|
নারায়ণ মূর্তির সত্তা আসলে পুঁজির সত্তাআর কারুমালাইয়ান |
মোদি সরকার কর্মঘন্টার লাগামছাড়া দীর্ঘায়নকে বৈধ করে দাসপ্রথার মতো এক ব্যবস্থাকে টিঁকিয়ে রেখেছে। প্রাথমিকভাবে চারটি শ্রম কোড বিলে আইনত সর্বোচ্চ কর্মঘন্টায় সীমা টানার মতো কিছুই ছিল না। এমনকী এই কোডগুলি প্রথম আইএলও কনভেনশন ০১ অনুযায়ী ধার্য বাধ্যতামূলক দৈনিক আট ঘন্টা কাজের মতো বুনিয়াদি মানবিক কাজের শর্তটিও নির্দিষ্ট করেনি, উপরন্তু সংশ্লিষ্ট সরকারগুলির উপর সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়টি ছেড়ে দিয়েছে। |
ইনফোসিসের সহ-প্রতিষ্ঠাতা, আইটি বিলিয়নেয়ার আর এন নারায়ণ মূর্তি, সম্প্রতি সাপ্তাহিক ৭০ ঘন্টা কাজের প্রস্তাব করেছেন, এবং ভারতীয় যুবসমাজকে পরামর্শ দিয়েছেন যে, উন্নয়নের গতিবৃদ্ধির জন্য ভারতের কাজের সংস্কৃতির পরিবর্তন প্রয়োজন। সত্তরের কোঠায় থাকা নয়া উদারবাদের এই পোস্টার বয় বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত কাজের ঘন্টা সংক্রান্ত শ্রমনীতির ঊর্ধ্বে উঠে কর্মঘন্টা বাড়ানোর পক্ষে এই প্রথমবার সওয়াল করছেন, এমনটা নয়। ২০২০ সালে নিজেই ইনি সাপ্তাহিক ৬০ ঘন্টা কাজের প্রস্তাব করেছিলেন। কর্মীদের উৎপাদনশীলতা নিয়ে এবং বিশ্ব-অর্থনীতিতে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে দেশের অর্থনৈতিক বৃদ্ধি নিয়ে নিজের ভিত্তিহীন বক্তব্যের জমিতে তিনি নিজের কাণ্ডজ্ঞানহীনতার ভিত গেঁথেছেন। এই বক্তব্য বস্তুত মোদি জমানার সবচেয়ে লজ্জাজনক নীতিরই প্রতিধ্বনি। তাঁর কাণ্ডজ্ঞানহীনতাকে বরং খতিয়ে দেখা যাক। নারায়ণ মূর্তি বলেছেন যে, 'বিশ্বের মধ্যে ভারতের কাজের উৎপাদনশীলতা সবচেয়ে কম'। তিনি এও বলেছেন যে, ভারতীয়দের শৃঙ্খলাবদ্ধ হতে হবে ও আমাদের কাজের উৎপাদনশীলতাকে উন্নত করতে হবে। এতে বিস্ময়ের কিছু নেই যে, তাঁর এসব মন্তব্য ভাইরাল হয়েছে। কাল বিলম্ব না করেই ওলা ক্যাব-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা ভাবীশ অগরওয়াল মূর্তির বক্তব্যকে সমর্থন করেছেন। এবং একইভাবে, বহুজাতিক সংস্থা জেএসডব্লু গ্রুপ-এর চেয়ারম্যান সজ্জন জিন্দালও মূর্তির প্রতি শ্রেণিসংহতি জানিয়েছেন। যদিও এই দেশগুলির আকার এবং প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে শিল্পায়নের গতির প্রেক্ষিতে যে কোনও তুলনা অর্থহীন এবং বৈজ্ঞানিকভাবে যুক্তিহীন হয়ে দাঁড়ায়; যেভাবে নারায়ণ মূর্তি আমাদের যুববয়সীদের উপর চাপ সৃষ্টি করছেন, তার পরিপ্রেক্ষিতে বলতে হয় যে, এমন কোনও প্রমাণ নেই যে গড় ভারতীয় কর্মীরা গড় জাপানিদের বা জার্মানদের তুলনায় অতীতে বা বর্তমানে অনেক কম কাজ করছেন। ১৯৭০ সালে, গড় ভারতীয় কর্মীরা বার্ষিক প্রায় ২,০৭৭ ঘন্টা কাজ করতেন, এবং এই সংখ্যা এখনও পর্যন্ত প্রায় একই রয়ে গেছে। ১৯৭০ সালে, জার্মান এবং জাপানি কর্মীরা যথাক্রমে ১,৯৪১ ঘন্টা এবং ২,১৩৭ ঘন্টা কাজ করতেন। ঊনিশশ’ ছয় থেকে আটের দশক পর্যন্ত, যখন জাপানের দ্রুত অর্থনৈতিক বৃদ্ধি হচ্ছিল, তখন সেখানকার বার্ষিক কর্মঘণ্টা ভারতের মতোই ছিল। ২০১৭ সালে, বার্ষিক কাজের সময় ভারতে ২,১১৭ ঘন্টা ছিল, এবং এই একই বছর জাপান এবং জার্মানিতে বার্ষিক কাজের ঘন্টা হয় যথাক্রমে ১,৭৩৮ ঘন্টা এবং ১,৩৫৪ ঘন্টা। নারায়ণ মূর্তি-র নজরে ভারত সরকারের প্রস্তুত করা ‘টাইম ইউজ ইন ইন্ডিয়া ২০১৯’-এর প্রতিবেদনের চমকপ্রদ উদ্ঘাটনটি আনা এক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক হবে। এই প্রতিবেদন সমসাময়িক পুঁজিবাদীদের অন্ধ, অপ্রতিরোধ্য আগ্রাসনকে, মার্কসের ভাষায়, উদ্বৃত্ত শ্রমের প্রতি তাদের নেকড়ের মতো খিদেকে উন্মোচিত করেছে। আইএলও-র পর্যবেক্ষণকে ছাপিয়ে যাওয়া এই প্রতিবেদন অনুসারে, ১৫ থেকে ৫৯ বছর বয়সী একজন ভারতীয় শহুরে পুরুষ কর্মী দৈনিক ৫২১ মিনিট এবং সাপ্তাহিক ৬০ ঘন্টা ৪৭ মিনিট সরাসরি কর্মক্ষেত্র ও সেই সংক্রান্ত কার্যকলাপে ব্যয় করেন। এটি আইনের নির্দিষ্ট করা সাপ্তাহিক ৪৮ ঘন্টা কাজের ধারণা ভেঙে দেয়। এই একটি তথ্যই কর্মদিবসের অমানবিক সম্প্রসারণের মাধ্যমে ভারতীয় শ্রমজীবী মানুষের উপর শাসক শ্রেণির বর্বর অত্যাচারের ছবিকে তুলে ধরে। উৎপাদনশীলতা প্রসঙ্গেও ভারত সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রকের বার্ষিক প্রতিবেদনে থাকা তথ্য, যা কি না সংসদে পেশ করা হয়েছিল, মূর্তির বক্তব্যকে সমর্থন করে না। প্রতিবেদন অনুসারে "২০০০ সাল থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে এশিয়ান প্রোডাক্টিভিটি অরগানাইজেশন (এপিও)-এর সদস্য দেশগুলির মধ্যে শ্রম উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি সবচেয়ে বেশি হয়েছে চীনে (৯.০%) তারপর ম্যাঙ্গোলিয়া (৫.৫%), ভারত (৫.২%), লাও পিডিআর (৪.৬%), কম্বোডিয়া (৪.৫%), ভিয়েতনাম (৪.৪%), শ্রীলঙ্কা (৪.১%) এবং ইন্দোনেশিয়া (৩.৫%)। এপিও-র ২০ টি সদস্য দেশের মধ্যে ভারত দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে”। এই সাপ্তাহিক ৭০ ঘন্টা শ্রমঘন্টার বিতর্কে আরেকটি প্রধান বিষয় হল, পেশাগত বিপদ এবং কর্মীদের স্বাস্থ্য এবং সুস্থতার উপর এর প্রভাব- অর্থাৎ কর্মীদের হিত এবং কর্মজীবনের ভারসাম্যের উপর প্রভাব। তথাকথিত মূলস্রোতের কর্পোরেট মিডিয়া এই বিষয়টি সুবিধামতো উপেক্ষা করে মুছে দিয়েছে; আর উদারবাদীদের কথা এক্ষেত্রে ছেড়ে দিন, তারা তো মূর্তি-দের মত নয়া উদারবাদীদের সঙ্গে সম্পূর্ণ সম্মত। এনভায়রনমেন্ট ইন্টারন্যাশনাল-এ প্রকাশিত ওয়ার্ল্ড হেলথ অরগানাইজেশন এবং ইন্টারন্যাশনাল লেবার অরগানাইজেশন-এর সর্বশেষ অনুমান অনুসারে, দীর্ঘ কর্মঘন্টার কারণে ২০১৬ সালে স্ট্রোক এবং ইস্কেমিক হার্টের রোগে আক্রান্ত হয়ে ৭,৪৫,০০০ জনের মৃত্যু হয়েছে, এবং এই মৃত্যু ২০০০ সাল থেকে ২৯ শতাংশ বেড়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করায় জীবন ও স্বাস্থ্যের খোয়ানোর ঘটনার প্রথম বিশ্বব্যাপী বিশ্লেষণে, ওয়ার্ল্ড হেলথ অরগানাইজেশন এবং ইন্টারন্যাশনাল লেবার অরগানাইজেশন অনুমান করেছে যে, ২০১৬ সালে, কমপক্ষে ৫৫ ঘন্টা কাজ করার ফলে ৩,৯৮,০০০ মানুষ স্ট্রোক-এ ও ৩,৪৭,০০০ মানুষ হৃদরোগে মারা গিয়েছিল। ২০০০ সাল থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে, এই দীর্ঘ সময় কাজ করার কারণে হৃদরোগে মৃত্যুর সংখ্যা ৪২% বৃদ্ধি পেয়েছে এবং স্ট্রোক-এর কারণে মৃত্যু বৃদ্ধি পেয়েছে ১৯%। এ কথা প্রমাণিত যে, সবচেয়ে বেশি পেশাগত ব্যাধির ঝুঁকি তৈরি হয় এই দীর্ঘ কর্মঘন্টার কারণে। জানা গেছে যে, পেশা সম্বন্ধীয় যাবতীয় ব্যাধির বোঝার এক তৃতীয়াংশ কারণ হল এই দীর্ঘ কর্মঘন্টা। এতে করে, দীর্ঘ কর্মঘন্টা মানুষের স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব বিস্তারকারী একটি পেশাগত ঝুঁকি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়, যার ফলে তুলনায় নতুন ও মনঃসামাজিক ঝুঁকির দিকে নজর পড়ে। উপরন্তু, দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করা মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে ও বর্তমানে তা গোটা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৯%। এই প্রবণতা আরও বিরাট সংখ্যক মানুষকে পেশা সম্বন্ধীয় অক্ষমতা এবং সময়ের আগেই মৃত্যুর মতো ঝুঁকির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অতএব দেখা যাচ্ছে, উপরোক্ত সব তথ্য কার্ল মার্কস-এর কথাকে স্পষ্টত প্রমাণ করে যে- পুঁজিবাদী উৎপাদন পদ্ধতি (মূলত উদ্বৃত্ত মূল্যের উৎপাদন এবং বিশোষণ) কর্মদিবসের সম্প্রসারণ করে উৎপাদন করে। কেবলমাত্র মানুষের শ্রমশক্তির স্বাভাবিক, নৈতিক ও শারীরিক বিকাশ এবং কার্যকারিতার রাহাজানি করে তার অবনতিই ঘটায় না, উপরন্তু শ্রমশক্তির শ্রান্তি এবং মৃত্যুকেও অকালে ডেকে আনে। মোদি সরকার কর্মঘন্টার লাগামছাড়া দীর্ঘায়নকে বৈধ করে দাসপ্রথার মতো এক ব্যবস্থাকে টিঁকিয়ে রেখেছে। প্রাথমিকভাবে চারটি শ্রম কোড বিলে আইনত সর্বোচ্চ কর্মঘন্টায় সীমা টানার মতো কিছুই ছিল না। এমনকী এই কোডগুলি প্রথম আইএলও কনভেনশন ০১ অনুযায়ী ধার্য বাধ্যতামূলক দৈনিক আট ঘন্টা কাজের মতো বুনিয়াদি মানবিক কাজের শর্তটিও নির্দিষ্ট করেনি, উপরন্তু সংশ্লিষ্ট সরকারগুলির উপর সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়টি ছেড়ে দিয়েছে। ট্রেড ইউনিয়নগুলির নিরন্তর হস্তক্ষেপ এবং আন্দোলনের ফলে, সরকার বাধ্য হয়ে কাজের সময় সম্পর্কে কিছু নির্দিষ্ট বিধি অন্তর্ভুক্ত করে; তবে এই বিধিগুলি শ্রমিকের অধিকার খর্ব করার লুক্কায়িত লক্ষ্য নিয়ে সমস্ত শর্তের প্রসারকে এবং মকুবকে অনুমোদন দিয়ে রেখেছে। মোদি সরকার সংশ্লিষ্ট সরকারগুলিকে, নিয়োগকর্তার পক্ষে, শ্রমিকের আট ঘন্টার কাজের ধারণার লঘুকরণের অনুমতি দিয়ে রেখেছে। ফ্যাক্টরিস অ্যাক্ট অনুযায়ী দৈনিক কর্মঘন্টা ছিল সাড়ে দশ ঘন্টা, এখন সেটি বেড়ে বারো ঘন্টা হয়েছে। মোদি সপ্তাহের প্রথম দিন, রবিবারকে ছুটির দিন হিসাবে বাদ দিয়ে রেখেছে, এবং ওকুপেশানাল সেফটি, হেলথ অ্যান্ড ওয়ার্কিং কনডিশনস কোড (ওএসএইচডব্লুসি) -এর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট সরকারগুলিকে শ্রমিকের অধিকার খর্ব করার অধিকার দান করেছে। উপরন্তু, কাজের সময়কে যতদূর সম্ভব বাড়ানোর প্রশ্নে, কুখ্যাত ওএসএইচডব্লু কোড-এ বলা হয়েছে যে, সংশ্লিষ্ট সরকার যেকোনও সীমা অবধি ওভারটাইমের মোট ঘন্টা নির্ধারণ করতে পারে। কেন্দ্রীয় খসড়া বিধি ত্রৈমাসিক ১২৫ ঘন্টা ওভারটাইমের অনুমতি দেয়। কিন্তু সরকার উক্ত কোড-এ, প্রতিষ্ঠানগুলির জন্য তাদের ইচ্ছামতো নিয়ম করার ব্যাপারে ছাড় রেখেছে এবং কোডটি পাশ হওয়া মাত্র, বহু রাজ্য সরকার দৈনিক কাজের সময় ১২ ঘন্টা বাড়ানোর জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছে, বিশেষত ভয়ানক অতিমারীর সময়ে। এ নিয়ে শ্রমিকেরা বিদ্রোহ করেন এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সরকারগুলি পিছিয়ে যায়। কর্ণাটকের গত দফার বিজেপি সরকার মূর্তির মতো মালিকদের তুষ্ট করতে বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগে দৈনিক ১২ ঘন্টা কাজের সময় বাড়ানোর জন্য একটি বিল পাশ করেছিল। একইভাবে তামিলনাড়ু সরকার দৈনিক ৮ ঘন্টা কাজ ও সেই সংক্রান্ত বিষয়ের বাধ্যবাধকতা থেকে যে কোনও কারখানা বা গোষ্ঠী বা শ্রেণিকে ব্যাপক হারে ছাড় দেওয়ার জন্য একটি বিল পাশ করেছিল। এবং তারপর রাজ্য জুড়ে ঐক্যবদ্ধ বিরোধিতার জেরে তা প্রত্যাহার করেছিল। মোদি ও কোম্পানির নেতৃত্বে সাম্প্রদায়িক উগ্র-দক্ষিণপন্থী শাসক যেহেতু নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে, ফলে নারায়ণ মূর্তির মতো কর্পোরেটদের উপর তাদের ফ্যাসিবাদী সম্মতি নির্মাণের লক্ষ্যকে রক্ষা করার দায়িত্ব ন্যস্ত করা হয়েছে। মার্কসের কথায়, নিজের হাড়-মাসসহ শ্রমশক্তির মালিক শ্রমিকের জীবনের দীর্ঘায়ুর পরোয়া পুঁজি মোটেই করে না। পুঁজির একমাত্র লক্ষ্য হল, প্রতিটি কর্মদিবসে সর্বাধিক শ্রমশক্তি নিষ্কাশন করে নেওয়া, আর শ্রমিকের আয়ুর হ্রাস ঘটিয়েই তা সম্ভব হয়। এই হল শ্রম ও পুঁজির সমসাময়িক সংগ্রামের মূল বিষয়। ভাষান্তর: উর্বা চৌধুরী প্রকাশের তারিখ: ২৪-নভেম্বর-২০২৩ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |