পুরনো বিশ্ব ব্যবস্থার কবর রচিত হল চীনে

ওয়েব ডেস্ক মার্কসবাদী পথ
তিয়ানজিনে সাংহাই কোঅপারেশন অর্গানাইজেশনের শীর্ষ বৈঠকে তত বেশি আনুষ্ঠানিক ভাষণ হয়নি, বরং এটি ছিল অনেক বেশি প্রতীকি। এই বৈঠক সঙ্কেত দিয়েছে এক পাক্ষিক বিশ্বের দিন শেষ হয়ে গেছে। ডেভেলপমেন্ট ব্যাঙ্ক থেকে এনার্জি করিডোর থেকে মিসাইলের প্রদর্শনী, একটি নতুন বহুপাক্ষিক বিশ্ব ক্রমশ স্পষ্ট চেহারা নিয়েছে। এবং তার জন্য দরকার নেই পশ্চিমের কোনও অনুমতি।

তিনয়ানজিনে সাংহাই কোঅপারেশন অর্গানাইজেসনের (‌এসসিও)‌ যে সম্মেলন সম্প্রতি হয়ে গেল সেটি আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে আরও একটি গয়ংগচ্ছ ধরনের শীর্ষবৈঠক— সেই করমর্দন, সেই পরিবারের সদস্যকে নিয়ে ছবি তোলা, সেই লিখে দেওয়া বিবৃতি পাঠ ইত্যাদি। কিন্তু ৩১ আগস্ট থেকে ১ সেপ্টেম্বরের শীর্ষবৈঠক নেহাত কূটনীতিক নাট্যশালা ছিল না। মার্কিন সাম্র্যাজ্যবাদ নিয়ন্ত্রিত এক মেরুবিশ্বের যে পর্ব, এই সম্মেলন তার সমাপ্তির আরও একটি চিহ্ন। এবং এশিয়া, ইউরেশিয়া এবং দক্ষিণ গোলার্ধের দেশগুলিকে নিয়ে একটি বহুপাক্ষিক বিশ্বের উত্থান।

সম্মেলনের আলোচনায় অংশ নিয়েছেন চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং, রাশিয়ার রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিন এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। এই দেশগুলি বিশ্বের তিনটি বৃহত্তম দেশগুলির অন্যতম। এবং এই দেশগুলির জনসংখ্যা সমগ্র মানবাজাতির এক তৃতীয়াংশ।

এই সম্মেলনে শি সামনে এনেছেন বিশ্বের শাসনব্যবস্থার একটি বৃহত্তর উদ্যোগ। সঙ্গে রয়েছে এসসিও উন্নয়ন ব্যাঙ্ক চালু করার প্রস্তাব। পুতিন বলেছেন এসসিও হল, ‘‌প্রকৃত বহুপাক্ষিকতার একটি হাতিয়ার’। এবং পশ্চিমী নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে তিনি ইউরেশিয় নিরাপত্তা মডেল গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন। মোদী বেশ কয়েক বছর পর প্রথম চীনে গেলেন। পুতিনের সঙ্গে তাঁর এই বৈঠক পাঠিয়েছে এক জোরালো বার্তা।

ঠিক কী ঘটল সম্মেলনে (‌কেন এই সম্মেলন নেহাত ছবি তোলার মঞ্চ নয়)‌

সম্মেলনের সুর: শি চাইছেন এমন একটি ব্যবস্থা যা বিশ্বের শাসনব্যবস্থাকে ‘আরও গণতান্ত্রিক করে তুলবে’‌ এবং আমেরিকা-কেন্দ্রিক ফিনান্স ব্যবস্থাকে দুর্বল করবে (‌ডলারের ওপর কম গুরুত্ব, আরও বেশি আঞ্চলিক প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি)‌। পুতিন বলেছেন এসসিও হল, ‘প্রকৃত বহুপাক্ষিকতা‌ ও ইউরেশিয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার’। চীনকে প্রতিদ্বন্দ্বী না বলে অংশীদার বলেছেন মোদী। এর মধ্যে দিয়ে মোদী বুঝিয়েছেন ওয়াশিংটনের চীন-বিরোধী অ্যাজেন্ডায় আটকে থাকবে না ভারত।

সম্মেলনের শ্রোতা: ইউরোপিয় নয় এমন ২০টি দেশের নেতারা উপস্থিত ছিলেন সম্মেলনে। রাষ্ট্রসঙ্ঘের মহাসচিব আন্তনিও গুতেরেস এই সম্মেলনকে স্বীকৃতি দিয়েছেন। ফলে এটি কোনও বিশেষ গোষ্ঠীর ক্লাবের বৈঠক ছিল না। ছিল চীনের নেতৃত্বাধীন ফোরামে রাষ্ট্রসঙ্ঘকেন্দ্রিক একটি কাঠামো।

বেজিংয়ের বক্তব্য খোলামেলা: ঠাণ্ডা যুদ্ধের গোষ্ঠীগুলিকে খারিজ করুন। এবং রাষ্ট্রসঙ্ঘের ব্যবস্থাকেই পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করুন। কারণ এই সংগঠনই সর্বজনীনভাবে স্বীকৃত এবং আইনি ভিত্তিসম্পন্ন। ওয়াশিংটন কিংবা ব্রাসেলসে বসে তৈরি করা তথাকথিত ‘নিয়ম-ভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা’‌, বাছাই করা দেশগুলির ওপর জোর করে চাপানো হয়েছে, শি-র বক্তব্যে সেই ব্যবস্থার সরাসরি ও তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে।

‘‌নিয়ম-ভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা’‌ জোর করে চাপানোর উদাহরণও কম নয়। রাষ্ট্রসঙ্ঘের সম্মতি ছাড়াই ১৯৯১ সালে যুগোস্লাভিয়ায় বোমাবর্ষণ করে ন্যাটো। এই হামলাকে ‘রক্ষা করা একটি দায়িত্ব’‌ এই নামে ন্যায্যতা দেওয়া হয়েছিল। ২০০৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ইরাক আগ্রাসন হয়। তবে তাতে নিরাপত্তা পরিষদের কোনও সম্মতি ছিল না। পরে পশ্চিমের কর্তারাও স্বীকার করেছিলেন পুরো হামলাটাই চালানো হয় মিথ্যা অভিযোগের ভিত্তিতে। ২০১১ সালে রাষ্ট্রসঙ্ঘ লিবিয়ার আকাশসীমায় নো ফ্লাই জোন চালু করার সম্মতি দিয়েছিল। সেটিকে ন্যাটো ব্যবহার করেছিল লিবিয়ার শাসক বদলের কাজে। পরে লিবিয়া হয়ে দাঁড়ায় একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র এবং পশ্চিম ইউরোপের একেবারে কেন্দ্রে দুঃখ-দারিদ্রে ভরা বঞ্চিতদের একটি জগৎ তৈরি হয়।

চীন, রাশিয়া এবং দক্ষিণ গোলার্ধের বহু দেশের কাছে এই ঘটনাগুলি প্রমাণ করেছে যে, ‘‌নিয়ম-ভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা’‌টা কোনও সর্বজনীন আইন নয়, এটি হল পশ্চিমী শক্তির বৈষম্যের হাতিয়ার। তিয়ানজিনে জোর দিয়ে বলা হয়েছে রাষ্ট্রসঙ্ঘের সনদকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে হবে, এবং সেটিই একমাত্র আইনি কাঠামো। তার মানে হল পশ্চিমী শক্তিগুলির বক্তব্যকে একেবারে উলটে দেওয়া হচ্ছে: এসসিও, ব্রিকস (ব্রাজিল, রাশিয়া, ইন্ডিয়া, চায়না, সাউথ আফ্রিকা এবং নতুন সদস্য মিশর, ইথিওপিয়া, ইরান, ইউএই এবং ইন্দোনেশিয়া) এবং তাদের সহযোগীরা আসলে আন্তর্জাতিক আইনের আসল বিধিগুলিকেই রক্ষা করতে চাইছেন। আর পশ্চিমী শক্তি নিজেদের সুবিধামতো চাইছে অস্থায়ী জোট এবং তাদের মানদণ্ডও বারে বারে বদলে যায়।

শি-র অবস্থান: শি ‌‘‌আধিপত্যাবাদ ও গুন্ডাগিরির মতো ব্যবহারের’‌ সমালোচনা করেছেন। এবং ‘‌বিশ্বের শাসন ব্যবস্থার গণতন্ত্রীকরণ’‌ চেয়েছেন। বলেছেন বহুপাক্ষিকতার সত্যিকারের মডেল হতে পারে এসসিও, যার শিকড় থাকবে রাষ্ট্রসঙ্ঘে এবং ডব্লিউটিওতে। তাঁর কথায়, পশ্চিমের রাজধানীগুলির খেয়ালখুশি মতো তৈরি করা অস্থায়ী ‘নিয়মে’‌ সব কিছু চলতে পারে না।

পুতিনের অবস্থান: আরও একধাপ এগিয়ে গেছেন পুতিন। তাঁর অভিযোগ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রেরা ইউক্রেন সঙ্ঘাতকে বাড়িয়ে তোলার জন্য সরাসরি দায়ী। তিনি বলেছেন, ইউরেশিয়ার জন্য একটি সত্যিকারের নিরাপত্তার কাঠামো এসসিও-ই দিতে পারে। ন্যাটো বা পশ্চিমীদের চাপানো কোনও মানদণ্ড মানা যাবে না।

একমেরু বিশ্বর কাঠামো কী ভাবে বদলে দেওয়া যাবে (এই কাঠামো এখনই রয়েছে)

নিরাপত্তার মেরুদণ্ড: সাংহাই কোঅপারেশন অর্গানাইজেসন এক জায়গায় এনেছে রাশিযা, চীন, ভারত এবং মধ্য এশিয়ার দেশগুলিকে। তারা নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবাদ বিরোধিতা এবং গোয়েন্দা তথ্য নিয়ে পারস্পরিক সহযোগিতা করবে। এটিই হল জোরদার ক্ষমতাসম্পন্ন একটি কাঠামো যা দিয়ে এই সহযোগিতা সম্ভব হবে।

অর্থনৈতিক বোর্ডরুম: ব্রিকস (ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকা)-কে ২০২৪ সালে সম্প্রসারিত করা হয়। তখন যোগ দেয় মিশর, ইথিওপিয়া, ইরান, ইউএই। এবং ২০২৫ সালে যোগ দেয় ইন্দোনেশিয়া।

ব্রিকসের রয়েছে নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাঙ্ক এবং বাণিজ্য হয় দেশীয় মুদ্রায়। এটি এখন জি-সেভেন গোষ্ঠীর প্রভাব ঠেকিয়ে রাখে।

আঞ্চলিক গুরুত্ব: দ্য অ্যাসোসিয়েশন অফ সাউথ ইস্ট এশিয়ান নেশনস বা আসিয়ান— ১০টি দেশের একটি ব্লক যারা এশিয়ার বাণিজ্যকে প্রভাবিত করে— তারা ক্রমশ এসসিও এবং ব্রিকসের প্রকল্পগুলির সঙ্গে সহযোগিতা গড়ে তুলছে।

জ্বালানির সুবিধা: দ্য গালফ কোঅপারেশন কাউন্সিল (জিসিসি), ৬টি আরব রাজতন্ত্র, তাদের ওপেক-প্লাস মঞ্চের মাধ্যমে নীতি সমন্বয় করে চলে। ফলে গুরুত্বপূর্ণ তেলের প্রবাহের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।

এগুলোকে একসঙ্গে ধরলে, এই সব সংস্থা ইতিমধ্যেই একটি সমান্তরাল শাসনব্যবস্থা হিসাবে কাজ করছে যেখানে পশ্চিমি স্পনশরশিপ বা ভেটো দেওয়ার ক্ষমতার দরকার পড়ে না।

অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে ইউরোপিয় ইউনিয়ন

তিয়ানজিনে ইউরোপিয় ইউনিয়নের উপস্থিতি ছিল না। এই অনুপস্থিতি অনেক কথা বলে। একদা ইউরোপ ছিল বিশ্বের দ্বিতীয় অক্ষ। এখন ইউরোপ সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেসন বা ন্যাটো-তে। ইউরোপ এখন জ্বালানির জন্য বহিঃশক্তির ওপর নির্ভরশীল। নিজেদের মধ্যেও ফাটল ধরেছে। এমনকী ইউরোপের কার্বন বর্ডার অ্যাডজাস্টমেন্ট মেকানিজমকে ঘিরে ভারত ও দক্ষিণের অন্য দেশগুলির সঙ্গে তাদের সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি হয়েছে। তিয়ানজিনে ইউরোপ ছিল নিছকই দর্শক।

আলোচনার পর রাজপথে গড়াল ট্যাঙ্কবাহিনী

এসসিও শীর্ষ বৈঠক হল চীনের বিজয় দিবসের সামরিক কুচকাওয়াজের আগে। সেটি হল ৩ সেপ্টেম্বর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের আত্মসমর্পণের ৮০ তম বার্ষিকী উদ্‌যাপন করা হয়। শি, পুতিন এবং গণতান্ত্রিক কোরিয়ার নেতা কিম জং উন, যাঁর সঙ্গে মস্কোর দ্বিপাক্ষিক নিরাপত্তা চুক্তি রয়েছে, এঁরা এসে দাঁড়িয়েছেন একই মঞ্চে। সেখানে দেখান হয়েছে বেজিংয়ের ইন্টারকন্টিনেন্টাল মিসাইল, দূর পাল্লার আঘাত হানার অস্ত্র এবং ড্রোনবাহিনী।

এতেই বোঝা যাবে বহুপাক্ষিকতা শুধুমাত্র কূটনৈতিক ভাষার একটি রূপ মাত্র নয়, এর পিছনে রয়েছে বিরাট শক্তি।

প্রতিদ্বন্দ্বী নিয়মভিত্তিক প্রতিষ্ঠান: সাংহাই কোঅপারেশন অর্গানাইজেসন ব্যাঙ্ক থেকে ব্রিকসের ফিনান্সিং এবং সম্ভাব্য আসিয়ান-জিসিসি সমন্বয়, এখন এগুলির মধ্যে রয়েছে একটি পদ্ধতিগত পথ যা পশ্চিমী দেশগুলির খবরদারি ছাড়াই কাজ করতে পারে।

রাষ্ট্রসঙ্ঘই প্রথম, এই অবস্থান: রাষ্ট্রসঙ্ঘের সনদে বৈধতা স্থাপিত করে এই ব্লকের অবস্থান হল পশ্চিমের ‌‘‌নিয়মভিত্তিক কাঠামো’‌ পুরোটাই পার্টিজান।

ভারতের সমীকরণ: মোদীর প্রকাশ্যে করমর্দন শি ও পুতিনের সঙ্গে স্বাভাবিক করে তুলেছে একটি ইউরেশিয় ত্রিভুজকে, যাতে ওয়াশিংটন কিংবা ব্রাসেলস সহজে ভাঙন ধরাতে পারবে না।

ইউরোপের ভেটো ক্ষমতা কমছে: ইউরোপিয় ইউনিয়নের নিয়মবিধি, যেমন কার্বন বর্ডার অ্যাডজাস্টমেন্ট মেকানিজম এখন আর ইউরেশিয়ার অ্যাজেন্ডা তৈরি করে দিতে পারবে না। এখানে শক্তি, বাণিজ্য এবং নিরাপত্তার সমন্বয় হচ্ছে অন্য জায়গায়।

আসল কথা

তিয়ানজিনে সাংহাই কোঅপারেশন অর্গানাইজেশনের শীর্ষবৈঠকে তত বেশি আনুষ্ঠানিক ভাষণ হয়নি, বরং এটি ছিল অনেক বেশি প্রতীকি। এই বৈঠক সঙ্কেত দিয়েছে এক পাক্ষিক বিশ্বের দিন শেষ হয়ে গেছে। ডেভেলপমেন্ট ব্যাঙ্ক থেকে এনার্জি করিডোর থেকে মিসাইলের প্রদর্শনী, একটি নতুন বহুপাক্ষিক বিশ্ব ক্রমশ স্পষ্ট চেহারা নিয়েছে। এবং তার জন্য দরকার নেই পশ্চিমের কোনও অনুমতি।

সূত্র: আরটি নিউজ, ইংরেজি  


এক ক্লিকেই ফলো করুন মার্কসবাদী পথের হোয়াটস্যাপ চ্যানেল


প্রকাশের তারিখ: ০৫-সেপ্টেম্বর-২০২৫

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org