|
দ্বিমেরু রাজনীতির যুগ শেষ হতে চলেছে পশ্চিমবঙ্গেরতন খাসনবিশ |
দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়ে ওঠা লালঝাণ্ডার মিছিল আসলে এই ন্যারেটিভ বা ভাষ্যকেই ভাঙতে চায়। এই ন্যারেটিভ-কে না ভাঙলে পশ্চিমবঙ্গে যে কোনও সুস্থ রাজনীতি করা যাবে না, এটা বোঝা দরকার। এই ন্যারেটিভ ভাঙার জন্য মোদী-মমতার দ্বিমেরু রাজনীতি বর্জন করার স্পর্ধা দেখানোর দরকার ছিল। দীর্ঘতর হয়ে ওঠা লালঝাণ্ডার মিছিল ইঙ্গিত রাখছে, বাংলার সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ এই ন্যারেটিভ থেকে মুক্তি চান। পঞ্চায়েত, পৌরসভার ভোট থেকেই বোঝা যাচ্ছিল বিকল্প ন্যারেটিভের চিন্তা শ্রমজীবী মানুষের মনে ক্রমশ তার জায়গা করে নিচ্ছে। এখনও পর্যন্ত ঘটে যাওয়া পাঁচ দফা নির্বাচনে যেভাবে মানুষ ভোটযন্ত্রের ওপর লুম্পেনের অধিকার আটকে দিতে সক্ষম হয়েছেন, তাতে বোঝা যায় দ্বিমেরু রাজনীতির ন্যারেটিভ এরাজ্যে ক্রমশ তার গ্রহণযোগ্যতা হারাচ্ছে। রাজনীতির রঙ্গমঞ্চ তার প্রকৃত নায়ক-নায়িকার উপস্থিতির জন্য উন্মুখ হয়ে আছে। |
এক ক্লিকে ফলো করুন মার্কসবাদী পথের হোয়াটসঅ্যাপ মোদী ও দিদি রাজনীতির ভিন্নতা নিয়ে এরাজ্যের খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের মধ্যে কিছু বিভ্রান্তি ছিল। এই বিভ্রান্তি সযত্নে লালন-পোষণ করছিল ‘বিদ্বৎসমাজ’ কিংবা ‘প্রকৃত বাম’-এর ঝান্ডাধারীরা। এরাজ্যের তৃণমূল কংগ্রেস এবং কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের মত, পথ ও দর্শন যে এক ও অভিন্ন, এই দুই শাসকের গুণগত কোনও ফারাক যে নেই, নিয়ন্ত্রণের রাজনীতিতে উভয়পক্ষই যে সমান সিদ্ধহস্ত, রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা এবং স্বৈরাচারের মাপকাঠিতে উভয়েই যে উভয়ের দৃষ্টান্ত মাত্র, এবং সর্বোপরি দুর্নীতিতে একই বৃন্তে ফোটা দুই ফুলের মতোই যে রয়েছে তাদের অবস্থানগত পার্থক্য, এই স্পষ্ট, সত্য কথাটি স্বীকার করতে এঁদের কষ্ট হয়। অস্ত্রটির মূলে আছে অন্ধ বাম বিরোধিতা। আছে দলত্যাগের যন্ত্রণা। আর আছে আখের গোছানোর জান্তব প্রবৃত্তি। নন্দীগ্রামে গণহত্যা কারা ঘটিয়েছিল কিংবা তাপসী মালিকের প্রকৃত খুনি কে, এসব প্রশ্ন যত সামনে চলে আসছে, ততই এই ‘বুদ্ধিজীবীরা’ এবং ‘প্রকৃত বাম’রা আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন। সত্য উদঘাটনে এঁদের কী সমস্যা আছে? সমস্যা গভীর। বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে জনমত তীব্র হয়ে ওঠার সুযোগে এরাজ্যে যা ঘটে, এককথায় সেটি হল প্রতিবিপ্লবী অভ্যুত্থান। যে অভ্যুত্থানের সাফল্যে আহ্লাদিত হয়ে মার্কিন সেক্রেটারি অফ স্টেটস হিলারি ক্লিন্টন স্বয়ং কলকাতায় এসে প্রতিবিপ্লবের মহানেত্রীকে অভিনন্দন জানাতে মহাকরণে হাজির হয়েছিলেন। বুদ্ধিজীবীদের একটা বড় অংশ এবং বামফ্রন্ট বিরোধী বামপন্থীদের অপিরণামদর্শী নেতৃত্বের অবিমৃষ্যকারিতায় এই প্রতিবিপ্লব দ্রুত সামাজিক মান্যতা অর্জন করে। ইস্ট জর্জিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জাল ডিগ্রিধারী এক উচ্ছৃঙ্খল যুবনেত্রী ১৯৯৩ থেকে যাবতীয় নুইসেন্স আশ্রয় করেও যা ঘটাতে পারেননি, ২০০৭-০৮ সালে সেটাই ঘটল। এই উচ্ছৃঙ্খল, আগাগোড়া মিথ্যায় ভরা রাজনীতি, বিজেপি-র প্রশ্রয়ে ফুলেফেঁপে ওঠা এই ধোঁকাবাজির রাজনীতি, ক্রমশ জনমানসে একটা ন্যায্যতা অর্জন করল। এই রাজনীতির অভিঘাত রাজ্য রাজনীতির এতটাই গভীরে তার বিস্তার ঘটাতে পারল যে, এই নেত্রী যদি হাম্বা হাম্বা কবিতা লেখেন, নজরুলকে দিয়ে মহাভারত লিখিয়ে নেন, কিংবা সিধু-কানহু ডহরে গিয়ে ডহরবাবুর খোঁজ করেন, রাজ্যের মানুষ মুগ্ধদৃষ্টিতে তা তাকিয়ে দেখেন। ২০১১-র পরবর্তী পশ্চিমবঙ্গ এই জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছিল যে, মানুষ জব কার্ড ভাড়া খাটিয়ে পয়সা উপার্জন করেন, একটি সুশৃঙ্খল ব্যবস্থায় মিড ডে মিলের চাল তছরূপ করার শিক্ষা পান এবং গ্রামে গ্রামে এজেন্সি খোলেন যা দিয়ে শিক্ষকের কাজ জুটিয়ে দিয়ে রীতিমতো ভাল কমিশন আদায় করতে পারেন। ‘প্রকৃত বাম’রা সমাজের এই অধঃপতন উদাস দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করলেন। মোদী আসবার জুজু দেখিয়ে এক উদ্ধত ভাইপোকে এসকালেটর কেনার পয়সা জুটিয়ে দিলেন। এবং ১২০০ টাকার ভিক্ষা নিয়ে মানুষ যখন ধেই নৃত্য করে, তখন তাঁদের মার্কসবাদ জুটিয়ে দিল জনবাদী রাজনীতি-র নতুন ব্যাখ্যা। দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়ে ওঠা লালঝাণ্ডার মিছিল আসলে এই ন্যারেটিভ বা ভাষ্যকেই ভাঙতে চায়। এই ন্যারেটিভ-কে না ভাঙলে পশ্চিমবঙ্গে যে কোনও সুস্থ রাজনীতি করা যাবে না, এটা বোঝা দরকার। এই ন্যারেটিভ ভাঙার জন্য মোদী-মমতার দ্বিমেরু রাজনীতি বর্জন করার স্পর্ধা দেখানোর দরকার ছিল। দীর্ঘতর হয়ে ওঠা লালঝাণ্ডার মিছিল ইঙ্গিত রাখছে, বাংলার সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ এই ন্যারেটিভ থেকে মুক্তি চান। পঞ্চায়েত, পৌরসভার ভোট থেকেই বোঝা যাচ্ছিল বিকল্প ভাষ্যের চিন্তা শ্রমজীবী মানুষের মনে ক্রমশ তার জায়গা করে নিচ্ছে। এখনও পর্যন্ত ঘটে যাওয়া পাঁচ দফা নির্বাচনে যেভাবে মানুষ ভোটযন্ত্রের ওপর লুম্পেনের অধিকার আটকে দিতে সক্ষম হয়েছেন, তাতে বোঝা যায় দ্বিমেরু রাজনীতির ন্যারেটিভ এরাজ্যে ক্রমশ তার গ্রহণযোগ্যতা হারাচ্ছে। রাজনীতির রঙ্গমঞ্চ তার প্রকৃত নায়ক-নায়িকার উপস্থিতির জন্য উন্মুখ হয়ে আছে। ‘বুদ্ধিজীবী’রা কষ্ট পাবেন। ‘প্রকৃত বাম’রা মোদী বিরোধী লড়াইয়ের ধার কমিয়ে আনার অপরাধে ডিমিট্রভ খুলে মীনাক্ষি মুখার্জিদের গালমন্দ করবেন। কিন্তু হাম্বা হাম্বার সঙ্গে এই ‘বাম’ আর এই ‘বুদ্ধিজীবী’রা বাংলার রাজনীতিতে ক্রমশ পিছু হঠবেন। এক যুদ্ধে দ্বিমেরু রাজনীতির অবসান ঘটবে। আরেক যুদ্ধ প্রয়োজন হবে দুই বিষবৃক্ষই সমূলে উৎপাটন করে বাংলার রাজনীতি থেকে বিসর্জন দেওয়ার। ‘প্রকৃত বাম’-এর ক্ষতি হবে। অসুবিধায় পড়বেন সেই বুদ্ধিজীবীরা, যারা এখনও পর্যন্ত গিরগিটি চরিত্র অর্জনে যথেষ্ট দড় হয়ে ওঠেননি। এই লোকসভা নির্বাচনের ফল কী দাঁড়াবে, দিল্লিতে এই মহিলা আবার হাজির হয়ে ঘোঁট পাকাবেন কিনা, এসব এখনও স্পষ্ট নয়। এই মহিলা একবার নিজেকে ইন্ডিয়া জোটের বাইরে নিয়ে এসেছিলেন। চার দফা নির্বাচনের পরে ইনি আবার উল্টো সুর গাইতে শুরু করেছেন। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। প্রণব মুখার্জি যখন রাষ্ট্রপতি হন বাংলার তৃণমূল কংগ্রেস তাঁকে ভোট দেয়নি। নির্বাচনে জয়লাভের পরেই অবশ্য একটি রসগোল্লার হাঁড়ি হাতে নিয়ে এই মহিলা প্রণববাবুর দিল্লির বাড়িতে সবার আগে হাজির হয়ে যান। ইন্ডিয়া জোট দিল্লিতে সরকার গড়লে অন্তত ভাইপোকে বাঁচাবার স্বার্থে মহিলাটি তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান বদল করতে পারেন। নীতির ভিত্তিতে যাঁরা ইন্ডিয়া জোট করতে চান, তাঁদের বুঝতে হবে এই মহিলাকে সঙ্গে নিয়ে চলা এক ঝুঁকিবহুল কাজ। সামান্য সুযোগে বিজেপি-র হাত ধরবেন ইনি। কারণ আরএসএস মনে করে, বাম ও কংগ্রেসমুক্ত পশ্চিমবঙ্গ গড়ার জন্য এই মহিলা এখনও অপিরহার্য। ‘প্রকৃত বাম’রাও সম্ভবত সেটাই মনে করেন। বঙ্গ রাজনীতিতে এই কারণেই আরএসএসের সঙ্গে ‘প্রকৃত বাম’-এর পরিসরও কমিয়ে আনা দরকার। দ্বিমেরু রাজনীতির অবসানের পর পশ্চিমবঙ্গে যে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট গড়ে উঠবে, তার প্রেক্ষিতে এই কথাগুলির তাৎপর্য আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠবে, একথা মনে করার কারণ আছে। শুধু দ্বিমেরু রাজনীতির অবসান নয়, বাংলার রাজনীতি থেকে তৃণমূলী কালচারটি সবার আগে বিসর্জন দিতে হবে। ডিমিট্রভ দেখিয়ে লাভ নেই। তত্ত্ব ধূসর, জীবন চিরসবুজ। প্রকাশের তারিখ: ২৩-মে-২০২৪ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |