্শ দেওয়া হয় আপনাদের এমন এক পার্টি গড়তে হবে, যা হবে জনগণের পার্টি, যেহেতু তিনভাগের দু’ভাগ আরব জনগণ, তাই শামিল করতে হবে তাঁদেরকে। সেই পরামর্শ মেনে বারোজন আরবকে রাজনৈতিক শিক্ষার জন্য পাঠানো হয় মস্কোতে। ফিরে এসে চারজন যোগ দেন কমিউনিস্ট পার্টিতে। সেই থেকে কমিউনিস্টরা প্যালেস্তিনীয়দের সমান অধিকারের পক্ষে, আরব-ইহুদি ঐক্য গঠনের জন্য প্রধান শক্তি হিসেবে কাজ করে আসছে। সেইসঙ্গে, ওয়েস্টব্যাঙ্ক ও গাজায় অন্যায় দখলদারির অবসান ঘটিয়ে একটি কার্যকর প্যালেস্তাইন রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে সংগ্রাম চালিয়ে আসছে। ১৯৭৭ থেকে বামপন্থী প্রগতিশীল রাজনৈতিক জোটের (ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট ফর পিস অ্যান্ড ইকোয়ালিটি, হাদাস) মধ্যে বৃহত্তম শক্তি কমিউনিস্টরা। এই মুহুর্তে ইজরায়েলের সংসদে হাদাসের সদস্য সংখ্যা পাঁচ। তারমধ্যে চারজন ইজরায়েলের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য। ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর কমিউনিস্ট এবং হাদাসের পাশাপাশি সংখ্যালঘু প্যালেস্তিনীয়রা তুমুল নিপীড়ন ও হুমকির শিকার। গাজায় আগ্রাসনের সমালোচনা করার জন্য অক্টোবরের মাঝামাঝি নাগাদ ৪৫-দিনের জন্য সাসপেন্ড করা হয়েছে সংসদে কমিউনিস্ট পার্টির একমাত্র ইহুদি সদস্য ওফার কাসিফকে। নভেম্বরের গোড়ায়, যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভ ঘোষণার জন্য কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম নেতা, প্রাক্তন সাংসদ মহম্মদ বারাকাহকে আটক করা হয় নাজারেথে। যথারীতি পুলিশের যুক্তি ছিল, ‘এতে প্ররোচনা ছড়াতে পারে’। আর অতি সম্প্রতি, পার্টির আরেকজন সাংসদ, পার্টির মুখপত্র আল-ইত্তিহাদ পত্রিকার সম্পাদক আইদা তোমা-সুলেমানকে দু’মাসের জন্য সাসপেন্ড করা হয়েছে। আইদার ‘অপরাধ’ তিনি ইজরায়েলি সেনাবাহিনীর হাতে নিরাপরাধ মানুষের হত্যার সমালোচনা করেছিলেন। যেমন শনিবার হাদাসের জাতীয় কনভেনশন আটকে দিতে চেয়েছে ইজরায়েলের পুলিশ। যথারীতি একই দাবি, ‘এতে এমনসব উসকানিমূলক ভাষণ হবে, যা জনসাধারণের শান্তিকে বিঘ্নিত করবে।’ উত্তর ইজরায়েলের শেফা-আমর শহরের যে হলে কনভেনশন হওয়ার কথা ছিল, তার মালিককে চোখ রাঙিয়েছে পুলিশ। বলেছে, যদি ওই হলে কনভেনশন হয়, তবে একমাসের জন্য হল বন্ধ করে দেওয়া হবে।’ হাদাসের সাধারণ সম্পাদক আমজাদ সবিতা পালটা জানিয়ে দিয়েছেন, কনভেনশন হবে। এবং ওই দিনই হবে। কনভেনশনে আলোচনার মধ্যে রয়েছে ‘গাজায় চলমান যুদ্ধ এবং উগ্র দক্ষিণপন্থী সরকারের রাজনৈতিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক পদক্ষেপের’ পরিকল্পনা। এরমধ্যেই বৈঠকে বসেছিল হাদাস এবং কমিউনিস্ট পার্টির পলিট ব্যুরোর বৈঠক। সেখান থেকে এক যৌথ বিবৃতিতে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, ‘ইজরায়েলি প্রশাসনের ফ্যাসিস্ত ভীতি প্রদর্শনকে আমরা সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করছি। আমরা যুদ্ধের বিরুদ্ধে এবং ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আমাদের আওয়াজ তুলে যাব। সরব হব সাহসের সঙ্গে, দায়িত্বের সঙ্গে। নির্ধারিত দিনেই হবে কনভেনশন, কোথায় হবে জানিয়ে দেওয়া হবে। এই নিপীড়নের বিরুদ্ধে সংগ্রামে অংশ নেওয়ার জন্য আমরা আমাদের সমস্ত কর্মীকে আহ্বান জানাচ্ছি। আমাদের পার্টি ও ফ্রন্টকে রাজনৈতিক ভূমিকা নিতে বলছি।’ ‘আমরা আমাদের সমস্ত কর্মী, সমস্ত ইহুদি ও আরব প্রগতিশীল শক্তি এবং আন্তর্জাতিক ফ্যাসিবাদ-বিরোধী শক্তিকে এই ম্যাকার্থিবাদী নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার আহ্বান জানাচ্ছি। এই যুদ্ধের বিরুদ্ধে, ইজরায়েলকে ফ্যাসিবাদের অন্ধকারে ঠেলে দেওয়ার বিরুদ্ধে যাঁরা রুখে দাঁড়াচ্ছেন, তাঁরাই ওদের লক্ষ্য।’ ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পরেই ইজরায়েলের কমিউনিস্ট পার্টি এবং হাদাস এক যৌথ বিবেতিতে বলে, আজ ‘এই বিপজ্জনক পরিস্থিতির তৈরির জন্য সম্পূর্ণ দায়ী নেতানিয়াহুর ফ্যাসিস্ত সরকার।’ যোগ করে, ‘ফ্যাসিস্ত দক্ষিণপন্থী সরকার দখলদারিকে চিরস্থায়ী করার জন্য পরিস্থিতিকে যে আঞ্চলিক যুদ্ধের দিকে নিয়ে যাচ্ছে, তা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। এমনকি এই কঠিন সময়েও আমরা নিরপরাধ সাধারণ মানুষের উপর যে কোনও ক্ষয়ক্ষতিকে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় নিন্দা জানাচ্ছি। এবং তাদেরকে রক্তপাত থেকে সরে আসার কথা বলছি। দখলদারির শিকার সমস্ত পরিবার, আরব ও ইহুদীদের প্রতি আমরা সমবেদনা জানাচ্ছি।’ কমিউনিস্টরা, শান্তি আন্দোলনের কর্মীরা, যারা আরব-ইহুদি ঐক্যের জন্য সওয়াল করে আসছেন, ৭ই অক্টোবরের পরে তাঁরা ঠিক কোন জায়গায়? ইজরায়েলে বসবাসকারী প্যালেস্তিনীয়রাই বা কেমন আছেন? পিপলস উইকলি ওয়ার্ল্ডের এই প্রশ্নের জবাবে ইজরায়েলের কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক বিভাগের প্রধান রিম হাজ্জান জানিয়েছেন, ঘটনা হলো ৭ অক্টোবরের আগেও, পার্টি বা পার্টিকর্মী হিসেবে সংগ্রাম জারি রাখলেও আমরা খুব ভালো অবস্থানে ছিলাম না। একইভাবে, ইজরায়েলে একজন প্যালেস্তিনীয় হিসাবে, আমরা এমন একটি গণতন্ত্রে বাস করছিলাম, যেখানে গণতন্ত্র কেবল ইহুদিদের জন্য। ২০১৮-তে নেশন স্টেট ল’র কথাই ধরা যাক। সেবছর, সংসদ একটি আইন পাশ করে, যাতে বলা হয় এই রাষ্ট্রের জমি এবং অন্য সবকিছুর সম্পূর্ণ অধিকার শুধুমাত্র ইহুদিদেরই আছে। তার আগেও এটি ছিল। কিন্তু আইন ছিল না। এখন এটি আইনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এখন এটা স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে আরবদের সমান অধিকার নেই। আমরা যখন কাজের সুযোগ, মজুরি, শিক্ষার জন্য বাজেট এবং পরিকাঠামোর কথা বলি, তখন দেখি এই প্রকট বৈষম্য। দ্বিতীয় বা তৃতীয় বা সপ্তম-শ্রেণির নাগরিক হওয়ার শুরু ২০১৮-তে নয়। এই অক্টোবরের পর থেকেও নয়। বরং, বহু আগে থেকে। যদিও, এখন পরিস্থিতি আরও উত্তেজনার হয়েছে। তবে ৭ অক্টোবরের পর, আমাদের আগে থেকে জমে থাকা ভয়ের সঙ্গে আরেকটি নতুন হুমকি যুক্ত হয়েছে, তা হলো শাসকদের নিপীড়ন। এটা এখন চরমপন্থী, দক্ষিণপন্থী ইহুদি গোষ্ঠীর উসকানিতে হচ্ছে। মানুষকে নির্বিচারে প্রেপ্তার করা হচ্ছে। আটক করা হচ্ছে। জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। যখন খুশি কাজ থেকে বরখাস্ত করা হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হচ্ছে। ক্যাম্পাসের ছাত্রাবাস থেকে বের করে দেওয়া হচ্ছে। আসলে জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার নামে চলছে ফ্যাসিবাদী কর্মকাণ্ড ও তৎপরতা। তবে একইসঙ্গে আশার দিক হলো, কমিউনিস্ট নেত্রী রিম হাজ্জান জানাচ্ছেন, টানা ন’মাস কয়েক হাজার মানুষ বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু সরকারের আইনি সংস্কারের বিরুদ্ধে শামিল ছিলেন। বিপুল সংখ্যায় ইজরায়েলি জনগণ রাস্তায় নেমে গণতন্ত্রের দাবি জানিয়েছেন। কী ধরনের গণতন্ত্র, তা নিয়ে আমাদের মতের ফারাক থাকতে পারে, তবে এটা ঠিক, মানুষ বুঝতে পারছেন নেতানিয়াহুর এই জমনায় কিছু ভুল হচ্ছে। আর এটা শুধু প্যালেস্তিনীয়রা মনে করছেন না, ইহুদিরাও মনে করছেন। আর এতে অবশ্যই আশার কিছু কারণ আছে। কিন্তু যুদ্ধের বিরুদ্ধে তেমন বড় সমাবেশ তো হচ্ছে না, তাহলে কি ইজরায়েলের জনগণ যুদ্ধের পক্ষে? হাজ্জান জানিয়েছেন, শুরুতেই পুলিশ প্রধান কোবি শাবতাই একটি ভিডিও-তে হুঁশিয়ারি শোনান কোথাও কোনও বিক্ষোভের অনুমতি দেওয়া হবে না। কেউ এই নির্দেশ লঙ্ঘন করলে তাকে আটক করা হবে, জরিমানা আদায় করা হবে। এমনকি বিক্ষোভকারীদের গাজায় পাঠিয়ে দেওয়ার হুমকি দেন তিনি! তারপরেও যারা এই নির্দেশ অস্বীকার করেছে, তাদের কয়েকদিন ধরে আটক রাখা হয়েছে। পরে তাদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট এবং ক্রেডিট কার্ড ব্লক করা হয়েছে। তাছাড়া, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইতামার বেন-গভির দু’বছর ধরেই স্বপ্ন দেখছিলেন কিভাবে সশস্ত্র জনতাকে দিয়ে এই দমনপীড়নের কাজ করানো যায়। যারা নিজেদেরকে বলবে পুলিশের জন্য ‘অসামরিক সহায়তা বাহিনী’। গাজায় এই আগ্রাসন বেন-গভিরকে তা বাস্তবে করে দেখানোর সুযোগ করে দিয়েছে। এখন তাঁর কাছে রয়েছে সশস্ত্র লোকজনের ৬০০টির বেশি গোষ্ঠী, তাদের মধ্যে কিছু অসামরিক লোক, বাকিরা একসময়ে সামরিক বাহিনী বা পুলিশে ছিলেন। তারাই এখন শহরে শহরে টহল দিচ্ছে। দাপিয়ে বেরাচ্ছে। যেমন আমি থাকি হাইফাতে, যেটি আরব ও ইহুদিদের মিশ্র শহর। এইসব লোকেরা এম-১৬ নিয়ে বেমালুম ঘুরে বেরাচ্ছে। যেন তারা পুলিশের নির্দেশ পালন করছে! আসলে তাদের মূল লক্ষ্য আরবদের ভয় দেখানো। আসলেই আমরা এক জরুরি অবস্থার মধ্যে রয়েছি। যেখানে কোনও দমনমূলক কাজকে ন্যায্য বলে চালানো হচ্ছে। সবকিছুই বৈধ! প্রকাশের তারিখ: ১৬-ডিসেম্বর-২০২৩ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |