|
সুকান্তপবিত্র সরকার |
সুকান্তর পরিণত জীবন ভারতের রাজনৈতিক স্বাধীনতার আন্দোলনের একটি সন্ধিক্ষণে সচেতন ও সক্রিয় ছিল। তাই তাঁর কবিতা ও গান দেশপ্রেমের আধারে গরিব মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির কথা বেশি করে বলেছে। এটা তো আমাদের সকলেরই অভিজ্ঞতা যে, কেবল রাজনৈতিক স্বাধীনতা বঞ্চিত ও শোষিত মানুষের মুক্তি আর উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন হলেও তা সেসব সুনিশ্চিত করে না ; দেশী লোকের তৈরি কোন্ ধরনের সরকার আমরা পাচ্ছি, তার উপর নির্ভর করে। তাই স্বাধীনতার প্রায় আশি বছর পরেও ভারতে দারিদ্র, অশিক্ষা দূর হয়নি, মানুষের কাজের অধিকার সুনিশ্চিত হয়নি। |
১ এক : সুকান্তদের হয়ে আমাদের লড়াই, আমাদেরই জন্য এ লড়াই এখনও করতে হয়, তার কারণ সাধারণ বাঙালি পাঠক, বামপন্থী-অবামপন্থী নির্বিশেষে এই ধারণায় দীক্ষিত হয়ে বসে আছেন যে, পৃথিবীর কবিতার বা শিল্প-সাহিত্যের একটাই পথ, একটাই অভিমুখ, একটাই লক্ষ্য। যাঁরা মার্কস-লেনিনবাদী বিপ্লবী সাহিত্যতত্ত্বের খোঁজ রাখেন সেই বামপন্থীরা কখনও কখনও অন্যমনস্কভাবে এই বিভ্রান্তির শিকার হন। এর মূলে আছে প্রথাগত সমালোচকদের একটা দল, যাঁরা অনেক সময় বিশেষ ক্ষমতাধর ও শক্তিশালী, যেমন বাংলা সাহিত্যে মোহিতলাল মজুমদার (১৮৮৮-১৯৫২) বা বুদ্ধদেব বসু (১৯০৮-১৯৭৪)—যাঁদের মতামত আমরা শ্রদ্ধাভক্তির সঙ্গে শিরোধার্য করতে এগিয়ে যাই। তাঁরা অনেকেই শ্রদ্ধার্হ নন তা আমি বলি না, কিন্তু তাঁদের সমস্ত কথা বিনা বিচারে গ্রহণ করার বিপদ আছে। শোনা যায়, বুদ্ধদেব বসু তাঁর ‘কবিতা’ পত্রিকায় সুকান্তর কোনও কোনও কবিতা রাজনৈতিক বক্তব্যের জন্য ছাপতে চাননি, যদিও তিনি সুকান্তর কবিত্বশক্তিকে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। পৃথিবীর সাহিত্যশিল্পের যেটা পুরোনো ধারা, কেউ কেউ বলবেন মূল ও আধিপত্যকারী ধারা, সেটা ত্যাগ করে যাঁরা অন্য একটা পথে কবিতা ইত্যাদি সৃষ্টির কথা ভাবেন, তাঁদের নিয়ে ওই প্রথাগত সমালোচকদের মধ্যে চিরকালই একটা সংকট ছিল। কারণ কবিতার মূল ধারা বলে প্রথাগত সমালোচকেরা যে ধারাটাকে ধরে নেন, মূলত ব্যক্তিগত সুখদুঃখ ও আরও নানা আবেগের উচ্চারণ—প্রকৃতি, প্রেম, শিশুর সারল্য, নানাবিধ সৌন্দর্য, কোনও ঘটনাকে ছুঁয়ে গভীর ব্যক্তিগত অনুভব, সুখদুঃখ থেকে বিস্ময়, ঘৃণা, ভয়—তাকেই কবিতার ‘একমাত্র’ আর অনুমোদনযোগ্য ধারা হিসেবে ধরে নেন, এবং তারই নন্দনতত্ত্ব খাড়া করে সমালোচনার কাজে এগিয়ে আসেন। এদের কাছে কবিতার বিষয় বহুবিচিত্র হলেও তাই একদিক থেকে সীমাবদ্ধ হয়ে আছে। ওই সব কবিতা কবিব্যক্তিটির দিকে আমাদের মনোযোগ টানে, সমাজ বা মানুষের দিকে নয়। এবং সেই প্রাচীন আরিস্তোতল থেকে এই ধারণাটা আমাদের মনে বদ্ধমূল করে দেওয়া হয়েছে যে, সাহিত্য ‘উদ্দেশ্যমূলক’[২] হবে না, তার একমাত্র কাজ হচ্ছে pleasure বা আনন্দ সৃষ্টি করা। পাঠক সাহিত্য শুধু সেই জন্যই পড়বেন। এ কথাটার দুটো দিক আছে, তা আমরা অনেক সময় খেয়াল করি না। দুটো দিক পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। এক হল, সাহিত্যে আমরা যা পড়ব, আমাদের সেই ‘পড়া’ কাজটা স্বচ্ছন্দ হবে। অর্থাৎ তার ভাষা, নির্মাণ সংগঠনে এমন কিছু থাকবে না যা আমাদের পড়াকে, বা নাটক হলে, দেখাকে-- ব্যাহত আর নিরুৎসাহিত করে—‘পড়া’ কাজটাই আমাদের কাছে বিরক্তিকর মনে হয়। দুই, লেখাটা, বইটা পুরোটা পড়ে বা নাটকটা পুরো দেখে আমাদের মনে একটা তৃপ্তি হয়। একটা হল সচল অনুভব—যা সঙ্গে করে পড়া বা দেখাটাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে, আর-একটা অন্তিম অনুভব। পড়া, দেখা শেষ করে যা মনে হবে। আমরা প্রথমটাকে বলি সচল তৃপ্তি, দ্বিতীয়টাকে বলি অন্তিম তৃপ্তি বা ওই আনন্দ। ভারতীয় অলংকারশাস্ত্রে যাকে বলা হয়েছে ‘রস’। বলা বাহুল্য, দ্বিতীয়টা প্রথমটার উপর নির্ভর করবে, কারণ দ্বিতীয়টা না থাকলে শেষের তৃপ্তি বা আনন্দ পাওয়া সম্ভব নয়। এ দুয়ের তফাতের কথা আমাদের মনে রাখতে হবে, পরে আবার এ কথা আসবে। এটা, বলা বাহুল্য, অবসরভোগী শ্রেণির নন্দনতত্ত্ব, যে শ্রেণি আনন্দ ব্যাপারটাকে খুবই সংকীর্ণভাবে দেখে, ক্ষণিক উপভোগ হিসেবে, এবং মহৎ সাহিত্য থেকে তার বেশি কোনও শিক্ষা বা নির্দেশ নিতে চায় না। এটাই পরে অষ্টাদশ ঊনবিংশ শতাব্দীতে কান্ট, হেগেল, বিয়ারবম্ প্রভৃতির ‘শিল্পের জন্য শিল্প’ (Art for art’s sake) নন্দনতত্ত্ব সৃষ্টিতে উৎসাহ দিয়েছে। এর একটা দিক স্রষ্টাকে লক্ষ্য করে, বলে যে, স্রষ্টা নিজের মনের আনন্দে শিল্প সৃষ্টি করবেন, তার ওই সৃষ্টির বাইরে আর কোনও লক্ষ্য থাকবে না, আর দ্বিতীয়ত, দর্শক বা পাঠকদের বলে, তোমরাও ওই শিল্পের মধ্যে ‘আনন্দ’ ছাড়া আর কিছু খুঁজো না। এতে তথাকথিত ‘শিল্পীর স্বাধীনতা’ বলে একটা ব্যাপার খাড়া হয়। শিল্পীর দু ধরনের স্বাধীনতা—এক তাঁদের নিজস্ব ভাষা আর শৈলী নির্বাচনের স্বাধীনতা। এ স্বাধীনতার মানে হল, ভাষা যেহেতু সংযোগের মাধ্যম, তাই ভাষার মধ্যে যে প্রাচীন দায়বদ্ধতা আছে—মানুষে মানুষে সহজ সংযোগ সাধন, শিল্পী বা স্রষ্টা তা নিয়ে নিজের ইচ্ছামতো খেলা করতে পারেন। তারই ফলে অনেক কবি ও শিল্পী ভাষা ও শৈলী নিয়ে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন, পাঠক দর্শক তাঁদের সৃষ্টির ভাষা বা শৈলী বুঝবে কি না তার বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা করেননি। পশ্চিমে বিশ শতকে আঙ্গিকবাদ (Formalism), অধিবাস্তববাদ (Surrealism), দাদাবাদ ইত্যাদি নানা সাহিত্য ও অন্যান্য শিল্প-সংক্রান্ত মতবাদ তৈরি হয়েছে। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে, আঙ্গিকবাদ বাদ দিলে, অন্যান্য বাদের সঙ্গে যুক্ত এই সব কবি ও শিল্পীরা অনেকেই ইউরোপে (বিশেষত ফ্রান্সে) কমিউনিস্ট পার্টির সংস্পর্শে এসেছিলেন, কিন্তু তাঁরাই পরে শিল্পীর স্বাধীনতার নাম করে বিচিত্র ধরনের রচনারীতি পরীক্ষা করতে শুরু করেন। শিল্পীর স্বাধীনতা ওই শিল্পের জন্য শিল্পের হাত ধরে থাকে, এ কথা আমরা বলেছি। এখানে ব্যক্তি শিল্পী, বিশাল সাধারণ পাঠকসমাজের থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঝুঁকি নেন, তিনি বা তাঁর গোষ্ঠী ভাবেন যে, আমাদের দর্শক বা পাঠক সমাজ আমরা নির্মাণ বা নির্বাচন করব, তারা নিশ্চয়ই আমাদের রচনার মর্ম ও রস গ্রহণ করবে। আমাদের রচনা আপামর পাঠক-দর্শকের জন্য নয়। এইভাবে নিজেদের পাঠক বা বোদ্ধা সমাজকে সীমাবদ্ধ ও সংকীর্ণ করতে তাঁদের দ্বিধা হয় না। সাহস করে বলি, এর মধ্যে একটা অহংকারও থাকে শিল্পীর। তাঁরা অনেকে হয়তো ভাবেন, আমাদের ‘মূল্যবান’ সৃষ্টির জন্য পাঠক বা দর্শক সমাজকেও প্রস্তুত হতে হবে। তাঁরা এটা ভাবেন না যে, ওই দর্শক বা পাঠক সমাজকে ‘প্রস্তুত’ করার দায় রাষ্ট্রের পাশাপাশি তাঁদেরও কিছুটা। কিন্তু তাঁরা সে দায় নেন না। দ্বিতীয় কথা হল, ইউরোপ-আমেরিকা বা অন্যান্য উন্নত দেশের সাক্ষরতা, শিক্ষা ও সংস্কৃতির অগ্রগতির হিসাবে এই দাবি সেখানকার সমাজে যতটা সংগত বলে গণ্য হবে, আমাদের দেশের কবি-শিল্পীরাও য়খন অনুকরণসূত্রে একই দাবি করেন তখন সেটা খানিকটা নিষ্ঠুরতার মতো মনে হয়। কারণ উন্নত দেশগুলি আর আমাদের দেশের সাক্ষরতা, শিক্ষা আর সাংস্কৃতিক দীক্ষা আর অগ্রগতির মান এক নয়। কিন্তু বিপ্লবী নন্দনতত্ত্ব তো আপামর পাঠক-দর্শক, বিশেষত বঞ্চিত পাঠক দর্শকের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হওয়ার বিষয়টা অনুমোদন করে না। এই হল এক নম্বর কথা। দ্বিতীয় কথা হল, বিপ্লবী নন্দনতত্ত্ব, চায় যে-কোনও শিল্প বিপ্লবের প্রচেষ্টাকে এবং বিপ্লবকে সাহায্য করুক। এটা শিল্পের জন্য শিল্পবাদীরা চায় না। তাদের ওই এক কথা, শিল্পের আনন্দ দান ছাড়া আর কোনও ‘উদ্দেশ্য’ নেই। এর ফলে আমরা এই প্রশ্নটার মুখোমুখি এসে দাঁড়াই—তবে কি শিল্পের জন্য শিল্পের নন্দনতত্ত্বই একমাত্র বৈধ নন্দনতত্ত্ব, বিপ্লবের নন্দনতত্ত্ব বৈধ নয় ? এইটা ‘শিল্পের জন্য শিল্প’বাদীরা খুব জোর গলায় বলে চলেছে, না আমাদেরটা ছাড়া অন্য কোনও শিল্পতত্ত্ব বৈধ নয়। আমাদের দাবি, কেন নয় ? অবসরভোগী শ্রেণি ক্ষুধার্ত, বঞ্চিত, শোষিত শ্রেণির চেয়ে কোন্ অংশে ভালো (তারা অনেকে ওই ক্ষুধা আর বঞ্চনা আর শোষণের কারণ বা কারকও বটে, আবার হয়তো তুলনায় সংখ্যালঘুও) যে, তাদের, অর্থাৎ সুবিধাভোগী আর সংখ্যালঘুর নন্দনতত্ত্বকেই মানুষের সমাজে একমাত্র বৈধ বলে মেনে নিতে হবে ? এর যুক্তি কী ? সংখ্যাগুরু আর বঞ্চিতদের দাবিকে অস্বীকার বা উপেক্ষা করা হবে কেন ? এই সুখে-থাকা সুবিধাভোগীরা যেমন অন্যদের বঞ্চনা বা অভাব বা ক্ষুধাকে অস্বীকার করে সেই একই তুলনায় ? নজরুল তাঁর ‘আমার কৈফিয়ৎ’ কবিতায় এই দাবিটাই জানিয়েছিলেন, ‘অমর কাব্য তোমরা লিখিও, বন্ধু, যাহারা আছ সুখে !’ কিন্তু তিনি নিজে তাঁর ক্রোধকেই সম্বল করেছেন, তাই অভিশাপের মতো করে উচ্চারণ করেছেন, ‘প্রার্থনা করো, যারা কেড়ে খায় তেত্রিশ কোটি মুখের গ্রাস, যেন লেখা হয় আমার রক্ত লেখায় তাদের সর্বনাশ !’ সুকান্তও বলেছিলেন, ‘ইতিহাস, নেই অমরত্বের লোভ !’ নজরুল ও সুকান্ত, আরও অনেকের সঙ্গে এই বঞ্চিতের বিকল্প এক নন্দনতত্ত্ব নিজের মতো করে প্রতিষ্ঠা করেছেন, যেখানে অত্যাচারীর বিরুদ্ধে ক্রোধ, ঘৃণা, ব্যঙ্গ, ধিক্কার, অভিশাপ—কবিতার বিষয় ও আবেগ হিসেবে সবই বৈধ। বিদ্রোহও বৈধ, যার জন্য নজরুল কারার লৌহকপাট ভাঙার ডাক দেন। সুকান্তও বলেন, ‘এসো তবে আজ বিদ্রোহ করি।’ আপনারা সবাই জানেন, এঁদের লড়াইটা অনেক আগেই শুরু হয়েছে, নজরুলের সুকান্তেরও বহু আগে, সারা পৃথিবীতেই। মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী সাহিত্যশিল্পতত্ত্ব বা সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতার প্রচারেরও আগে। তার মূল কথা এই যে, সাহিত্য শুধু অবসরের সুখ দেবে না, তা মানুষের জীবন-পরিবর্তনের জন্যও ব্যবহৃত হবে। তা খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে প্লাতো বা প্লেটোর হাতে ব্যক্তিগত নৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্য নির্দেশ করেছিল, পরে কখনও ব্যাপকভাবে দেশের মানুষের মুক্তির কথা বলেছে, বায়রন (১৭৮৮-১৮২৪), শেলির (১৭৯২-১৮২২) কবিতায়, ডিকেন্সের (১৮১২-১৮৭০) জবানিতে বলেছে মানুষের দারিদ্র্য মোচনের কথা, ইবসেনের (১৮২৮-১৯০৬) হাতে এসেছে নারীর মুক্তির সওয়াল। এঁরা কেউ সেই অর্থে মার্কসবাদী বিপ্লবী নন, কোনও রাজনৈতিক দলের কর্মী ছিলেন না, কিন্তু এঁরাও সাহিত্য শিল্পের ওই তথাকথিত ‘মূল’ বা আধিপত্যকারী ধারা সম্বন্ধে প্রশ্ন তুলেছেন। পরে ম্যাক্সিম গোর্কি (১৯৬৮-১৯৩৬), জঁ পোল সার্ত্র (১৯০৫-১৯৮০)-ও এই মানবিক বা সর্বহারার নন্দনতত্ত্বকে নিজের নিজের মতো করে গ্রহণ করেছেন। সার্ত্র-এর engage বা দায়বদ্ধতার কথাটি এখানে উল্লেখযোগ্য। বহুসংখ্যক ভারতীয় লেখকও, প্রেমচন্দ থেকে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়—সকলেই এই নন্দনতত্ত্বের শরিক হয়েছেন। আমরা সে দীর্ঘ তালিকায় না গিয়ে বলি যে, সুকান্ত সেই ধারার এক অত্যন্ত শক্তিশালী কবি। বাংলার আরও অনেক কবি সুকান্তর সঙ্গী ছিলেন, আছেন। আগেই বলেছি, এবং আর একবার বলি যে, সাহিত্য ‘শুদ্ধ’ আনন্দসৃষ্টি ছাড়া উদ্দেশ্যমূলক হবে না, এই কথাটা সকলে বিনা তর্কে মেনে নেননি। তবে উদ্দেশ্যের চেহারা নিয়ে তফাত ঘটেছে। প্লাতোর প্রতিধ্বনি তুলে বাঙালি বঙ্কিমচন্দ্রের লক্ষ করেছেন, মানুষের, হযতো তাঁর শ্রেণির মানুষের ব্যক্তিগত নৈতিক উন্নয়ন, এমনকি রবীন্দ্রনাথও ‘সত্য’ আর ‘সুন্দর’-এর পাশাপাশি ‘মঙ্গল’-এর ধারণাটিকে গ্রহণ করেছেন। কার মঙ্গল, কী ধরনের মঙ্গল— এ সব প্রশ্ন তুললেও, তাকে ব্যাপক অর্থে গ্রহণ করাই যায়। কাজেই সর্বহারার নন্দনতত্ত্ব বৈধ— এটুকু সুকান্তের হয়ে আমাদের লড়াইয়ের ভিত্তি। বলা বাহুল্য, সুকান্ত নিজেও তাঁর সমৃদ্ধ শৈলী আর বিষয়ে এই বৈধতা প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ২ দুই : সুকান্ত যে লড়াই করেন আমাদের হয়ে দিনবদলের লড়াইয়ের নানা চরিত্র দেখা যায়। একটি পরিচিত চেহারা হল সাম্রাজ্যবাদের কাছে পরাধীন দেশের স্বাধীনতার সংগ্রাম। সে লড়াইয়ে আমাদের অনেক বাঙালি কবি ও লেখক যোগ দিয়েছেন, রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়, বঙ্কিমচন্দ্র, নবীনচন্দ্র সেন, রবীন্দ্রনাথ, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, অতুলপ্রসাদ সেন, রজনীকান্ত সেন, মুকুন্দ দাস, শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত সহ অনেকেই। তাঁদের দেশপ্রেমের কবিতা, গান ও নাটক এখনও আমরা স্মরণ ও ব্যবহার করি। সুকান্তর পরিণত জীবন ভারতের রাজনৈতিক স্বাধীনতার আন্দোলনের একটি সন্ধিক্ষণে সচেতন ও সক্রিয় ছিল। তাই তাঁর কবিতা ও গান দেশপ্রেমের আধারে গরিব মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির কথা বেশি করে বলেছে। এটা তো আমাদের সকলেরই অভিজ্ঞতা যে, কেবল রাজনৈতিক স্বাধীনতা বঞ্চিত ও শোষিত মানুষের মুক্তি আর উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন হলেও তা সেসব সুনিশ্চিত করে না ; দেশী লোকের তৈরি কোন্ ধরনের সরকার আমরা পাচ্ছি, তার উপর নির্ভর করে। তাই স্বাধীনতার প্রায় আশি বছর পরেও ভারতে দারিদ্র, অশিক্ষা দূর হয়নি, মানুষের কাজের অধিকার সুনিশ্চিত হয়নি। তাই পরিযায়ী শ্রমিকদের দুর্গতির কথা আমরা রোজ শুনতে পাই। সুকান্ত এমন এক দেশ বা পৃথিবীর স্বপ্ন দেখেন যেখানে এ সব থাকবে না। তো সুকান্ত নিজে তাঁর কৈশোরেই কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত হয়ে, ওই (আমাদের মতে রীতিমতো বৈধ) বিপ্লবী নন্দনতত্ত্বে দীক্ষা নিয়েছিলেন। দেশের ইতিহাসের যে সন্ধিক্ষণে তিনি তাঁর সংক্ষিপ্ত জীবন বেঁচেছিলেন, তাতে তিনি তাঁর কবিতাকে প্রধানত ভারতের বঞ্চিত ও দরিদ্র মানুষের জীবনের পরিবর্তনের জন্য তাঁর শিল্পকে নিয়োজিত করেছিলেন। তিনি শুধু ইতিহাসের সাক্ষী নন, তাঁর সময়কার ইতিহাসের মানুষ, ভারতের মানুষ যে সংগ্রাম করছে, শুধু নিরপেক্ষ ঐতিহাসিকের মতো তার ‘দিনপঞ্জিকা লিখে’ যাননি, পক্ষপাতী হয়ে ওই বিদ্রোহের ঘটনায় উচ্ছ্বসিত হয়ে সবাইকে আহ্বানও করেন ওই বিদ্রোহে যোগ দেওয়ার জন্য— এত বিদ্রোহ কখনো দেখেনি কেউ, দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ। স্বপ্নচূড়ার থেকে নেমে এসো সব, শুনেছ, শুনেছ, উদ্দাম কলরব। অর্থাৎ ইতিহাসের সাক্ষী ও লেখক শুধু নন, ইতিহাসের স্রষ্টা হওয়ারও সংকল্প নিয়ে তিনি কলম ধরেন। ইতিহাসের স্রষ্টা তো নানা ভাবে হওয়া যায়। এক, কাজের মধ্য দিয়ে, রাজনৈতিক সংগঠন বা পার্টির অংশ হয়ে, দিনবদলের জন্য কর্মী হয়ে। সুকান্ত বিশেষ করে ছোটদের সংগঠন ‘কিশোর-বাহিনী’ তৈরি করে একটি অসামান্য কাজ করেছিলেন, যা এখনও তাঁর স্বপ্নকে বহন করে চলেছে। আর দুই, তাঁর প্রধান আত্মপরিচয় তৈরি হয়েছে তাঁর কবিতায় ও অন্যান্য রচনায়। ইতিহাস বদলের লক্ষ্যে এগুলির কী ভূমিকা, সে প্রশ্ন উঠতেই পারে। আমরা বলব, দিনবদলের কর্মী ও সৈনিকদের প্রেরণা সৃষ্টির ভূমিকা। তাঁদের কোন্ স্বপ্ন দেখতে হবে, কেন সেই স্বপ্নপূরণের লক্ষ্য থেকে বিচলিত হলে চলবে না, কেন তাতে দ্বিধা বা জড়তার স্থান নেই, সুকান্তের মতো স্রষ্টারা যুদ্ধের চারণগায়কদের মতো যুদ্ধেরই অঙ্গ হয়ে যান। সেই চারণ সুকান্তই আমাদের মূল লক্ষ্য। তাই আমরা তাঁর পরিণত ভাবনার কবিতাগুলিকেই সামনে তুলে আনব, মূলত তাঁর ‘ছাড়পত্র’ ও ‘ঘুম নেই’-এর কবিতা। ‘পূর্বাভাস’-এরও কিছু, যদিও এ বইটির কবিতাগুলির পরিণতি সুষম নয়। তাঁর গান ও অন্যান্য রচনা, যেগুলির মধ্য তিনি প্রথাকে বেশি অনুসরণ করেছেন সেগুলির প্রতি তত মনোযোগ দেব না। এখন মনেই হতে পারে যে, যে বিপ্লবের কথা সুকান্ত বলছেন, যার স্বপ্ন দেখছেন দেখাচ্ছেন, তার কি কোনও চিহ্ন ভারতের বিবর্তিত ও বর্তমান ইতিহাসে খুঁজে পাওয়া যাবে ? এ প্রশ্ন সংগত, যাঁরা করবেন তাঁরা হয়তো বিদ্রুপ আড়াল করার চেষ্টা না করেই করবেন। কিন্তু মনে রাখতে হবে, সুকান্তের মতো যাঁরা বিপ্লবের স্বপ্ন দেখেন তাঁদের অধিকাংশের হাজার প্রতিকূলতার মধ্যেও বিপ্লবের বা লাঞ্ছিত মানুষের জীবন পরিবর্তনের স্বপ্ন মরে না। মনুষ্যত্বের দায় থেকে এই স্বপ্নটা বাঁচিয়ে রাখতে হয়। তবু আমাদের মনে হয়, গত শতাব্দীর তিরিশ আর চল্লিশের বছরগুলিতে সুকান্ত একটা ইতিহাসের সন্ধিক্ষণ লক্ষ করেছিলেন। অন্য অনেক কবিও— বিষ্ণু দে (১৯০৯-১৯৮২), অরুণ মিত্র (১৯০৯-২০০০), দীনেশ দাস (১৯১৩-১৯৮৫) আর অন্যান্যরাও এই স্বপ্নের কমবেশি শরিক ছিলেন। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পরিণামে এশিয়া-আফ্রিকার অনেকগুলি দেশ স্বাধীনতা পাবে, সেটা এক ধরনের বিপুল পরিবর্তন, তা সর্বহারার বিপ্লব না হোক। বিশেষ করে পঞ্চাশের মন্বন্তরে মানুষ বিদ্রোহ করেনি, এটা সুকান্তর কাছে বিস্ময়কর মনে হয়েছে, বলেছেন, ‘মূর্খ তোমরা,/লাইন দিলে, কিন্তু মুক্তির বদলে কিনলে মৃত্যু’ (‘ঐতিহাসিক’)। তিনি লক্ষ করেছেন ইতিহাসের হয়ে, ‘অন্য দেশ মুক্তি কিনে নিয়েছে’। এই মুক্তির ছবিটা কী ? তা হল, ‘ছাড়পত্র’ কবিতাতেই বলে দিয়েছেন তিনি, শিশুর বাসযোগ্য এক পৃথিবী। তাই তাঁর দৃপ্ত ঘোষণা— চলে যাব—তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ, প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল, এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার। অবশেষে সব কাজ সেরে আমার দেহের রক্তে[৩] নতুন শিশুকে করে যাব আশীর্বাদ। তার পর হব ইতিহাস। যারা বিপ্লবের স্বপ্ন দেখে, স্বপ্ন দেখা শত বিপর্যয়ের পরেও ছাড়ে না, তাদের কাছে সুকান্তর এই পঙ্ক্তিগুলি আলোকস্তম্ভের মতো কাজ করে। শুধু তাই নয়, সুকান্ত তাদের হার-না-মানা সংকল্পকে জাগিয়ে রাখতে অজস্র রূপক চিহ্ন নির্মাণ করেন বিজয়ের। অত্যাচারী চিলের মৃতদেহ, দেশলাই-কাঠি, পদদলিত সিঁড়ি ও কলমের বিদ্রোহ, অশত্থ চারার মধ্যে প্রাচীন ও জরাজীর্ণ প্রাসাদ ধ্বংসের সম্ভাবনা— কত কী লক্ষ করেন এই দুর্দমনীয় স্বপ্নদর্শী কবি। বিপ্লব-স্পন্দিত বুকে যাঁর নিজেকে লেনিন মনে হয়। ফলে তাঁর বহু ছত্র উজ্জীবন ও প্ররোচনা বহন করে, কিছুতেই আমরা যাতে বিপ্লবের সংকল্প থেকে বিচ্যুত না হই, তার জন্য আমাদের অন্তহীন তাগিদের মধ্যে অশান্ত রাখে। এ রকম অনেক ছত্র আমাদের স্মরণে মুদ্রিত হয়ে আছে— অস্ত্র ধরেছি এখন, সমুখে শত্রু চাই। মহামরণের নিষ্ঠুর ব্রত নিয়েছি তাই।
আর কতদিন দুচক্ষু কচলাবে— জালিয়ানওয়ালায় যে পথের শুরু সে পথে আমাকে পাবে।
ভগ্ননীড়,-- ক্ষুধিত জনতা আজ নিবিড়। সমুদ্রে জাগে বাড়বানল, কী উচ্ছল তীরসন্ধানী ব্যাকুল জল। কখনো হিংস্র নিবিড় শোকে দাঁতে ও নখে— জাগে প্রতিজ্ঞা অন্ধ চোখে।
রক্তে আনো লাল, রাত্রির গভীর বৃন্ত থেকে আনো ছিঁড়ে ফুটন্ত সকাল।
বেজে কি উঠল সময়ের ঘড়ি ? এসো তবে আজ বিদ্রোহ করি।
এ রকম উদ্ধৃতির অনন্ত তালিকা সাজিয়ে দেওয়া যায়।
তাঁর কবিতার শৈলী অনুসরণ করে মনে হয়, রবীন্দ্রনাথ তো আছেনই, তা ছাড়াও এক সময় তিনি তিরিশের অভিজন (‘এলিট’) কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্তের (১৯০১-১৯৬০) শৈলীর দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। কিন্তু সুধীন্দ্রনাথের ব্যক্তিগত অভিমুখ ও দুর্বোধ্যতা পরিহার করে, ছন্দ ও মিলের বিচিত্র কারুকর্ম তিনি সম্পূর্ণ আত্মস্থ করেছিলেন এবং নিজের বিপ্লবমুখী উৎসাহ ও আবেগকে প্রকাশ করবার এক একান্ত নিজস্ব শৈলী তিনি নির্মাণ করেছিলেন, যা একই সঙ্গে সহজ ও তেজঃপূর্ণ। বিশেষ করে মনে আসে তাঁর বিরোধাভাসপূর্ণ ‘হে মহাজীবন’ কবিতাটি, যেখানে কবিতার চমৎকার ছন্দমিলের শৈলী ব্যবহার করেই তিনি ‘কবিতা’র বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন, আর একটি অসামান্য উৎপ্রক্ষা নির্মাণ করেন ‘পূর্ণিমা-চাঁদ যেন ঝলসানোর রুটি’ এই অভূতপূর্ব ছত্রে। তেমনই যখন তিনি গদ্যছন্দে লেখেন তাও তাঁর তীব্র অথচ সংযত আবেগে আমাদের আলোড়িত করতে থাকে। তা অন্য বামপন্থী কবিদের থেকেও নিজেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র করে চিহ্নিত করে, তা সুকান্তরই, আর কারও নয়। সেজন্য সর্বস্তরের পাঠকের কাছে সুকান্তর জনপ্রিয়তা এত ব্যাপক ও দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে। টীকা প্রকাশের তারিখ: ১৬-আগস্ট-২০২৫ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |