|
'দ্য কন্ডিশন অব দ্য ওয়ার্কিং ক্লাস ইন ইংলন্ড’— পুঁজিবাদের স্বরূপ চেনালেন এঙ্গেলস (দ্বিতীয় পর্ব)অর্ণব ভট্টাচার্য |
|
পুঁজির দাসত্ব পুঁজিপতিদের মুনাফার লালসার অন্যতম শিকার ছিল শিশু ও নারীরা। এঙ্গেলস তা বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করেছেন। ইংলন্ডে পুঁজিবাদ বিকাশের প্রাথমিক পর্যায়ে অষ্টাদশ শতকে শিশুদের ওয়ার্ক হাউসগুলি থেকে মিলমালিকদের শিক্ষানবীশ হিসেবে ভাড়া দেওয়া হত। তাদের ওপর যে চরম শোষণ ও নির্যাতন চালানো হত তার প্রতিবাদে ডাঃ পার্শিভাল ও স্যার রবার্ট পিল ১৭৯৬ সাল থেকে সরব হন যার ফলস্বরূপ ১৮০২সালে, ইংলন্ডের পার্লামেন্টে— ‘শিক্ষানবিশী বিল’ (Apprentices Bill) পাশ হয় যাতে শিশুদের কাজ করবার বয়স কিছুটা বাড়ানো হয়। এঙ্গেলস-এর বিবরণ অনুযায়ী সে সময়ে শিশুশ্রমিকদের পরিশ্রমের যে চিত্র উঠে আসে তা এককথায় চূড়ান্ত অমানবিক ও ভয়াবহ। উপরোক্ত বিল অনুযায়ী ৯ থেকে ১৩ বছর বয়সী শিশুশ্রমিকদের কারখানায় সাড়ে ছ’ঘণ্টা কাজের সময়। ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সীদের কাজের সময় ১২ঘণ্টা। ১৮৩৩ সালের ফ্যাক্টরিস ইনকুয়ারি কমিশন-এর রিপোর্ট উদ্ধৃত করে এঙ্গেলস জানাচ্ছেন যে, পাঁচ বছরের বাচ্চা শ্রমিক হিসেবে খুব কম ক্ষেত্রেই নিযুক্ত হলেও প্রায়শই ৬, ৭ বছর বয়সী শ্রমিক এবং সাধারণভাবে ৮ ও ৯ বছর বয়সী শিশুরা শ্রমিক হিসেবে ১৪ থেকে ১৬ ঘণ্টা কাজ করত। ওভারসিয়াররা মালিকের নির্দেশে শিশুশ্রমিকদের ওপর চাবুক মারত এবং নির্যাতন চালাত।১৪ হাড়ভাঙা খাটুনি ও শারীরিক নির্যাতনের ফলে কিভাবে শিশুদের কোমল শরীরে রোগ বাসা বাঁধত তার মর্মান্তিক বিবরণ দিয়েছেন লিডসের হাসপাতালে ১৮ বছর ধরে কর্মরত ডাঃ হে। শ্রমিকদের পেশাগত ব্যাধির কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে কারখানার পরিবেশ , কাজের শর্তাবলী, বাসস্থানকেই তাদের অঙ্গ প্রত্যঙ্গের বৈকল্য, দুর্বলতা ও শারীরিক বিকাশের অভাবের জন্য দায়ী করেন একাধিক ডাক্তার। ডঃ হে বলেছিলেন: ‘‘কারখানায় যারা কাজ করে তাদের মেরুদণ্ডের রোগ খুব বেশি দেখা যায়। ... অবশ্য শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গে অস্বাভাবিকতার হার মেরুদণ্ডের রোগের চেয়েও বেশি লক্ষণীয়... যে সমস্ত মিল ও কারখানায় দীর্ঘসময় ধরে কাজ হয় সেখানে নিযুক্তদের এই সমস্ত রোগ হতে আমি দেখেছি।’’১৫ যে শিশু শ্রমিকেরা কাপড়ের মিলে লেস উৎপাদনের কাজে যুক্ত তারা সামগ্রিক শারীরিক দুর্বলতার সাথে সাথে মাঝেমধ্যেই জ্ঞান হারাতো। তাদের মাথা, ঘাড় ও পিঠে ব্যাপক ব্যথা হত, হৃদ্যন্ত্রের গতি বেড়ে যেত, ক্ষুধামান্দ্য দেখা যেত, মেরুদণ্ড বেঁকে যেত এবং তারা যক্ষ্মার শিকার হত। শিশুদের অধিকাংশ সময়েই পরনে উপযুক্ত জামাকাপড় থাকত না, ছেঁড়াখোড়া জামাকাপড় পড়েই তাদের দিন কাটত। মাসের পর মাস তারা মাংস খেতে পেত না, কেবল রুটি আর চা খেয়ে উদরপূর্তি করত। ১৮৩৩ সালে ফ্যাক্টরিস ইনকুয়ারি কমিশন-এর কমিশনার ড. লডন মন্তব্য করেন, “I think it has been clearly proved that children have been worked a most unreasonable and cruel length of time daily, and that even adults have been expected to do a certain quantity of labour which scarcely any human being is able to endure. The result of this has been, that many have met with a premature death; many have been affected constitutionally for life..."১৬ পুঁজিপতিদের মুনাফার লোভ যে শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিকদের অকাল মৃত্যু কিম্বা জীবনব্যাপী শারীরিক বৈকল্যের জন্য দায়ী ছিল, তার এমন অজস্র প্রমাণ দিয়েছেন এঙ্গেলস। " দ্য কন্ডিশন অব দ্য ওয়ার্কিং ক্লাস ইন ইংলন্ড "-এ মূর্ত হয়ে উঠেছে নারীশ্রমিকদের অসহনীয় জীবনযন্ত্রণার কথা। সস্তা শ্রমিক হিসেবে চরম শোষণের শিকার ছিলেন নারী ও শিশু শ্রমিকেরা। তার ওপর ছাঁটাইয়ের ভয় দেখিয়ে নারী শ্রমিকদের ওপর যৌন নির্যাতন ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। এঙ্গেলস লিখেছেন যে অনেক পুঁজিপতির কারখানাই ছিল হারেম (If the master is mean enough, and the official report mentions several such cases, his mill is also his harem’) ১৭। অন্যদিকে কারখানায় হাড়ভাঙা খাটুনির জন্য নারীশ্রমিকদের যে সমস্ত শারীরিক সমস্যা ভোগ করতে হত, তা ছিল পুরুষদের থেকে আরও বেশি তীব্র। গর্ভবতী নারীদেরও কাজ থেকে রেহাই মিলত না। কারখানায়ই প্রসব করতেন অনেক সন্তানসম্ভবা নারীশ্রমিক। তাদেরও ১২/১৩ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে কাজ করতে হত, মাঝেমধ্যেই নিচু হতে হত। সন্তান প্রসবের তিন চার দিনের মধ্যেই কাজ হারাবার ভয়ে এবং অনাহারে মৃত্যুর আশঙ্কায় নারীশ্রমিকরা কাজে যোগ দিতে বাধ্য হতেন। তাদের অধিকাংশই যন্ত্রণাদায়ক অনিয়মিত ঋতুস্রাব, অন্যান্য শারীরিক উপসর্গ, বিশেষত রক্তাল্পতার শিকার ছিলেন। তার ওপর ছিল কৈশোরকালীন মাতৃত্বের সমস্যা। এক্ষেত্রেও ম্যাঞ্চেস্টারের প্রখ্যাত স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ রবার্টের মন্তব্য উদ্ধৃত করে এঙ্গেলস তার বক্তব্যের সারবত্তা প্রমাণ করেছেন। কাপড়ের মিলে কর্মরত শ্রমিকদের সারা দিন যে বাতাসে শ্বাসপ্রশ্বাস নিতে হত, তা থাকত কাপড়ের সূক্ষ্ম তন্তু ও ধুলোয় ভরা। অধিকাংশ শ্রমিকই ফুসফুসের রোগের শিকার হত। নিঃশ্বাসের কষ্টের সাথে সাথে কাশি, নিদ্রাহীনতা সহ হাঁপানির যাবতীয় লক্ষণ তাদের মধ্যে দেখা দিত এবং অনেকেই যক্ষ্মার শিকার হতো। শ্রমজীবী মানুষের বিশেষত বালক ও বালিকাদের ওপর যে অমানুষিক পরিশ্রমের বোঝা চাপাত পুঁজিপতিরা, তার আরেক দৃষ্টান্ত ধাতুশিল্পের ক্ষেত্রে দেখা যায়। ধাতুশিল্পে বালক ও বালিকারা ১০-১২ বছর বয়স থেকে নিযুক্ত হত। প্রতিদিন ১০০০ পেরেক বানাতে পারলে তাকে দক্ষ শ্রমিক বলা হত। ১০০০ পেরেক বানানোর মজুরি ছিল যৎসামান্য। আর সেকাজ করতে প্রতিদিন বারে বারে যে ওজনের হাতুড়ি তুলতে হত তা মোট ১৮ হাজার পাউন্ড ওজন তোলার সমান। একজন বালক/বালিকার রুগ্ন শরীরের ওপর ওই হাড়ভাঙা খাটুনি অত্যন্ত ক্ষতিকর প্রভাব ফেলত। কারখানায় নানারকম দুর্ঘটনা ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। ‘ম্যাঞ্চেস্টার গার্ডিয়ান’ পত্রিকার রিপোর্ট উদ্ধৃত করে এঙ্গেলস লিখছেন যে- বিভিন্ন দুর্ঘটনায় শিশু শ্রমিক, পূর্ণবয়স্ক শ্রমিকদের অঙ্গহানি হত কিংবা প্রাণ চলে যেত।১৮ এঙ্গেলস দেখিয়েছেন, শ্রমজীবী মানুষের ওপর নির্মম শোষণের ক্ষেত্রে পুঁজিপতিরা যে অস্ত্রগুলি ব্যবহার করত তার অন্যতম ছিল ট্রাক সিস্টেম ও কটেজ সিস্টেম। ট্রাক সিস্টেমের অর্থ ছিল শ্রমিকদের মজুরি হিসেবে নগদ অর্থ না দিয়ে সমপরিমাণ মূল্যের পণ্য দেওয়া। মালিকরা যে দোকান খুলত, সেখানে বাজার মূল্যের চেয়ে বেশি দামে বিভিন্ন সামগ্রী কিনতে বাধ্য করা হত শ্রমিকদের। শ্রমিকের মজুরির সমমূল্যের পণ্য তাদের দেওয়া হত। এক্ষেত্রেও শ্রমিকদের ব্যাপকভাবে ঠকাতো মালিকপক্ষ। ১৮৩১ সালে ইংলন্ডে ট্রাক অ্যাক্ট প্রণয়ন হয়। এই পদ্ধতিতে শ্রমিকদের মজুরি প্রদান নিষিদ্ধ করা হলেও গ্রামাঞ্চলে এই প্রথা বলবৎ ছিল। কটেজ সিস্টেমও ছিল একইরকমের বঞ্চনামূলক। ধূর্ত মালিক একসারি ঘর তৈরি করে বাড়তি ভাড়া দিয়ে সেখানে শ্রমিকদের থাকতে বাধ্য করত। আর শ্রমিকেরা সেখানে না থাকলেও তাদের ঘরের ভাড়া গুণতে হত।১৯ কয়লাখনিতে শ্রমিক শোষণ কৃষিশ্রমিকদের দুর্গতি " দ্য কন্ডিশন অব দ্য ওয়ার্কিং ক্লাস ইন ইংলন্ড " রাষ্ট্রশক্তির সহায়তায় পুঁজিবাদী শোষণের এমন বহুমাত্রিক চেহারা সকলের সামনে তুলে ধরে যা এর আগে কখনও কেউ তুলে ধরেনি। কেউ কেউ অভিযোগ করার চেষ্টা করেছেন এই বইয়ে অনেক তথ্যগত ভ্রান্তি আছে, কিন্তু তারা সেই অভিযোগ প্রমাণ করতে পারেননি। বরং এঙ্গেলস নানারকম সূত্র উদ্ধৃত করে ইংল্যান্ডের তৎকালীন সামাজিক ইতিহাস যেভাবে তুলে ধরেছেন তা নিঃসন্দেহে বস্তুনিষ্ঠ। কেউ কেউ এমন বলারও চেষ্টা করেছেন যে, শ্রমজীবী মানুষের জীবনের যে বর্ণনা তিনি হাজির করেছেন তা মাত্রাতিরিক্ত ও অনাবশ্যকভাবে নেতিবাচক। আসলে এরা রূঢ় বাস্তবকে এড়িয়ে যেতে চেয়েছেন। ইংলন্ডের শ্রমজীবীরা এই জীবনযন্ত্রণা মুখ বুজে সহ্য করেননি। পুঁজিবাদী শোষণ শ্রমিকশ্রেণির সংগঠিত প্রতিরোধের পথ প্রশস্ত করে, যার সর্বোত্তম রূপ তৎকালীন ইংলন্ডে চার্টিস্ট আন্দোলন ও কয়লাখনির শ্রমিকদের ঐতিহাসিক ধর্মঘটের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায়। (চলবে…) তথ্যসূত্র— শেষ পর্ব মার্কসবাদী পথ-এর ওয়েবসাইটে আগামী ১ ডিসেম্বর ২০২৩-এ প্রকাশিত হবে। প্রকাশের তারিখ: ২৯-নভেম্বর-২০২৩ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |