২০১৪ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি শিলচরের অদূরে রামনগরে নির্বাচনী সভায় বিজেপির প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী নরেন্দ্র মোদি বুকে হাত দিয়ে প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেছিলেন ‘কেন্দ্রে বিজেপি ক্ষমতায় এলে আর আমি প্রধানমন্ত্রী হলে ছয় মাসের মধ্যে আসামের ডিটেনশন ক্যাম্পগুলি গুড়িয়ে দেবো’। সেদিন রাজ্যে ডি ভোটার ব্যবস্থা (যা গোটা দেশের মধ্যে শুধু আসামেই রয়েছে) তুলে দেওয়ারও আশ্বাস দিয়েছিলেন মোদি। মোদির এই বক্তব্য ভোটের আটচল্লিশ ঘণ্টা আগে পর্যন্ত মাইকে প্রচার করেছে বিজেপি। অন্যদিকে, ২০১৪-র লোকসভা নির্বাচনে উজান আসামে নির্বাচনী প্রচারে ‘ঘুসপেটিয়াদের তাড়ানোর’ প্রতিশ্রুতি দেন মোদি৷ উজান আসামে অসমিয়াভাষীদের মধ্যে একটি মিথ রয়েছে। তা হল, আসামে বাংলাভাষীরা (হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে) সকলেই বাংলাদেশি৷ যদিও তা ঐতিহাসিকভাবে সত্য নয়।
১৮৭৪ সালে বাংলা প্রেসিডেন্সি থেকে আসামকে চিফ কমিশনার শাসিত পৃথক প্রদেশ গঠন করার সময় বাঙালি নিবিড় গোয়ালপাড়া ও সিলেট জেলাকে আসামের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। সুরমা উপত্যকার কাছাড় জেলাকেও আসামে যুক্ত করা হয়। সেদিন থেকে আসামে বাঙালি জনসংখ্যা বাড়তে থাকে। এরও আগে আসামে উন্নত কৃষি কাজের জন্য বাংলা প্রভিন্সের বিভিন্ন জেলা থেকে বাংলাভাষী চাষিদের আসামে নিয়ে আসে ব্রিটিশ শাসকরা। ফলে দেশভাগের আগে থেকেই আসামে বাঙালিদের বসবাস। দেশভাগের পর নানা কারণে পূর্ব পাকিস্তান থেকে অল্প সংখ্যক মানুষ আসামে চলে আসেন৷ কিন্তু এটা বাস্তব যে, দেশ বিভাজনের অনেক আগে থেকেই আসামে বাঙালিরা বসবাস করছেন৷
কিন্তু গত শতকের পাঁচ দশকে পরিচিত সত্তার রাজনীতি আসামে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে থাকে। ‘আসাম ফর আসামিজ’ অর্থাৎ আসাম শুধু অসমিয়াদের জন্য, এই স্লোগান তুলে রাজ্য রাজনীতি উত্তাল হয়ে উঠে৷ যার পরিণতিতে ষাটের দশক থেকে আশির দশক পর্যন্ত বারবার অসমিয়া-বাঙালি সংঘর্ষ হয়েছে। ‘বিদেশি খেদা’ আন্দোলন একসময় ‘বাঙালি খেদা’ আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। এরই পরিণতিতে সংবিধান সংশোধন করে ১৯৭১ সালকে আসামের নাগরিকত্বের ভিত্তিবর্ষ করা হয়েছে। ১৯৯৭ সালে নির্বাচন কমিশন আচমকা আসামের ভোটার তালিকায় বেছে বেছে প্রায় চার লক্ষ বাঙালি ভোটারকে সন্দেহভাজন বলে ‘ডি’ স্ট্যাম্প মেরে ভোটাধিকার কেড়ে নেয়। এরপর গঠিত হয় বিদেশি ট্রাইবুনাল। অস্থায়ীভাবে তৈরি হয় ডিটেনশন ক্যাম্প।
বিদেশি ধরতে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে ২০১৫ সাল থেকে টানা ছয় বছর ধরে রাজ্যে এনআরসি হয়েছে। ফলে বিদেশি যা বিজেপি অলংকার লাগিয়ে ‘ঘুসপেটিয়া’ বলে, তা আসামে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু৷ বিজেপি এই ইস্যুকে যত্ন করে ব্যবহার করে তাদের বিভাজনের রাজনীতি চালিয়ে যাচ্ছে। উজান আসামে অসমিয়াভাষীদের খুশি করতে ঘুসপেটিয়া তাড়ানোর হুংকার দিতে হবে, আর বাঙালিদের খুশি করতে ডিটেনশন ক্যাম্প গুড়িয়ে দেওয়ার হুংকার দিলে দুই জনগোষ্ঠীর ভোট বিজেপির বাক্সে আনা সম্ভব, তা মোদি বিলক্ষণ জানতেন। কিন্তু ক্ষমতা পেয়ে মোদি কথা রাখেননি৷ রাজ্যে বিদেশি ইস্যু যেমন জিইয়ে রেখেছে বিজেপি, একইসঙ্গে রাজ্যে স্থায়ী ডিটেনশন ক্যাম্প নির্মাণ করেছেন। যা এশিয়ার মধ্যে বৃহত্তম ক্যাম্প৷ মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দুই বছর পর আসামে বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এর কয়েকমাস আগে রাজ্যে এনআরসির কাজ শুরু হয়। বিজেপি বিভাজনের রাজনীতি চাঙ্গা করতে এনআরসিকে হাতিয়ার করে৷ কংগ্রেসের একটি অংশকে (এর মধ্যে হিমন্তবিশ্ব শর্মাও রয়েছেন) ভাঙিয়ে, ঝুলিতে পুরে পনেরো বছরের কংগ্রেস সরকারের ব্যর্থতাকে কাজে লাগিয়ে প্রথমবারের মতো আসামের ক্ষমতায় আসে বিজেপি।
ওই নির্বাচনে জমি-জাতি-ভেটি অর্থাৎ ভূমিপুত্রদের হাতে জমি তুলে দেওয়া ,অসমিয়া জাতি ও ভিটেমাটির সুরক্ষা প্রদান করার প্রতিশ্রুতি দেয় বিজেপি। তাছাড়া, বছরে ২ লক্ষ পাঁচ বছরে ১০ লক্ষ বেকারের চাকরি দেওয়া, বন্ধ কলকারখানা খোলা, রুগ্ন শিল্পগুলিকে পুনরুজ্জীবিত করা, চা শিল্পে সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, আসামের সবচেয়ে বড়ো সমস্যা বন্যা সমস্যার স্থায়ী সমাধান করা, বিভিন্ন ধরনের সামাজিক ভাতা প্রদান, সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিশেষ করে উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, জনস্বাস্থ্য পরিষেবার উন্নত পরিকাঠামো গড়ে তোলা, প্রকৃত বিদেশি শনাক্ত করে শুদ্ধ এনআরসি তালিকা তৈরি করা, রাজ্যের ছয়টি জনগোষ্ঠীকে (টাই-আহোম, চুতিয়া, মরাণ, মটক, কোচ-রাজবংশী ও আদিবাসী চা জনগোষ্ঠী) তফসিলি উপজাতির মর্যাদা দেওয়া ইত্যাদির প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসে বিজেপি।
কিন্তু গত দশ বছরে একটি প্রতিশ্রুতিও রাখেনি। আসামের ক্ষমতায় এসেই প্রথমে ২৯টি তৈলকূপ বেসরকারি সংস্থার হাতে তুলে দেয়। কিছুদিনের মাথায় গুয়াহাটি বিমানবন্দরকে আদানির হাতে তুলে দেয়। ভূমিপুত্রদের জমির অধিকার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসে উলটো ভূমিপুত্রদের জমি থেকে উচ্ছেদ করে আদানি-আম্বানি-রামদেবের হাতে তুলে দিতে শুরু করে। মানুষকে ধর্মের নামে ভাগ করে প্রথমে বেছে বেছে মুসলিমদের উচ্ছেদ করে এখন আদিবাসী এমনকি অসমিয়া জাতির সবচেয়ে প্রাচীন জনগোষ্ঠী আহোম, চুতিয়াদেরও জমি কেড়ে নিচ্ছে। গত দশ বছরে দুই লক্ষাধিক গরিব মানুষকে জমি থেকে উচ্ছেদ করেছে। ক্ষমতায় এসেই ৮ হাজার কম্পিউটার শিক্ষকের চাকরি কেড়ে নেয়। ভেঞ্চার স্কুল প্রাদেশিকীকরণ আইন বাতিল করে প্রায় ৫২ হাজর শিক্ষককে পথে বসিয়েছে। সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করতে হিন্দু-মুসলিম বিভাজনের রাজনীতি সামনে আনে৷ মাদ্রাসায় ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়া হয়, তাই সরকারি টাকায় বিশেষ ধর্মের শিক্ষার বিস্তার করা সঠিক নয়, এই অজুহাত তুলে সাতশোর বেশি সরকারি মাদ্রাসা বন্ধ করে দেয়। এতে গরিষ্ঠ সংখ্যক হিন্দুদের সমর্থন পায়। কিন্তু কয়েক মাস পর এমালগেশনের নামে সরকারি স্কুলে তালা ঝুলিয়ে দিতে শুরু করে। এখন ছাত্র সংখ্যা কম বা মাধ্যমিকে খারাপ ফলের অজুহাত দেখিয়ে স্কুল বন্ধ করে দিচ্ছে। গত দশ বছরে সাড়ে আট হাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিয়েছে বিজেপি সরকার। বিপরীতে হু হু করে বাড়ছে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। খোদ মুখ্যমন্ত্রী হিমন্তবিশ্ব শর্মা পরিবারের নামে বেসরকারি স্কুল খুলে ব্যবসা করছেন। বছরে দুই লক্ষ বেকারের চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে গত দশ বছরেও দুই লক্ষের চাকরি দেয়নি। উলটো ৮ হাজার শিক্ষক পদ সহ বিভিন্ন সরকারি বিভাগে কয়েক হাজার পদ বিলুপ্ত করে দিয়েছে।
নতুন কারখানা খোলার বদলে চালু কারখানা বন্ধ করে দিয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ব সংস্থা হিন্দুস্তান পেপার কর্পোরেশনের তিনটি কাগজকল বন্ধ করেছে৷ বন্যা মুক্ত আসামের জন্য ধুবড়ি থেকে শদিয়া পর্যন্ত নদী খনন, ব্রহ্মপুত্র ও তাঁর উপনদী খনন ও নদীর জল সংরক্ষণ করতে বিশাল জলাধার তৈরি করা, ব্রহ্মপুত্রের দুপারে উঁচু বাঁধ নির্মাণ করে এক্সপ্রেস হাইওয়ে নির্মাণ করার গালভরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বিজেপি। গত দশ বছরে একটি কাজও করেনি৷ নদীর নাব্যতা বৃদ্ধি কিংবা ভাঙা বাঁধ মেরামতির কাজও ঠিক মতো করেনি। ফলে রাজ্যের বন্যা সমস্যা আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও মঙ্গলা বন্দরের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক জলপথের সঙ্গে আসামকে সংযোগ করার জন্য বরাক নদী খনন করবে বলেছিল। দশ বছরে কাজে হাতই দেয়নি।
চা-শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ৩৫০ টাকা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। দশ বছরে এক টাকাও বৃদ্ধি করেনি। এবার মজুরি ৫০০ টাকা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে৷ পূর্বের সরকারের আমলে রাজ্যে যে-সকল সামাজিক ভাতা চালু ছিল, সবগুলিকে এক প্রকল্পের অধীনে এনে ২০২০ সালে অরুণোদয় নামে একটি ভাতা চালু করে। বছর ঘুরতে-না-ঘুরতে অসংখ্য প্রতিবন্ধীদের ভাতা, বিধবাদের ভাতা, বৃদ্ধদের ভাতা বন্ধ করে দেয়। ভাতা প্রাপকের সংখ্যা হ্রাস করার উদ্দেশ্যেই যে অভিন্ন ভাতাটি চালু করেছিল, তা এখন জলের মতো পরিষ্কার। এখন অরুণোদয় প্রকল্পকে দলীয় প্রকল্পে পরিণত করেছে বিজেপি। ভাতা পেতে হলে বিজেপির সভা-সমিতিতে যেতে বাধ্য করা হয়। জোর করে দলের সভ্যপদ ধরিয়ে দেওয়া হয়। বিজেপিকে ভোট না-দিলে অরুণোদয় সুবিধাপ্রাপকদের তালিকা থেকে নাম ছেঁটে ফেলার ভয় দেখায়।
আসামে রেগার মজুরি বৃদ্ধির কথা বলেছিল। এখন রাজ্যে রেগার কাজ প্রায় বন্ধ। কাগজে-কলমে যা আছে, তা শুধু ছবি তোলায় সীমাবদ্ধ। রেগা শ্রমিকদের প্রতি এক হাজার টাকা মজুরির মধ্যে মাত্র দুশো টাকা হাতে গুজিয়ে ছবি তুলে বাকি টাকা হাপিস করছে পঞ্চায়েত ও বিজেপি নেতারা৷ রেগার নয়া নিয়মে শ্রমিকরা কাজে এলে তাদের ছবি তুলে তা নির্দিষ্ট অ্যাপে আপলোড করতে হয়। বাছাই করা কিছু শ্রমিকদের কাজের জায়গায় নিয়ে গিয়ে ছবি তুলে তাদের বাড়ি পাঠিয়ে দেয়। এরপর ব্যাংকে মজুরির টাকা তুলে সব টাকা বিজেপি নেতাদের হাতে তুলে দিতে হয়। এই টাকা থেকে হাজারে দুশো টাকা শ্রমিককে দিয়ে বাকি টাকা আত্মসাৎ করে নেয়৷ সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে দেশে র্যাটহোল মাইনিং অর্থাৎ ইঁদুরগর্ত করে কয়লা খনন নিষিদ্ধ। কিন্তু বিজেপি আমলে আসামে বেপরোয়াভাবে র্যাটহোল মাইনিং করে খাদান লুট চলছে। এতে ফি বছর খাদানের ভেতর অনেক শ্রমিকের মৃত্যু ঘটছে। খনিতে মৃত শ্রমিকদের পরিবারকে সরকারি সাহায্যও দেওয়া হয় না।
গত দশ বছর ধরে আসামে বিজেপির শাসনকাল প্রতারণার এক দশক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। এবারের নির্বাচনেও একই প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোট ভিক্ষায় নেমেছেন মোদি-শাহ। ঘুসপেটিয়া তাড়ানো, বিদেশিদের উচ্ছেদ করার হুংকার দিয়ে মুসলিম বিদ্বেষের রাজনীতিকে পুনরায় চাঙ্গা করার চেষ্টা করছেন বিজেপি নেতারা। কিন্তু রাজ্যের মানুষ বিজেপির অপশাসন, অত্যাচার থেকে মুক্তি চাইছেন। বিজেপি-বিরোধী ভোট ভাগাভাগি রুখতে ইউডিএফকে বাদ দিয়ে সবকটি বিরোধী দল আসন রফা করে নির্বাচনে লড়াই করছে। এবার অন্যবারের চেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে বিজেপি-অগপ জোট। অবস্থা বেগতিক দেখে গুন্ডাবাহিনী নামিয়েছে বিজেপি। বিরোধীদের প্রচারে বাধার সৃষ্টি করছে৷ বিরোধীরা নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা বজায় রাখার দাবি জানিয়েছেন।
শুদ্ধ এনআরসি প্রকাশের বদলে ২০১৯ সালে ১৯ লক্ষ ৬ হাজার নাগরিকের নাম তালিকা থেকে বাদ দিয়ে এনআরসি প্রকাশিত করে। এরমধ্যে ১৪ লক্ষ হিন্দু, ৬ লক্ষ মুসলিম। বাদ-পড়াদের প্রায় একশো শতাংশ বাংলাভাষী। এখন বিদেশি সমস্যা জিইয়ে রাখতে বাদ-পড়াদের পুনরাবাদনের সুযোগ দিচ্ছে না, এনআরসি তালিকা গ্রহণ করে সুপ্রিম কোর্টে জমাও করছে না মোদি সরকার। এই হল গত এক দশকের বিজেপি সরকারের কীর্তি।
লেখক সাংবাদিক, ডেইলি দেশের কথা, গণশক্তি পত্রিকার আসামের সংবাদদাতা
প্রকাশের তারিখ: ০৪-এপ্রিল-২০২৬ |