|
শুল্ক হাঙ্গামাঅর্ক রাজপন্ডিত |
|
|
চীনকে হারিয়ে জিততে পারবে আমেরিকা? ট্রাম্পের ঘোষিত শুল্ক যুদ্ধের মধ্যে, চীনের অর্থনৈতিক বৃদ্ধি হয়েছে তাক লাগানো। ২০২৫ এর প্রথম ত্রৈমাসিকে এই বৃদ্ধির হার আগের বছরের তুলনায় ৫.৪ শতাংশ বেড়েছে। এটা বেশির ভাগ বিশ্লেষকের পূর্বাভাসের সমস্ত অঙ্ককে ছাপিয়ে গেছে। সাধারত বৃদ্ধির এই হার বজায় থাকে ৪.৯ শতাংশ থেকে ৫.২ শতাংশের মধ্যে। ২০২৪ সালে চীনের জিডিপির বৃদ্ধি হয়েছে একেবারে চোখ কপালে তুলে দেওয়ার মতো ৫ শতাংশ হারে। তুলনায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এই হার ছিল ২.৮ শতাংশ, ইউরোপিয় ইউনিয়নে ১.১ শতাংশ। সুতরাং ২০২৪ সালে চীনের জিডিপি বৃদ্ধির হার ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপি বৃদ্ধির হারের চেয়ে ৮০ শতাংশ বেশি। ই ইউ এর চেয়ে সাড়ে চারগুণ দ্রুতগতিতে বেড়েছে চীনের অর্থনীতি। ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের পর্বে চীনের অর্থনীতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ই ইউকে পিছনে ফেলে অনেকটা এগিয়ে চলে গেছে। এই চার বছরে চীনের জিডিপি বৃদ্ধির হার ছিল ২৩.৪ শতাংশ। অথচ এই পর্বে আমেরিকা ও ইইউর জিডিপি বৃদ্ধির হার ছিল যথাক্রমে ১৫ শতাংশ এবং ১২.২ শতাংশ। এই যে বিরাটভাবে এগিয়ে থাকা, সেটা শুধু ২০২৪ সালেই নয়, বরং গোটা সেই পর্বটা জুড়ে যখন থেকে চীন তাদের স্ট্র্যাটেজিক অর্থনৈতিক লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে এবং অর্থনীতির দ্রুত সম্প্রসারণ সম্ভব করে তুলেছে। এখানে অনস্বীকার্য নির্ধারক বিষয় হল সেই অভিজ্ঞতাজনিত আবিষ্কার যে, যেগুলি আয়তনে বড় অর্থনীতি তাতে খুবই নজরে পড়ার মতো ইতিবাচক পারস্পরিক সম্পর্ক দেখা যায়, জিডিপির মধ্যে নীট স্থির পুঁজি গঠনের শতাংশ এবং বার্ষিক জিডিপির বৃদ্ধির মধ্যে। নীট স্থির পুঁজি গঠনের হিসাব কষা হয় নতুন স্থির বিনিয়োগ থেকে বিদ্যমান পুঁজির ক্ষয় বাদ দিয়ে — সেটাই অর্থনীতির সম্প্রসারণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অতিরিক্ত পুঁজি। যদি আমরা ১০টি বৃহৎ অর্থনীতি সম্পর্কে বিশ্ব ব্যাঙ্কের তথ্য কাজে লাগাই, তাহলে দেখা যাবে জিডিপিতে নীট স্থির বিনিয়োগের শতাংশ এবং বার্ষিক জিডিপি বৃদ্ধির ইতিবাচক পারস্পরিক সম্পর্ক দাঁড়াবে ০.৯৫। যা আসলে চরম বেশি। এই সম্পর্কের অত্যন্ত দৃঢ়বদ্ধ চরিত্র একটা স্পষ্ট নীতিকে সামনে নিয়ে আসে, জিডিপি বৃদ্ধির হারকে উৎসাহ দিতে হলে প্রয়োজন হয় জিডিপির আপেক্ষিকে নীট স্থির বিনিয়োগের শতাংশের বৃদ্ধি। উল্টোদিকে, যদি বিনিয়োগের অংশ কমে তাহলে অনিবার্যভাবে তা জিডিপি বৃদ্ধির হারকে শ্লথগতির করে দেবে। এগুলো নমনীয় সম্পর্ক নয়। বরং এই দুই সম্পর্ক এতটাই পরস্পরের সঙ্গে সুতোর মতো জড়িয়ে থাকে যে এদেরকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না। এই যে সম্পর্কটি পর্যবেক্ষণের মধ্যে দিয়ে উঠে আসছে তার তাত্ত্বিক ভিত্তি খুবই সাদামাটা এবং উপভোগ ও বিনিয়োগের মধ্যে যে পারস্পরিক ক্রিয়াপ্রতিক্রিয়া, তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। যেহেতু দেশের জিডিপির ১০০ শতাংশই হল উপভোগ ও বিনিয়োগ মিলিয়ে সবটা, তাই উপভোগের অনুপাত যদি বাড়ে তাহলে তার থেকে অনিবার্যভাবে যা এসে পড়ে তা হল বিনিয়োগের অনুপাতে হ্রাস। এবং এর পরিণামে জিডিপি বৃদ্ধির হার ক্রমশ কমে। সংজ্ঞার কথা ধরলে উপভোগ উৎপাদনের কোনও ইনপুট বা উপাদান নয়। অন্যভাবে বললে, উৎপাদনের উপাদান হিসাবে ধার্য কোনও কিছুই উপভোগ নয়। সুতরাং, বাকি সব কিছু অপরিবর্তিত থাকলে, জিডিপিতে উপভোগের শতাংশ বৃদ্ধি মানে জিডিপিতে আবশ্যিকভাবে বিনিয়োগের শতাংশ কমে যাওয়া। এর জেরে উৎপাদনে উপাদান যোগ করার পরিমাণ কমে যায় এবং তারই জেরে আসলে জিডিপির বৃদ্ধিটাই কমে যায়। এই বিষয়টার প্রমাণ হিসাবে, যদি আমরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ ব্যুরোর তথ্য বিচার করি, তাহলে দেখব ১৯৭১ থেকে ২০২১ পর্যন্ত জি সেভেনভুক্ত দেশগুলির অর্থনীতিতে নীট স্থির পুঁজির গঠনের শতাংশ, কানাডা বাদে, অন্য দেশগুলির ক্ষেত্রে দারুনভাবে কমেছে। বেশ কয়েকটি বৃহৎ আয়তনের অর্থনীতিতে নীট স্থির পুঁজি গঠনের শতাংশ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এই শতাংশ ৮.৫ থেকে কমে হয়েছে ৫.১, ব্রিটেনে ১১.৬ থেকে কমে হয়েছে মাত্র ২.৬। জার্মানিতে ১৬.৬ থেকে কমে হয়েছে ১.৮। অন্য দেশগুলির ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। উল্টোদিকে, ১৯৭০ সালে প্রাথমিক ভাবে জিডিপিতে চীনের নীট স্থির পুঁজির গঠনের শতাংশ ছিল ৫.৬ শতাংশ (সেই সময় দ্রুতগতিতে বেড়ে চলা অর্থনীতির দেশ ছিল জাপান ও জার্মানি এবং চীনের নীট স্থির পুঁজির গঠনের শতাংশ ছিল এই দুই দেশের চেয়ে কম)। ১৯২১ সালে চীনে এই শতাংশ বেড়ে দাঁড়ায় ১৫.৮ শতাংশ, যা যে কোনও জি সেভেনভুক্ত দেশের চেয়ে বেশি। সুতরাং চীনকে হারাতে হলে আমেরিকার সামনে দুটি রাস্তা খোলা আছে। প্রথমত আমেরিকাকে নিজেদের নীট স্থির পুঁজির বিনিয়োগ বাড়াতে হবে এবং দ্বিতীয়ত আমেরিকা চীনের বৃদ্ধির গতি শ্লথ করে দিতে পারে শুল্ক ও আর্থিক নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দিয়ে। এর আগে নিজেদের আর্থিক ও সামরিক শক্তি কাজে লাগিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফল হয়েছে তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের আর্থিক বৃদ্ধির গতি শ্লথ করে দিতে। তবে চীনের ক্ষেত্রে এমনটা নাও ঘটতে পারে। চীন সামরিক কিংবা অর্থনৈতিক ভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অধীন নয়। তাই চীনের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একই কৌশল প্রয়োগ করতে পারবে না। তাছাড়া যে তথ্য এখানে উদ্ধৃত করা হয়েছে তা স্পষ্ট দেখিয়ে দিচ্ছে যে, ২০১৮ সাল থেকে চীনের বিরুদ্ধে আমেরিকার জারি করা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং শুল্ক আরোপের নীতি জিডিপির শতাংশের অনুপাতে চীনের বিনিয়োগ তেমন কিছু উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারেনি। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। এখন বিশ্ববাণিজ্যের ১০.৩৫ শতাংশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দখলে। যদিও ১৯৯০ সালে এটা ছিল ১৪ শতাংশ। এ থেকে বোঝা যায় তাদের আমদানি ও রপ্তানি বিশ্ববাণিজ্য আর আধিপত্যকারী শক্তি নয়। এর সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে ইউরোপিয় ইউনিয়নের। ই ইউর হাতে এখন রয়েছে বিশ্ববাণিজ্যের মোট ২৯ শতাংশ শেয়ার (যা ১৯৯০ সালে ছিল ৩৪ শতাংশ)। এবং ব্রিকসভুক্ত দেশগুলির যৌথ ভাগ এখন বেড়ে হয়েছে ১৭.৫ শতাংশ। এদের মধ্যে আবার চীনের ভাগ যা ১৯৯০ সালে ছিল মাত্র ১.৮ শতাংশ। এখন তা বেড়ে হয়েছে প্রায় ১২ শতাংশ। এর মানে দাঁড়াচ্ছে, অন্য দেশগুলির বাণিজ্য যা আসলে অ-মার্কিন বাণিজ্য, তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভাগ আরো কমে গেলে তা পূরণ করে দিতে পারে। একবিংশ শতকে, বাণিজ্যের বিকাশে সবচেয়ে বড় অবদান আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নয়, বরং এব্যাপারে সবচেয়ে বেশি নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়েছে চীন। চীন এখনই বাণিজ্যের বিকল্প জায়গাগুলো খুঁজছে এবং তারা জোর দিয়েছে এশিয়া এবং তাদের প্রতিবেশী দেশগুলির ওপর এবং এভাবেই তারা মার্কিন শুল্কের প্রভাবকে খর্ব করার চেষ্টা করছে। পাশাপাশি, চীন সম্প্রতি কয়েকট রেয়ার আর্থ খনিজ রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। এটা এমনই একটা বিষয় যার সূদূর প্রসারী প্রভাব পড়বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর। এই নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে সাতটি রেয়ার আর্থ খনিজের ওপর: সামারিয়াম, গ্যাডোলিনিয়াম, ইট্ট্রিয়াম, টারবিয়াম, ডিসপ্রোসিয়াম, লিউটেটিয়াম, স্ক্যানডিয়াম, এবং এই সব খনিজ থেকে তৈরি চুম্বক। এর ফলে একাধিক ক্ষেত্রে মার্কিন সাপ্লাই চেন ভালভাবে ব্যাহত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তার ফলে একদিকে উৎপাদনে দেরি হবে, খরচ বৃদ্ধি পাবে। এবং তার জেরে এইসব খনিজ ও এগুলির প্রক্রিয়াকরণের ক্ষমতায় চীনের ওপর মার্কিন নির্ভরতা আরও প্রকট হয়ে উঠবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শুরু করা শুল্কযুদ্ধ একটা ধারাবাহিক বৃদ্ধির পথ নয়। বরং এ হল পুঁজিবাদের অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্বের আরও অবনতি। এটা শেষ পর্যন্ত পুঁজিবাদের ব্যবস্থাগত সঙ্কটকে গভীরতর করে তোলে, যে সঙ্কটের বৈশিষ্ট্য হল চক্রাকারে মন্দা এবং স্থবিরতার পর্ব। শুল্ক আরোপের মতো সংরক্ষণবাদী ব্যবস্থাগুলি আমেরিকার জন্য কোনও দীর্ঘকালীন সুবিধা বয়ে আনবে না। বরং চলতি অর্থনৈতিক সঙ্কটকে তীব্রতর করবে। পুঁজিবাদের মৌলিক চালিকাশক্তি হল শ্রমের নিরবচ্ছিন্ন শোষণের মাধ্যমে মুনাফার সঞ্চয় এবং সেটাকেই আরও প্রকট করে তুলবে এই শুল্ক আরোপ। সঙ্কট যত ঘনীভূত হবে ততই পুঁজিপতি শ্রেণি আরও তীব্র করে তুলবে শ্রমিকশ্রেণির ওপর তার লুটেরাসুলভ হামলা এবং তারা আরও বেশি শোষণ করে আরও বেশি উদ্বৃত্ত মূল্য শুষে নেওয়ার চেষ্টা করবে। এবং তার জেরে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার যে অন্তর্নিহিত অস্থিরতা তাতেই আরো জ্বালানি যুগিয়ে দেবে। (শেষপর্ব)
প্রকাশের তারিখ: ০৮-মে-২০২৫ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |