|
জাতপাতের প্রভাব ছড়িয়ে রয়েছে সারা দেশেএম এ বেবি |
ভারতে জাতপাতের ভিত্তিতে বৈষম্য চলেই আসছে। এরই প্রেক্ষিতে সিপিআই(এম)-এর ২৪ তম কংগ্রেসে যে রাজনৈতিক প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে সেখানে বাম ও গণতান্ত্রিক কর্মসূচির একটা প্রধান উপাদান হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে সামাজিক ন্যায়কে। রাজনৈতিক প্রস্তাবে আহ্বান রাখা হয়েছে জাতপাত ব্যবস্থা ও সব ধরনের জাতপাত ভিত্তিক নির্যাতন ও বৈষম্যের অবসান ঘটাতে হবে। এবং দলিত , আদিবাসী ও সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষা করতে হবে। একই সঙ্গে মহিলা, দলিত, আদিবাসী ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অধিকারের জন্য লড়াইকে পার্টির কাজ হিসাবে গ্রহণ করতে হবে। |
সিপিআই(এম) দলের কর্মসূচিতে রাষ্ট্রকাঠামো এবং গণতন্ত্রের মূল্যায়ন করা হয়েছে। দলের এই কর্মসূচি গৃহীত হয়েছিল ১৯৬৪ সালে এবং পরে তা নানাভাবে সময়োপযোগী করা হয়েছে। সিপিআই(এম)-এর কর্মসূচিতে সঠিকভাবেই এই বিষয়টিকে চিহ্নিত করা হয়েছে যে, এদেশের বুর্জোয়া-জমিদারি ব্যবস্থা জাতপাতভিত্তিক নিপীড়ন ব্যবস্থার অবসান ঘটাতে পারেনি। এই নিপীড়নের ফল যাদের সবচেয়ে বেশি ভোগ করতে হয় তারা হলেন তপশিলি জাতির মানুষজন। দলিতদের বিরুদ্ধে অস্পৃশ্যতা এবং আরও নানা ধরনের বৈষম্য চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, যদিও এই সমস্ত বিষয়গুলিও আইনসম্মত নয় বলে ঘোষণা করা আছে। এমনকী ৬০ বছর পরেও ভারতীয় রাষ্ট্র ও সমাজ সম্পর্কে সিপিআই(এম)-এর মূল্যায়ন এখনও সঠিক। সাম্প্রতিককালের চারটি ঘটনায় বিষয়গুলি স্পষ্ট হয়। প্রথম ঘটনাটি হল সুপ্রিম কোর্টের মধ্যেই এখনকার প্রধান বিচারপতির ওপর হামলার চেষ্টা। মনে রাখতে হবে, বর্তমান প্রধান বিচারপতি একজন দলিত। দ্বিতীয় ঘটনাটি হল হরিয়ানায় একজন দলিত আইপিএস-এর আত্মহত্যা। তৃতীয় ঘটনা হল, চোর সন্দেহে উত্তরপ্রদেশে একজন দলিতকে পিটিয়ে খুন। অভিযোগ, গোটা ঘটনায় পুলিশ ছিল নীরব দর্শক। চতুর্থ ঘটনা হল মধ্যপ্রদেশে একজন দলিত যুবকের মুখে প্রস্রাব করে দেওয়া। এটা লক্ষ করার মতো যে, এই চারটি ঘটনাই ঘটেছে বিজেপি শাসিত রাজ্যে। এই ঘটনাগুলি থেকে বোঝা যায় জাতপাত ব্যবস্থা সর্বত্র বিরাজমান, জাতপাত ভিত্তিক বৈষম্য আকছার ঘটছে, এবং এখনও অস্পৃশ্যতা টিকে রয়েছে। অথচ এখন থেকে ৭৫ বছরের বেশি সময়েরও আগে ভারতীয় সংবিধান ধর্ম, বর্ণ, জাতপাত, লিঙ্গ কিংবা জন্মস্থানের নিরিখে বৈষম্য-করাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে সংবিধানের ১৫ ধারা মারফত এবং সংবিধানের ১৭ ধারায় অস্পৃশ্যতাকে রহিত করা হয়েছে। সমানাধিকার বিষয়ে সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতি থাকা সত্ত্বেও এদেশে তপশিলি জাতি ও উপজাতির মানুষেরা ধারাবাহিক হিংসার শিকার। সমাজে কখনই তাদের একাসনে বসার সুযোগ দেওয়া হয় না। ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর (এনসিআরবি) দেওয়া তথ্য অনুসারে, তপশিলি জাতির মানুষদের বিরুদ্ধে অপরাধের ঘটনা যা ২০১৩ সালে ছিল ৩৯,৪০৮টি তা ২০২৩ সালে বেড়ে হয়েছে ৫৭,৭৮৯টি। তপশিলি জাতির মানুষদের বিরুদ্ধে অপরাধের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে দ্বিগুণ। ২০১৩ সালে এই সংখ্যা ছিল ৬৭৯৩টি। ২০২৩ সালে তা বেড়ে হয়েছে ১২,৯৬০টি। বিজেপি শাসনে, তপশিলি ও জাতি ও উপজাতির মানুষদের ওপর হিংসার ঘটনা বেড়েছে। একই সঙ্গে শিক্ষার সুযোগ থেকে এবং সামাজিকভাবে ওপরে ওঠার সুযোগ থেকে তাদের পরিকল্পিতভাবে বঞ্চিত করা হয়েছে। তপশিলি উপজাতির পড়ুয়াদের জন্য জাতীয় ফেলোশিপ কার্যত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এবছর ওই খাতে বাজেট বরাদ্দ কমানো হয়েছে ৯৯.৯৯ শতাংশ। এর মানে (সংশোধিত হিসাব) ২৪০ কোটি টাকা থেকে বরাদ্দ কমিয়ে করা হয়েছে মাত্র ২ লক্ষ টাকা। ন্যাশনাল ওভারসিজ স্কলারশিপ দেওয়ার সংখ্যাও ভীষণভাবে কমানো হয়েছে। চলতি শিক্ষাবর্ষে যে ১০৬ জনকে এই স্কলারশিপের জন্য বেছে নেওয়া হয়েছিল তাদের মধ্যে পেয়েছেন মাত্র ৪০ জন। তপশিলি জাতি, তপশিলি উপজাতি, ওবিসি ও সংখ্যালঘু পড়ুয়াদের প্রি ম্যাট্রিক স্কলারশিপ প্রথম থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত দেওয়া একেবারে বন্ধ করা হয়েছে। এবং নবম ও দশম শ্রেণিতে স্কলারশিপ পাওয়া পড়ুয়ার সংখ্যা কমানো হয়েছে। স্কলারশিপ কমানো মানে শিক্ষার সুযোগ সঙ্কুচিত হওয়া, ড্রপ আউটের হারে বৃদ্ধি এবং চাকরির সুযোগের সংকোচন। এর ফলে সমাজের এই সব অংশ থেকে আসা হাজার হাজার যোগ্য ছাত্র শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এর উল্টোদিকে, সিপিআই(এম) নেতৃত্বাধীন কেরলের এলডিএফ সরকার সামাজিক ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়েছে এবং জাতপাতের বিচারে বৈষম্য দূরীকরণের কাজে অনেক দূর পর্যন্ত অগ্রসর হয়েছে। ২০১৭ সালে সারা দেশের মধ্যে এই প্রথম মন্দির প্রশাসনে পিছিয়ে পড়া শ্রেণি ও দলিতদের জন্য পদ সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এর জেরে ৬ জন দলিত সহ ৩৬ জন অব্রাহ্মণকে পুরোহিতের পদে নিয়োগ করেছে ত্রিবাঙ্কুর দেবসোম বোর্ড। নজিরবিহীন পদক্ষেপ হিসাবে রাজ্য সরকার প্রথম শ্রেণি থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত এসসি, এসটি ও ওবিসি এবং সংখ্যালঘু পড়ু্য়াদের প্রি ম্যাট্রিক স্কলারশিপ চালু রেখেছে, যদিও কেন্দ্রীয় সরকার এই খাতে টাকা বরাদ্দ করা বন্ধ করে দিয়েছে। রাজ্যের ই-গ্র্যান্টস কর্মসূচির আওতায় এখন ৪ লক্ষ ৬০ হাজারেরও বেশি পড়ুয়া নানা ধরনের প্রি ও পোস্ট ম্যাট্রিক স্কলারশিপের সুবিধা পাচ্ছে। উন্নথি স্কলারশিপ কর্মসূচিতে ১১০০-র বেশি এসসি ও এসটি পড়ুয়াকে সাহায্য করা হয়েছে যাতে তারা বিদেশের সেরা ৫০০ বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট স্তরে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে। প্রান্তিক অংশের ৩১০ জন পড়ুয়া চলতি শিক্ষাবর্ষে এই প্রকল্প থেকে উপকৃত হচ্ছে। বাড়িতে স্মার্ট স্টাডি রুম তৈরি করার জন্য এসসি ও এসটি গোষ্ঠীর সদস্যদের আড়াই লক্ষ টাকা পর্যন্ত আর্থিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। ১ লক্ষ ৬০ হাজরের বেশি এসসি ও এসটি পরিবার LIFE মিশনের আওতায় বাড়ি পেয়েছে। এটা এলডিএফ সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি যা রাজ্যে গৃহহীনতার অবসান ঘটাতে চায়। এছাড়াও, ৪ লক্ষের বেশি জমির পাট্টা বণ্টন করা হয়েছে যাতে কেউ ভূমিহীন না-থাকেন। এসসি ও এসটি গোষ্ঠীর লোকজনদের মধ্যেই ভূমিহীনতার সমস্যা সবচেয়ে বেশি। ভারতে জাতপাতের ভিত্তিতে বৈষম্য চলেই আসছে। এরই প্রেক্ষিতে সিপিআই(এম)-এর ২৪তম কংগ্রেসে যে রাজনৈতিক প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে সেখানে বাম ও গণতান্ত্রিক কর্মসূচির একটা প্রধান উপাদান হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে সামাজিক ন্যায়কে। রাজনৈতিক প্রস্তাবে আহ্বান রাখা হয়েছে জাতপাত ব্যবস্থা ও সব ধরনের জাতপাত ভিত্তিক নির্যাতন ও বৈষম্যের অবসান ঘটাতে হবে। এবং দলিত, আদিবাসী ও সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষা করতে হবে। একই সঙ্গে মহিলা, দলিত, আদিবাসী ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অধিকারের জন্য লড়াইকে পার্টির কাজ হিসাবে গ্রহণ করতে হবে। জাতপাতের বিষয়ে যেহেতু আমাদের উপযুক্ত ও কর্মসূচিভিত্তিক উপলব্ধি রয়েছে, তাই এটা খুবই স্বাভাবিক যে জাতপাত ভিত্তিক অত্যাচারের ঘটনা ঘটলেই সেখানে আমাদের হস্তক্ষেপ করতে হবে। সম্প্রতি তামিলনাড়ুতে আমরা ঘোষণা করেছি যে ভিন জাতে বিয়ে করার জন্য পরিবারের বাধার সামনে পড়লে তাদের বিয়ের জন্য আমাদের দপ্তর খোলা থাকবে। তিরুনেলভেলিতে পার্টির একটি অফিসে ভিনজাতের বিয়ে হওয়ার পর কনের আত্মীয়রা অফিসে ভাঙচুর চালিয়েছিল। তারপরেই আমাদের এই ঘোষণা বহু লোকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। ওপরে যে সাম্প্রতিক ঘটনাবলীর কথা বলা হয়েছে সে বিষয়েও সিপিআই(এম) হস্তক্ষেপ করেছে। আইপিএস পূরণ কুমারের শোকার্ত পরিবারের সঙ্গে দলের প্রতিনিধিরা দেখা করেছেন চণ্ডীগড়ে তাদের বাড়িতে গিয়ে। এবং তাঁদের গভীর দুঃখ ও যন্ত্রণার কথা শুনেছেন। তাঁদের কথা থেকে এটা স্পষ্ট যে, এ-বিষয়ে নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত দরকার যাতে আসল সত্যি সামনে আসে এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা যায়। এ-বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে চিঠি পাঠিয়ে গোটা ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করা হয়েছে, এবং দাবি করা হয়েছে যে এই তদন্ত হতে হবে সু্প্রিম কোর্টের কোনও বিচারপতির নেতৃত্বে। তবে দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হল, এমন কোনও তদন্তের কাজ এখনও শুরু করা হয়নি। এখন সারা দেশ থেকেই জাতপাতের ভিত্তিতে নিপীড়ন ও বৈষম্যের খবর এসে পৌঁছচ্ছে। এবং এ-ধরনের বিষয়ে প্রতিটি সরকারই চোখ বন্ধ করে রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ২৪তম পার্টি কংগ্রেসের দেখানো পথে সিপিআই(এম) এগিয়ে যাবে যাতে সবার জন্য সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা যায়। সূত্র: পিপলস ডেমোক্রেসি প্রকাশের তারিখ: ০২-নভেম্বর-২০২৫ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |