'দ্য কন্ডিশন অব দ্য ওয়ার্কিং ক্লাস ইন ইংলন্ড’— পুঁজিবাদের স্বরূপ চেনালেন এঙ্গেলস (শেষ পর্ব)

অর্ণব ভট্টাচার্য
প্রখ্যাত ঐতিহাসিক এরিক হবসবম এঙ্গেলসের এই ভাবনাকে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বলেছেন যে, এঙ্গেলসের সমকালীন ইংল্যান্ডে চরম মন্দার মধ্যে ছিল পুঁজিবাদী অর্থনীতি। স্বভাবতই এঙ্গেলসের ধারণা হয়েছিল যে পুঁজিবাদ মৃত্যু শয্যায় এবং তার আশু ধ্বংস অনিবার্য। ১৮৪৮ সালে ইউরোপ জুড়ে যে বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ড হয়েছিল তার পূর্বাভাস এঙ্গেলস খুব সঠিকভাবেই দিতে সক্ষম হয়েছিলেন।

ইংল্যান্ডে শ্রেণি সংগ্রাম

 লেনিন বলেছিলেন যে এঙ্গেলসই প্রথম তার বিশ্লেষণের মাধ্যমে দেখান যে শ্রমিক শ্রেণি কেবলমাত্র কষ্ট ভোগ করে তা নয়, চরম অর্থনৈতিক শোষণ  তাকে চূড়ান্ত মুক্তির জন্য সংগ্রামের পথে অপ্রতিরোধ্য গতিতে অগ্রসর করে। এঙ্গেলস স্পষ্ট ভাবে উল্লেখ করেছেন যে শ্রমিক শ্রেণি যত নিবিড় ভাবে শিল্পের সাথে যুক্ত থাকবে, তত বেশি চিন্তা ও চেতনায় অগ্রসর হবে এবং সমাজবদলের লড়াইয়ে শামিল হবে। ইংল্যান্ডে সামাজিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে এঙ্গেলস খুব আশাবাদী ছিলেন। তাই এই বইটিতে উনবিংশ শতকে ইংল্যান্ডের শ্রমজীবী মানুষের প্রতিরোধের কাহিনির বিস্তৃত  বিবরণ রয়েছে । এঙ্গেলস দেখিয়েছেন যে, শ্রমিকশ্রেণির ওপর পুঁজিপতিদের বর্বরোচিত শোষণের পরিণতিতে সমগ্র সমাজ ক্রমাগত দুটি প্রধান শ্রেণিতে বিভক্ত হয়ে যাচ্ছে যার একদিকে বৃহৎ পুঁজির মালিকরা অন্যদিকে নিঃসম্বল  শ্রমিকরা। ইংলন্ডে শিল্পবিপ্লবের পর থেকেই শ্রমিকরা নানা ধরণের প্রতিবাদী আন্দোলনে শামিল হন। ক্রমশ ট্রেড ইউনিয়ন গঠন এবং মজুরি বৃদ্ধি সহ নানাবিধ দাবীতে ধর্মঘট সংগঠিত হয়। সেই সময় ইংলন্ডে চার্টিস্ট আন্দোলন শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। চার্টিস্টরা ২১ বছর বয়সীদের গোপন ব্যালটে ভোটাধিকার, সম্পত্তি অর্জনকে ভোটার হওয়ার শর্ত হিসেবে বাতিল করা ইত্যাদি ৬ দফা দাবিতে সাংবিধানিক পদ্ধতির মাধ্যমে ইংল্যান্ডের রাজনৈতিক ব্যবস্থা গণতন্ত্রীকরণের পক্ষে ছিলেন। এঙ্গেলস লিখেছেন,"... in Chartism it is the whole working-class which arises against the bourgeoisie, and attacks, first of all, the political power, the legislative rampart with which the bourgeoisie has surrounded itself."২২ অর্থাৎ চার্টিস্টদের নেতৃত্বে শ্রমিকশ্রেণি বুর্জোয়া শ্রেণি এবং তার রক্ষাকর্তা রাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ করেছিল।

ঊনবিংশ শতকের মাঝামাঝি খনির মজুররা  অসহনীয় যন্ত্রণা ও শোষণ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য চার্টিস্টদের সাথে যোগ দেন। এঙ্গেলসের বিবরণ থেকে জানা যায় যে, ম্যাঞ্চেস্টারে প্রথম সম্মেলনে ৬০ হাজার এবং ৬ মাস পরে গ্লাসগোতে দ্বিতীয় সম্মেলনে ১ লক্ষ খনিশ্রমিক যোগ দেন। সম্মেলনে কয়লা খনির শ্রমিকদের যাবতীয় দুর্দশার কারণ বিশ্লেষণ করে সাধারণ ধর্মঘটের সিদ্ধান্ত হয়। এ সময় শ্রমজীবীদের সমর্থনে বেশ কিছু পত্রিকা চালু হয় বিশেষ করে নিউক্যাসেলে ‘মাইনারস অ্যাডভোকেট’। চার্টিস্ট নেতা রবার্টসের ওপর মালিকদের সাথে নতুন এক চুক্তির বয়ান তৈরি করার দায়িত্ব অর্পণ করা হয় যেখানে শ্রমিকরা পাঁচদফা দাবি উত্থাপন করেন। এই দাবিগুলি ছিল: (১) কয়লার ওজনের ওপর মজুরি দিতে হবে, আয়তনের ওপর নয়, (২) সরকারি ইনস্পেক্টরের উপস্থিতিতে কয়লার ওজন পরিমাণ করতে হবে, (৩) চুক্তির ষান্মাসিক পুনর্নবীকরণ চাই, (৪) ফাইন প্রথা তুলে দিতে হবে এবং প্রকৃত কাজের নিরিখে মজুরি দিতে হবে, (৫) প্রতি সপ্তাহে খনিশ্রমিকদের চারদিন অন্ততপক্ষে কাজ বা চারদিনের মজুরি দিতে হবে।২৩

খনিমালিকরা এই দাবিপত্র পাওয়ার পর জানালেন যে তারা খনিশ্রমিকদের সাথে ব্যক্তিগতভাবে কথা বলবেন, ইউনিয়নকে তারা মানেন না। মালিকরা নিজেরাও একটা চুক্তিপত্রের বয়ান পেশ করে যাতে শ্রমিকদের কোনো দাবিই ঠাঁই পায়নি। স্বাভাবিকভাবেই ১৮৪৪ সালের ৩১ মার্চ ৪০ হাজার কয়লা খনিশ্রমিক অনির্দিষ্টকালের জন্য  ধর্মঘটে শামিল হন। ইংল্যান্ডের সবক’টি কয়লাখনি স্তব্ধ হয়ে যায়। এই ধর্মঘটে ইংল্যান্ডের খনিশ্রমিকরা তাদের মালিকদের ওপর যে চাপ সৃষ্টি করেছিলেন তা অবিস্মরণীয়। অন্যদিকে রবার্টস অসামান্য আইনি লড়াই লড়েছিলেন এবং ইউনিয়নের সঞ্চয় থেকে প্রত্যেক শ্রমিক পরিবারকে সংসার চালানোর জন্য ন্যূনতম সাহায্য করেছিলেন বেশ কয়েক মাস। ধর্মঘটীদের দৃঢ়তা দেখে বাধ্য হয়ে কোনো কোনো কোলিয়ারিতে মালিকপক্ষ নোটিশ দিয়ে শ্রমিকদের বেশ কিছু দাবি মেনে নেওয়ার কথা জানায়, যেমন পেনট্রিচ কোলিয়ারি কর্তৃপক্ষ। শ্রমিকশ্রেণির অনমনীয় অবস্থানের বদল ঘটাতে মালিকপক্ষ তাদের শেষ অস্ত্র প্রয়োগ করে শ্রমিকদের তাদের আবাসন থেকে উচ্ছেদ করে। তখন ইংল্যান্ডে কটেজ সিস্টেম চালু থাকার দরুন শ্রমিকরা মালিকের তৈরি করে দেওয়া ঘরে থাকত ও বাড়তি ভাড়া গুণতে বাধ্য হতো। গৃহহীন করে দিয়েও শ্রমজীবী মানুষকে বশ মানাতে পারেনি মালিকরা। শত প্ররোচনাতেও শ্রমিকরা হিংস্র হয়ে ওঠেনি। যার দরুন পুলিশ ও সেনাবাহিনী নামিয়ে নির্বিচারে লাঠি-গুলি বর্ষণ করার সুযোগ পায়নি মালিকপক্ষ। টানা আট সপ্তাহ খোলা আকাশের নিচে বাস করে কয়েক হাজার গৃহহীন খনি মজুর পরিবার। শেষমেষ খনিমালিকরা আয়ারল্যান্ড ও ওয়েলস থেকে শ্রমিক আমদানি করে খনির কাজ শুরু করলে শ্রমিকদের পাঁচমাস ব্যাপী ধর্মঘট ভেঙে যায়। এঙ্গেলস খনিশ্রমিকদের এই ঐতিহাসিক ধর্মঘটকে কুর্নিশ জানিয়ে লেখেন:
‘Thus ended at the close of September the great five months’ battle of the Coal miners against the mine owners, a battle fought on the part of the oppressed with and endurance, courage, intelligence and coolness which demands the highest admiration. What a degree of true human culture, of enthusiasm and strength of such a battle implies on the part of men who, as we have seen in the Children’s Employment Commissions report, were described as late as 1840, as being thoroughly brutal and wanting in moral sense ... And what a battle! Not against visible mortal enemies, but against hunger, want, misery and homelessness...’  ২৪

এঙ্গেলসের প্রত্যাশা ও বাস্তবতা

ইংল্যান্ডের সমাজে তখন শ্রেণিবিভাজন তীব্রতর হচ্ছিল, শ্রমজীবীদের মধ্যে প্রতিরোধী স্পৃহা প্রবলতর হয়ে উঠছিল, বুর্জোয়া ও সর্বহারার মধ্যে পরস্পরের প্রতি‍‌ ক্ষোভ বাড়ছিল এবং ক্রমাগত বিভিন্ন সংঘর্ষে গেরিলা কায়দায় আঘাত হানছিল শ্রমজীবী মানুষ। অর্থনীতিবিদ ম্যালথাসের তত্ব অনুসরণ করে New Poor Law এর মত চরম অমানবিক আইন চালু করে গরীব মানুষের ওপর নিপীড়নকে যেভাবে আইনী মান্যতা দেওয়া হয়েছিল তাতে জনগণের ক্ষোভ আরও বৃদ্ধি পেয়েছিল। এঙ্গেলসের বিশ্বাস ছিল যে, চার্টিস্টদের স্লোগান "war to the mansion, peace to the cottage" (প্রাসাদবাসীদের সাথে যুদ্ধ হোক, কুঁড়ে ঘরে শান্তি নামুক) সারা ইংল্যান্ডে রণধ্বনি হিসেবে ছড়িয়ে পড়বে।২৫ এঙ্গেলসের প্রত্যাশা ছিল যে আসন্ন দুটি অর্থনৈতিক মন্দা যা কিনা ১৮৪৬-৪৭ এবং ১৮৫০ এর মধ্যভাগে ঘটবে বলে তিনি অনুমান করেছিলেন তার প্রতিক্রিয়ায় ইংল্যান্ডে সমাজ বিপ্লব ঘটে যাবে। এঙ্গেলসের এই আশাবাদের মূল কারণ ছিল তারুণ্যের উচ্ছ্বাস এবং কিছুটা ঐতিহাসিক দূরদৃষ্টির অভাব। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক এরিক হবসবম এঙ্গেলসের এই ভাবনাকে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বলেছেন যে, এঙ্গেলসের সমকালীন ইংল্যান্ডে চরম মন্দার মধ্যে ছিল পুঁজিবাদী অর্থনীতি। স্বভাবতই এঙ্গেলসের ধারণা হয়েছিল যে পুঁজিবাদ মৃত্যু শয্যায় এবং তার আশু ধ্বংস অনিবার্য। ১৮৪৮ সালে ইউরোপ জুড়ে যে বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ড হয়েছিল তার পূর্বাভাস এঙ্গেলস খুব সঠিকভাবেই দিতে সক্ষম হয়েছিলেন। কিন্তু সেই বিপ্লবের কোন ছোঁয়া ইংল্যান্ডে লাগেনি। ইতিমধ্যেই রেললাইন স্থাপন ইত্যাদি নানারকম প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, নতুন বাজার দখলের মত নানা কারণে ব্রিটিশ পুঁজিবাদ ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছিল, যার ফলাফল অত দ্রুত অনুধাবন করা এঙ্গেলসের পক্ষে সম্ভবপর ছিল না। তবে পুঁজিবাদ যে নির্দিষ্ট সময় অন্তর সংকটের সম্মুখীন হয় তা এঙ্গেলস সঠিকভাবেই চিহ্নিত করেছিলেন। হবসবমের মতে এঙ্গেলস প্রমাণ করে দিয়েছেন যে একজন ভাল সমাজবিজ্ঞানী হতে হলে তাকে বুর্জোয়া সমাজের ভ্রম থেকে মুক্ত হতে হবে।২৬

জার্মান ভাষায়  'দ্য কন্ডিশন অব দ্য ওয়ার্কিং ক্লাস ইন ইংলন্ড’ প্রকাশের চল্লিশ বছর পর ইংরেজিতে এর সংস্করণ প্রকাশিত হলে তার মুখবন্ধে এঙ্গেলস উল্লেখ করেন যে  বিগত চার দশকে ইংল্যান্ডের  বুর্জোয়া শ্রেণি ভারতের মত উপনিবেশের বিপুল বাজার দখল করেছে, চীনের বাজার ইংল্যান্ডের পণ্যের জন্য আরো বেশি উন্মুক্ত করতে সক্ষম হয়েছে। ভারতের লক্ষ লক্ষ তাঁতির সর্বনাশ করা হয়েছে ইংল্যান্ডের মিলের কাপড়ের বাজার দখলের স্বার্থে। এর সাথে রেলপথের বিস্তার এবং সমুদ্র পথে স্টিমারের ব্যবহার আন্তর্জাতিকভাবে বুর্জোয়াদের ব্যবসা সম্প্রসারণে ব্যাপক ভূমিকা পালন করে। এর ফলে  ইংল্যান্ডে শ্রমিক শোষণের অতীতের নগ্ন উপায়গুলি বুর্জোয়ারা অনেকাংশে বর্জন করে। না, এর কারণ বুর্জোয়াদের মহানুভবতা বা হৃদয় পরিবর্তন নয়। আসলে যে বৃহৎ পরিমণ্ডলে পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থা পরিচালিত হতে শুরু করেছিল তাতে অতীতের ধাঁচের লুণ্ঠন প্রক্রিয়া আর কার্যকরী ছিল না। এঙ্গেলস মন্তব্য করেছেন যে বুর্জোয়ারা শ্রমিকদের দুর্দশা গোপন করবার শিল্প আরো ভালোভাবে রপ্ত করছিল। ন্যায় বিচার বা মানবিকতার যেটুকু নিদর্শন দেখা যাচ্ছিল তা আসলে ছিল শান্তিপূর্ণ উপায়ে পুঁজির কেন্দ্রীভবন ঘটানোর প্রয়াস । এর পাশাপাশি এঙ্গেলস দেখিয়েছিলেন যে ইংল্যান্ডের পুঁজিপতিদের একচেটিয়া আধিপত্য ক্রমশ খর্ব হচ্ছে। তিনি বিশ্বাস করতেন যে শিল্প ও বাণিজ্যক্ষেত্রে ইংল্যান্ডের একচেটিয়া আধিপত্যের অবসান যে সামাজিক সংকটের জন্ম দেবে তা সে দেশকে সমাজতন্ত্রের  পথে এগিয়ে দেবে।

১৮৯২ সালে এই বইটির আমেরিকান সংস্করণের মুখবন্ধে এঙ্গেলস উল্লেখ করেন যে , ইংল্যান্ডের বুর্জোয়াশ্রেণি মধ্যবর্তী সময়ে পুঁজিবাদের শৈশব অবস্থা কাটিয়ে উঠলেও ফ্রান্স,জার্মানি বা আমেরিকা রয়েছে পুঁজিবাদের বিকাশের প্রাথমিক পর্যায়ে। উদাহরণস্বরূপ তিনি লিখছেন যে ঐ শতাব্দীর শেষ দশকেও আমেরিকায় কুখ্যাত ট্রাক সিস্টেম ও কটেজ সিস্টেম প্রচলিত ছিল শ্রমিকশ্রেণিকে যথেচ্ছ শোষণের জন্য। বিশেষ করে মহিলা ও শিশু শ্রমিকদের অবস্থা ছিল শোচনীয়। সকলেরই জানা যে শ্রমিক শোষণের প্রতিবাদে ১৮৮৬ সালের ১লা মে শিকাগোর হে মার্কেটে ৮ ঘণ্টা কাজের দাবিতে ডাকা সমাবেশে হামলা চালিয়ে, শ্রমিকনেতাদের বিচারের প্রহসন শেষে ফাঁসিকাঠে ঝু‍‌লিয়েছিল মার্কিন রাষ্ট্র। অর্থাৎ ইংল্যান্ডের অতীত অন্য অনেক দেশে ঘটমান বর্তমান হিসেবে দেখা দিয়েছিল।

১৮৪৪ সালের সমাজ বদল সম্পর্কে এঙ্গেলসের যে ধ্যানধারণা ছিল তা পরবর্তীকালে অনেকটাই পরিবর্তিত হয় কেননা বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের তত্ত্ব তখনো ভ্রূণ অবস্থায় রয়েছে। তবে এঙ্গেলস পুঁজিবাদ বিকাশের প্রাথমিক স্তরে পুঁজি সঞ্চয়ের প্রক্রিয়ায় নির্মম  শ্রমিক শোষণের যে চেহারা উন্মোচন করেছেন তা পুঁজিবাদের চরিত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা দেয়। মুনাফাই যে অর্থনৈতিক ব্যবস্থার চালিকাশক্তি সেই পুঁজিবাদী যন্ত্র সভ্যতার কদর্য রূপ এঙ্গেলস তার অসামান্য পর্যবেক্ষণ শক্তি, বিশ্লেষণ ক্ষমতা এবং শ্রমজীবী মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা ও অপরিসীম মমত্ববোধের সাহায্যে ফুটিয়ে তুলেছেন। ১৮৬৩ সালে 'ডাস ক্যাপিটাল ' লেখার সময় এঙ্গেলসের এই বইয়ের প্রসঙ্গ  উল্লেখ করে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন কার্ল মার্কস।  তিনি এঙ্গেলসকে লেখা একটি চিঠিতে লেখেন , “What power, what incisiveness and what passion drove you to work in those days. […] Those were the days when you made the reader feel that your theories would become hard facts if not tomorrow then at any rate on the day after.”২৭। এঙ্গেলসের সাথে মার্কসের সংযোগের পর শ্রমজীবি মানুষের আন্দোলন কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো প্রকাশের মাধ্যমে সুস্পষ্ট দিক্‌নির্দেশ লাভ করে। পরবর্তীকালে কার্ল মার্কস 'ডাস ক্যাপিটাল'-এ পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থার যথাযথ ব্যবচ্ছেদ করে মুক্তিকামী সর্বহারাকে মতাদর্শগতভাবে আরো সমৃদ্ধ করেন।

'দ্য কন্ডিশন অব দ্য ওয়ার্কিং ক্লাস ইন ইংল্যান্ড ' প্রকাশের পর পৌনে দুশো বছরেরও বেশি সময় অতিক্রান্ত হলেও তার প্রাসঙ্গিকতা এখনও অম্লান কেননা পুঁজিবাদী শোষণের চরিত্র সম্পর্কে এঙ্গেলস যে বিশ্লেষণ করেছিলেন তার যাথার্থ্য প্রতি মুহুর্তে প্রমাণিত হচ্ছে।পুঁজিবাদী সভ্যতায় নগর পরিকল্পনা থেকে শুরু করে সর্বক্ষেত্রে মুনাফা অর্জনের তাগিদ ও বুর্জোয়াদের আধিপত্য সুনিশ্চিত করার যে বাসনা প্রতিফলিত হয় তার কোন পরিবর্তন বিগত দু'শতকে ঘটেনি আর কখনও ঘটবেনা কেননা তা পুঁজিবাদের অন্তর্নিহিত বৈশিষ্ট্য। বিশেষ করে কোভিড মহামারীর সময়কালে মেহনতী মানুষের বঞ্চনার যে নগ্ন বাস্তবতা ও তার বিপরীতে পুঁজির বিপুল কেন্দ্রীভবন ঘটেছে বিশ্বজুড়ে তাতে পুঁজির লুঠেরা চরিত্র আরো স্পষ্ট হয়েছে। সোভিয়েত ইউনিয়নে সমাজতন্ত্রের বিপর্যয়ের পর বিগত তিন দশকের বেশি সময় ধরে পৃথিবীর অধিকাংশ দেশে অর্থনৈতিক বৈষম্য ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে। ভারতের মত বিভিন্ন দেশে ক্রমশ বাড়ছে অভুক্ত, অর্ধভুক্ত মানুষের সংখ্যা। অপুষ্টির শিকার হয়ে রক্তাল্পতায় ভুগছে বিপুল অংশের নারী, উচ্চতা কমে যাচ্ছে গরিব শিশুদের। ক্রমশ বুর্জোয়াদের শ্রেণি শাসন নয়া উদারবাদের হাত ধরে আরো নগ্ন ও  নির্মম হয়ে উঠছে। কল্যাণকর রাষ্ট্রের মুখোশ খুলে ফেলে পুঁজি এখন সর্বগ্রাসী। আমাদের দেশে কৃষি আইন ও শ্রম আইন পরিবর্তন করে যেভাবে ধান্দার ধনতন্ত্রকে অবাধ লুঠের সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে, আইন করে মেহনতী মানুষের অর্জিত অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে তাতে এঙ্গেলসের বোঝাপড়ার সত্যতাই প্রমাণিত হয়। এঙ্গেলস তখন দেখিয়েছিলেন যে বুর্জোয়ারা সর্বত্র মুক্ত বাজার অর্থনীতির নিয়ম চালু করতে চায় আর রাষ্ট্রকে ব্যবহার করতে চায় নিজেদের শ্রেণিস্বার্থ রক্ষা ও শ্রমজীবীদের দমন করতে। সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়নের যুগে পুঁজিবাদের এই দৃষ্টিভঙ্গী প্রতি মুহুর্তে প্রতিফলিত হচ্ছে। পুঁজিবাদের আগ্রাসন এবং তার রক্ষাকর্তা রাষ্ট্রের  হিংস্রতা যেভাবে  বৃদ্ধি পাচ্ছে সেখানে একথা আরো বেশি ভাবে প্রমাণিত যে শ্রমিকশ্রেণির প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ছাড়া এই শোষণের শৃঙ্খল চূর্ণ করা যাবে না। তাই শ্রেণি সংগ্রামের মাধ্যমে পুঁজিবাদকে উৎখাত করে শোষণহীন সমাজ গড়া যাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য তাদের কাছে এঙ্গেলসের এই সৃষ্টি  এক অত্যন্ত শক্তিশালী হাতিয়ার।

সূত্র:
২২. দ্য কন্ডিশন অব দ্য ওয়ার্কিং ক্লাস ইন ইংল্যান্ড, পৃ ১৫৮
২৩. ঐ, পৃ ১৭১
২৪. ঐ, পৃ ১৭৩
২৫. ঐ, পৃ ১৯৪
২৬. Introduction, The Condition of the Working Class in England,  পৃ ১৩-১৪
২৭.  Karl Marx to Friedrich Engels, April 9, 1863, in Gesamtausgabe, Part III, Vol. 3, 138.


প্রকাশের তারিখ: ০১-ডিসেম্বর-২০২৩

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org