সুভাষচন্দ্র বসু ও সাম্প্রদায়িক সমস্যা

অমলেন্দু দে
হিন্দু ও মুসলিম স্বাতন্ত্র্যবোধ স্বাধীনতা সংগ্রামের পথে অন্তরায় সৃষ্টি করায় সুভাষচন্দ্র উদ্বিগ্ন হন। হিন্দুরাষ্ট্র গঠন করে অথবা পৃথক মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে যে সাম্প্রদায়িক সমস্যার প্রকৃত সমাধান সম্ভব হবে না, সে বিষয়ে সুভাষচন্দ্রের মনে কোনো সংশয় ছিল না। তিনি ভারতীয় পরিবেশে ভারতের উপযোগী করে একটি সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা গঠনের মাধ্যমে ভারতকে সাম্প্রদায়িক সমস্যা থেকে মুক্ত করে এক ঐক্যবদ্ধ স্বাধীন ভারত গড়ে তুলবার জন্য একটি বিকল্প কর্মসূচিও তৈরি করেন। তাঁর ভাবনা অনুযায়ী ভারতের 'সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র' এমন একটি রাষ্ট্র হবে যেখানে প্রতিটি নাগরিক সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দাসত্ব থেকে মুক্ত হবে।

সুভাষচন্দ্রের জীবনের ঘটনাবলিকে প্রধানত দুটো ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথম পর্বে (১৯০৯-১৯২১ মে) তাঁর মানস গঠিত হয়। এই পর্বেই তাঁর আত্মপ্রস্তুতি ও জীবন দর্শনের ভিত্তি স্থাপিত হয়। আর এই সময়ে তিনি কটকে, কলকাতায় এবং ইংল্যান্ডে ক্রমান্বয়ে তাঁর ছাত্র জীবন অতিবাহিত করেন। দ্বিতীয় পর্বে (১৯২১ জুন-১৯৪৫) সুভাষচন্দ্রের সমন্বয়ী জীবন দর্শনের পরিণত রূপ পরিস্ফুট হয় এবং ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে এক অনন্যসাধারণ নেতা হিসাবে তাঁর ভূমিকা লক্ষ করা যায়। অবশ্য এই দুটো পর্বই একে অপরের সঙ্গে যুক্ত। প্রথম পর্বে তাঁর জীবন দর্শনের যে প্রকাশ ঘটে, দ্বিতীয় পর্বে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে তাঁর ব্যাপ্তি ঘটে, পরিণত রূপটি সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রথম পর্বেই তার মনন গঠিত হয়। স্বামী বিবেকানন্দের রচনাবলি পাঠ করে তিনি খুবই অনুপ্রাণিত হন। তিনি বুঝতে পারেন, জীবনের উদ্দেশ্য হলো নিজের মুক্তি ও মানব সেবা। তিনি উপলব্ধি করেন প্রকৃত আদর্শ কখনই 'মধ্যযুগের স্বার্থপর মঠ জীবনে' এবং বেন্থাম ও মিল প্রচারিত 'আধুনিক উপযোগবাদে' (mordern Utilitarianism) পাওয়া সম্ভব নয়। তিনি স্বামী বিবেকানন্দের মধ্যে প্রকৃত আদর্শ খুঁজে পান। স্বামী বিবেকানন্দ প্রচারিত মানব সেবায় দেশ সেবাও যুক্ত। ভগিনী নিবেদিতা রচিত The Master As I saw him গ্রন্থ পড়ে সুভাষচন্দ্র তা স্পষ্ট উপলব্ধি করতে পারেন। এইভাবে তাঁর বয়স যখন পনেরো বছর, তখনই স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর অন্তরে প্রবেশ করেন। ক্রমশ রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের প্রতিও তাঁর দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়। তার ফলে সুভাষচন্দ্র আধ্যাত্মিক উন্নতির পথ দেখতে পান। তিনি আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে আত্মশুদ্ধি ও আত্মজ্ঞান লাভ করেন। রামকৃষ্ণের আদর্শের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তিনি নিষ্পাপ জীবনের প্রতি আকর্ষণ অনুভব করেন। কটকে ছাত্র জীবনের সময়ই রামকৃষ্ণ- বিবেকানন্দের প্রভাবে সুভাষচন্দ্রের মানস এক নতুন পথে ধাবিত হয়। ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে দীন-দুঃখী মানুষের প্রতি সমবেদনা, আর গ্রামে গ্রামে ঘুরে সমাজ সেবার কাজের মধ্য দিয়ে তাঁর ভাবনার আরও বিকাশ ঘটে। তিনি ধর্মীয় গোঁড়ামি ও কুসংস্কারমুক্ত হন। প্রাদেশিকতা ও ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতাবাদের প্রভাব থেকেও তিনি মুক্ত থাকেন। তাঁর বাবা ও মা উভয়েই ধর্মপ্রাণ মানুষ ছিলেন। কিন্তু তাঁদের কোনো ধর্মীয় গোঁড়ামি ছিল না। তাঁদের ঔদার্যবোধ এমনই ছিল যে, তাঁরা বাড়ির বিভিন্ন কাজে ওড়িয়া, হিন্দু ও মুসলমান কর্মচারী নিযুক্ত করতে কোনো দ্বিধাবোধ করেননি। এইসব বিভিন্ন ধর্ম ও ভাষার কর্মচারীদের মধ্যে সখ্যর ভাব ছিল। বাড়ির এই পরিবেশের প্রভাব স্বাভাবিকভাবেই সুভাষচন্দ্রের উপর পড়ে। নিজ ধর্মের প্রতি অনুরক্ত থেকে যে অন্য ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া যায়, তার শিক্ষা পারিবারিক পরিবেশেই সুভাষচন্দ্র লাভ করেন।

কটক থেকে কলকাতায় পড়তে আসার পর সুভাষচন্দ্র শ্রী অরবিন্দের রচনাবলির প্রতি আকৃষ্ট হন। তাঁর রচনাবলির মধ্যে সুভাষচন্দ্র 'আধ্যাত্মিকতা মিশ্রিত রাজনীতি'র সন্ধান পেতেন এবং তিনি শ্রী অরবিন্দকে গুরুরূপে পেতে চান। শ্রী অরবিন্দের 'গভীরতর দর্শন' যা 'যোগসমন্বয় তত্ত্বের' মধ্যে প্রকাশিত, তা সুভাষচন্দ্রকে মুগ্ধ করে। শ্রী অরবিন্দের দর্শন সুভাষচন্দ্রকে শঙ্করাচার্যের 'মায়াবাদ' কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করে। কলকাতাতে পড়বার সময়েই সুভাষচন্দ্র তাঁর সমাজসেবার ভাবনাকে বাস্তবায়িত করার উদ্দেশে বস্তিতে নৈশ বিদ্যালয় খুলে কাজ শুরু করেন। প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বিতাড়িত হওয়ার পর তিনি কটকে ফিরে গিয়ে রোগীর সেবা, মৃতদেহ সৎকার, টাইফয়েড আক্রান্ত সাঁওতাল ছাত্রের সেবা ইত্যাদি কাজে নিজেকে যুক্ত করেন। তাঁর মা-ও তাঁর সঙ্গে এইসব কাজে সহযোগিতা করেন।

এইসব কথা লিখলাম এই কারণে যে, বিশ শতকের প্রারম্ভ থেকে যখন ধর্ম-নির্ভর ধর্মান্ধতাকে অবলম্বন করে কোনো কোনো হিন্দু ও মুসলিম সংগঠন সক্রিয় হয়, ঠিক সেই সময়েই সুভাষচন্দ্র ধর্ম-নির্ভর ঔদার্যবোধ ও মানবিকতাবোধ অবলম্বন করে পথ চলতে শুরু করেন। এই শতকের সূচনাতেই 'হিন্দুরাষ্ট্রের তত্ত্ব' অথবা 'হিন্দুত্ব' হিন্দু সংগঠনগুলো প্রচার করতে থাকে। ১৯০৭ সালে বাংলায় 'হিন্দু আন্দোলন' এবং পাঞ্জাবে 'হিন্দু সভা' হিন্দু স্বাতন্ত্র্যবোধকে সংগঠিত রূপ দান করে। হিন্দুদের ধর্মীয় ও সামাজিক ঐক্য সাধন করে আর্যসমাজ 'হিন্দু জাতীয়তাবাদ' উজ্জীবিত করতে তৎপর হয়। ১৯০৯ সালে আর্যসমাজ 'সারা ভারত শুদ্ধিসভা' স্থাপন করে। ভারতের বিভিন্ন স্থানে শুদ্ধিসভার শাখা-প্রশাখা গঠিত হয় এবং শুদ্ধি আন্দোলন হিন্দু-মন প্রভাবিত করতে চেষ্টা করে। একই উদ্দেশ্য নিয়ে ১৯১৩ সালে 'সারা ভারত হিন্দু মহাসভা' স্থাপিত হয়। এইভাবে হিন্দু স্বাতন্ত্র্যবোধ অবলম্বন করে 'হিন্দু বৃত্ত' ক্রমশ প্রভাব বিস্তার করে। হিন্দু মহাসভা রাজনৈতিক আন্দোলন সংগঠিত করে 'হিন্দু জাতীয়তাবাদকে' শক্তিশালী করতে তৎপর হয়। অন্যদিকে 'মুসলিম বৃত্তটি'ও বিভিন্ন মুসলিম সংগঠনের মধ্য দিয়ে ব্যাপ্ত হয়। আঞ্জুমান, তবলিগ,তনজিম ইত্যাদি সংগঠন এবং ১৯০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত 'সারা ভারত মুসলিম লিগ' এই বৃত্তটিকে প্রসারিত করার সঙ্গে সঙ্গে মুসলিম স্বাতন্ত্র্যবোধকেও সুদৃঢ় ভিতের ওপর স্থাপন করে। ১৯০৬ সালের ১ অক্টোবর মুসলিম সম্প্রদায়ের আধ্যাত্মিক নেতা আগা খাঁর নেতৃত্বে অভিজাত মুসলমানদের এক প্রতিনিধিদল সিমলায় ভাইসরয় লর্ড মিন্টোর সঙ্গে দেখা করে মুসলিম সম্প্রদায়ের 'স্বার্থরক্ষার দাবি' জানান। তখনই লর্ড মিন্টো তাঁদের 'পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থার' (Separate Electorate) আশ্বাস দিয়ে বলেন, 'সম্প্রদায় হিসাবে মুসলমানদের রাজনৈতিক অধিকার ও স্বার্থ সুরক্ষিত হবে'। এইভাবে তিনি হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করেন। ১৯০৯ সালে ভাইসরয় মিন্টো এবং ভারতসচিব লর্ড মর্লি পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থাকে বিধিবদ্ধ করেন। ১৯০৬ সালে লর্ড মিন্টো যখন মুসলমানদের স্বার্থরক্ষার আশ্বাস দেন, তখন জনৈক রাজপুরুষ লেডি মিন্টোকে লেখেন, 'ভারত ও ভারতের ইতিহাসকে দীর্ঘকাল ধরে প্রভাবিত করতে পারে এমন এক কূটনীতির খেলা হয়ে গেল।' তখন ভারতসচিব লর্ড মর্লি হিন্দু ও ইসলামের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য বিস্তৃত বিশ্লেষণ করে এই বিভেদ নীতিকে কার্যকর করতে উদ্যোগী হন। লক্ষণীয় এই যে, আগা খাঁর এই ডেপুটেশনের পরই ঢাকা শহরে মুসলিম লিগ গঠিত হয়। এইভাবে বিশ শতকের সূচনাতেই হিন্দু ও মুসলিম বৃত্ত দুটো সম্প্রদায়গত স্বাতন্ত্র্যবোধকে প্রবল করে এবং রাজনৈতিক আন্দোলনকে প্রভাবিত করে ব্রিটিশ বিরোধী ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের পথে অন্তরায় সৃষ্টি করে। ব্রিটিশ শাসকরা 'ভাগ করো দেশ, শাসন করো' নীতি প্রয়োগ করে দুটো সম্প্রদায়ের মধ্যে তিক্ততা সৃষ্টিতে সহায়তা করে। সুভাষচন্দ্র যখন ছাত্র ছিলেন, তখন এই ছিল ভারতের পরিস্থিতি। তিনি যে ইংরেজের বিভেদ নীতি সম্বন্ধে যথেষ্ট সচেতন ছিলেন, তা তাঁর পরবর্তী কাজকর্ম থেকে উপলব্ধি করা যায়।

প্রথম পর্বে সুভাষচন্দ্রের চিন্তা দর্শন তত্ত্বকে অবলম্বন করে প্রবহমান হয়। দ্বিতীয় পর্বে যখন প্রত্যক্ষভাবে রাজনৈতিক মঞ্চে তাঁর আবির্ভাব ঘটল, তখন তাঁর ভাবনা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক তত্ত্বের দ্বারা আরও পরিপুষ্ট হয়। ১৯২১ সালের জুন মাসে ইংল্যান্ড থেকে ভারতে ফিরে এসেই তিনি তাঁর রাজনৈতিক গুরু চিত্তরঞ্জন দাশের প্রভাবে এবং গান্ধীজি পরিচালিত আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করার মধ্য দিয়ে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেন। এই সময়ে তাঁর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চিন্তার বিকাশ ও ব্যাপ্তি ঘটে। স্বাধীন ভারতের রাষ্ট্রব্যবস্থা কী ধরনের হবে, তার অর্থনৈতিক গড়নটি কীরকম হবে এবং নানা ধর্মের জনসাধারণকে কী করে একই রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে ঐক্যবদ্ধ করে এক নতুন ভারত গঠন করা যায়, এইসব নিয়ে তাঁর চিন্তার প্রকাশ ঘটে। সম্প্রদায়গত স্বাতন্ত্র্যবোধ যাতে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতাবাদের পথটি প্রশস্ত করতে না পারে, তার জন্য গঠনমূলক কর্মপদ্ধতির প্রতি তিনি গুরুত্ব আরোপ করেন। একইসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের ঐক্যের ও বিশ্ব সংস্কৃতির সমন্বয়ের ভাবনার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে সুভাষচন্দ্র দেশবাসীকে ধর্মীয় গোঁড়ামি ও সংকীর্ণতা বর্জন করে স্বাধীন ভারত গঠনে দায়িত্ব পালন করতে আহ্বান জানান। তিনি যুবকদের দেহে, মনে ও আধ্যাত্মিকতায় উদ্বুদ্ধ করে ভারতীয় সমাজ পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত করেন।

১৯২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে চৌরিচৌরার হিংসাত্মক ঘটনার পর গান্ধীজি অহিংস অসহযোগ আন্দোলন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত রাখেন। তার ফলে সমগ্র দেশ হতাশায় নিমজ্জিত হয়। খিলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনের সময়ে হিন্দু-মুসলিম মিলিত প্রয়াসের মধ্য দিয়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী সংগ্রাম এক উচ্চপর্যায়ে উন্নীত হয়। কিন্তু গান্ধীজি কর্তৃক আন্দোলন প্রত্যাহার করার ফলে যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, তাতে হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে তিক্ততা ও বিরোধ দেখা দেয়। সাম্প্রদায়িক সমস্যা জটিলতা সৃষ্টি করে। এই সময়ে চিত্তরঞ্জন দাশ বাংলার হিন্দু মুসলমানের মধ্যে সুসম্পর্ক স্থাপনের উদ্দেশে ১৯২৩ সালে জাতীয়তাবাদী মুসলমানদের সঙ্গে একটি চুক্তিতে আবন্ধ হন। এই চুক্তি 'বেঙ্গল প্যাক্ট' বা 'হিন্দু- মুসলিম প্যাক্ট' নামে পরিচিত। ধর্মীয় সহনশীলতা এবং রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অধিকার সংরক্ষণের নীতি অবলম্বন করেই এই প্যাক্ট রচিত হয়। এই চুক্তির মাধ্যমে স্বরাজ্য পার্টি লখনউ প্যাক্টের (১৯১৬) ত্রুটি দূর করার চেষ্টা করে। কিন্তু কংগ্রেস নেতৃবৃন্দ এই প্যাক্ট অনুমোদন না করায় সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে এই প্যাক্টের কোনো প্রভাব পড়েনি। বাংলায় মুসলমানদের বেশি সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়েছে বলেও চিত্তরঞ্জন দাশের সমালোচনা করা হয়। সুভাষচন্দ্র চিত্তরঞ্জনকে সম্পূর্ণভাবে সমর্থন করেন। স্বরাজ্য দলের পক্ষ থেকে এই প্যাক্টের সমর্থনে বিভিন্ন জেলায় সভা করা হয়। ১৯২৪ সালের মার্চ মাসে কলকাতা কর্পোরেশনের নির্বাচনে স্বরাজ্য পার্টি জয়ী হয়। চিত্তরঞ্জন দাশ হলেন মেয়র, এইচএস সোহরাওয়ার্দি হলেন ডেপুটি মেয়র এবং সুভাষচন্দ্র বসু হলেন চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার। ১৯২৪ সালে উত্তরবঙ্গের সিরাজগঞ্জ শহরে বঙ্গীয় প্রাদেশিক সম্মেলনে 'বেঙ্গল প্যাক্ট' অনুমোদিত হয়। এই সম্মেলনের সভাপতি ছিলেন মৌলানা মহম্মদ আকরম খাঁ। বিশিষ্ট মুসলিম নেতা মুজিবর রহমান এই সভায় উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু বেঙ্গল প্যাক্টের প্রভাব ক্ষণস্থায়ী হলো। ১৯২৫ সালে চিত্তরঞ্জন দাশের মৃত্যুর পর স্বরাজ্য পার্টির প্রভাব হ্রাস পায়।হিন্দু মুসলমানে বিভেদ প্রকট হয়। 

সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে হিন্দু ও মুসলিম সংগঠনগুলো তৎপর হয়। তারা সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়িয়ে দেয়। ১৯২৫ সালে হিন্দু মহাসভার পক্ষ থেকে প্রচার করা হয়, গান্ধীজি প্রচারিত অহিংসা নীতি হিন্দু সংহতিকে ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। একই বছরে নাগপুরে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) প্রতিষ্ঠিত হয়। এই দল 'হিন্দুরাষ্ট্র' তত্ত্ব প্রচার করে। ১৯৩১ সাল থেকে ১৯৩৯ সাল পর্যন্ত সময়কালে আরএসএস-এর প্রভাব খুবই বৃদ্ধি পায়। অন্যদিকে ১৯২৩-১৯২৪ সালে তবলিগ, তনজিম, আঞ্জুমান ইত্যাদি মুসলিম সংগঠনের প্রভাবও বৃদ্ধি পায়। কবি মহম্মদ ইকবাল তাঁর রচিত বিখ্যাত সঙ্গীতে ভারতীয় ঐক্যের আদর্শের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেন। কিন্তু তাঁর ভাবনায় পরিবর্তনও লক্ষ করা যায়। ১৯৩০ সালে তিনি একটি 'মুসলিম ভারত' গঠনের জন্য 'মুসলিম দাবি' উত্থাপন করেন। তিনি পাঞ্জাব, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ, সিন্ধু ও বালুচিস্তান নিয়ে একটি রাষ্ট্র গঠনের কথাও বলেন।

১৯৩৩ সালে ইংল্যান্ডের কেমব্রিজে পঠনরত মুসলমান ছাত্ররা কবি ইকবালের ভাবনার প্রতি আকৃষ্ট হন। তাঁরা 'পাকিস্তান ন্যাশনাল মুভমেন্ট' নামে একটি সংস্থাও গড়ে তোলেন। কেমব্রিজ গ্রুপ পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের দাবি উত্থাপন করেন। ১৯৩৬-১৯৩৭ সালে কবি ইকবাল ও মুসলিম লিগ নেতা এম এ জিন্নাহ, পরস্পরের নিকটবর্তী হন। কবি ইকবালের ভাবনার দ্বারা জিন্নাহ প্রভাবিত হন এবং মুসলিম স্বাতন্ত্র্যবোধের পথটি প্রশস্ত করেন। অবশেষে জিন্নাহর উদ্যোগে ১৯৪০ সালে 'লাহোর প্রস্তাব' গৃহীত হয়। এই প্রস্তাব 'পাকিস্তান প্রস্তাব' নামেই পরিচিত। এই প্রস্তাবের মাধ্যমেই জিন্নাহ দ্বিজাতিতত্ত্বকে রূপদান করেন এবং মুসলমানদের জন্য একটি পৃথক রাষ্ট্রের দাবি উত্থাপন করেন। হিন্দু ও মুসলিম স্বাতন্ত্র্যবোধ স্বাধীনতা সংগ্রামের পথে অন্তরায় সৃষ্টি করায় সুভাষচন্দ্র উদ্বিগ্ন হন। হিন্দুরাষ্ট্র গঠন করে অথবা পৃথক মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে যে সাম্প্রদায়িক সমস্যার প্রকৃত সমাধান সম্ভব হবে না, সে বিষয়ে সুভাষচন্দ্রের মনে কোনো সংশয় ছিল না। তিনি ভারতীয় পরিবেশে ভারতের উপযোগী করে একটি সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা গঠনের মাধ্যমে ভারতকে সাম্প্রদায়িক সমস্যা থেকে মুক্ত করে এক ঐক্যবদ্ধ স্বাধীন ভারত গড়ে তুলবার জন্য একটি বিকল্প কর্মসূচিও তৈরি করেন। তাঁর ভাবনা অনুযায়ী ভারতের 'সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র' এমন একটি রাষ্ট্র হবে যেখানে প্রতিটি নাগরিক সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দাসত্ব থেকে মুক্ত হবে। তিনি যে কর্মসূচি রচনা করেন তাতে কৃষক, শ্রমিক, যুবক ও নারীদের সংগঠিত করা, জাতিভেদ প্রথার অবসান ঘটানো, সর্বপ্রকার সামাজিক ও ধর্মীয় কুসংস্কার সমূলে উৎপাটন করা ইত্যাদির প্রতি বিশেষভাবে গুরুত্ব আরোপ করা হয়। মানব সভ্যতার অগ্রগতিতে ফরাসি বিপ্লবের ও রুশ বিপ্লবের অবদান উল্লেখ করে সুভাষচন্দ্র এই প্রত্যয় ব্যক্ত করেন যে, আগামীদিনে সামাজিক অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধানের মধ্য দিয়ে ভারত ও মানব সভ্যতার ইতিহাসে তার অবদান রাখতে সক্ষম হবে। শ্রমজীবী মানুষের অধিকার রক্ষার উদ্দেশ্যে তিনি নিজেও শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত হন। 

১৯৩৮ সালে কংগ্রেস সভাপতিরূপে কংগ্রেসের হরিপুরা অধিবেশনে তিনি যে দীর্ঘ ভাষণ দেন তাতে তিনি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের বিভেদনীতি স্পষ্ট করে দেশবাসীর সামনে তুলে ধরেন। তারা ভারতকে বিভক্ত করার ষড়যন্ত্র করছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন। তিনি ভারতীয় ঐক্যের বিষয়টি আলোচনা প্রসঙ্গে বলেন, জাতীয়তাবাদের মূল নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য সাধন করে ঐক্যের প্রশ্নের চূড়ান্ত মীমাংসার সুযোগ উপস্থিত হয়েছে। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের একই রকম অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বার্থের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করলে সম্প্রদায়গত বিভেদ অতিক্রম করা সম্ভব হবে। তিনি এই ভাষণে এই কথাও বলেন, কংগ্রেসের নীতি হবে নিজে বেঁচে থাকা এবং অন্যকেও বাঁচতে দেওয়া কংগ্রেসের নীতি হবে সম্পূর্ণভাবে বিবেক, ধর্ম এবং বিভিন্ন ভাষাভাষী অঞ্চলের সাংস্কৃতিক স্বায়ত্তশাসনে সম্পূর্ণভাবে হস্তক্ষেপ না করা। তিনি স্বাধীনতা আন্দোলনকে চূড়ান্ত পর্যায়ে উন্নীত করার উদ্দেশ্যে আইন অমান্য আন্দোলন শুরু করে কার্যকর প্রতিরোধের পথ অনুসরণ করতে বলেন। একই সঙ্গে তিনি এই কথাও বলেন, সমাজতান্ত্রিক পদ্ধতিতেই দারিদ্র্য, নিরক্ষরতা ও ব্যাধির মতো প্রধান জাতীয় সমস্যাসমূহ দূর করতে হবে এবং উৎপাদন ও বণ্টনের ব্যবস্থা করতে হবে। 'প্ল্যানিং কমিশন' স্থাপন করে কৃষি ও শিল্পের উন্নতি সাধন করতে হবে। অবশ্য কংগ্রেসের আশু উদ্দেশ্য হবে, দেশকে আত্মত্যাগের জন্য প্রস্তুত করা, ভারতকে ঐক্যবদ্ধ করা এবং আঞ্চলিক ও সাংস্কৃতিক স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা। সুভাষচন্দ্র দৃঢ়তার সঙ্গেই বলেন, সমস্ত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলোকে এবং প্রদেশগুলোকে সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে ও সরকার পরিচালনার বিষয়ে স্বায়ত্তশাসন দিতে হবে। কংগ্রেসের সভাপতি হিসেবে সাম্প্রদায়িক সমস্যা সমাধানের এক বিকল্প পথ তিনি নির্দিষ্ট করে তার বিশদ বিশ্লেষণ করেন। উল্লেখ্য, সুভাষচন্দ্র ব্রিটিশ মডেলের যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার তীব্র বিরোধিতা করেন।

হিন্দু-মুসলিম সমস্যা সমাধানের উদ্দেশ্যে সুভাষচন্দ্র কংগ্রেস সভাপতি হিসেবে মুসলিম লিগ নেতা এম এ জিন্নাহর সঙ্গে অনেকবার আলোচনা করেন এবং পত্রালাপ করেন। কিন্তু জিন্নাহ বারে বারে এই দাবি করেন যে, মুসলিম লিগকে ভারতীয় মুসলমানদের একমাত্র প্রতিনিধিত্বমূলক প্রতিষ্ঠান বলে কংগ্রেসকে মানতে হবে। এই প্রশ্নেই তাঁদের আলোচনা ভেঙে যায়। তাহলেও ১৯৩৯ সালে সুভাষচন্দ্র কলকাতা মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনে বাংলার মুসলিম লিগের সঙ্গে একটি কার্যকর চুক্তি করতে সক্ষম হন। তা 'বসু-লিগ চুক্তি' নামে পরিচিত।

অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাধ্যমে সমগ্র দেশকে নতুনভাবে গড়ে তোলার ভাবনাটিকেও ১৯৩৮ সালে সুভাষচন্দ্র রূপদান করেন। তিনি জওহরলাল নেহরুকে চেয়ারম্যান করে একটি 'কাতীয় প্ল্যানিং কমিটি' গঠন করেন। জাতীয় পুনর্গঠন সম্বন্ধে সুভাষচন্দ্রের যে সুনির্দিষ্ট ধারণা ছিল তা তাঁর এই সময়ের কর্মপদ্ধতি থেকে লক্ষ করা যায়। শিল্পোন্নয়নের মাধ্যমেই সমগ্র দেশের অগ্রগতি সম্ভব, আর সমাজতন্ত্র হবে জাতীয় পুনর্গঠনের ভিত্তি। তিনি জাতীয় ঐক্য ও সংহতি অর্জন করার জন্য কংগ্রেস কর্মীদের উদ্যোগী হতে আহ্বান জানান। একটি জাতি হিসেবে ভারত যাতে গড়ে ওঠে, তার জন্য সুভাষচন্দ্র ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধের পথ ধরে চলার সঙ্গে সঙ্গে গঠনমূলক পরিকল্পনাও করেন। তিনি মনে করেন ঐক্যের সমস্যা হলো 'a mass psychological problem' এবং জনসাধারণকে এমনভাবে শিক্ষিত করতে হবে যাতে তাঁরা অনুভব করেন যে তাঁরা 'এক জাতি'। মুসলিম লিগ দ্বিজাতিতত্ত্ব প্রচার করে যে পৃথক রাষ্ট্রের দাবিতে আন্দোলন করে তিনি তার বিরোধী ছিলেন। ১৯৪৩ সালে সিঙ্গাপুরে তিনি যে 'আজাদ হিন্দ সরকার' নামে অস্থায়ী স্বাধীন ভারতীয় সরকার প্রতিষ্ঠান করেন এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের উপর চূড়ান্ত আঘাত হেনে এক স্বাধীন ঐক্যবদ্ধ ভারত গঠনে প্রয়াসী হন, আর তাঁর পরিচালিত আজাদ হিন্দ ফৌজের হিন্দু, মুসলমান, শিখ ইত্যাদি বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সৈন্যরা সাম্প্রদায়িক বিভেদ ভুলে স্বাধীনতা অর্জনের জন্য তাঁদের সমস্ত শক্তি যেভাবে নিয়োগ করেন, তা থেকে হিন্দুত্ববাদীদের ও ইসলামত্ববাদীদের এবং অন্যান্য বিচ্ছিন্নতাবাদীদের থেকে সুভাষচন্দ্রের বিকল্প পথটি আমাদের কাছে আরও স্বচ্ছ হয়ে ওঠে।


প্রকাশের তারিখ: ২৩-জানুয়ারি-২০২৪

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org