|
শোক থেকে শপথটিম মার্কসবাদী পথ |
এরই পরিপ্রেক্ষিত থেকেই মহাত্মা গান্ধীর ১৫৪তম জন্মবার্ষিকীতে ১৯৪৮ সালের ৩১ জানুয়ারি 'স্বাধীনতা' পত্রিকার সম্পাদকীয় এবং কমিউনিস্ট পার্টির বাংলা প্রাদেশিক কমিটির বিবৃতি পুনঃপ্রকাশ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে 'মার্কসবাদী পথ'। পাঠকরা নিশ্চিতভাবেই লক্ষ্য করবেন, সেই সময়েই গান্ধীহত্যার রাজনীতি ও উল্টোদিকে মহাত্মা গান্ধীর রাজনীতি নিয়ে কতটা সঠিক ও স্পষ্ট অবস্থান ছিল কমিউনিস্ট পার্টির। |
জন্মদিনে মৃত্যুদিনের কথা উঠছে কেন? আসলে যে মানুষের মৃত্যুর ঘটনায় সারা জীবনের সংগ্রামের নির্যাসটুকু ব্যক্ত হয়ে যায়, তাঁর জীবনকে উদযাপন করতে হলে বারবার ফিরে যেতে হয় তাঁর মৃত্যুর দিনে। রক্তকরবী নাটকে রঞ্জনের মৃতদেহ নিঃশব্দে পড়ে আছে শুনে নন্দিনী উত্তরে বলেছিল, নিঃশব্দ নয়, মৃত্যুর মধ্যে তার অপরাজিত কণ্ঠস্বর আমি যে এই শুনতে পাচ্ছি। ১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি ঘাতকের গুলিতে যখন মহাত্মা গান্ধী শেষ শব্দ 'হে রাম' বলে মৃত্যুর কোলে লুটিয়ে পড়েন, তখন সেই মৃত্যুতেই ছিল ভারত আত্মার অপরাজেয় কন্ঠস্বর। সেই কন্ঠস্বরটি জাতি ধর্ম ভাষা নির্বিশেষে সমন্বিত বহুসংস্কৃতির ভারতের স্বর। তাঁর শেষ শব্দের রাম ঈশ্বর ও আল্লার অভিন্ন নাম। যে রাম কবীরের, মীরার। এই রামের রথযাত্রা নেই, শিলা নেই, করসেবা নামের ধ্বংস অভিযান নেই। এই রাম অস্ত্র হয়ে নাজিব আখলাক জুনেইদের বুকে বিদ্ধ হয় না। স্বাধীনতার প্রাক মুহর্ত থেকে মৃত্যুর দিন অবধি মহাত্মা গান্ধীর দৃঢ়পণ লড়াই ছিল এই হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িকতা ও তার দোসর মুসলিম লিগের আত্মঘাতী সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধেই। এই লড়াইকে স্তব্ধ করতেই রচিত হয়েছিল ষড়যন্ত্র সাভারকারের নীল নকশায়। দেশের অভ্যন্তরে গান্ধীজীর বিরুদ্ধে ঘৃণা জাগাতে লাগাতার বিষাক্ত প্রচার করে গেছে হিন্দু মহাসভা ও আরএসএস। আজকের আত্মঘাতী মানববোমা সন্ত্রাসবাদীদের আদলেই প্রশিক্ষিত করা হয়েছিল খুনি নাথুরাম গডসেকে। উগ্র যুক্তিহীন ধর্মান্ধতা ও সংখ্যাগুরুবাদের বিষে ভরিয়ে দেওয়া হয়েছিল নাথুরামদের মগজ। ভারতকে হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্রে পরিণত করতে নীল নকশা সাজানো হয়েছিল গান্ধী নেহরু সহ জাতীয় নেতাদের হত্যার। সারা দেশে একযোগে হিংসাত্মক পরিস্থিতির সৃষ্টি করে ক্ষমতা দখল ছিল চূড়ান্ত লক্ষ্য। ৩০ জানুয়ারির আগে এই ষড়যন্ত্রের আঁচ পায়নি কংগ্রেস নেতৃবৃন্দ। তাদের একটি অংশ নিজেরাও তখন হিন্দুত্বের দিকে ঝুঁকেছে। টের পেয়েছিলেন গান্ধীজী স্বয়ং। অন্তত পাঁচবার তাঁকে হত্যার চেষ্টা হয়েছে। শেষবার মৃত্যুর দশদিন আগে স্বয়ং নাথুরামই তাঁকে হত্যার চেষ্টা করেছিল। ২০ জানুয়ারির তাঁর সভাস্থলের বোমা বিস্ফোরণকে তাঁর এক সহযোগী দুর্ঘটনা বলে ভেবেছিলেন। মহাত্মা গান্ধী তাঁকে শুধরে দিতে গিয়ে বলেছিলেন, তুমি কি নির্বোধ? কী গভীর এবং ব্যাপক ষড়যন্ত্র চলছে, সেটা টের পাচ্ছো না? সেদিন এই বৃহৎ ষড়যন্ত্র নজর এড়িয়ে যায়নি ভারতের কমিউনিস্টদের। গান্ধীজীর বিরুদ্ধে হিন্দু সাম্প্রদায়িকতাবাদীদের ষড়যন্ত্র এবং সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে গান্ধীজীর দৃঢ়প্রতিজ্ঞ সংগ্রাম সম্পর্কে সচেতন ছিল ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি। ১৯৪৭ সালের নভেম্বর মাসেই বিহারে সিপিআই-এর কৃষক নেতা কার্যানন্দ শর্মা এক সভায় বলেছিলেন, হিন্দু রাষ্ট্র গড়তে যাওয়া একটি জঘন্যতম কাজ। এর আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে গান্ধীজী, নেহরুর মত জাতীয় নেতৃবৃন্দের হত্যার চক্রান্ত। ১৯৪৮ এর ৩০ জানুয়ারি মহাত্মা গান্ধীর হত্যার পর জাতীয় স্তরের সংবাদপত্র লিখেছিল, এক উন্মাদ হিন্দু যুবকের গুলিতে গান্ধীজীর মৃত্যু। জনসাধারণেরও ধারণা ছিল, একটি উন্মাদ হত্যা করেছে গান্ধীজীকে। বৃহত্তর রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রটি আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসেনি। এমনকী মহাত্মা গান্ধীর হত্যার পর সংবিধান গণপরিষদের শোকসভায় গান্ধীজীর মহত্ব নিয়েই আলোচনা হয়েছে বেশি। গান্ধীহত্যার রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের দিকটি উচ্চারিতই হয়নি। নেহরু ও প্যাটেল ৩০ জানুয়ারির মর্মান্তিক ঘটনার পর অবশ্য অনুভব করতে পেরেছিলেন এই বৃহৎ রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের দিক। নেহরু বলেছিলেন, সাম্প্রদায়িকতার ফলশ্রুতিতে শুধু দেশই বিভক্ত হয়নি, এতে মানুষের হৃদয়ে গভীর ক্ষতের জন্ম দিয়েছে তার নিরাময় সম্ভব কিনা জানি না, তবে তা একইসঙ্গে জাতির পিতা মহাত্মা গান্ধীকেও হত্যা করেছ। ১৯৪৮ সালের ৬ মে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীকে চিঠি লিখে সর্দার প্যাটেল বলেছিলেন, এত বড় একটি বিপর্যয়ের ঘটনায় হিন্দু মহাসভার সদস্যদের উল্লাস প্রকাশ ও মিষ্টি বিতরণের বিষয়টিতে আমরা চোখ বুঁজে থাকতে পারি না। এই বিষয়ে সারা দেশ থেকেই সুনির্দিষ্ট তথ্য আমাদের কাছে আছে। গান্ধীহত্যার পরদিনই ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি পশ্চিমবঙ্গ প্রাদেশিক কমিটির মুখপত্র 'স্বাধীনতা' পত্রিকায় যে সম্পাদকীয় নিবন্ধ লেখা হয় সেখানে গান্ধীহত্যার বৃহত্তর রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের কথা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করে এর বিরুদ্ধে সর্বাত্মক লড়াইকে এক গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। একইভাবে সেদিনের পত্রিকাতেই মুজফ্ফর আহ্মদ ও ভবানী সেনের স্বাক্ষরে কমিউনিস্ট পার্টির প্রাদেশিক কমিটির তরফে যে বিবৃতি প্রকাশ করা হয় সেখানেও ছিল এই বৃহত্তর রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের উল্লেখ। আহ্বান জানানো হয়েছিল এর বিরুদ্ধে তীব্র সংগ্রাম গড়ে তোলার। দুঃখের হলো বিগত সাত দশকে গান্ধীহত্যার রাজনীতির বিরুদ্ধে লড়াই যথাযথ গুরুত্ব পায়নি দেশের প্রধান অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল ও তাদের সরকারের সময়ে। উপেক্ষিত রয়ে গেছে প্যাটেল ও নেহরুর সতর্কবাণী। বারবার আপস হয়েছে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির সাথে। এই শিথিলতার সুযোগেই গান্ধীহত্যার পর কোণঠাসা ও একঘরে হয়ে যাওয়া চরম দক্ষিণপন্থী হিন্দুত্ববাদী শক্তি দেশের রাজনীতির মূলস্রোতে জায়গা করে নিয়ে আজ একক শক্তিতে ক্ষমতাসীন হয়ে দেশের সংবিধানকেই বদলে দিতে উদ্যত হয়েছে। ১৯৪৮ এর হত্যাকারীরা ২০২৩-এ ভক্ত সেজে হাজির হয়েছে। গান্ধীহত্যার রাজনীতি আজ গান্ধীভক্তির মুখোস পরে তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য পূরণে নেমেছে। এরা ২ অক্টোবর স্বচ্ছতার বুলি কপচায়, আর ৩০ জানুয়ারি নাথুরামের মূর্তি বসায়। মুখে গান্ধী, বুকে গডসে এই সংখ্যাগুরুবাদী হিন্দুত্বের বিরুদ্ধে সংগ্রামই এই মুহূর্তের সবচেয়ে বড় কর্তব্য। এরই পরিপ্রেক্ষিত থেকেই মহাত্মা গান্ধীর ১৫৪তম জন্মবার্ষিকীতে ১৯৪৮ সালের ৩১ জানুয়ারি 'স্বাধীনতা' পত্রিকার সম্পাদকীয় এবং কমিউনিস্ট পার্টির বাংলা প্রাদেশিক কমিটির বিবৃতি পুনঃপ্রকাশ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে 'মার্কসবাদী পথ'। পাঠকরা নিশ্চিতভাবেই লক্ষ্য করবেন, সেই সময়েই গান্ধীহত্যার রাজনীতি ও উল্টোদিকে মহাত্মা গান্ধীর রাজনীতি নিয়ে কতটা সঠিক ও স্পষ্ট অবস্থান ছিল কমিউনিস্ট পার্টির। — টিম মার্কসবাদী পথ সাম্প্রদায়িক আততায়ীর গুলিতে গান্ধীজী নিহত গান্ধীজীর মৃত্যু হয় নাই, তাঁহাকে হত্যা করা হইয়াছে। শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য সুবিন্যস্ত বাণী কিংবা বিহ্বল শোকের খোলশ অশ্রু বিলাস আজ তাঁহার মৃত্যুকেই অপমান করিবে। চক্রান্তকারী বৃটিশের মসনদ হইতে দেশের রাজা, নবাব, কায়েমী স্বার্থ পৰ্য্যন্ত সেই হত্যাকারীরা ছড়াইয়া আছে। নানা রংয়ের ও নানা ঢংয়ের পতাকার আশ্রয় হইতে যাহারা সাম্প্রদায়িক প্রতিশোধ প্রচারের ইন্ধন যোগায়, হত্যাকারীর ছুরিকা তাহাদেরই হাতে। ক্ষমতার গদীতে বসিয়া যাহারা হিন্দুস্থান-পাকিস্তান যুদ্ধের হুংকার ছাড়ে তাহাদের মুখোসের পিছনে হত্যাকারীদের মুখই লুকাইয়া আছে। শত্রুকে চেনো, অগ্নিময় ক্রোধে উহাদের মুখোস টানিয়া ছিঁড়িয়া ফেলো। উহারাই দেশের হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করিয়াছে, লক্ষ লক্ষ মানুষকে ভিটামাটি হইতে উচ্ছন্ন করিয়া আশ্রয়প্রার্থী ভিখারীতে পরিণত করিয়াছে – আর আজ ক্রুরতম স্পর্দ্ধায় সকল মানুষের প্রিয় গান্ধীজীকেও হত্যা করিয়াছে। আগামীকাল সমস্ত দেশকে হত্যা করিবে। ক্ষমা নাই, মমতা নাই, নিজ সম্প্রদায়ের লোক বলিয়া বিন্দুমাত্র দুর্বলতা দেখাইবার সময় নাই। শত্রুদের চেনো। আগ্নেয়গিরির লেলিহান শিখায় সমস্ত মানুষের ক্রোধ প্রজ্জ্বলিত হোক। সাম্প্রদায়িকতাকে পুড়াইয়া ছাই করিয়া দিতে অগ্রসর হও।
বাংলার প্রাদেশিক কমিটির পক্ষে মুজফ্ফর আহমদ ও ভবানী সেন নিম্নলিখিত বিবৃতি দিয়েছেন : যে সাম্প্রদায়িকতাবাদী ও হত্যাকারীরা ইতিহাসের অন্যতম মহান মানবকে এইভাবে হত্যা করিয়া দেশের এতবড় ক্ষতি করিল, তাহাদের বিরুদ্ধে ক্ষমাহীন ঘৃণার ব্যাপকতম প্রকাশের মধ্য দিয়াই শোকদিবস পালন করিতে হইবে। যাহারা জাতির এই দুদৈবের সময়ও গান্ধীজীর আন্তরিকতম ইচ্ছা ও অনুশাসনের বিরুদ্ধে জনসাধারণের এই গভীর বেদনাকে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষে পরিণত করার চেষ্টা করিবে আমরা তাহাদের সাবধান করিতে চাই। আজ গান্ধীজীর প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের জন্য তাঁর অসমাপ্ত কাজকে আগাইয়া লইতে সাম্প্রদায়িক ঐক্য দৃঢ়তর এবং যে কোন মুখোস পরিহিত সাম্প্রদায়িক প্রচারকারীদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করিতে হইবে। প্রিয় নেতার মৃত্যু আমাদের এই চেতনা আনিয়া দিক যে সাম্প্রদায়িকতাবাদীরা ও সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ সৃষ্টিকারীরাই জনসাধারণের সবচেয়ে বড় শত্রু। কমিউনিস্ট পার্টি এই প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করিতেছে যে তিনি যে কাজের জন্য জীবন বিসর্জন দিয়াছেন পার্টি তাহার সমস্ত শক্তি দিয়া সেই সাম্প্রদায়িক ঐক্য প্রতিষ্ঠার জন্য চেষ্টা করিবে। প্রকাশের তারিখ: ০২-অক্টোবর-২০২৩ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |