স্বাধীনতা ইতিহাসে সুভাষচন্দ্র বসু

ই এম এস নাম্বুদিরিপাদ
এটা ছিল ভারতের নতুন গণ-অভ্যুত্থানের একটি সংকেত। আইএনএ বন্দিদের মুক্তির দাবি এবং তাঁদের বিচারের বিরোধিতা করার বিষয়টি সমস্ত রাজনৈতিক দলের সীমানা অতিক্রম করে সামনের সারিতে চলে আসে। এমনকি যাঁরা স্বাধীনতা অর্জনের জন্য বসুর 'শত্রুর শত্রু'-র সঙ্গে আঁতাত করার নীতির সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করতেন, তাঁরাও তাঁর দেশপ্রেম এবং আত্মত্যাগের মনোভাবকে প্রশংসা করেছিলেন। কমিউনিস্ট, সোস্যালিস্ট, গান্ধীবাদী, মুসলিম লিগ পন্থী নির্বিশেষে সবাই আইএনএ বন্দি মুক্তির দাবিতে ঐক্যবদ্ধভাবে জোরালো আন্দোলন গড়ে তোলেন।

সুভাষ বসু ছিলেন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের একজন অবিসংবাদী নেতা। তাঁর জন্মশতবর্ষ এখন উদযাপিত হচ্ছে। তিনি গান্ধীজি এবং অন্যান্য নেতাদের 'দক্ষিণপন্থা'র বিপরীতে বামদিকে দাঁড়িয়েছিলেন। তাই যখন ১৯৩৯ সালে কংগ্রেস সভাপতি নির্বাচনের ফলাফল ঘোষিত হলো, গান্ধীজি বলেছিলেন যে সুভাষের জয়ে 'আমার পরাজয়' হলো। এ কথা প্রকৃতই সত্য, কারণ সুভাষ বসু ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে আপোষের নীতির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন। যেখানে গান্ধীজি তাঁর সারা জীবন ধরেই আপোষের পক্ষে লড়েছিলেন। তাঁর 'অহিংসা' দর্শনের মোড়কের আড়ালে তিনি চেয়েছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের আলাপ-আলোচনার মাধ্যমেই ভারতের স্বাধীনতার বিষয়টি মীমাংসা করতে।

১৯৩৯ সালে কংগ্রেস সভাপতিপদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে গিয়ে সুভাষ বসু তাঁর নির্বাচনী ইশতেহারে বিরোধীপক্ষের প্রতি গুরুতর অভিযোগ আনেন যে, তাঁরা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে আপসে মীমাংসা করার পরিকল্পনা করছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরুর ঠিক আগে সুভাষ বসু এবং গান্ধীজি ও অন্যান্য দক্ষিণপন্থী নেতাদের যুদ্ধ সম্পর্কে প্রতিক্রিয়া ছিল মৌলিকভাবে পরস্পর বিরোধী। গান্ধী ও তাঁর সহকর্মীরা যুদ্ধের ফলে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের উদ্ভূত সমস্যাকে সাম্রাজ্যবাদীদের সঙ্গে দরকষাকষির কাজে ব্যবহার করার পক্ষপাতী ছিলেন। সুভাষ বসু এই আপোষকামী মনোভাবের বিরুদ্ধে ছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন ভারতের যুদ্ধে অংশগ্রহণের বিরোধিতা করে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে জনসাধারণকে সমবেত করতে। অন্যদিকে, যুদ্ধের প্রথম পর্যায়ের পুরো সময় জুড়েই, যা 'টেলিফোন যুদ্ধ' বলে পরিচিত, দক্ষিণপন্থীরা যুদ্ধে ভারতের বলপূর্বক অংশগ্রহণের বিরুদ্ধে জনগণকে জঙ্গি আন্দোলনে শামিল হওয়ার আহ্বান জানাতে অস্বীকার করেন।

তবে যাই হোক না কেন, যুদ্ধের প্রথম পর্যায় শেষ হলো এবং এই যুদ্ধ একটি বিশ্বযুদ্ধে পরিণত হলো। এই যুদ্ধে সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নও অংশ নেয়। তখন ঐ কংগ্রেস নেতারাই তাঁদের আগের দ্বিধাদ্বন্দ্ব ঝেড়ে ফেলে ব্রিটেনের যুদ্ধের বিরুদ্ধে জনগণকে সর্বতোভাবে শামিল হবার আহ্বান জানায়। ১৯৪২ সালের আগস্ট মাসে বোম্বাই-এ অনুষ্ঠিত সারা ভারত কংগ্রেস অধিবেশন থেকে যে 'ভারত ছাড়ো' আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়েছিল, কার্যত তা ছিল ব্রিটিশ শাসকদের সঙ্গে আপোষ চুক্তির একটি পরিকল্পিত প্রস্তুতি। এই নীতির তীব্র বিরোধিতা করে সুভাষ বসু ব্রিটিশদের সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে উৎখাত করার পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন, এমনকি তা যদি ইউরোপের জার্মানি এবং এশিয়ার জাপানের মতো ফ্যাসিবাদী শক্তির সাহায্য নিয়ে হয়, তাও। এ কারণেই তিনি ভারত ছেড়ে প্রথমে জার্মানি এবং পরে জাপানে গিয়েছিলেন।

পরের দেশটিতে তখন ইতোমধ্যেই মোহন সিং-এর নেতৃত্বে একটি 'ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মি' গঠিত হয়েছে, যার রাজনৈতিক নেতা ছিলেন রাসবিহারী বসু। প্রকৃতপক্ষে এই সংগঠনটির পক্ষ থেকেই সুভাষ বসুকে জাপানে এসে সংগঠনের নেতৃত্ব গ্রহণ করতে অনুরোধ করা হয়। তিনি এটা করেন এবং 'ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মির'-র প্রধান হিসাবে ভারত অভিমুখে অভিযান শুরু করেন।

কিন্তু সুভাষ বসুর নেতৃত্বে ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মির প্রচেষ্টা বিফল হয়েছিল। তার কারণ, আইএনএ ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর থেকে সামরিক দিক দিয়ে অনেক দুর্বল ছিল। আইএনএ পরাজিত হলে ব্রিটিশদের হাতে বিরাট সংখ্যক সৈন্য বন্দি হন। তাঁদের ভারতে নিয়ে আসা হয় এবং ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ সংগঠিত করার অপরাধে অভিযুক্ত করা হয়।

এটা ছিল ভারতের নতুন গণ-অভ্যুত্থানের একটি সংকেত। আইএনএ বন্দিদের মুক্তির দাবি এবং তাঁদের বিচারের বিরোধিতা করার বিষয়টি সমস্ত রাজনৈতিক দলের সীমানা অতিক্রম করে সামনের সারিতে চলে আসে। এমনকি যাঁরা স্বাধীনতা অর্জনের জন্য বসুর 'শত্রুর শত্রু'-র সঙ্গে আঁতাত করার নীতির সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করতেন, তাঁরাও তাঁর দেশপ্রেম এবং আত্মত্যাগের মনোভাবকে প্রশংসা করেছিলেন। কমিউনিস্ট, সোস্যালিস্ট, গান্ধীবাদী, মুসলিম লিগ পন্থী নির্বিশেষে সবাই আইএনএ বন্দি মুক্তির দাবিতে ঐক্যবদ্ধভাবে জোরালো আন্দোলন গড়ে তোলেন।

এটা ছিল দেশব্যাপী জঙ্গি আন্দোলনের সূচনা, যার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল বোম্বাইতে ভারতের রাজকীয় নৌবাহিনীর বিদ্রোহ। স্মরণ করা যেতে পারে, নৌ-বিদ্রোহে অংশগ্রহণকারীরা জাতির স্বাধীনতার জন্য জাতীয় ঐক্যের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁরা ভারতের তিনটি জাতীয় দলের পতাকা উড়িয়েছিলেন — জাতীয় কংগ্রেস, সারা ভারত মুসলিম লিগ এবং ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির।

আমরা যারা সুভাষ বসু যে কৌশল অবলম্বন করেছিলেন, তার সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করেছিলাম — ব্রিটিশ-বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে ফ্যাসিবাদী জার্মান ও জাপানের কাছ থেকে সাহায্য নেওয়ার — তাঁর উদ্দেশ্য উপলব্ধি করেছিলাম যে, তিনি দেশকে ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত করার ব্যাকুল বাসনা থেকেই এ পথ নিয়েছিলেন। আমরা সে কারণে তাঁকে গান্ধী, জওহরলাল নেহরু এবং অন্যান্যদের সমতুল্য ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের একজন নেতা হিসাবে মনে করি। সুভাষ বসুর নেতৃত্বে আইএনএ-র ভারত অভিমুখে অভিযান, গান্ধীর ডাকা ভারত ছাড়ো আন্দোলনের মতোই একটি শক্তিশালী আন্দোলন ছিল।

যদিও আমরা গান্ধীজি এবং সুভাষ বসু- উভয়েই যে পথ নিয়েছিলেন, তার থেকে ভিন্নমত পোষণ করেছিলাম, কিন্তু সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত আঘাত হানতে শ্রমজীবী জনতার জাগরণে সুভাষ বসুর অবদান আমি মর্যাদা দিই।


প্রকাশের তারিখ: ২৩-জানুয়ারি-২০২৫

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org