|
আবাসনের উচ্চবিত্তায়ন এবং উচ্ছেদের বিরুদ্ধে আন্দোলন মাদ্রিদ ও বার্সেলোনার একটি রিপোর্টওয়েব ডেস্ক মার্কসবাদী পথ |
|
২০২৬ এর ২ সেপ্টেম্বর ম্যারিকারমেন অ্যাবাস্কালকে গায়ের জোরে বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করে স্পেনের পুলিশ। ৮৭ বছরের বৃদ্ধা। প্রতিবন্ধী। অনেক দিন ধরেই তাঁর মাদ্রিদের ভাড়া বাড়ি নিয়ে মামলা চলছিল আরবাজেসন কোম্পানির সঙ্গে। ৭০ বছর ধরে ওই ভাড়াবাড়িতে বাস করছিলেন তিনি। তবে শেষবার ভাড়া এতটাই বাড়ানো হয় যে তিনি তা মেটাতে পারেননি। এই ঘটনার প্রতিবাদে ওই দিনই ১০ হাজার মানুষ রাস্তায় নামেন। তিন দিন পর আরও বড় আকারে বিক্ষোভকারীরা পথে নেমে মাদ্রিদের পুয়ের্তা দেল সল স্কোয়ারে একটি শিবির তৈরি করে বসে পড়েন। এই জায়গাতেই ২০১১ সালে গড়ে উঠেছিল ১৫ এম মুভমেন্ট। সেটাই ছিল আমেরিকার অকুপাই আন্দোলনের আসল উৎস। উচ্ছেদের মানসিক অভিঘাত সইতে না পেরে ম্যারিকারমেন অ্যাবাসস্ক্যালের মৃত্যু হয় ৭ অক্টোবর। এরপর আইবেরিয়ান পেনিনসুলা জুড়ে শহরের পর শহরে শিবির গড়ে রাস্তায় বসে পড়েন প্রতিবাদীরা। তাঁরা সবাই মিলে ১১ নভেন্বর সাধারণ ধর্মঘটের ডাক দিয়েছেন। স্পেনে আবাসন আন্দোলনের ইতিহাস দীর্ঘদিনের। যে কোনও পর্বকেই ধরা যাক না কেন, সবক্ষেত্রেই আন্দোলনের নানান পূর্বনজির রয়েছে। ফলে আজ যা ঘটছে তাকে যদি আমরা বুঝতে চাই তাহলে সেটা নির্ভর করবে আমরা কীভাবে শুরু করব তার ওপর। মনে রাখতে হবে আন্দোলনের ইতিহাস এখনও রচিত হয়ে চলেছে রাস্তায় রাস্তায়। আমরা শুরু করতে পারি এম ১৫ আন্দোলন দিয়ে। এই আন্দোলন শুরু হয়েছিল দেড় দশক আগে। সেটা ছিল ২০১১ সালে বিশ্বজুড়ে ঘটে চলা অভ্যুত্থানের অংশ। তখনও স্পেন জুড়ে গড়ে উঠেছিল অসংখ্য শিবির এবং মানুষ তখন প্রকৃত গণতন্ত্রের দাবিতে সোচ্চার হয়েছিলেন। এখনও ঠিক তেমনটাই ঘটছে। তবে স্পেনে এম ১৫ আন্দোলন নিষ্ফলা ভাবে শেষ হয়নি। এই আন্দোলন থেকে উঠে এসেছিল বেশ কয়েকটি অতি-বাম রাজনৈতিক দল যার মধ্যে ছিল পোডেমোস পার্টি। একইসঙ্গে মাদ্রিদ, বার্সেলোনা সহ অন্য শহরগুলিতে গড়ে উঠেছিল পুরসভাবাদী বা মিউনিসিপ্যালিস্ট আন্দোলন। এখন এই দলগুলি মৃতপ্রায়। মিউনিসিপ্যালবাদীদের শক্তিরও ক্ষয় হয়েছে। চূড়ান্ত অর্থে, অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট এবং আরব বসন্তের মতো, এই সব আন্দোলনের সত্যিকারের ঐতিহ্য যে কী তা অস্পষ্টই রয়ে গেছে, রয়েছে এগুলিকে ঘিরে নানা মতপার্থক্যও। এসব নিয়ে নানান ব্যাখ্যাও করা যায়। বস্তুত আমাদের গল্পের শুরুটা এম ১৫ আন্দোলন নয়, বরং এম ১৫ আন্দোলন হল সেই ধ্বংসস্তূপ যেখান থেকে এখনকার গল্পটা উঠে এসেছে। এখন স্পেন জুড়ে যে আন্দোলন ঢেউয়ের মতো ছড়িয়ে পড়ছে, তার পিছনে রয়েছে একটা জোরালে, স্থায়ী ইউনিয়ন ধরনের সংগঠন। এখানকার রাজনৈতিক জীবনে যে স্বীকৃত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অস্তিত্ব রয়েছে এবং জনজীবনে যার প্রভাব রয়েছে, স্থায়ী ইউনিয়ন ধরনের সংগঠনগুলি তার থেকে আলাদাভাবে কাজ করে। এই সংগঠনগুলি গড়ে তোলাই হয়েছিল আবাসন সমস্যা মোকাবিলার জন্য। এজন্য ব্যবহার করা হয়েছিল তৃণমূল ও অনুভূমিক স্তরের ক্ষমতাকে। একই সঙ্গে জোর দেওয়া হয়েছিল লোকজনদের বিপুল জমায়েতের ওপর যেমন আমরা আজকের দিনে দেখছি। এই ইউনিয়নগুলি একেবারে নতুন এই অর্থে যে, এগুলি সরাসরি কাজের ইস্যুতে নিজেদের জড়ায় না। বরং যে পরিস্থিতির মধ্যে আমরা বাঁচি এই সংগঠনগুলি সে সব নিয়ে কাজ করে। এই আন্দোলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পূর্বসূরী হল পিএএইচএ-র মতো সংগঠনের সৃষ্টি (প্লাটফর্ম ফর পিপল অ্যাফেক্টেড বাই মর্টগেজেস)। এটা প্রথম গড়ে ওঠে ২০০৯ সালে বার্সেলোনায়। সম্প্রতি আরও যে সব হাউজিং সংস্থা গড়ে উঠেছে তাদের মতোই পিএএইচ গ্রুপ চর্চা করে সেই জিনিসটার যাকে আমরা বলি ‘সোশাল ইউনিয়নিজম’। এই আন্দোলনের মূল যুক্তিটা খুবই সহজ: ধরা যাক, একজন বাড়ি থেকে উচ্ছেদের ভয়ে রয়েছেন। সেটা তার ব্যক্তিগত সমস্যা। সেই ব্যক্তিগত সমস্যাটাকেই ভাগ করে নেওয়া রাজনৈতিক অ্যাকশন মারফৎ একটা যৌথ ইস্যুতে রূপান্তরিত করাটা হল এই আন্দোলনের কাজ। এর দরুন নানা ধরনের ইউনিয়ন ধাঁচের কৌশল খুব তাড়াতাড়ি সামনে আসতে শুরু করল। পরিণতিতে অনেকগুলি আশু উচ্ছেদ আটকে দেওয়া গেল। বিষয়টা এরকম। একজন ভাড়াটের উচ্ছেদ আটকাতে ৩০ জন বা তার বেশি লোকেদের একটা দল খুব ভোরে মাদ্রিদের ঐতিহাসিক সিটি সেন্টারের একটি অ্যাপার্টমেন্টের সামনে জড়ো হলেন। সকলে পরস্পরকে হাতে হাত বেঁধে জড়িয়ে ধরে রইলেন। ভিড় করে বসে পড়লেন বাড়ির দরজার সামনে। ইতিমধ্যে কয়েক ভ্যান রায়ট পুলিশ এসে কাছাকাছি দাঁড়িয়ে পড়ল। পুলিশ মাইকে বলল ভিড় সরিয়ে নিতে। তবে সেকথা শুনে কেউই নড়লেন না। এরপর পুলিশ এসে একে একে সকলকে সরাতে শুরু করবে। চলল ধাক্কাধাক্কি । এসবের শেষে পুলিস একে একে সবাইকে সরিয়ে দেবে। শেষ পর্যন্ত অবশ্য উচ্ছেদ হবে। তবে তা করতে হলে দরকার হবে কয়েক ডজন পুলিস ও কয়েক ঘণ্টা সময়। এতে উচ্ছেদের গতিও কমবে। উচ্ছেদের জন্য খরচও বেশি হবে। ফলে উচ্ছেদ করাটাই বেশ কঠিন হয়ে পড়বে। যারা উচ্ছেদে বাধা দিলেন তারা ওই পাড়ারই টেনান্টস অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য। সব মিটে গেলে তাঁরা যে যার বাড়ি চলে যাবেন। তবে পরের মিটিংয়ে খুব শিগগিরই তাঁদের দেখা হবে। সেখানে আলোচনা হবে উচ্ছেদে বাধা দেওয়ার বিষয়টা কেমন হয়েছে, এবং পরের উচ্ছেদে বাধা দেওয়ার পরিকল্পনা করা হবে। মাঝে মাঝে এই সগঠনের লোকেরা এক জায়গায় জড়ো হবেন, কোনও প্লাজা বা রাস্তায় গোল করে চেয়ার সাজিয়ে বসবেন, সেখানে পাড়ার লোকেদের ডাকা হবে, তাঁদের বলতে বলা হবে বাড়িওয়ালার সঙ্গে তাঁদের সমস্যা কিছু আছে কিনা, জানাবেন তাঁদের সমস্যাটা আরও বড় কিনা। এই জমায়েতে আসেন বয়স্ক ও তরুণ, উভয়েই। এর মধ্যে থাকেন অনেক রাডিক্যাল যাদের নানান সামাজিক আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কারণে ভাবনার গভীরতা আছে। অন্যেরা আসবেন স্রেফ এই কারণে যে তাঁরা কাছেই থাকেন। তাঁরা চান না যে তাঁদের প্রতিবেশীদের বাড়িওয়ালা উচ্ছেদ করে দিক। বার্সেলোনার কথাই ধরা যাক। সোশালিস্ট সরকারই জনগণের ব্যবহারের একটা পরিসর কেড়ে নিতে চাইল। সেটা প্রতিরোধের ডাক দেওয়া হল। সময়টা ছিল ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসের শীতার্ত একটি দিন। ওই জায়গাটায় এলাকার লোকেরা দেখা করতেন, একটা জিম চালু করা হয়েছিল, ছিল লাইব্রেরিও। জায়গাটা ছিল পর্যটক অঞ্চলের কাছে। তাই সরকার জায়গাটা কেড়ে নিতে চাইছিল। ওই জায়গায় আগে ছিল একটা আর্ট স্কুল, লা অ্যান্টিগা মাসানা। সেই নামেই তৈরি হল আন্দোলনের ব্যানার। উচ্ছেদ রুখতে পর পর বিক্ষোভের ডাক দেওয়া হল। একদিন সকালে পুলিশ এসে বিনা নোটিশে ওই জায়গাটায় তালা লাগিয়ে দিল। ওই দিন বিকেলেই বাড়িটা দখল করার জন্য লোকেরা জমায়েত হলেন। রাস্তা আটকে দাঁড়াল অনেক পুলিস। এতেই গোটা এলাকাজুড়ে পুলিশের সঙ্গে শুরু হয়ে গেল রাস্তার লড়াই। আগুন লাাগানো হল। রঙিন মশাল জ্বলে উঠল। বেশি রাতের দিকে লড়াই থেকে পিছু হঠে বিক্ষোভকারীরা ফিরে গেলেন। এভাবে জড়ো হওয়ার আরও একটা জায়গা হাতছাড়া হল। বার্সেলোনা আর বসবাসের শহর থাকছিল না, হয়ে উঠছিল শপিং আর ট্যুরিজমের শহর। আর এভাবে গেড়ে বসছিল পুঁজি। এখন উচ্ছেদ বিরোধী জমায়েতের দৃশ্য আরও ঘন ঘন স্পেনজুড়ে আরও বেশি করে ফিরে আসছে। যদি কেউ সকালে হাঁটতে বেরিয়ে পাঁউরুটি কিনতে যান তাহলে অপ্রত্যাশিত ভাবে তাঁর চোখে পড়ে যাবে উচ্ছেদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের দৃশ্য। এগুলো এখন দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠছে। স্পেনের রিয়েল এস্টেটের বাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে ২০০৮ সালে। ফলে এতদিন যে সমস্যার ওপর দাঁড়িয়ে হাউজিং সংগঠনগুলি কাজ করছিল তা বদলে যায়। আগে আবাসন সংক্রান্ত ঝামেলাগুলির মূলে ছিল মর্টগেজ এগ্রিমেন্ট। পরে আইনে পরিবর্তন এবং তার জেরে সম্পত্তির কাঠামোয় পরিবর্তন হয়। তখন মর্টগেজ চুক্তির বদলে ভাড়া নিয়ে সংঘাতই একেবারে সামনে চলে আসে। ২০১৭ সালে মাদ্রিদ ও ক্যাটালোনিয়ায় যারা বাড়ি ভাড়া নিয়েছেন তাদের ইউনিয়ন গড়ে ওঠে। সেই সময়ই গড়ে ওঠে অসংখ্য হাউজিং গ্রুপ। তাদের মধ্যে নানা পার্থক্যও ছিল। এই সব ইউনিয়নগুলি নতুন সাংগঠনিক কৌশল কাজে লাগাল। যেমন গোটা অ্যাপার্টমেন্টের এবং গোটা পাড়ার বাসিন্দাদের এক জায়গায় জমায়েত করা হল। ইউনিয়নগুলি বিভিন্ন লোকের কাছে আমন্ত্রণ জানাল সদস্য হওয়ার জন্য। রাডিক্যাল সোশাল সেন্টার, বইয়ের দোকান, জনসাধারণের জন্য নির্দিষ্ট পরিসরে বৈঠক ডেকে তাদের যোগ দিতে বলা হল। এখন যে প্রতিটি ব্লকে প্রতিটি উচ্ছেদের বিরুদ্ধে বাধার পর বাধা দেওয়ার ঘটনা ঘটছে, অর্থাৎ সাম্প্রতিক সময়ের যে সামাজিক বিস্ফোরণ আমরা দেখতে পাচ্ছি, তা গত কয়েক বছর ধরে ধৈর্য ধরে কাজ করে যাওয়ার ফসল। আসলে এমন একটা ইস্যুকে ধরা হযেছিল যাকে ঘিরে, আগে হোক বা পরে, বিস্ফোরণ ঘটতই। এখন আবাসন সমস্যাকে ঘিরে আমরা যে বড় বড় জমায়েত দেখছি সেটাকে বোঝা যাবে না যদি না আমরা এই সব তৃণমূল স্তরের সংগঠনগুলির উপস্থিতিকে দেখতে পাই। এগুলো হল সামাজিক আন্দোলনের কর্মীদের নেওয়া পরিকল্পিত রাজনৈতিক কৌশলের ফল— বিশেষ করে সেই সব কর্মীদের নেওয়া কৌশল যারা এসেছিলেন স্বশাসিত, উদারবাদী কিংবা কমিউনিস্ট ধারা থেকে। এরা কাজ করেন প্রথাসিদ্ধ প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর বাইরে যে কাঠামোগুলি এখন মৃত। জমায়েতের সাম্প্রতিক বৃত্তটা শুরু হয়েছিল খুব সম্ভবত মাদ্রিদে ১৩ অক্টোবর, ২০২৪ সালের বিশাল জমায়েত থেকে। সেই জমায়েতের শ্লোগান ছিল, ‘অনেক হয়েছে। এখন ভাড়া কমাতে পথে নামতে হবে।’ তখন জমায়েতটা এত বিশাল ছিল যে তাতে অনেকে অবাক হয়ে গিয়েছিলেন, এমনকী সংগঠকেরা নিজেরাও। তখন থেকেই আরও অনেক বড় জমায়েত হয়েছে। আবার বেশ কিছু বড় মাপের উচ্ছেদও হয়েছে। এই দুটি বিষয়ই এখনকার সামাজিক বিস্ফোরণের জমি তৈরি করে দিয়েছিল। এখন হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে আসছেন। কারও হাতে ব্যানার। কেউ বা রঙিন ধোয়ঁার মশাল জ্বালছেন। সেগুলো সন্ধের মুখে গোটা জমায়েতকে আলোকিত করে তুলছে এবং তা দেখে জনতা উল্লাসে চিৎকার করে উঠছে। প্রায়ই লোকেরা তাঁদের পকেট থেকে বাড়ির চাবি বের করে মাথার ওপরে তুলে ধরে দোলাচ্ছেন। এখন বাড়ির চাবিই হয়ে উঠেছে আন্দোলনের প্রতীক। চাবির সঙ্গে চাবি, ধাতুর সঙ্গে ধাতু ঘষা খেয়ে এক উচ্চকিত শব্দতরঙ্গ সৃষ্টি করে চলেছে। মাঝে মাঝে ভিড়ের মধ্যে থেকে বেরিয়ে আসছে ছোট ছোট দল। তাদের হাতে চৌকো কার্ডবোর্ড এবং স্প্রে পেন্টের ক্যান। তাঁরা তাতে স্লোগানে লিখে ভরিয়ে তুলছেন বাসস্টপ, ব্যাঙ্কের দেওয়াল এবং শহরের দেওয়ালগুলি। তাঁরা লিখছেন, টাকার কুমির ‘শকুনিদের’ বিরুদ্ধে স্লোগান। কারণ তারাই হাউজিংএর বাজারে শিকার ধরতে নেমে পড়েছে। এতে লোকেদের মধ্যে এই চেতনা জাগছে েয, এই আন্দোলনটা আরও বড় হতে পারে, আরও বেশি শক্তি নিয়ে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। আমাদের মতো সমাজে অর্থনৈতিক উৎপাদনের হার আপেক্ষিকভাবে কম। এই সমাজে হাউজিং মার্কেটের মতো ফিনান্সের বাজার থেকেই পুঁজি মুনাফা শুষে নিতে চায়। এই বিষয়টা একটা পরিকল্পিত ব্যবস্থার মতো, সারা বিশ্বের লোকজন তাদের দৈনন্দিন জীবনে এই চাপ অনুভব করতে পারেন। তবে চাপটা নানা চেহারায় আসে। যেহেতু পাড়াটাই বদলে যাচ্ছে তাই অনেকে বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন কারণ বাড়তি বাড়িভাড়া দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে আয়ের বড় অংশ চলে যাচ্ছে বাড়ি ভাড়া মেটাতে। অনেক দেশেই আমাদের মতো স্থানীয় হাউজিং ইউনিয়ন গড়ে উঠছে। এর কারণ হল, পুঁজি যেখানে যাবে সেখানে অনিবার্যভাবে সঙ্ঘাত দেখা দেবেই। এর সবকিছু বোঝা যায় জনগণের দৈনন্দিন জীবনে। সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ আরও অনেক ইস্যু রয়েছে। সেসবেরও পিছনের কারণ হল পুঁজিবাদ। তবে সেটা হয়ত তত সরাসরি মানুষের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার সঙ্গে জড়িত নয়। যেমন খাদ্যপণ্যের বেড়ে চলা দাম। সেটা ঘটছে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে চলা যুদ্ধের কারণে। কিন্তু যদি আপনাকে নিজের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ হতে হয় কিংবা আপনি যদি দেখেন আপনার প্রতিবেশী উচ্ছেদ হয়ে যাচ্ছেন, সেটা স্পষ্টভাবে অনুভব করা যায়। কারণ এগুলির তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া আছে যেগুলোকে ধরতে ছুঁতে পারা যায়। এই সব ঘটনায় দোষী কারা তাও সহজে চিহ্নিত করা যায়। সবাই জানে পুলিসই শারীরিকভাবে বাড়ি থেকে ভাড়াটেদের উচ্ছেদ করে। তবে পুলিস এটা করতে পারে আবাসন কোম্পানি বা বাড়িওয়ালাদের ইচ্ছায় এবং বিচারকদের নির্দেশের ভিত্তিতে। সুতরাং এরাও দোষী। এমনকী যে আইনি কাঠামোয় উচ্ছেদ করা সম্ভব হয় সেই কাঠামো যে রাজনীতিকরা তৈরি করেছে তারাও সমান অপরাধী। এখানে আসল েয সফলতা মিলেছে তা হল উচ্ছেদের সমস্যাকে সামাজিক ও রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত করা গেছে হাউজিং সংগঠন এবং রাজনৈতিক নেটওয়ার্কের সাহায্যে। এক্ষেত্রে ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ হল আবাসনের জন্য লড়াইকে অন্য লড়াইগুলির সঙ্গে এবং সাধারণ মানুষের অন্যান্য সমস্যাগুলির সঙ্গে যুক্ত করা। তবে এই লক্ষ্যে কাজ অনেকটাই এগিয়েছে। তুমুল এই উত্তেজনায় ভরা সময়ে আমাদের রাজনৈতিক চালচিত্র একেবারে উল্টে গেছে। গভীর আনন্দের সঙ্গে আমরা এই পরিবর্তনকে স্বাগত জানাচ্ছি, এবং এটা আমাদের আরো কঠোর লড়াইয়ে নামার কাজে প্রেরণা দিচ্ছে। কিছুদিন আগেও আমরা দেখছিলাম আপেক্ষিক নিষ্ক্রিয়তার একটি পর্ব। তখন অসহায় ভাবে দেখছিলাম স্পেনে, এমনকী গোটা ইউরোপে, ফ্যাসিবাদ একটু একটু করে নিজের জায়গা তৈরি করে নিচ্ছে।এখন আমরা দেখছি এক বিরাট সামাজিক শক্তির উত্থান যা সবকিছু বদলে দিতে চায়। হঠাৎ করেই আমরা প্রস্তুত হচ্ছি সাধারণ ধর্মঘটের জন্য, যে ধর্মঘট গত এক দশকে স্পেনে হয়নি। তবে যে পরিস্থিতিতে এই ধর্মঘট হবে বলে আমরা আশা করেিছলাম পরিস্থিতি তেমনটা নয়। আবাসন ক্ষেত্রে রিলিফ দিতে ব্যর্থ হওয়ার পর পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়া হয়েছে। এরপর নির্বাচন হবে ২৯ নভেম্বর। সেই নির্বাচনকে প্রগতিশীল মিডিয়া ও বাম দলগুলি আবাসন বিষয়ে জাতীয় গণভোটে পরিণত করার চেষ্টা করবে। দক্ষিণপন্থীরাও পরিস্থিতির সুযোগ নিতে চাইবে এবং তারা দেখাতে চাইবে শিবির গড়ে আন্দোলন এবং সরকার— এ দুটো হল একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ। ক্ষমতাসীন সোশালিস্ট পিওএসই পার্টিও (Partido Socialista Obrero Español, PSOE) তাদের তাস খেলছে। সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভকে তারাও কাজে লাগাতে চাইছে। নির্বাচনের পর আবারও যদি সোশালিস্টরা ক্ষমতায় ফেরে কিংবা বাম অথবা দক্ষিণ যারাই ক্ষমতায় আসুক, রাস্তার বিরোধিতা কিন্তু থামবে না। এই বিরোধিতা শুধুমাত্র ফ্যাসিবাদ কিংবা রাষ্ট্রের ব্যর্থতার বিরুদ্ধে নয়, এই আন্দোলন একটা স্বশাসিত শক্তি যারা আমাদের শ্রেণির জাগতিক উন্নতি চায়। ভাড়াটেদের সংগঠন আরও বিকশিত হচ্ছে এবং বাড়ছে, সংগঠিত হচ্ছে প্রতিটি এলাকায়, নিয়মিত জনসভা হচ্ছে, এবং নতুন নতুন কৌশলের কথা ভাবা হচ্ছে। এই সব ইউনিয়নে বিভিন্ন রাজনৈতিক ধারার লোকেরা রয়েছেন, রয়েছেন সোশালিস্ট ইয়ুথ গ্রুপ, স্বাধীন রাজনৈতিক দল, আছেন অ্যানার্কিস্টরা, এবং এমন লোকেরাও আছেন যাদের রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট নয়। দেশজুড়ে শিবির গড়ে বসে পড়ার বিষয়টা আরও ছড়াচ্ছে। তৈরি হচ্ছে যৌথ রান্নাঘর। গড়ে তোলা হচ্ছে খবরের কেন্দ্র যেখান থেকে নানান বিক্ষোভ ও কর্মসূচির খবর পাবেন সাধারণ মানুষ। এবং নানা ধরনের বৈঠক চলছে সারাদিন ধরেই। মাঝে মাঝে অতি দক্ষিণপন্থী ফ্যাসিস্টরা হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। এরপরেই শিবির রক্ষায় সংগঠিত করা হচ্ছে ফ্যাসিবিরোধী বিক্ষোভ। তবে শিবিরের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। এই সব শিবিরগুলি তৈরি করছে বিভিন্ন ধরনের সংগঠন। কিছু শিবির কয়েকদিন পরেই উঠে যাচ্ছে। এতই বোঝা যাচ্ছে শিবিরগুলির চরিত্র স্বশাসিত এবং অনুভূমিক ধরনের। মাদ্রিদে একটা শিবিরের লোকজন পুলিশকে হঠিয়ে দিয়ে উচ্ছেদ রুখে দেয়। এর পরেই গোটা স্পেন জুড়ে, বিশেষ করে বড় শহরগুলিতে, অবিশ্বাস্য রকমের বড় জমায়েত হয়। ‘আমরা ফ্যাসিবিরোধী’, ‘আ, আ্যান্টি, অ্যান্টিক্যাপিটালিস্টা’, ‘লং লিভ দ্য স্ট্রাগল অফ দ্য ওয়ার্কিং ক্লাস’, এধরনের শ্লোগান উঠে আসছে জমায়েতগুলি থেকে। এর মানে লড়াইটা ভাড়াটে উচ্ছেদের বিরুদ্ধে লড়াই থেকে বৃহত্তর সংগ্রামের পরিসরে পৌঁছচ্ছে। বার্সিলোনায় পুলিশের সঙ্গে সঙ্ঘাত বেধে যায় আন্দোলনকারীদের, এর জেরে শুরু হয়ে যায় রাস্তার লড়াই যা থেকে রাস্তায় রাস্তায় গড়ে ওঠে এমন জিনিসের ব্যারিকেড যেখানে আগুন লাগানো যায়। পিছু হঠার সময় আশপাশে জড়ো করা নির্মাণ সামগ্রী দিয়ে পুলিসকে পাল্টা আক্রমণ করেছে জনতা। সাধারণ ধর্মঘটকে সাধারণ মানু্য ব্যবহার করবেন এই আন্দোলনকে বৃহত্তর পরিসরে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য। আন্দোলনের তীব্রতাও বাড়বে। বিভিন্ন গ্রুপ যারা নিয়মিত পাড়া বৈঠকগুলি করছে উচ্ছেদ আটকাতে, তারাও প্রতিবেশীদের সঙ্গে মিলেমিশে প্রতিরোধ আরও বাড়াবে। ইউরোপ জুড়ে রাস্তায় রাস্তায় নতুন প্রাণের স্পন্দন দেখা দিচ্ছে। গোটা ফ্রান্স ছাত্র বিক্ষোভে উত্তাল এমন এক সরকারের বিরুদ্ধে যারা ছাত্রদের কার্যত পরিত্যাগ করেছে। বিক্ষোভ ছড়িয়েছে বেলজিয়ামেও। ইতালিতেও মানুষ রাস্তায় নামতে শুরু করেছেন। আগুনে পুড়েছে আলবানিয়ার শিক্ষা মন্ত্রক। আমাদের খেয়াল রাখতে হবে সাধারণ ধর্মঘট যেন সরকারের লেজুড়ে পরিণত না হয়। সাধারণ ধর্মঘটেই যেন সব শেষ না হয়ে যায়। ধর্মঘট যেন হয় আরও একটি অতিরিক্ত অধ্যায় যেখানে আমরা আগের সব সীমারেখা ছাপিয়ে যাব। [এমআর অনলাইনে-এ প্রকাশিত এই রিপোর্টটি এবছরের ১৫ অক্টোবর প্রথম প্রকাশিত হয় CrimethInc. ওয়েবসাইটে। স্পেনে উচ্ছেদ বিরোধী আন্দোলনকে বুঝতে সাহায্য করবে এই নিবন্ধটি। রিপোর্টের কিছু অংশের অনুবাদ প্রকাশিত হল। রিপোর্টটি তৈরি করেছেন ক্রাইমথিঙ্ক.এর মাদ্রিদ ও বার্সেলোনার প্রতিনিধিরা। — মার্কসবাদী পথ।] প্রকাশের তারিখ: ৩০-অক্টোবর-২০২৬ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |