|
লক্ষ্য ‘বৃহত্তর ইজরায়েল’শান্তনু দে |
গত ক’মাসে এই তিনটি গোষ্ঠীকে নিশানা করে ইজরায়েল আসলে আঘাত হানতে চেয়েছে পশ্চিম এশিয়াতে ইরানের প্রভাবের ওপর। ইজরায়েলের যুদ্ধবাজ নেতারা মনে করছেন এতে হিজবুল্লা, হামাস, হুতিকে শেষ করে দেওয়া যাবে। আর এভাবে ইরানকে ‘বেআব্রু ও দুর্বল’ করা যাবে। নেতানিয়াহু আগেই ইরানে ‘জমানা বদলের’ ডাক দিয়েছিলেন। ‘পশ্চিম এশিয়ার রাজনৈতিক মানচিত্র পরিবর্তনের’ কথা বলছেন। এভাবেই পশ্চিম এশিয়ায় আধিপত্য বিস্তার করতে চাইছে ইজরায়েল। যা আসলে পূরণ করবে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থ। |
ইজরায়েলি নেতাদের দাবি, আত্মরক্ষার খাতিরেই ইরানে সাম্প্রতিক হামলা! যদিও, ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও আক্রমণের সময় নির্বাচন বলছে সম্পূর্ণ অন্য কথা। পশ্চিম এশিয়ায় শান্তি প্রতিষ্ঠায় ইজরায়েল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তরফে এটি আরেকটি অন্তর্ঘাত। আশু লক্ষ্য: পরমাণু-কূটনীতিকে ভেস্তে দেওয়া এবং প্রতিরোধ দমন। সেই সঙ্গেই, ইরানের জমানা বদল। মূল লক্ষ্য: তেল আভিভের বহুদিনের বিস্তারবাদী প্রকল্প– ‘বৃহত্তর ইজরায়েল’। পরমাণু চুক্তি নিয়ে ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যে যখন আলোচনা চলছে, তামাম বিশ্ব যখন কিছুটা হলেও আশার আলো দেখছে, তখন ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলিতে ইজরায়েলের এই একতরফা হামলা অবৈধ, বেপরোয়া এবং বিপজ্জনক। আলোচনার মাধ্যমে পারমাণবিক সমস্যা সমাধানের কোনও সম্ভাবনা যদি থেকেও থাকত, তাকে কার্যত শেষ করে দিয়েছে ইজরায়েল। রবিবারই ওমানের রাজধানী ম্যাসকটে বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। তার আটচল্লিশ ঘণ্টা আগে শুক্রবার এই হামলা। সংবাদ সংস্থা রয়টার্স-কে মার্কিন রাষ্ট্রপতি ট্রাম্প জানিয়েছেন, ‘এই হামলার বিষয়ে আমরা আগেই জানতাম। বড় রকমের ক্ষয়ক্ষতি এড়ানোর জন্য ইরানকে আমি পরামর্শও দিয়েছিলাম। তবে ওরা আমার কথামতো চুক্তিতে রাজি হয়নি।’ ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুও ফক্স নিউজ-কে বলেছেন, ইরানে সামরিক অভিযানের কথা তিনি মার্কিন রাষ্ট্রপতিকে আগেই জানিয়েছিলেন। বর্তমান মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে সহযোগিতার সম্পর্ককে ‘নজিরবিহীন’ বলে বর্ণনা করে যোগ করেছেন, ‘প্রতিটি তথ্যের খুঁটিনাটি’ তেল আভিভ ভাগ করে নিচ্ছে ওয়াশিংটনের সঙ্গে। বুঝতে এতটুকুুও অসুবিধা হয় না, আলোচনার প্রশ্নে কতটা আন্তরিক ছিল ওয়াশিংটন! ইজরায়েলের অন্তর্ঘাত ইজরায়েলের তরফে এমন অন্তর্ঘাত অবশ্য নতুন কিছু নয়। ইরানের সঙ্গে সংঘাতকে ছাপিয়ে তা অনেকটা বিস্তৃত। ইজরায়েল বরাবরই প্যালেস্তাইন, লেবানন, সিরিয়া-সহ অন্যত্র শান্তি প্রতিষ্ঠাকে ব্যাহত করেছে এবং প্রতিটি ক্ষেত্রেই অন্তত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের থেকে পেয়েছে নীরব সমর্থন। গাজায় গণহত্যার কুড়ি মাস। এই সময়ে ইজরায়েলের জন্য বারংবার ব্যর্থ হয়েছে যুদ্ধবিরতির চেষ্টা। যেমন, ২০২৩ সালের নভেম্বরে একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতির সময়, ওয়েস্টব্যাঙ্কে প্যালেস্তিনীয়দের বিরুদ্ধে ব্যাপক আক্রমণ শুরু করে ইজরায়েল। তার সাথে গাজায় প্যালেস্তিনীয়দের ওপর গুলিবর্ষণ জারি রাখে। সেসময় ইজরায়েলের নেতাদের দেওয়া বিবৃতিতেই স্পষ্ট হয়ে যায় তেল আভিভ আদৌ যুদ্ধের স্থায়ী অবসান চায় না। জুলাই, ২০২৪ বিশেষ করে শিক্ষা নেওয়ার মতো। ওই মাসের বেশিরভাগ সময় জুড়ে খবর ছিল, মধ্যস্থতাকারী কাতার ও মিশর গাজার যুদ্ধবিরতি চুক্তি নিয়ে আলোচনার একেবারে শেষ পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে, যা যুদ্ধের অবসান ঘটাতে পারে। তবুও, ইজরায়েল আবারও উত্তেজনা বাড়ানোর পথকেই বেছে নেয়ে। গাজার তথাকথিত ‘নিরাপদ অঞ্চলে’ বেপরোয়া বোমাবর্ষণ করে, রাষ্ট্রসঙ্ঘের বেশ কয়েকটি স্কুলে হামলা চালায়। মাসের শেষের দিকে আলোচনা যখন উত্তপ্ত হয়ে ওঠে, তখন নেতানিয়াহু মার্কিন কংগ্রেসে এক ভাষণে যে কোনও মূল্যে গাজায় যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। আর জুলাইয়ের শেষ দিনে, ইজরায়েল হত্যা করে হামাস নেতা ইসমাইল হানিয়াকে, যিনি ছিলেন যুদ্ধবিরতি আলোচনার দায়িত্বে, এই ঘটনাকে বিবিসি পুরো যুদ্ধবিরতি প্রক্রিয়ার উপর সরাসরি ‘হাতুড়ির আঘাত’ বলে বর্ণনা করে। হামাসের রাজনৈতিক শাখার প্রধান হানিয়া নির্বাসনে থাকতেন কাতারে। ইরানে গিয়েছিলেন নতুন রাষ্ট্রপতি মাসুদ পেজেশকিয়ানের শপথ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে। ওই অনুষ্ঠানের কয়েক ঘণ্টা পরেই তেহরানের এক সরকারি অতিথিশালায় তিনি খুন হন। ইরানের সংসদে হানিয়া যখন পেজেশকিয়ানকে আলিঙ্গন করেছিলেন, তখন সকলে গলা মিলিয়ে চেয়েছিলেন ‘ইজরায়েলের মৃত্যু’। ভোরে আলো ফোটার আগেই হানিয়ার মৃত্যু! সেসময়ও ইজরায়েলের প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল বাইডেন-প্রশাসনের সঙ্গে একসূত্রে গাঁথা। ইজরায়েলকে শুধু সমরাস্ত্র পাঠানোই নয়, রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদে বেশ কয়েকটি যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবে ভেটো দিয়েছে মার্কিন প্রশাসন। নতুন ট্রাম্প প্রশাসনের চাপে এবছর জানুয়ারিতে সাময়িক যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব মেনে নিলেও, মার্চেই ইজরায়েল তা লঙ্ঘন করে। যথারীতি এবারেও ছিল ওয়াশিংটনের পূর্ণ সমর্থন। আর এভাবেই গাজা গণহত্যার অবসানে সবচেয়ে আশা জাগানো সুযোগকে শেষ করে দেয়। ইজরায়েল একইভাবে বারবার যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করেছে হিজবুল্লা এবং লেবানন উভয়ের সঙ্গে। লেবাননে সাম্প্রতিকতম বোমাবর্ষণের ঘটনাটি ঘটেছে রাজধানী বেইরুটে। সপ্তাহখানেক আগে, ঈদের ঠিক আগে। গতবছর নভেম্বরে হিজবুল্লার সঙ্গে যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর ইজরায়েল এ পর্যন্ত অন্তত ২,৭০০-বার তা লঙ্ঘন করেছে। সিরিয়ায় ইজরায়েল হাঁটছে সম্পূর্ণ অন্য পথে। মূলত একতরফা আগ্রাসনের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। গত ডিসেম্বরে আসাদ সরকারের পতনের পর থেকে বিনা প্ররোচনায় ইজরায়েল কয়েকশো বার আঘাত হেনেছে সিরীয় ভূখণ্ডে এবং তা চালিয়ে যাচ্ছে। যা দেখে মনে হচ্ছে সিরিয়াকে অস্থিতিশীল এবং অন্তর্বর্তী সরকারকে দুর্বল করাই লক্ষ্য। যেখানে যুদ্ধ নেই, সেখানে নতুন করে যুদ্ধ শুরুর চেষ্টা। ইজরায়েল যেমন সামরিক অভিযানের মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠায় অন্তর্ঘাত হানে, তেমনই কূটনীতিকে দুর্বল করার কাজও করে– যারা এই শান্তি প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগ নেয়, তাদের বিরুদ্ধে। যেমন কাতার। হামাসের সঙ্গে যোগসাজশ আছে বলে লাগাতার কুৎসা চালায় কাতারের বিরুদ্ধে। দাবি করে কাতার সন্ত্রাসবাদে মদত দিচ্ছে, মধ্যস্থতাকারী হিসেবে একপেশে, পক্ষপাত করছে, যখন ইজরায়েলের গণমাধ্যমের কাছে কাতার ‘অপরিহার্য মধ্যস্থতাকারী’! ‘সন্ত্রাসের চ্যানেল’ বলে দেগে দিয়ে ইজরায়েল ও ওয়েস্টব্যাঙ্কে আল জাজিরা-কে নিষিদ্ধ করে দিয়েছে, যার মালিক কাতার সরকার। বৃহত্তর ইজরায়েল ইজরায়েলের সমস্ত সামরিক ও কূটনৈতিক কৌশলের লক্ষ্য এক: ভূখণ্ডের বিস্তার এবং আঞ্চলিক আধিপত্য। বৃহত্তর ইজরায়েল বলতে বোঝায় জায়নবাদীদের অন্ধ বিশ্বাসকে– ইউফ্রেটিস নদী ও নীল নদের মধ্যবর্তী সমস্ত ভূখণ্ড ঈশ্বর ইহুদিদের দেওয়ার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এই দৃষ্টিভঙ্গি কেবল জায়নবাদী মতাদর্শেই নয়, ইজরায়েলের রাজনৈতিক আলোচনা ও সমাজের গভীরেও যথেষ্ট রয়েছে। গাজা থেকে সমস্ত প্যালেস্তিনীয়কে উৎখাতের ঘোষণা যখন ট্রাম্প করেন, তখন ইজরায়েলি সমাজ থেকে তা পায় ব্যাপক সমর্থন। ইহুদি পিপলস পলিসি ইনস্টিটিউট (জেপিপিআই)-এর একটি সমীক্ষায়, ৮২ শতাংশ ইহুদি প্যালেস্তিনীয়দের গণ-উৎখাতকে ‘বাঞ্ছনীয়’ বলে রায় দেন। গত অক্টোবরের গোড়ায় এক সাংবাদিক বৈঠকে নেতানিয়াহু বলেন তাঁর দেশ ‘সাতটি পৃথক ফ্রন্টে লড়ছে’। প্রকৃত সত্য হল, সাতটি ফ্রন্টে লড়ার পথ বেছে নিয়েছে ইজরায়েল। গাজায় হামাস, লেবাননে হিজবুল্লা, ইয়েমেনে বিদ্রোহী গোষ্ঠী হুতি, সিরিয়ায় উগ্রপন্থী গোষ্ঠী, ইরাকে শিয়া উগ্রপন্থী, ওয়েস্ট ব্যাঙ্কের প্যালেস্তিনীয় যোদ্ধা এবং ইরানের বিরুদ্ধে অভিযান ঠিক করেছে তারা নিজেরাই। লক্ষ্য– বৃহত্তর ইজরায়েল। নেতানিয়াহুর দাবি, প্রতিটি ফ্রন্টে লড়াইয়ের উদ্দেশ্য এক– ‘বর্বরতার বিরুদ্ধে আত্মরক্ষা’! যেন ‘ডিফেন্সিভ ওয়ার’! যুদ্ধে যেতে বাধ্য হচ্ছে তেল আভিভ! নেহাতই আত্মরক্ষার খাতিরে! নেতানিয়াহুর দাবি, ‘সভ্যতার বিরুদ্ধে যারা আমাদের সবার উপর উন্মত্ততার একটি অন্ধকার যুগ চাপিয়ে দিতে চায়।’ কে বলবে, গণহত্যাকে ‘আত্মরক্ষা’ হিসেবে বর্ণনা করা যায় না! ‘সভ্যতা’ রক্ষার নামে মানুষকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা যায় না! যদিও, প্রকৃত লক্ষ্য গোপন করেননি তিনি। জানুয়ারিতে এক সাংবাদিক বৈঠকে বলেন, ‘জর্ডনের পশ্চিমে সমস্ত ভূখণ্ডের নিরাপত্তার নিয়ন্ত্রণ ইজরায়েলেরই থাকা উচিত।’ আরও সুনির্দিষ্ট করলে, ‘সমুদ্র আর জর্ডনের মধ্যে কেবলই থাকবে ইজরায়েলের সার্বভৌমত্ব।’ আর কে না জানে, ‘নিরাপত্তার নিয়ন্ত্রণ’ হল আঞ্চলিক সম্প্রসারণের জন্য ইজরায়েলের বিস্তারবাদের প্রিয় ভাষ্য। আরও স্পষ্ট করে বলেছেন নেতানিয়াহুর অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোত্রিচ। ইউরোপীয় চ্যানেল আর্তে-র সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে স্মোত্রিচ বলেছেন, ইজরায়েল ‘অল্প অল্প করে’ নিজেদের সম্প্রসারিত করছে এবং শেষ পর্যন্ত জর্ডন, লেবানন, মিশর ও অন্যান্য আরব দেশগুলি ছাড়া গোটা প্যালেস্তিনীয় ভূখণ্ডকেই ঘিরে ফেলবে। ‘জেরুজালেমের ভবিষ্যৎ যে দামাস্কাস (সিরিয়ার রাজধানী) পর্যন্ত প্রসারিত হবে, তা লেখা হয়ে আছে।’ আসল লক্ষ্য পুরো ওয়েস্ট ব্যাঙ্ক, স্মোত্রিচরা যাকে বলেন ‘জুদেয়া ও সামারিয়া’ অঞ্চল। পাশে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ইজরায়েল কেন এত বেপরোয়া, কারণ পাশে রয়েছে আমেরিকা। পশ্চিম এশিয়াতে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সবচেয়ে উন্নত ঘাঁটি ইজরায়েল। সাম্প্রতিক সংঘাতে তেল আভিভের প্রতিটি পদক্ষেপকে সমর্থন করছে ওয়াশিংটন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে অন্য যে কোনও দেশের চেয়ে ইজরায়েলকে বেশি সামরিক সহায়তা দিয়েছে আমেরিকা। যার পরিমান ১২,৪০০ কোটি ডলারের বেশি। দশ-বছরের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ২০১৬ থেকে প্রতি বছর পাচ্ছে ৩৮০ কোটি ডলার। অক্টোবর, ২০২৩– ইজরায়েল যেদিন গাজায় আঘাত হেনেছে, সেদিনই মার্কিন রাষ্ট্রপতি জো বাইডেন ইজরায়েলের জন্য আরও বেশি সামরিক সহায়তার পক্ষে সওয়াল করেছেন। প্যালেস্তাইনের হামাস (সুন্নি), ইয়েমেনের হুথি (শিয়া) এবং লেবাননের হিজবুল্লা (শিয়া)– এই তিনটি গোষ্ঠীর মধ্যে সাধারণ যোগসূত্র হল ইরান। গত ক’মাসে এই তিনটি গোষ্ঠীকে নিশানা করে ইজরায়েল আসলে আঘাত হানতে চেয়েছে পশ্চিম এশিয়াতে ইরানের প্রভাবের ওপর। ইজরায়েলের যুদ্ধবাজ নেতারা মনে করছেন এতে হিজবুল্লা, হামাস, হুতিকে শেষ করে দেওয়া যাবে। আর এভাবে ইরানকে ‘বেআব্রু ও দুর্বল’ করা যাবে। নেতানিয়াহু আগেই ইরানে ‘জমানা বদলের’ ডাক দিয়েছিলেন। ‘পশ্চিম এশিয়ার রাজনৈতিক মানচিত্র পরিবর্তনের’ কথা বলছেন। এভাবেই পশ্চিম এশিয়ায় আধিপত্য বিস্তার করতে চাইছে ইজরায়েল। যা আসলে পূরণ করবে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থ। রাষ্ট্রসঙ্ঘে সংখ্যালঘু হওয়া সত্ত্বেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের অধিকাংশ দেশ, জাপান, অস্ট্রেলিয়া নিজেদেরকে মনে করছে তারাই ‘আন্তর্জাতিক জনমত’! যদিও, পশ্চিম এশিয়ার মুখ্য বিষয়, প্যালেস্তাইন ইস্যু। আন্তর্জাতিক জনমত চায়, ‘মুক্ত প্যালেস্তাইন! পশ্চিম এশিয়াতে শান্তি!’ একমাত্র দখলদারি-মুক্ত প্যালেস্তাইনই আনতে পারে সেই মহার্ঘ শান্তি। অশান্ত পশ্চিম এশিয়া গাজা আগ্রাসনের পর থেকে ক্রমশ অবনতি হচ্ছে পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি। ইজরায়েল প্রতিদিন যুদ্ধের উত্তেজনা বাড়িয়ে চলেছে। শুরুতে যা ছিল গাজায় ইজরায়েলের একতরফা আগ্রাসন, ক্যালেন্ডারের পাতা ওলটাতে না ওলটাতেই ছায়াযুদ্ধের পর্দা উড়িয়ে তাই হয়ে উঠেছে ইরান, লেবাননে ইজরায়েলের পুরোদস্তুর যুদ্ধ। শুধু প্যালেস্তাইন নয়। ইজরায়েলের তাণ্ডবে এখন অশান্ত গোটা পশ্চিম এশিয়া। ঘোরতর সংকটে। বৃহত্তর যুদ্ধের কিনারে। ফুটন্ত কড়াইয়ে। লক্ষ্য স্পষ্ট: পুরো অঞ্চল জুড়ে যুদ্ধকে ছড়িয়ে দেওয়া। পশ্চিম এশিয়ার আকাশ আবারও ঢাকা পড়েছে যুদ্ধের কালো মেঘে। ইরান বা ইজরায়েল– দু’দেশই সামরিক সক্ষমতার দিক থেকে অত্যন্ত শক্তিশালী। সামরিকভাবে শক্তিশালী বিশ্বের প্রথম কুড়িটি দেশের মধ্যেই রয়েছে এই দু’টি দেশ। গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ার-এর পরিসংখ্যান বলছে, সামরিক দক্ষতা এবং প্রভাবের দিক থেকে ইজরায়েলের তুলনায় কয়েক ধাপ এগিয়ে ইরান। তেহেরানের স্থান ১৪, তেল আভিভ ১৭। শুরু থেকেই সতর্ক করে আসছিল যুদ্ধ-বিরোধী আন্দোলন। এখন সেটাই ঘটে চলেছে। ইজরায়েলের আগ্রাসন পশ্চিম এশিয়াকে ঠেলে দিচ্ছে সর্বাত্মক আঞ্চলিক যুদ্ধের দিকে। ভারতের অবস্থান ভারত সরকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইজরায়েল উভয়েরই স্ট্র্যাটেজিক অংশীদার। সরে এসেছে প্যালেস্তাইনের প্রতি তার চিরায়ত সংহতির নীতি থেকে। ইরানে হামলার পরেই মোদীকে ফোন করে নেতানিয়াহু হামলার ব্যাখ্যা করেছেন এবং ভারতের সমর্থন চেয়েছেন। মোদী-নেতানিয়াহুর ফোনালাপ প্রকাশ্যে না এলেও তার প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে ভারতের অবস্থানে। সাংহাই কো-অপারেশন (এসসিও)-র বৈঠকে সব সদস্য সহমত হয়ে এই হামলার নিন্দা ও উভয় পক্ষকে হামলা বন্ধের কথা বলে যৌথ বিবৃতি দিলেও, ব্যতিক্রম ভারত। এই যৌথ বিবৃতিতে অংশ নেয়নি, হামলার নিন্দা করেনি। অথচ, ইরান ভারতের বরাবরের বন্ধু দেশ। এর মধ্যেও ইরানের চাবাহার বন্দরে বিনিয়োগ করেছে ভারত। লক্ষ্য পাকিস্তানকে এড়িয়ে ইরানের মধ্যে দিয়ে পশ্চিম এশিয়া, মধ্য এশিয়া ও রাশিয়ায় বাণিজ্য প্রসারিত করা। ভারতের এই অবস্থানে সেই বাণিজ্য স্বপ্নও বরবাদ হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সমস্যা হতে পারে জ্বালানি সরবরাহেও। সাংহাই বৈঠকের একদিন আগে রাষ্ট্রসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদে গাজায় গণহত্যা বন্ধ করার প্রস্তাব বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠে পাস হলেও, ভারত ইজরায়েলের পাশে দাঁড়িয়ে ভোটে অংশ নেয়নি। পরোক্ষে গাজার গণহত্যাকে সমর্থন জানিয়েছে। ইজরায়েলের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে হচ্ছে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ। এই প্রতিরোধ আন্দোলনকে ভারতেও শক্তিশালী করতে হবে। গাজায় কেন ব্যবহার হবে হায়দরাবাদে আদানি ডিফেন্স অ্যান্ড অ্যারোস্পেস-এ তৈরি হার্মিস-৯০০ ড্রোন? হামাসের ডেরাগুলি চিহ্নিত করাই হোক, বা সুড়ঙ্গে লুকিয়ে থাকা হামাসের সদস্যদের খুঁজে বার করা– এই অভিযানে হার্মিস-৯০০ ড্রোনকে কাজে লাগাচ্ছে ইজরায়েল। নিশানা এমনই নিখুঁত যে, ব্রিটিশ দ্য সান পত্রিকা জানাচ্ছে, যদি কোনও গাড়ির চালককে নিশানা করা হয়, তাহলে সেই গাড়ির চালকেরই শুধু মৃত্যু হবে। কিন্তু ওই গাড়িতে থাকা অন্য সওয়ারিদের গায়ে আঁচড়টি পর্যন্ত লাগবে না! ইজরায়েলকে সমরাস্ত্র পাঠানো বন্ধ করা এবং প্যালেস্তাইনের পাশে দাঁড়ানোর জন্য তাই সরকারকে বাধ্য করতে হবে। বন্ধ হোক ইজরায়েলের আগ্রাসন! প্রকাশের তারিখ: ১৭-জুন-২০২৫ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |