সুকান্ত

বুদ্ধদেব বসু
তার কবিতা প'ড়ে মোটের উপর এ-কথাই মনে হয় যে তার কিশোর-হৃদয়ের স্বাভাবিক উন্মুখতার সঙ্গে পদে-পদে দাঙ্গা বাধিয়ে দিয়েছে একটি কঠিন, সংকীর্ণ তথাকথিত বৈজ্ঞানিক মতবাদ। কবিতাগুলি যেন সেই মতবাদের চিত্রণ মাত্র; জোর গলায় চেঁচিয়ে বলা, কবিতা না-হ'য়ে খবরকাগজের প্যারাগ্রাফ হ'লেই যেন মানাতো। ‘পদাতিক' লেখবার সময় সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের যে-স্বাধীনতা ছিলো, যার জন্য একই মতবাদ সম্বন্ধে মুগ্ধতা সত্ত্বেও ঐ ক্ষীণ বইখানার কাব্যের মর্যাদা পাওয়া সম্ভব হয়েছে, সুকান্ত ভট্টাচার্যে সে-স্বাধীনতার কিছুই তো বর্তালো না।

বন্ধুমহলে নাম শুনেছিলুম আগেই; চোখে দেখলুম লেক-লগ্ন একটি ক্লাবের বাইশে শ্রাবণের অনুষ্ঠানে। উজ্জ্বল আলোয়, সুবেশ, চিক্কণ এবং সাধারণত কাব্য সম্বন্ধে উদাসীন মেয়ে পুরুষের ভিড়ের মধ্যে কালো একটি ছেলে উঠে দাঁড়িয়ে, বেশ চেঁচিয়ে, বেশ স্পষ্ট ক'রে রবীন্দ্রনাথের উদ্দেশে নিজের লেখা একটি কবিতা পড়লো। পড়াটা ভালো লাগলো আমার, কবিতাটিও মন্দ না। সভার শেষে একটু আলাপ করলুম ছেলেটির সঙ্গে। 

এর পরে সুকান্ত একদিন এলো আমার কাছে। কালোকেলো শক্তপোক্ত চেহারা, ছোটো ক'রে ছাঁটা রুক্ষ্ম চুল, আধ-ময়লা মোটা জামাকাপড়, পায়ে (খুব সম্ভব ) জুতো নেই। তার বড়ো-বড়ো মজবুত হাত-পায়ের দিকে তাকিয়ে মনে হ'লো, তার রক্তের আত্মীয়তা সেই কৃষক-মজুরেরই সঙ্গে, যাদের কথা লিখতে সে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। গর্কীর মতো, তার চেহারাই যেন চিরাচরিতের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ । কানে একটু কম শোনে, কথা বেশি বলে না, দেখামাত্র প্রেমে পড়ার মতো কিছু নয়, কিন্তু হাসিটি মধুর, ঠোঁট দুটি সরল। 

পাঁচ বছরে বোধহয় পাঁচবারও সুকান্তকে চোখে দেখিনি আমি । বছরে দু-একবার চিঠি লিখতো সে–কিংবা 'কবিতা'র জন্য কবিতা পাঠাতো— ব্যক্তিগতভাবে এটুকুই ছিলো তার সঙ্গে আমার সংযোগ । কিন্তু ব্যক্তিগতর বাইরে অন্য যে-জগৎ আছে আমাদের, সেখানে সে তো সহযাত্রী, নিত্যসঙ্গী আমাদের; সুকান্তকে আমি ভালোবেসেছিলুম, যেমন ক'রে প্রৌঢ় কবি তরুণ কবিকে ভালোবাসে; দূর থেকে লক্ষ করেছি তাকে, সে একটি ভালো লাইন লিখলে উৎসাহ পেয়েছি নিজের কাজে। আর ভালো লাইন সে মাঝে মাঝেই লিখেছে; ছন্দে ভুল নেই, হাতের লেখা সুন্দর, যা বলতে চায় স্পষ্ট ক'রেই বলে। এত তরুণ একটি ছেলের পক্ষে এর প্রত্যেকটিই উল্লেখযোগ্য। মনে-মনে আমি তাকে মার্কা দিয়ে রেখেছিলুম জাত-কবিদের ক্লাশে ; উঁচু পর্দায় আশা বেঁধেছিলুম তাকে নিয়ে। কিন্তু আশা তো বিশ্বাসঘাতিকা? সুকান্তর অল্প কয়েকটি প্রাথমিক রচনা প'ড়েই বুঝেছিলুম যে সুভাষের সঙ্গে তার মিল শুধু নামের আদ্যক্ষরে নয়; কী প্রসঙ্গে, কী আঙ্গিকে, কী অঙ্গীকারে, 'পদাতিক'-এর একান্ত অনুগামী সে। কিন্তু সুভাষ তো কাব্যের ক্ষেত্রে আর-কিছু করলো না; এরও যদি তা-ই হয় ? আশাভঙ্গের দূত এলো অন্য দিক থেকে। কয়েক মাস আগে— শীতকাল তখন— সুভাষ হঠাৎ রাত ক'রে এলো এই খবর দিতে যে সুকান্তর যক্ষ্মা হয়েছে। যক্ষ্মা!...ক-দিন পরে আবার শুনলুম ডাক্তার বলেছেন রোগ এগিয়ে গেছে অনেক দূর।...তারপর ভরা গ্রীষ্মের একটি দিনে এসে পৌঁছলো বর্তমানের তরুণতম বাঙালি কবির মৃত্যু-সংবাদ। খবরটার জন্য প্রস্তুত হ'য়ে ছিলুম, কিন্তু তাই ব'লে দুঃখ কি কম ? 

যক্ষ্মার খবরের অল্পদিন আগে সুকান্তর একটি পোস্টকার্ড পেয়েছিলুম। নিজের দুটি লাইন তুলে দিয়ে জিগেস করেছে : ছন্দ ঠিক আছে কি? বন্ধুরা সংশয় প্রকাশ করেছে। আমি তাকে জানিয়েছিলুম যে ছন্দে তার দোষ হয়নি, আর সেই সঙ্গে জুড়ে দিয়েছিলুম আদর্শ-বিশ্বাসীর গর্বপ্রস্তুত এই কথা : 'রাজনৈতিক পদ্য লিখে শক্তির অপচয় করছো তুমি ; তোমার জন্য দুঃখ হয়।' সমগ্রভাবে সুকান্তর কবিতা সম্বন্ধে এটুকুই আমার বক্তব্য । তার কবিতা প'ড়ে মোটের উপর এ-কথাই মনে হয় যে তার কিশোর-হৃদয়ের স্বাভাবিক উন্মুখতার সঙ্গে পদে-পদে দাঙ্গা বাধিয়ে দিয়েছে একটি কঠিন, সংকীর্ণ তথাকথিত বৈজ্ঞানিক মতবাদ। কবিতাগুলি যেন সেই মতবাদের চিত্রণ মাত্র; জোর গলায় চেঁচিয়ে বলা, কবিতা না-হ'য়ে খবরকাগজের প্যারাগ্রাফ হ'লেই যেন মানাতো। ‘পদাতিক' লেখবার সময় সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের যে-স্বাধীনতা ছিলো, যার জন্য একই মতবাদ সম্বন্ধে মুগ্ধতা সত্ত্বেও ঐ ক্ষীণ বইখানার কাব্যের মর্যাদা পাওয়া সম্ভব হয়েছে, সুকান্ত ভট্টাচার্যে সে-স্বাধীনতার কিছুই তো বর্তালো না। কেন বর্তালো না, এ প্রশ্নের কি উত্তর দিতে হবে? যুদ্ধকালীন উদ্ভ্রান্তির সুযোগে দেশের রাজনৈতিক দলগুলি সাহিত্যের ক্ষেত্রে এক একটি ফ্রন্ট খুললেন, আর আমাদের নবীন লেখকেরা যৌবনের ত্যাগ-প্রবণতায় অধীর হ'য়ে উঠলেন নিজেদের বিকিয়ে দিতে। “পদাতিকে' যা ছিলো মুগ্ধতার আবেগ, সুকান্তর ক্ষেত্রে তা হ'য়ে উঠেছিলো সুচিন্তিত দাসত্ব। তা-ই যদি না হবে, তাহ'লে যে-ছেলে দেয়ালে পেনসিল দিয়ে লিখেছিলে : 

দেয়ালে দেয়ালে মনের খেয়ালে 
                               লিখি কথা 
আমি যে বেকার, পেয়েছি লেখার 
স্বাধীনতা
কি 

হে রাজকন্যে 
তোমার জন্যে 
এ-জনারণ্যে নেইকো ঠাঁই 
জানাই তাই ৷ 
এমনকি
সকালে বিকালে মনের খেয়ালে 
             ইদারায় 
দাঁড়িয়ে থাকলে অর্থ টা তার 
            কী দাঁড়ায় ? 

আর লেখার পরে ফিরেও তাকায়নি, সে কী ক'রে নিম্নোদ্ধত ডামাডোলকে কবিতা ব'লে ভুল করতে পেরেছিলো-

এখন এই তো সময়- 
কই ? কোথায় ? বেরিয়ে এসো ধর্মঘট-ভাঙা দালালরা ; 
সেই সব দালালরা 
ছেলেদের চোখের মতো যাদের ভোল বদলায়, 
বেরিয়ে এসো, 
জাহান্নমে যাওয়া মূর্খের দল, 
বিচ্ছিন্ন, তিক্ত, দুর্বোধ্য- 
কিংবা ধরা যাক : 
হে মহাজীবন, আর এ কাব্য নয় 
এবার কঠিন কঠোর আঘাত আনো, 
পদলালিত্য ঝংকার মুছে যাক 
গদ্যের কড়া হাতুড়িকে আজ হানো ৷ 
প্রয়োজন নেই কবিতার স্নিগ্ধতা—
কবিতা তোমায় দিলাম আজকে ছুটি
 ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময় : 
পূর্ণিমা-চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি । 

এখানে ঘোষিত মতের সঙ্গে অভ্যাসের সুস্পষ্ট বিরোধ ঘটিয়ে যে-ছেলে কবিতা লিখে কবিতাকে ছুটি দিচ্ছে, গদ্যের হাতুড়িকে আহ্বান করছে ললিত পদাবলিতে, সে কী ক'রে এত দূর আত্মবিস্মৃত হ'তে পেরেছিলো যে : 
সহসা নেতারা রুদ্ধ—দেশ জুড়ে 
‘দেশপ্রেমিক’ উদিত ভূঁই ফুঁড়ে প্রথম তাদের অন্ধ বীর মদে 
মেতেছি এবং ঠকেছি প্ৰতি পদে- 

এই আধুনিক সম্ভাবশতক লিখতেও তার কলমে আটকায়নি ? বস্তুত, ধনিকের দ্বারা শ্রমিকের রক্তশোষণ সুকান্তর রীতিমতো একটা ম্যানিয়া হ'য়ে উঠেছিলো; সর্বত্রই সে যেন বিভীষিকা দেখছে, আর তা থেকে পালাতে গিয়ে বার-বার ডুব দিচ্ছে ভাবালুতায়। সূর্যকে সে বলছে— “হে সূর্য, তুমি তো জানো আমাদের গরম কাপড়ের কতো অভাব !' সে দেখছে, অসহায় সিঁড়িকে পা দিয়ে পিষে মারছে ‘গর্বোদ্ধত অত্যাচারী', ‘মৌন-মূক শব্দহীন' কলমকে দিয়ে কলঙ্কময় দাসত্ব করিয়ে নিচ্ছে হৃদয়হীন লেখক ; সে উত্তেজিত করছে সিগারেটকে ‘হঠাৎ জ্ব'লে উঠে বাড়িসুদ্ধ পুড়িয়ে’ মারতে, ‘যেমন ক'রে তোমরা আমাদের পুড়িয়ে মেরেছো এতোকাল'; সে কাঁদছে ডাকঘরের রানারের ছঃখে—‘পিঠেতে টাকার বোঝা, তবু এই টাকাকে যাবে না ছোঁয়া'! ( ছুঁতে পারলে কি ভালো হতো ? ) 

বালকের ভাবালুতা ব'লে এ-সব উড়িয়ে দিতে পারতুম, যদি না । সুকান্তর সহজাত কবিত্বশক্তি সম্বন্ধে শ্রদ্ধা থাকতো আমার ৷ এর চেয়ে ভালো কবিতা তার আমি দেখেছিলুম; আর আভাস পেয়েছিলুম নেপথ্যবর্তী আরো বড়ো সম্ভাবনার। কিন্তু সম্প্রতি এ-ধরনের লেখাই বেশি বেরোচ্ছিলো তার কলম থেকে, তার কারণ হয়তো এই যে রাজনৈতিকের বিচারে এগুলোই ভালো কবিতা । বাংলা সাহিত্যের বৃহৎ দুর্ভাগ্য আজ এইটেই যে এর অনেকটা অংশই হ'য়ে উঠেছে বিভিন্ন শিবিরবাসী সৈনিকদের যান্ত্রিক কুচকাওয়াজ মাত্র। আমার বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় যে এ-সব রচনা সুকান্তর স্বাধীন স্বচ্ছন্দ কর্মপ্রসূত। সৈনিকপঙক্তিতে বন্দী হ’লে, কোনো মতবাদের দাসত্ব স্বীকার করলে, কবিত্বশক্তির স্বাভাবিক বিকাশ কী ভাবে অবরুদ্ধ হয়, তারই উদাহরণ সুকান্ত । ছেলেমানুষ ব'লে অসম্মান করবো না তাকে, কেননা উনিশ-কুড়ি বছর বয়সে স্মরণীয় কবিতা লিখেছেন স্বদেশের ও বিদেশের অনেক কবি। সুকান্ত কেন পারলো না? অথবা তার স্মরণীয় কৰিতা এত অল্প কেন, যদিও তার রচনাস্রোত ছিলো স্বচ্ছন্দ, আর প্রতিভা তর্কাতীত? সে মৃত ব’লে এই প্রশ্ন কি আমরা এড়িয়ে যাবো? কবির কায়িক মৃত্যু যত দুঃখের, তার মানসিক পক্ষাঘাত কি তার চেয়ে কম? স্বেচ্ছায় আত্মবিলোপ করেছিলো সুকান্ত; শেষ পর্যন্ত নিজের লুপ্তি দ্বারা রচনা ক'রে গেলো সমসাময়িক আর পরবর্তী নবীন লেখকদের জন্য সাবধানী বাণী । 

সুকান্তর নিজের দিক থেকে মহৎ এই ত্যাগ। স্বল্প পরিসরের মধ্যে দ্বিধাহীন খেদহীন, নির্মল, সম্পুর্ণ তার জীবন। যে-প্রতিজ্ঞা সে নিয়েছিলো, তার দায়িত্ব নিঃশেষে পালন ক'রে গেছে সে। সে তো জানতো না যে দেশের ও বিদেশের বীভৎস নৈরাজ্য থেকে যে-মতবাদে নিশ্চিন্ত আশ্রয় সে খুঁজেছিলো, তারও ক্রিয়াকর্ম নৈরাজ্যাভিমুখী; সে তো জানতো না যে 'বিদ্রোহ আজ বিদ্রোহ চারদিকে' ব'লে ক্ৰমাগত চীৎকার করতে থাকলে শেষ পর্যন্ত শুধু যে রেল-লাইন ওপড়ানো আর পোস্টাপিশ পোড়ানো হবে তা নয়, শুধু যে কলকাতার রাস্তা হত্যার প্রকাশ্য রঙ্গালয় হ'য়ে উঠবে, তাও নয় ; আরো অনেক কিছু হবে: পরীক্ষা দিতে এসে ছেলেরা চেয়ার-টেবিল ভেঙে বেরিয়ে যাবে, পড়া না-পারলেই ধর্মঘট করবে স্কুলের ছাত্র- তারপর একদিন নম্বর-বিতরণে ঘোরতর অসাম্যের অন্যায় আর যদি সহ্য না হয়, যদি বিদ্যার্থী-বঞ্চিতেরা পাশ-করা পুঁজিওলাদের বিরুদ্ধে ধর্মযুদ্ধ ঘোষণা করে— তাহ’লেই বা কী বলবার আছে ? কিন্তু এই সর্বনাশী পরিণাম সম্বন্ধে অচেতন থেকেও কাব্যশক্তির বিকাশ তো সম্ভব, যদি কবির আত্মচেতনা থাকে । তাও উৎসর্গ ক’রে দিয়েছিলো সুকান্ত, কিছু হাতে রাখেনি, যুথের কাছে ব্যক্তির সর্বস্বসমর্পণের সমীকরণে তার কবিত্বে কুঁড়ি ধরেই ঝ’রে গেলো। যে-চিলকে সে ব্যঙ্গ করেছিলো, সে জানতো না সে নিজেই সেই চিল ; লোভী নয়, দস্যু নয়, গর্বিত নিঃসঙ্গ আকাশচারী, স্খলিত হ’য়ে পড়লো ফুটপাতের ভিড়ে, আর উড়তে পারলো না, অথবা সময় পেলো না। কবি হবার জন্যই জন্মেছিলো সুকান্ত, কবি হ’তে পারার আগে তার মৃত্যু হ'লো। তার জন্য দ্বিগুণ আমাদের দুঃখ । 

টীকা
১ এই প্রবন্ধের রচনাকাল ১৯৪৭; সে-সময়ে আমার তা-ই মনে হয়েছিলো, কিন্তু আজকের দিনে (১৯৭০) এ-কথা আর গ্রাহ্য নয়।
 -লেখকের টীকা । 

কবিতা। আষাঢ় ১৩৫


প্রকাশের তারিখ: ০৮-আগস্ট-২০২৫

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org