|
সুকান্ত সম্পর্কে, ব্যক্তিগতভাবে, কিছুসিদ্ধেশ্বর সেন |
কিন্তু, সুকান্ত আমার 'অরণি'র লেখার উপরে জোর দিল। তাতেই। সে সময় আরও দু'একজন কবির কথা আমার মনে পড়ে, যাদের আমরা আলোচনায় পেতাম । এঁদের একজন হলেন কবি জগন্নাথ চক্রবর্তী আর একজন কবি নরেশ গুহ। 'কবিতা'-গোষ্ঠীর সঙ্গে এঁর যোগ ছিল। আর একজনের কথা এ প্রসঙ্গে না বললেই নয়। ইনি শিল্পী দেবব্রত মুখোপাধ্যায় । সুকান্ত বা আমাদের সঙ্গে তাঁর বয়সের ফারাক ছিল বেশ। তবু, তাঁর সঙ্গে সুকান্তর সম্পর্কটা ছিল যেন বয়সের। |
সুকান্ত সম্পর্কে, ব্যক্তিগতভাবে, কিছু লিখতে যাওয়া, আমার পক্ষে বোঝা গেল যে বেশ কঠিন।
সুকান্ত ভট্টাচার্য, — প্রতিভাধন্য সে কবির কথা, ব্যক্তি-নিরপেক্ষভাবে আজ দু'যুগ ধ'রে তো বহু আলোচনার সাক্ষী। কিন্তু আমার সমানবয়সী সেই তরুণ বন্ধু-কবির কথা ভাবতে গেলে মনে যে অভাববোধ জাগে, তা একান্তভাবে আমারই। সে কথা শাখা-পল্লবে বিস্তার করতে চাওয়ায়, আমার দিক থেকে, ব্যক্তিগত সংকোচই থেকে যায়।
যেমন, ধরা যাক, সুকান্ত ছিল গানের ভক্ত। রবীন্দ্র-সংগীতের। আমার গলায় যদি কিছু সুর সেকেলে লেগেও থাকত, তবে নিঃসংশয়ে তার কৃতিত্ব অনেকখানিই ছিল সুকান্তর কানের। সে-বয়সেই কানে খাটো ছিল, তাই মন দিয়ে শুনত, ভুল শুধরে দিত।
এরকম গানের ঘরোয়ার কথা আমার বেশ মনে আছে। সুকান্ত তখন অসুস্থ। গায়ে প্রায়ই জ্বর লেগে থাকে। তাই কলকাতার রাস্তায় হাঁটাহাঁটি করতে করতে আলাপ করার অভ্যস্ত পথ বন্ধ। কাজেই, জোড়াসাঁকো থেকে আমাকে যেতে হয় নারকেলডাঙ্গায় সুকান্তদের বাড়ি। নানা কথাবার্তার পর অসুস্থ শয্যা থেকে সুকান্তের ফরমাস হতই গানের। আমার কাছে, নিজের হাতে কপি ক'রে দেওয়া তার প্রিয় রবীন্দ্রনাথের গানের অনুলিপিও, বোধ হয়, এখনও আছে। ( তার হাতের লেখা ও ছিল গোটা গোটা, সুন্দর, প্রায় রবীন্দ্রনাথেরই লিপি মক্সো করা যেন।) যেমন তার একটি প্রিয় গান ছিল : “সঘন গহন রাত্রি ঝরিছে শ্রাবণ ধারা।” এ গানটি আমারও এমন প্রিয়!
আসলে সুকান্ত ছিল গুণগ্রাহী, যতটুকু যার কাছে যা পাওয়া যেত,—অন্তরঙ্গ, অত্যন্ত এক সুকুমার মনের অধিকারী। ২ সুকান্ত তখনই যশস্বী, সাহিত্য-দরবারে স্বীকৃত, সর্বজন-প্রশংসিত কবি। কিন্তু আমি যে সুকান্তকে চিনেছিলাম, সে ছিল কিছু লাজুক, প্রথমে মনে হত বুঝি মুখচোরা,—কিন্তু আত্মপ্রত্যয়ী, অনেকের মনে হতে পারতো হয়তো বা খুব বেশীই। ঠিক কী ক'রে আমাদের আলাপ হল? হয়েও ছিল ঘটনাসূত্রে।
ছাত্র আন্দোলনের ডাকে সে-যুগের নামকরা ভবানী দত্ত লেনের বি-পি-এস-এফ-এর দপ্তরে অনেকের মতো আমারও যাতায়াত। কিশোর বাহিনীরও অফিস বসত সেখানে। উঠতে-নামতে দেখতে পেতাম বাহিনীর ভারপ্রাপ্ত কবি সুকান্তকে। আমার মনে হয় সে সময় বোধহয়, তার "অভিযান” নাট্যের মহড়া চলছিল। কিন্তু আমিও ছিলাম স্বভাববশে আত্ম-মুখ । তাই যেচে কারুর সঙ্গেই আলাপ বড় একটা হত না। তবু, বরাবরই ইচ্ছে ছিল সুকান্তর সঙ্গে আলাপের। তখন নতুন লিখছি। সে-যুগের ‘অরণি'তে আমার কবিতা বের হতে থাকে। বোধহয়, অন্নদাশঙ্কর ভট্টাচার্য বা দিলীপ রায়চৌধুরীই সুকান্তর সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দিলেন।
প্রথম আলাপেই দেখলাম সুকান্তর নজর কিন্তু সর্বদিকে। আমার লেখা যে সে পড়েছে, তা কবুল করাতে আমার সেদিন যে খুশী লেগেছিল, আজও তা মনে আছে। সেটা বোধহয় ১৯৪৫। সে-ই হল সূত্রপাত। গোড়া থেকেই লেখা পড়ে কবি সুকান্তর ওপর আমার যে আস্থা গড়ে উঠেছিল, পরিচয়ের মধ্যে দিয়ে ব্যক্তি সুকান্ত তা দিনে দিনে আমার কাছে স্পষ্ট ক'রে মেলে ধরলে। সে আমি ভুলতে পারি না ।
সুকান্ত যে কবি হতেই জন্মেছিল, তার এক বর্ণ-ও অত্যুক্তি নয়। কিন্তু গতানুগতিক পথের কবি তো সে নয়। তাই কর্মী তাকে এক দণ্ডও বসিয়ে রাখে নি । যতক্ষণ না সে রোগশয্যায় শুয়ে পড়েছিল। রোগশয্যা সুকান্তর একবার নয়, কয়েকবার। আমার মনে আছে, ডেকার্স লেনে 'স্বাধীনতা' বের হতে সুকান্তর ওপর ভার পড়ল 'কিশোর-সভা' পাতার। ডেকার্স লেনে মাঝে মাঝেই যেতাম সমান দুটো আকর্ষণে। এক 'স্বাধীনতা,' আর সুকান্ত। এখানেও কাজের মধ্যে সে অসুস্থ হয়ে পড়ল। তখন অল্পদিনের মতো সে চলে গেল পার্টির রেড-এড কিওর হোমে। রডন স্ট্রীটে। সেখানেও গিয়েছি। সুকান্তর মনে খেদ নেই যে কাজের চাপে রোগে পড়েছে। বরং যেন সে চিরকালের গর্বিতই। আসলে শরীরই তার কাহিল হতে বসেছিল। বুকে বাসা বাঁধছিল কাল-রোগ। কিন্তু, মন?
রাজনীতিতে কবিতার ক্ষতি হচ্ছে কিনা, সে তর্ক তখনই উঠেছিল, তুলেছিলেন বোধহয় বুদ্ধদেব বসু। তাঁর 'কবিতা' পত্রিকায় আমিও লিখেছিলাম। সুকান্ত তার এক অন্তরঙ্গের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেয়—কবি অরুণাচল বসু। অরুণাচলের পক্ষপাত ছিল আমার লিরিকের প্রতি। কিন্তু, সুকান্ত আমার 'অরণি'র লেখার উপরে জোর দিল। তাতেই। সে সময় আরও দু'একজন কবির কথা আমার মনে পড়ে, যাদের আমরা আলোচনায় পেতাম । এঁদের একজন হলেন কবি জগন্নাথ চক্রবর্তী আর একজন কবি নরেশ গুহ। 'কবিতা'-গোষ্ঠীর সঙ্গে এঁর যোগ ছিল। আর একজনের কথা এ প্রসঙ্গে না বললেই নয়। ইনি শিল্পী দেবব্রত মুখোপাধ্যায় । সুকান্ত বা আমাদের সঙ্গে তাঁর বয়সের ফারাক ছিল বেশ। তবু, তাঁর সঙ্গে সুকান্তর সম্পর্কটা ছিল যেন বয়সের। তার ছড়ার সঙ্গে ওঁর ছবির খেলা তখন দেখতাম। নতুন যুগের সংজ্ঞায় একজনের নাম উঠত, আমাদের মধ্যে, খুবই । তিনি কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় । সে সময় সুকান্ত একবার আমায় বলেছিল, তাঁর সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেবে, ‘স্বাধীনতা'য়। কিন্তু, আমারই সংকোচ হয়। আসলে কবিতা দিয়ে যা কিছু হবার হবে, এই আমার মন বলত । এই আমার মন বলত। যদি ভাল কখনও কিছু লিখতে পারি।
একবার রাজনীতি ও কবিতার তর্কের মধ্যে সুকান্ত একটু চুপ ক'রে থেকে বলেছিল, 'আমরা যে নতুন জাতের লিখিয়ে, এটাই অনেকে বুঝছে না।'
এখন নিশ্চয়ই অনেকে বুঝছে, কিন্তু তখন ? রোগও সুকান্তকে কাবু করতে পারল না। পরের বার রোগশয্যা তাদের নারকেলডাঙ্গার বাড়ি থেকে সরে এল শ্যামবাজারে রামধন মিত্তির লেনে। সুকান্তর জ্যেঠতুতো দাদাদের বাড়ি। সেখানেও অনেক সন্ধ্যেয় গিয়েছি। সুকান্তের নারকেলডাঙ্গা থাকার সময়ের একটা ঘটনা মনে পড়ছে। মাঝে কিছুদিন বাদ দিয়ে গিয়েছি। দোতলার সিঁড়ি দিয়ে উঠে যেতে হত । পুরনো বাড়ি । নিচ থেকে ডাকতাম। তখন সুকান্তর ছোট ভাইয়েরা প্রশান্ত, মুকুল বা অশোক, এখনকার কবি অশোক ভট্টাচার্য, আমাদের ওপরে যাবার পথ দেখিয়ে দিত। অমিয় তখন খুবই ছোট ছিল। কত অল্প বয়সই না তখন ছিল ওদের। একথা সেকথার পর অনিবার্যভাবে সুকান্ত আমাকে কবিতার কথা জিজ্ঞেস করে বসল। আমি একটু অপ্রতিভ জবাবে বললাম, 'মনে হয়, আমার কবিতা ঠিক হচ্ছে না।' আসলে আমার বার বার এরকম মনে হয়। এখনও, আজও। সুকান্ত একটু পরে মাথার নিচ থেকে তার কয়েকটি নতুন কবিতা বার করে পড়ে শোনাল। “সিঁড়ি” “চারাগাছ” “প্রার্থী”। সত্যি মুগ্ধ হয়ে গেলাম। পরে “প্রার্থী” বেরিয়েছিল “পরিচয়”-এ। বোধহয়, যখন সে যাদবপুরে টি. বি. হাসপাতালে, একেবারে শেষশয্যায়।
8 যাদবপুরে সুকান্তকে দেখতে আমার আর যাওয়া হয়ে ওঠে নি। কিন্তু, তার আগেই সুকান্ত সম্পর্কে আমার মনে এক দারুণ উৎকণ্ঠা সহসা ভেসে উঠেছিল। সে কথা বলছি।
একদিন রামধন মিত্তির লেনে খোঁজ করতে গিয়ে, নিচে যে ঘরটিতে সে শুয়ে থাকত, দেখলাম ফাঁকা পড়ে আছে। কোথায় গেল সে, চলৎশক্তি তো ছিল জ্যেঠতুতো দাদা রাখাল ভট্টাচার্য, তাঁর সঙ্গেও দেখা হল না। জানতাম তো পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়ের চেষ্টায় ডা: রাম অধিকারী তার চিকিৎসা করছিলেন। রোগ কি এতো বাড়ল, এতোই......
যাদবপুর হাসপাতালে, সুকান্তর সঙ্গে শেষ যোগ আমার এক চিঠিতে। লিখেছিলাম 'পরিচয়' প্রকাশিত “প্রার্থী” কবিতা আবার পড়ে। সে চিঠির ভাষা ছিল আমার কৃতজ্ঞতার ভাষা—সহকর্মী পাঠক হিসাবে সেই অনাড়ম্বর, সরল অথচ আশ্চর্যগম্ভীর, প্রায় মন্ত্রময় কবিতাটির জন্যে।
কিন্তু সুকান্ত কী তখন আর সে চিঠি পড়বার অবস্থায় ছিল? আমি লিখেছিলাম, এরকম কবিতা ওর কলম থেকে আরও কত না পাবার প্রতীক্ষায় দিন গুণব। তার আরোগ্যের দিন আমরা গুণব।
গভীর বিশ্বাসের সঙ্গেই তো আমি সুকান্তকে এ সব কথা লিখতে পেরেছিলাম। কিন্তু, আমি কি জানতাম যে এর থেকেও গভীর, গূঢ়, অবিসম্বাদিত অনেক সত্য জীবনে থেকে যায়।
তা আমি জানতে পেরেছিলাম মাত্র কয়েকদিন পরেই। একদিন সকালে উঠেই জানতে পারা গেল, সুকান্ত আর নেই । সারা শহরই সে খবর পেল, খবরের কাগজের পাতায়।
হঠাৎ এক মুহূর্তে যেন আমার অনেকখানি ছিন্ন হয়ে গেল। বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়লাম রাস্তায়। চোখ ঝাপসা হয়ে এসেছে। আর না জেনেই, আমি দেখলাম হাঁটছি কলকাতার সেই সব রাস্তাঘাটের দিকে, একদিন বহু সন্ধ্যায় বা বিকেলে যে সব পথঘাট দিয়ে আমি বন্ধু সুকান্তর সঙ্গে হেঁটে যেতে পেরেছিলাম।
সূত্র- সুকান্ত স্মৃতি, সুজিতকুমার নাগ (সম্পাদিত) প্রকাশের তারিখ: ১৫-আগস্ট-২০২৫ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |