যে বই হাতিয়ার

সৌম্যজিৎ রজক
কেন জরুরি শ্যামাপ্রসাদকে জানা? জরুরি কারণ, বাংলায় সাভারকর, গোলওয়ারকারদের তৈরি উত্তরভারতীয় হিন্দুত্ববাদের ভাগীরথ তিনি। আজ সেই ধারাটিই পশ্চিমবাংলার রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করেছে। তাঁকে না জেনে বাংলায় রাজনৈতিক হিন্দুত্বের প্রকল্পটিকে বোঝা অসম্ভব। আর তাঁকে জানা মানে তো স্রেফ তাঁকে জানা নয়, তাঁর সময়কে জানা। তাঁর সময়ে ক্রিয়াশীল নানা শ্রেণি, নানা সামাজিক গোষ্ঠীর সংঘাতকে জানা। বোঝা। একটেরে বোঝা নয়, আলোয়-আঁধারে দেখা। আলো-আঁধারের দ্বন্দ্ব দিয়েই বোঝা প্রয়োজন।

বাংলায় সরকার বদলেছে। সরকার বদলালে সরকারের নীতি বদলাতে পারে, অভিমুখ বদলাতে পারে, অগ্রাধিকারও। কিন্তু যে শক্তি এবার সরকারে এসেছে, তারা বদলাতে চায় অধিকতর কিছু। বাংলার সামাজিক বুনন, সাংস্কৃতিক চলন, ইতিহাস সম্পর্কে সাধারণ বোঝাপড়াও। ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে মাতামাতি শুরু করা সেই কারণেই জরুরি ওদের কাছে। 

বাংলার অন্যান্য ঐতিহাসিক চরিত্রদের তুলনায় শ্যামাপ্রসাদকে নিয়ে চর্চা কম হয়েছে এতদিন। গণপরিসরে তো বটেই, অ্যাকাদেমিক পরিসরেও। বর্তমান শাসক দল ও গোষ্ঠীর এই দাবি ভুল নয়। সত্যিই তো রামমোহন, বিদ্যাসাগর, বিবেকানন্দ, ডিরোজিও, ক্ষুদিরাম, নজরুল, সুভাষচন্দ্র কিংবা রবি ঠাকুরকে নিয়ে বাঙালির যত মাতামাতি তার সিকিভাগও কি জুটেছে শ্যামাপ্রসাদের? কেউ কেউ বলবেন, জোটার কথাও নয়; বাকিদের মাপেই আসেন না শ্যামাপ্রসাদ। জোর ঝগড়া লেগে যেতে পারে এইখানে, লেগে গেছেও ইতিমধ্যে। 

এই ঝগড়ায় ভক্তের কাছে তিনি ভগবান, সমালোচকের কাছে খলনায়ক। কিন্তু সম্পূর্ণ সাদা, সম্পূর্ণ কালোর বাইরে কি ভাবীকাল দেখবে না তাঁকে তাঁর সময়ের সামগ্রিকতায়? ইতিহাসের নির্মোহ দাড়িপাল্লায় সাদায় এবং কালোয় বিচার করবে না শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের? 

সমসাময়িক বাংলার অন্যতম অগ্রণী চিন্তাবিদ আশীষ লাহিড়ী এই কাজটিই করেছেন। 'বহুস্বর' থেকে প্রকাশিত তাঁর সাম্প্রতিকতম বইটিতে। স্বল্প পরিসরে, সহজ স্পষ্ট বাংলা গদ্যে। 

কেন জরুরি শ্যামাপ্রসাদকে জানা? জরুরি কারণ, বাংলায় সাভারকর, গোলওয়ারকারদের তৈরি উত্তরভারতীয় হিন্দুত্ববাদের ভাগীরথ তিনি। আজ সেই ধারাটিই পশ্চিমবাংলার রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করেছে। তাঁকে না জেনে বাংলায় রাজনৈতিক হিন্দুত্বের প্রকল্পটিকে বোঝা অসম্ভব। আর তাঁকে জানা মানে তো স্রেফ তাঁকে জানা নয়, তাঁর সময়কে জানা। তাঁর সময়ে ক্রিয়াশীল নানা শ্রেণি, নানা সামাজিক গোষ্ঠীর সংঘাতকে জানা। বোঝা। একটেরে বোঝা নয়, আলোয়-আঁধারে দেখা। আলো-আঁধারের দ্বন্দ্ব দিয়েই বোঝা প্রয়োজন। 

বইটির শুরুতেই, 'লেখকের নিবেদন'-এ, আশীষবাবু লিখছেন একথাই: "আমি যে ধরণের দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী চিন্তাধারায় অভ্যস্ত, তাতে নিছক সাদা-কালো বলে কিছু হয় না; বরং যে-কোনও প্রক্রিয়াই চলমান ও পরিবর্তনশীল: 'তরঙ্গ মিলায়ে যায়, তরঙ্গ উঠে'। শ্যামাপ্রসাদ সম্পর্কেও সেই কথা। মার্কসের সেই অমূল্য  উক্তিটি এক্ষেত্রে আমার পথপ্রদর্শক: মানুষ নিজেই ইতিহাস তৈরি করে, কিন্তু যে-পরিস্থিতিতে মানুষ সে-কাজ করে, তার উপর তার কোনও হাত নেই। শ্যামাপ্রসাদের চিন্তাধারা কীভাবে কোন পরিস্থিতিতে কোন পথ ধরে বিকশিত ও পরিবর্তিত হয়েছে, তার নেতিবাচক ও ইতিবাচক দিকগুলি এখানে বোঝবার চেষ্টা করেছি।"

রাজনৈতিক হিন্দুত্ববাদের এই চিন্তাধারাকে কোন পথ দিয়ে প্রতিহত করতে হবে তা যদি বুঝতে চাই, এ বই তাহলে আয়ুধ। মাত্র ৮৮ পাতার ছিপছিপে বইটি সত্বর পড়ে ফেলা জরুরি ভীষণ; তারও পরে আরও যদি কৌতূহল জন্মে, বাড়ে তাহলেও ছোট্ট এই বইটিই সহায়। শেষ ৬ পাতাজুড়ে সাজানো 'সূত্রনির্দেশ'-এ খোঁজ মিলবে ইতিহাসের বিস্তারিত দলিল, দস্তাবেজের।

মোদ্দা কথাটা হল, বিপুল গবেষণা আর অত্যন্ত স্বল্প পরিসরে, সহজ করে, খানিক গল্পের মতো করেই সাধারণ মানুষের কাছে সবটা তুলে ধরার প্রয়াস। সফল প্রয়াস। এমন চমৎকার বই, এমন চমৎকার পাঠ অভিজ্ঞতা মেলে না সহজে।

যেমন চমৎকার লেখা, তেমনই যত্নে ছাপা। আশীষ লাহিড়ীর লেখা, বহুস্বর প্রকাশিত ইতিহাসের আলো-অন্ধকারে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় বইটি পড়ে ফেলুন, পাঠক। পাশের জনকে পড়ান। 

বই: ইতিহাসের আলো-অন্ধকারে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় 
লেখক: আশীষ লাহিড়ী 
প্রকাশনা: বহুস্বর
দাম: ১৮০ টাকা
প্রাপ্তিস্থান: এনবিএ, মনীষা, লালন, ধ্যানবিন্দু, দে বুক স্টোর, প্রতিক্ষণ


প্রকাশের তারিখ: ২৮-অক্টোবর-২০২৬

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org