|
সুকান্ত: উদ্দীপ্ত হৃদয়ের কথাদেবরাজ দেবনাথ |
জানবার সুযোগ পাচ্ছে, “মজুরেরা দ্রুত খেটেই চলেছে—/ খেটে খেটে হল হন্যে;/ ধনদৌলত বাড়িয়ে তুলছে/ মোটা প্রভুটির জন্যে।” স্পষ্ট হৃদয়গ্রাহী ভাষায় শ্রেণির কথা, শ্রেণির শোষণের কথা সুকান্ত বলছেন। শুধু তাই নয়, “সব চেয়ে ভাল খেতে গরীবের রক্ত॥” কিম্বা “বড়লোকের ঢাক তৈরি গরীব লোকের চামড়ায়॥” জাতীয় অসংখ্য লাইন সুকান্তের সাফ রাজনৈতিক বোধের প্রতিফলক। |
সুকান্তকে আমরা চিনি কবি হিসাবে। সুকান্তের কবিতা আমাদের সন্ধান দেয় সমাজে ঘটমান অন্যায়ের, অবিচারের, তার পালটা প্রতিরোধের। অন্তত সুকান্তকে এইভাবেই চিনে অভ্যস্ত আমরা দীর্ঘকাল ধরে। বাংলা জুড়ে অজস্র সুকান্তপল্লী, সুকান্ত মূর্তি, সুকান্ত সরণিতে সুকান্তের একই ধরনের অবয়ব আমরা দেখে থাকি। গালে হাত দিয়ে স্মিতহাস্যে সুকান্ত কোন এক মহাকালিক ভাবনায় ভাবিত যেন। কোথাও দেখি হাল্কা গোঁফের বলিরেখা। চোখে যেন কী গভীর এক ইশারা! স্কুলের বেঞ্চে বসে গালে হাত দিয়ে কেউ মাস্টারমশাইয়ের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকলে তাকে সুকান্তের ভঙ্গিতে বসা নিয়ে মশকরা করাটা একপ্রকার দস্তুর হয়ে গেছে। যেমনি দস্তুর হয়েছে সুকান্তকে ‘কিশোর কবি’ বলা। ২০ বছর ৯ মাস আয়ুষ্কালের সুকান্তের কবিজীবনের বেশিরভাগই কেটেছে কৈশোরে, তা সত্য। তবে এই সব প্রচলিত ধারণার বাইরে গিয়েও সুকান্তকে দেখার চেষ্টা করা যেতে পারে। সুকান্তের জন্মের একশো বছর পরেও সুকান্ত, তার লেখাকে নিয়ে আলাপ-আলোচনা হচ্ছে। তার কোনো কোনো লেখা নতুনভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে। যেমন: রানার। সোশ্যাল মিডিয়াতে অধুনা ডেলিভারি শ্রমিকদের জীবনযন্ত্রণাকে ফুটিয়ে তুলতে আকছার ‘রানারে’র কোনো না কোনো অনুসরণমূলক রচনা ঘুরে বেড়ায়। সেগুলি সবই উত্তম সাহিত্য না ঠিকই। কিন্তু তা নি:সন্দেহে ‘রানারে'র প্রায় শতাব্দীপেরনো পাঠযোগ্যতা, সমকালীনতাকে দর্শায়। ইদানিংকালে যখন মুকেশ আম্বানির ছেলের বিবমিষা-উদ্রেককারী বৈভবের বিশ্রী প্রদর্শনমূলক বিয়ে নিয়ে দেশ উত্তাল হল, তখন সুকান্তের ‘বিয়ে বাড়ির মজা’ বারবার করে মনে পড়ে। বিশ্ব ক্ষুধা সূচকে ভারতের অবস্থান যখন তলানিতে, তখনই এ হেন ‘big fat wedding’ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় দেশের প্রকৃত অবস্থা। এরকম অজস্র উদাহরণ দেওয়া যায়, যেখানে আমরা দেখতে পাব সুকান্ত কেন কালোত্তীর্ণ। সে প্রসঙ্গ দীর্ঘায়িত করব না। আমরা সরাসরি ঢুকে যাব সুকান্তের সমকালে। বুদ্ধদেব বসু লিখছেন, ‘কবি হবার জন্যেই জন্মেছিল সুকান্ত, কবি হবার আগেই তার মৃত্যু হল।’ বুদ্ধদেব বাবুর আক্ষেপ ছিল যে সুকান্তের কবিতা বড় বেশি রাজনৈতিক। সুকান্ত কি কবিতাকে রাজনৈতিক দর্শনের প্রোপাগাণ্ডা ছাড়া অন্য কিছু ভাবতেন? সুকান্তের রাজনৈতিক দর্শনের মূল কথা তো ছিল সাম্রাজ্যবাদ, ফ্যাসিবাস ও পুঁজিবাদ বিরোধিতা, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্যের বিলোপ, দেশপ্রেম, সাম্যবাদকে অর্জন করা। তার কবিতায়, গল্পে, গদ্যে, তার চিঠিপত্রে স্পষ্ট উল্লেখ পাওয়া যায় এর। ‘দরদী কিশোর’ গল্পে সুকান্ত লিখছেন, “বাস্তবিক, আজকাল তার মন থেকে এ্যাডভেঞ্চারের, ক্লাবের আর সিনেমার নেশা মুছে গেছে। সে আজকাল বড় হবার স্বপ্ন দেখছে। তা ছাড়া সবচেয়ে গোপন কথা, সে একজন কমুনিষ্টের সঙ্গে মিশে অনেক কিছুই জানতে পারছে।” কোনো রাখঢাক রাখেননি সুকান্ত। কমিউনিস্টদের সঙ্গে মিশে কিশোর দরদ কী জিনিস, সমানুভূতি কী বিষয় তা জানবার সুযোগ পাচ্ছে। জানবার সুযোগ পাচ্ছে, “মজুরেরা দ্রুত খেটেই চলেছে—/ খেটে খেটে হল হন্যে;/ ধনদৌলত বাড়িয়ে তুলছে/ মোটা প্রভুটির জন্যে।” স্পষ্ট হৃদয়গ্রাহী ভাষায় শ্রেণির কথা, শ্রেণির শোষণের কথা সুকান্ত বলছেন। শুধু তাই নয়, “সব চেয়ে ভাল খেতে গরীবের রক্ত॥” কিম্বা “বড়লোকের ঢাক তৈরি গরীব লোকের চামড়ায়॥” জাতীয় অসংখ্য লাইন সুকান্তের সাফ রাজনৈতিক বোধের প্রতিফলক। কিশোর কবি সুকান্তকে নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে বহু গুণীজনই আফশোস করেন যে রাজনৈতিক কবিতা লিখতে গিয়ে সুকান্তের কবিত্বশক্তির অপচয় হল। কেউ কেউ বলেন বেচারা কমিউনিস্ট পার্টি করতে গিয়ে পড়াশোনা লাটে তুলে দিল। উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ জলাঞ্জলি দিল। আহা রে! কত ভালো ছেলে ছিল সুকান্ত! রাজনীতি বেচারির জান কেড়ে নিল। অথচ ‘ভালো ছেলে’ সুকান্ত বন্ধু অরুণকে ব্যক্তিগত চিঠিতে লিখছেন, “প্রেমে পড়ে কবিতা লেখা আমার কাছে ন্যক্কারজনক বলে মনে হয়।” শরীর খারাপের জন্যে যখন পড়াশোনাতে বিশেষভাবে মনোযোগ, সময় দিতে পারছেন না সুকান্ত, তখন নিজেকেই ধিক্কৃত করছেন। লিখছেন, “একদিকে বাইরের খ্যাতি, সম্মান প্রতিপত্তি লাভ করছি, অন্যদিকে... ...আমার সমস্ত আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং ভবিষ্যৎকে চূর্ণ করে দিচ্ছে। আমার শিক্ষা জীবনের ওপর এতবড় আঘাত আর আসে নি, তাই বোধহয় এত নিষ্ঠুর মনে হচ্ছে এই স্বাভাবিকতাকে, তাই সমস্ত শিরা—শিরার রক্তে রক্তে ধ্বনিত হচ্ছে প্রতিবাদ!” কবিত্বের ব্যক্তিগত খ্যাতিলাভ তার অন্তরে পড়াশোনা বন্ধের যথাযথ ক্ষতিপূরণ হতে পারেনি। সুকান্ত ছিলেন তার সমকালের মধ্যবিত্ত তরুণ মনের অন্তর্দ্বন্দ্বের মূর্ত বাস্তবতা। বন্ধু অরূণাচল দত্তকে নিজের ভিতরকে দুমড়েমুচড়ে দেওয়া প্রশ্নকে খোলাখুলি রাখলেন সুকান্ত এক চিঠিতে, “আমার লেখকসত্তা অভিমান করতে চায়, কর্মীসত্তা চায় আবার উঠে দাঁড়াতে! দুই সত্তার দ্বন্দ্বে কর্মীসত্তাই জয়ী হতে চলেছে; কিন্তু কি করে ভুলি, দেহে আর মনে আমি দুর্বল: একান্ত অসহায় আমি? আমার প্রেম সম্পর্কে সম্প্রতি আমি উদাসীন। অথোপার্জন সম্পর্কেই কেবল আগ্রহশীল। কেবলই অনুভব করছি টাকার প্রয়োজন। শরীর ভাল করতে দরকার অর্থের, ঋণমুক্ত হতে দরকার অর্থের; একখানাও জামা নেই, সেজন্যও যে বস্তুর প্রয়োজন তা হচ্ছে অর্থ। সুতরাং অর্থের অভাবে কেবলই নিরর্থক মনে হচ্ছে জীবনটা।” এক মধ্যবিত্তের আত্মপরিচয়ের আকাঙ্ক্ষা, টাকা-সর্বস্ব সমাজে অর্থের অভাব মানুষকে কোন কোন দিক থেকে অথর্ব করে দিতে পারে তার সকল ইঙ্গিত আছে এই আত্মোপলব্ধিতে। সুকান্ত শুধু প্রোপাগাণ্ডার কবি ছিলেন না, নিজে ছিলেন এই বৈষম্যের বিষম সমাজে বড় হতে থাকা সংকটদীর্ণ মনের অধিকারী এক মানুষ। শুধু কৈশোরের এডভেঞ্চার তার সঙ্গী ছিল না, সুকান্ত কালোত্তীর্ণ হতে পেরেছিলেন কারণ কৈশোরমন পেরিয়েও সুকান্ত ধরতে পেরেছিলেন, কলকাতার সামগ্রিক মনকে, বয়স, শ্রেণি, সমকালের বেড়া পেরিয়ে। “বোমারু বিমান সর্বদাই পৃথিবীর নশ্বরতা ঘোষণা করছে।” এই নশ্বরতার উপলব্ধি আছে বলেই সুসময়ের আশা অবিনশ্বর করে তোলেন সুকান্তকে। দাঙ্গা, দুর্ভিক্ষ, মহাযুদ্ধ, রোগব্যাধি, মহামারি যত সুকান্তের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতালব্ধ হয়েছে, ততই তার কবিতায় ব্যক্ত হয়েছে, “যদিও দলিত দেশ, তবু মুক্তি কথা কয় কানে, সুকান্ত ভোলেননি যে মহাজীবনের অংশ তিনি নিজে। সুকান্ত ভোলেননি তার কবিজীবনের দায়, দায়িত্ব ঠিক কোন মানুষের প্রতি। ঠিক কোন মানুষ সুকান্তের ‘বিপ্লব-স্পন্দিত বুকে লেনিনে'র সন্ধান করে আর কারা তাকে সংশোধিত করে নিছক ভাবুক বেচারা ভালো ছেলে বানিয়ে রাখতে চায় তা স্পষ্ট বোঝা যায়। সুকান্ত কোনো ভুঁইফোঁড় বিস্ময় প্রতিভা নয়। সুকান্তের জীবনের ধাঁচ, লেখার ঝাঁঝ আমাদের দাঁড় করায় দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের শেষলগ্নে এক ঘটনাবহুল মোড়ে। একশো বছর পরে দাঁড়িয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতি, দেশের রাজনীতি, সমাজ, কলকাতা, ব্যক্তিপ্রেম, জীবনের রোমান্টিকতা, প্রকৃতিপ্রেম মিলেমিশে সুকান্তকে আমরা আবিষ্কার করতে পারি নতুন আলোয়। এই দেখা অভিনব নয়, তবে স্বল্পালোচিত বটেই। যেখানে সুকান্ত একমাত্রিক ভালো ছেলে না, একমাত্রিক বিদ্রোহজীবী নয়, একমাত্রিক সুলেখক নয়, একমাত্রিক পার্টির সর্বক্ষণের কর্মী নয়। বরং সবকটিই, নানা স্তরে। ঠিকভুলে ভরা, অন্তর্দ্বন্দ্বে জর্জরিত এক মানুষ। সেই মানুষের দেখার চোখ ছিল একদম সাফ: “জন্মের প্রথম কাল হতে,/ আমরা বুদ্বুদ মাত্র জীবনের স্রোতে।” মহাজীবনের প্রতি এই বিনয় থেকেই জেগে ওঠে তার দৃঢ়সংকল্প: “জীবন যদিও উৎক্ষিপ্ত, প্রকাশের তারিখ: ১০-আগস্ট-২০২৫ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |