|
উগ্র দক্ষিণপন্থার বিকল্প ঐক্যবদ্ধ বামপন্থাই, ফের প্রমাণ করল ফ্রান্সঅর্ক ভাদুড়ি |
ইউরোপ তথা গোটা বিশ্বের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের নিরিখে ফ্রান্সের নির্বাচনী ফলাফলের গুরুত্ব অপরিসীম। প্রথমত, বিভিন্ন মাত্রার বামমনস্ক দলগুলি একত্রিত হয়ে অতি দক্ষিণপন্থা এবং মধ্যপন্থাকে আজকের দিনে দাঁড়িয়েও যে হারিয়ে দেওয়া সম্ভব, বাকি দুনিয়ার কাছে সজোরে এই বার্তা পৌঁছে দিয়েছে ফরাসি নির্বাচন। ফ্রান্সের বেশ কিছু বড় পুঁজিপতি, বিশেষত ফিনান্স, টেকনোলজি বা প্রযুক্তি এবং ফসিল ফুয়েল বা জীবাশ্ম জ্বালানি-নির্ভর এনার্জি ব্যবসায় যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলি দক্ষিণপন্থীদের সমর্থক ছিল। ফরাসি গণমাধ্যমও লাগাতার প্রচার চালিয়েছে এনএফপি-র বিরুদ্ধে। তবে এনএফপি-র পক্ষে সর্বাধিক ভোট ফিনান্স পুঁজির এই আঁতাতকে হারিয়ে দিয়েছে। |
ইতিহাসের মতিগতি বোঝা দায়। কোথায় এবং কখন আচম্বিতে তার বাঁক বদল হয়, আগে থেকে কে বলতে পারে! পশ্চিম ইউরোপের বিভিন্ন দেশে উগ্র দক্ষিণপন্থা যখন ক্রমশ শক্তি সঞ্চয় করছে, তখনই এক সপ্তাহের মধ্যে দুই পুরনো সাম্রাজ্যবাদী শক্তির দেশ– ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সে– মুখ থুবড়ে পড়ল দক্ষিণপন্থী রাজনীতি। এর মধ্যে ইংল্যান্ডের ফলাফল প্রত্যাশিতই ছিল, যা এককথায় বলতে গেলে , দক্ষিণপন্থী সরকারের দীর্ঘকালীন প্রশাসনিক ব্যর্থতার ফল। তাছাড়া এই লেবার পার্টি যে করবিনের লেবার নয়, বিলেতের ফলাফলে শ্রমিকশ্রেণির উল্লাসের যে কোনও কারণই নেই, তা তো আর নতুন করে বলার প্রয়োজন নেই। কিন্তু ফ্রান্সের নির্বাচনী ফলাফল মোটেই প্রত্যাশিত ছিল না। অন্তত গোটা পৃথিবীর মেইনস্ট্রিম মিডিয়ার কাছে তো বটেই। প্রথমত, প্রত্যাশিত ছিল না ফ্রান্সের নির্বাচনটাই। জুনের ৯ তারিখ ইউরোপীয় পার্লামেন্টের নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী ফরাসি দলগুলির মধ্যে অতি দক্ষিণপন্থী ন্যাশনাল র্যালি সর্বোচ্চ ভোট পায়। এরই জেরে দেশের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক চাপের আশঙ্কায় আচমকা এই নির্বাচনের ডাক দেন রাষ্ট্রপতি ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ। তাঁর দল রেনেসাঁ যে জোটের শরিক ছিল, তারা ওই নির্বাচনে ন্যাশনাল র্যালির অর্ধেকেরও কম ভোট পায়। এই হঠাৎ নির্বাচনেও সুবিধা পায় ন্যাশনাল র্যালি, কারণ ইউরোপীয় পার্লামেন্টের নির্বাচনে লড়ার ফলে খানিকটা প্রস্তুতি তাদের ছিলই। তা সত্ত্বেও, সোশ্যালিস্ট পার্টি, কমিউনিস্ট পার্টি, ইকোলজিস্ট কোয়ালিশন, এবং অতি বামপন্থী হিসেবে পরিচিত লা ফ্রান্স ইনসুমি একত্রে নিউ পপুলার ফ্রন্ট গঠন করে এবং একটি সাধারণ ইশতেহারের ভিত্তিতে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। অনুমান ছিল, ম্যাক্রোঁর এনসেম্বল-কে হয়তো পিছনে ফেলে দিতে পারে এই জোট। তবে ন্যাশনাল র্যালিকে ঠেকাতে পারার সম্ভাবনা কোনও প্রাক্-নির্বাচনী সমীক্ষা বা বিশ্লেষণে অনুমান করা হয়নি। সেই অনুমান মতোই ৩০ জুন প্রথম দফা নির্বাচনের ফল বেশ কিছুটা ভয় পাইয়ে দিলেও, ফরাসি বিপ্লবের দেশ শেষ পর্যন্ত নিরাশ করলো না তার আচমকা নির্বাচনের ফলাফলে। ৭ জুলাই দ্বিতীয় দফায় অতি দক্ষিণপন্থী ন্যাশনাল র্যালিকে অনেকটা পিছনে ফেলে দিয়ে ৫৭৭টি কেন্দ্রের মধ্যে ১৮২টি-তে জয় পেল বামপন্থী নির্বাচনী জোট নিউ পপুলার ফ্রন্ট (এনএফপি)। ১৬২টি আসনে জিতল রাষ্ট্রপতি ম্যাক্রোঁর মধ্যপন্থী জোট এনসেম্বল। ১৪৩টি আসনে জিতে তৃতীয় স্থানে রইল ন্যাশনাল র্যালি। এছাড়া ৬৬টি আসনে জিতেছে দক্ষিণপন্থী রিপাবলিকান দল ও তার শরিকরা। সবকটি জোটের মধ্যে সর্বোচ্চ সংখ্যক আসন এনএফপি পেলেও এককভাবে আইনসভা গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি কোনও দলই। ফলত ত্রিশঙ্কু হতে চলেছে নতুন আইনসভা। ফ্রান্সের নির্বাচনের নিয়ম এমন যে প্রথম দফায় সব কেন্দ্রে ভোট হলেও ফলাফল নির্ধারিত হয় কেবল সেইসব কেন্দ্রের ভোটের ভিত্তিতে যেখানে কোনও একজন প্রার্থী তালিকাভুক্ত ভোটারসংখ্যার ৫০ শতাংশ পরিমাণ ভোট পেয়েছেন। ৩০ জুন এইভাবে স্থির ফলাফল নিরূপিত হয় মাত্র ৭৬টি কেন্দ্রে। বাকি কেন্দ্রগুলির মধ্যে ২৯৬টি-তে সর্বোচ্চ ভোট পেয়েছিলো ন্যাশনাল র্যালির প্রার্থী, তবে ৫০ শতাংশের কম। সুতরাং প্রায় ধরেই নেওয়া গিয়েছিল যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রথমবারের জন্য রাষ্ট্রের ক্ষমতা পেতে চলেছে অতি দক্ষিণপন্থী একটি দল। ন্যাশনাল র্যালির শীর্ষনেত্রী মেরিন লে পেন এবং দলের সভাপতি জর্ডান বার্ডেলা তাঁদের ভবিষ্যৎ মন্ত্রিসভা নিয়ে পরিকল্পনা শুরু করে দিয়েছিলেন। তাঁদের পরিকল্পিত কর্মসূচির মধ্যে উঠে এসেছিল সরকারি ব্যয়সংকোচ ও অবসরের বয়স ৬৬ বছর করার কথাও। কিন্তু তারপরেই ঘুরে গেল খেলাটা। প্রথম দফায় অমীমাংসিত সব কেন্দ্রে ফের ভোট হলো ৭ জুলাই। প্রথম দফায় কোনও অমীমাংসিত কেন্দ্রে ১২.৫ শতাংশ তালিকাভুক্ত ভোট পাওয়া যে কোনও প্রার্থীই ওই কেন্দ্রের দ্বিতীয় দফায় লড়তে পারেন। কিন্তু ন্যাশনাল র্যালি সর্বোচ্চ ভোট পেয়েছে এমন কেন্দ্রগুলিতে তাদের বিপক্ষের ভোট যাতে যথাসম্ভব ভাগ না হয়, তাই বামপন্থী এনএফপি ও মধ্যপন্থী এনসেম্বলের মধ্যে যে যেখানে এগিয়ে সে সেখানে লড়বে, এই কৌশল নেওয়া হয়। বিভিন্ন কেন্দ্রের দৌড়ে তৃতীয় স্থানে থাকা ২১০ জনের বেশি প্রার্থী স্বেচ্ছায় সরে দাঁড়ান। এই আপৎকালীন সমঝোতার ফলাফলেই অতি দক্ষিণপন্থী শক্তির পরাজয়। রবিবারের শেষ সন্ধ্যায় প্যারিস নগরীর কেন্দ্রে প্লাসে ডি লা রিপাবলিক জুড়ে ছিল মানুষের ঢল। শুধু মানুষের ঢল বললে ভুল হবে। পরিবর্তনকামী বামপন্থী মানুষের ঢল। নির্বাচনের ফলাফল আসতে শুরু করার পর থেকেই উল্লাসে ফেটে পড়তে থাকেন তাঁরা। মারিয়ানের বিশাল মূর্তির পাদদেশে ফরাসি তেরঙা পতাকার সঙ্গে উড়তে থাকে প্যালেস্তাইন-সহ নানা দেশের নানা রঙের পতাকা। সাদা ব্যানারে লেখা দেখা যায় ‘অভিবাসীদের মিলনক্ষেত্র ফ্রান্স।’ ইউরোপ তথা বিশ্বের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের নিরিখে এই ফলাফলের গুরুত্ব অপরিসীম। প্রথমত, বিভিন্ন মাত্রার বামমনস্ক দলগুলি একত্রিত হয়ে অতি দক্ষিণপন্থা এবং মধ্যপন্থাকে আজকের দিনে দাঁড়িয়েও যে হারিয়ে দেওয়া সম্ভব–বাকি দুনিয়ার কাছে এই বার্তা পৌঁছে দিলো ফরাসি নির্বাচন। দ্বিতীয়ত, এই জয়ের পুরোভাগে রইলেন লা ফ্রান্স ইনসুমির নেতা ও প্রতিষ্ঠাতা জ্যঁ-লুক মেলেশোঁ, যিনি বহুদিন ধরেই তাঁর র্যাডিকাল রাজনীতির জন্য দক্ষিণপন্থী থেকে মধ্যপন্থী এবং সোশ্যালিস্টদেরও আক্রমণের লক্ষ্য। কেউ কেউ বলে থাকেন, তিনি ফরাসি দেশের জেরেমি করবিন। প্রথম দফার ভোটের আগে ম্যাক্রোঁ মেলেশোঁকে দেখিয়ে এনপিএফ সম্বন্ধে ভোটারদের মনে সন্দেহ সৃষ্টির চেষ্টা করেছেন। দ্বিতীয় দফায় এনপিএফ জেতার পরেও এনসেম্বলের নেতৃত্বের একাংশ বলেছেন যে, অতি-বামপন্থী অংশের কেউ যাতে প্রধানমন্ত্রী না হন তা বাকি শরিকদের নিশ্চিত করা উচিত। প্রসঙ্গত, বহু আগেই বামপন্থী জোট এবং বিশেষত মেলেশোঁর গায়ে ইহুদিবিদ্বেষের তকমা লাগানো হয়েছে। স্পষ্টতই তাতে তাঁর অবস্থান কিছু বদলায়নি। জয়লাভের পর ইতিমধ্যেই তিনি বলেছেন যে, নতুন সরকারের উচিত যত শীঘ্র সম্ভব প্যালেস্তাইনকে রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দেওয়া। তৃতীয়ত, স্বাভাবিকভাবেই বামপন্থী জোট যেখানে শ্রমিকের অধিকার এবং নাগরিকদের জন্য বেশি সুবিধার পক্ষে, সেখানে পুঁজিপতিদের স্বার্থ ছিল দক্ষিণপন্থীদের দিকে। ফ্রান্সের বেশ কিছু বড় পুঁজিপতি মেরিন লে পেনের প্রচারে সাহায্য করেছিল বলে জানিয়েছে ফরাসি সংবাদমাধ্যম লে মঁদ। বিশেষত, ফিনান্স, টেকনোলজি বা প্রযুক্তি এবং ফসিল ফুয়েল বা জীবাশ্ম জ্বালানি-নির্ভর এনার্জি ব্যবসায় যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলি মেরিন লে পেনের সমর্থক ছিল। ফরাসি গণমাধ্যমও লাগাতার প্রচার চালিয়েছে এনএফপি-র বিরুদ্ধে। একদিকে অতি দক্ষিণপন্থা ও অতি বামপন্থাকে এক করে দেখিয়ে তারা এনএফপি সম্বন্ধে ভীতি সৃষ্টি করতে চেয়েছে। অন্যদিকে বহু বিষয়ে প্রবল মতানৈক্য এবং পারস্পরিক আক্রমণ থাকা সত্ত্বেও নির্বাচনের জন্য ইনসুমি, সোশ্যালিস্ট, ইকোলোজিস্ট ও কমিউনিস্টদের এক মঞ্চে আসার কারণে তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। এনএফপি-র পক্ষে সর্বাধিক ভোট ফিনান্স পুঁজির এই আঁতাতকে হারিয়ে দিয়েছে। মেরিন লে পেন এবং বিশেষত তাঁর তরুণ সেনাপতি জর্ডান বার্ডেলার নেতৃত্বে ন্যাশনাল র্যালি যে ঘৃণাভিত্তিক প্রচার চালায় তার মূল উপজীব্য ছিল, অভিবাসীদের প্রতি বিদ্বেষ, মুসলিমবিদ্বেষ এবং অবশ্যই ইজরায়েলের প্রতি অকুন্ঠ সমর্থন। মেয়েদের গর্ভপাতের অধিকারের বিরুদ্ধেও তারা। বেকারত্ব, কাজের নিরাপত্তা, মূল্যবৃদ্ধির মত সমস্যা নিয়ন্ত্রণে ম্যাক্রোঁ সরকারের ব্যর্থতা, আর অন্যদিকে মধ্যপন্থার আড়ালে পেনশন রিফর্ম বা মিডিয়া ব্যান ইত্যাদি দক্ষিণপন্থী কার্যকলাপ মানুষকে ন্যাশনাল র্যালির দিকে ঝুঁকতে সাহায্য করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মানুষ বিদ্বেষের রাজনীতির বিপক্ষে দাঁড়াতে পেরেছেন। এনএফপি-র নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির মধ্যে ছিল অবসরের বয়স ৬৪ থেকে কমিয়ে ৬০ করা, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি রোধ, শিক্ষাক্ষেত্রে সরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো, কর-কাঠামো আরও প্রোগ্রেসিভ করে তোলা এবং ইজরায়েলের প্রতি ফরাসি সরকারের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সমর্থন প্রত্যাখ্যান। তবে ত্রিশঙ্কু আইনসভায় কোনও আইন পাশ করানোই খুব সহজসাধ্য হবে না। তবে আশার কথা এই যে ফ্রান্সের শ্রমিকশ্রেণি তাদের অধিকার সম্বন্ধে অত্যন্ত সচেতন। গত বছরের শেষদিকের বিপুল ধর্মঘটই তার টাটকা প্রমাণ এবং সদ্য সমাপ্ত এই নির্বাচনের ফলাফলও। মেলেশোঁর নেতৃত্বে লা ফ্রান্স ইনসুমি শ্রমিকশ্রেণির ক্ষমতাকে যদি আরও বাড়াতে পারে তবে আইনসভার অমীমাংসিত লড়াই ফ্রান্সের কলকারখানায় এবং রাস্তার লড়াইয়ে মীমাংসার পথ খুঁজে নেবে। প্রকাশের তারিখ: ১১-জুলাই-২০২৪ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |