পশ্চিমী আধিপত্যের জোয়াল ভেঙে ডলার সাম্রাজ্যের বাইরে আসার বিপজ্জনক পথ (প্রথম পর্ব)

জাস্টিন পোদুর
বিংশ শতকে আর্জেন্টিনায় পালা করে ক্ষমতায় থেকেছে নির্বাচিত সরকার ও সামরিক একনায়কেরা। এর ফলে একবার উন্নয়নবাদী অর্থনীতি, আবার কখনও বা নয়া উদারবাদী অর্থনীতি — দুই বিপরীত পথে পালা করে হেঁটেছে এই দেশ।  নয়া উদারাবাদী পর্বে, আর্জেন্টিনা ছিল উদ্ভাবনের জায়গা— কী করে নতুন নতুন পথে একটা দেশকে লুঠ কর যায় সেসব এই দেশেই উদ্ভাবন করা হত।

দক্ষিণ গোলার্ধের বেশির ভাগ দেশকে চলতে হচ্ছে অর্থনৈতিক দুর্দশা, নানা ধরনের বিপদ এবং কঠিন সব সিদ্ধান্ত নেওয়ার মধ্যে দিয়ে। পশ্চিমী শক্তির নাগপাশ থেকে তাদের মুক্ত করা খুবই যন্ত্রণাদায়ক হবে, তবে বিষয়টা এখন আর অসম্ভব বলে মনে হয় না।

এবছরের আগস্ট মাসে দক্ষিণ আফ্রিকায় ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে। ২০২৪ সালে কয়েকটি নতুন দেশকে সদস্য হিসাবে ব্রিকস–এ যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে: আর্জেন্টিনা, ইজিপ্ট, ইথিওপিয়া, ইরান, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহী (‌ইউএই)‌। এবং ব্রাজিলের আর্জিতে সাড়া দিয়ে একটা কমিশন তৈরি করা হয়েছে, যে কমিশন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ডলারের বদলে নতুন কোনও মু্দ্রা চালু করার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখবে। যেহেতু খুব ঝটিতি ডলারকে সরিয়ে অন্য কোনও মুদ্রাকে তার জায়গায়  আনা সম্ভব নয়, তাই স্বল্পকালীন ক্ষেত্রে ব্রিকসভুক্ত দেশগুলি নিজেদের মুদ্রায় পারস্পরিক বাণিজ্যের প্রক্রিয়া চালিয়ে যাবে (‌কারেন্সি সোয়াপ এগ্রিমেন্ট)‌ এবং এই পথেই আরও এগিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া জারি রাখবে।

ডলার বাণিজ্যের শৃঙ্খল থেকে মুক্তির জন্য দক্ষিণ গোলার্ধের দেশগুলিকে খুব বিপজ্জনক পথে হাঁটতে হবে। রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ মাইকেল হাডসন এবং রাধিকা দেশাই এক্ষেত্রে যে সব বড় সমস্যাগুলির মোকাবিলা করতে হবে সেগুলির উল্লেখ করেছেন। সমস্যাগুলি হল, দক্ষিণ গোলার্ধের দেশগুলির ওপর চেপে রয়েছে বিপুল ঋণের বোঝা যা রয়েছে ডলারে এবং পশ্চিমী কর্পোরেশনগুলি  এই সব দেশের সম্পদের ওপর মালিকানা দাবি করে। আন্তর্জাতিক যে আইনি কাঠামো রয়েছে, তা পশ্চিমী শক্তিগুলির অনুকূলে। এই কাঠামো মার্কিন কর্পোরেশন এবং ভালচার ফান্ডগুলির ( ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড যারা সঙ্কটাপন্ন বিনিয়োগের সিকিওরিটি কেনাবেচা করে) পক্ষেও সুবিধাজনক। তাদের শাসন, এমনকী আর্থিক শাসনকেও যেসব দেশ অমান্য করে, সেই সব দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ লাগিয়ে দেওয়া কিংবা সেই সব দেশে অভ্যুত্থান ঘটানোর ক্ষমতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পরিচালিত গোপন নেটওয়ার্কগুলির এখনও রয়েছে । বিশ্বের বেশির ভাগ দেশকেই এখন এই সব সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে।

এখনও পর্যন্ত, বিশ্বের বেশিরভাগ দেশই নির্দিষ্ট কোনও মেরুভুক্ত নয়। খুব কম দেশই (ইউরোপের প্রায় সব দেশ)‌ মার্কিন নেতৃত্বাধীন পশ্চিমী জোটের নিঃশর্ত সমর্থক। এর উল্টোদিকে রয়েছে মাত্র গুটিকয় দেশ (‌যেমন রাশিয়া, চীন, ইরান)‌ যারা পশ্চিমী শক্তি যখন কোনও কিছু দাবি করে তখন তারা স্পষ্টভাবে না বলার সাহস দেখাতে পারে।

বাকি সব দেশই বিশ্ব অর্থনীতির ভবিষ্যত যেখানে নির্ধারিত হবে তার ঠিক মাঝামাঝি অবস্থানে দাড়িয়ে রয়েছে।  সেই দেশগুলি কি কখনই এইসব ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে?

আর্জেন্টিনার ঋণ রাজনৈতিক হাতিয়ার

প্রায় ২০০ বছর ধরে ঋণভারে-জর্জর অধীনতার পরীক্ষাক্ষেত্র হয়ে রয়েছে আর্জেন্টিনা। প্রথম এই পরীক্ষা চালায় ব্রিটিশরা ও পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। যতবার সে দেশে উন্নয়নপন্থী কোনও সরকার ক্ষমতায় এসেছে এবং দেশকে সঙ্কটের বাইরে নিয়ে ফেলার চেষ্টা করেছে, ঠিক তার পরপরই দেশে ক্ষমতায় বসেছে দক্ষিণপন্থী সরকার এবং সেই সরকার দেশকে ফের ঋণভারগ্রস্ত অতীতে ফিরিয়ে নিয়ে গেছে।

ওপরে যে মধ্যবর্তী অবস্থানে থাকা দেশগুলির কথা বলা হয়েছে তার মধ্যে আর্জেন্টিনার এক বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। ব্রিকস নতুন যে দেশগুলিকে সদস্যপদ নেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছে, সেই তালিকায় রয়েছে আর্জেন্টিনা। এই দেশটার আর্থিক ব্যবস্থা একেবারে ছন্নছাড়ার মতো। এই দেশের প্রেসিডেন্ট পদের নির্বাচনে  অন্যতম প্রধান প্রার্থী হলেন জাভিয়ের মিলেই। ইনি অর্থনৈতিক বিষয়ে পরামর্শ নেন তাঁর চারটে পোষা কুকুরের কাছ থেকে, এবং তিনি সরকারের বেশিরভাগ বিভাগই তুলে দিতে চান এবং দেশে মুদ্রা হিসাবে মার্কিন ডলার চালু করতে চান। পশ্চিমী দুনিয়ার বহু দক্ষিণপন্থী শাসকের মতো, অর্থাৎ বারলুসকোনি এবং সারকোজি থেকে ট্রাম্প ও বোলসোনারোর মতো, মিলেই–এর নির্বাচনী ব্র্যান্ড, তাঁর ক্লাউনের মতো কাণ্ডকারখানা কিংবা অবাস্তব  অর্থনৈতিক পরিকল্পনা সত্ত্বেও, কিছুতেই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না।

মিলেই–এর অর্থনৈতিক পরিকল্পনাগুলি সত্যিসত্যিই বাস্তবে কার্যকর করা সম্ভব নয়। তাই দ্য ইকনমিস্ট পত্রিকা মন্তব্য করেছে যে, ‘‌মিলেই প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন যে তিনি জিডিপির ১৫ শতাংশের সমান মূল্য ছাঁটাই করবেন রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্র থেকে যা এখন রয়েছে জিডিপির ৩৮ শতাংশ..., অথচ রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রের কোন জায়গা থেকে টাকাটা আসবে তার হিসাব করতে তিনি হিমশিম খাচ্ছেন।’‌

তিনি জানেন ও না

‘‌কীভাবে... মিলেই–এর সরকার ৪০ বিলিয়ন (৪০০০ কোটি) ডলার যোগাড় করবে।  ‌তাঁর টিমের সদস্যরা মনে করে মুদ্রা হিসাবে ডলারে ফিরে যাওয়ার জন্য ওই অর্থ দরকার। বর্তমানে, আর্জেন্টিনা ইন্টারন্যাশনাল মানিটারি ফান্ড (‌আইএমএফ)‌–এর ঋণই শোধ করতে পারছে না। আইএমএফ–এর কাছে এই দেশের ঋণের পরিমাণ ৪৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। মার্কিন ডলারের ভাণ্ডার নিঃস্ব হয়ে যাওয়ায় আর্জেন্টিনার কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক এখন চীনের কাছ থেকে ধার করা ইউয়ান দেদার খরচ করে যাচ্ছে। ...‌মিলেই প্রস্তাব দিয়েছেন রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সংস্থাগুলি ও সরকারি ঋণ কোনও বিদেশি ফান্ডের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হোক যাতে প্রয়োজনীয় পুঁজি জোগাড় করা যায়। তবে এগুলোর খুব বেশি ক্রেতা পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না।’‌ 

সেই ১৮২৪ সাল থেকেই আর্জেন্টিনার ভাগ্য নির্ধারণ করে আসছে সাম্রাজ্যের দেওয়া ঋণের বোঝাগুলি।  ওই বছরই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ব্যাঙ্ক (‌বারিংস ব্যাঙ্ক— যার শীর্ষকর্তা লর্ড ক্রোমার ইজিপ্ট দখল করার জন্য আর্থিক কলাকৌশল কাজে লাগিয়েছিলেন, সেটা ছিল তাঁর উল্লেখযোগ্য ‘‌কীর্তি’‌গুলির মধ্যে অন্যতম)‌ সদ্য স্বাধীন হওয়া আর্জেন্টিনাকে সর্বপ্রথম ১ মিলিয়ন পাউন্ড ঋণ দিয়েছিল। প্রথমে ব্রিটিশরা জোর করে আর্জেন্টিনায় সেনাবাহিনী নামিয়ে দেশটিকে উপনিবেশে পরিণত করার চেষ্টা করেছিল। তবে সেই চেষ্টা সফল হয়নি। এই ঘটনার ২০ বছরেরও কম সময়ের ব্যবধানে আর্জেন্টিনাকে ঋণ দেয় ব্রিটেন। এবং শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ বুঝেছিল যে আর্থিক হাতিয়ারই অনেক বেশি কার্যকর। আর্জেন্টিনা প্রথমবার ঋণশোধে ব্যর্থ হয় ১৮২৭ সালে। এরপর আরও ৮ বার এই ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ ঋণশোধে ব্যর্থতার ঘটনা ঘটেছে ২০২০ সালে (‌এখন দ্য ইকনমিস্ট পত্রিকা ঋণশোধে আর্জেন্টিনার দশমবার ব্যর্থতার কথা বলছে)‌।

বিংশ শতকে আর্জেন্টিনায় পালা করে ক্ষমতায় থেকেছে নির্বাচিত সরকার ও সামরিক একনায়কেরা। এর ফলে একবার উন্নয়নবাদী অর্থনীতি, আবার কখনও বা নয়া উদারবাদী অর্থনীতি — দুই বিপরীত পথে পালা করে হেঁটেছে এই দেশ।  নয়া উদারাবাদী পর্বে, আর্জেন্টিনা ছিল উদ্ভাবনের জায়গা— কী করে নতুন নতুন পথে একটা দেশকে লুঠ কর যায় সেসব এই দেশেই উদ্ভাবন করা হত। এসবের মধ্যে ছিল সেই ব্যবস্থা যাকে ইস্টেবান অ্যালমিরন বলেছিলেন ‘‌ফিনান্সিয়াল বাইসাইকেল’‌। এটা সম্ভব হয়েছিল মার্কিন ডলার ও পেসোর দাম বেঁধে দিয়ে :

‘‌যখন বিলিওনিয়ার ফাটকাবাজদের আর্জেন্টিনার পেসোর বিনিময়ে যত খুশি ডলার সংগ্রহের অনুমতি দেওয়া হল, তখন পেসোয় [চড়া সুদের কারণে] বিলিওনিয়ারদের লাভই হল, (অর্থাৎ পেসোর বিনিময়ে তারা অনেক বেশি ডলার সংগ্রহ করতে পারল)। অথচ রাষ্ট্রই ওই ডলার ধার করে নিয়ে এসেছিল [মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র] এর…বেসরকারি ব্যাঙ্ক থেকে কিবা আইএমএফের কাছ থেকে এবং সেই ধার করা ডলারের সুদও গুনল রাষ্ট্র। একবার পেসো বিনিময় করা হয়ে গেলে ফাটকাবাজদের হাতে যে ডলার এল তা দেশের বাইরে পাচার করে দেওয়া হল। অথচ ধারের বোঝাটা রয়ে গেল রাষ্ট্রের ঘাড়ে।’‌

২০০১ সালে আর্জেন্টিনা ঋণ শোধ করতে পারল না, ফলে পেসোর দাম কমে গেল। এর পর ২০০৫ সালে আর্জেন্টিনা আইএমএফের ৯.৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণ পুরোপুরি শোধ করে দেয় । এতে পরবর্তী বছরগুলিতে সুদ খাতে দেশের সাশ্রয় হল ৮৪২ মিলিয়ন ডলার।  এরপর ২০১০ সালের মধ্যে বাকী জাতীয় ঋণের ৯২ শতাংশের পুনর্বিন্যাসের বিষয়ে আলোচনা সেরে ফেলল আর্জেন্টিনা।

আর্জেন্টিনার ঋণের ইতিহাস নিয়ে লিখেছেন অ্যালমিরন। এরপর কী ঘটেছিল সেটা তিনি জানিয়েছেন: সেটা হল আর্জেন্টিনা ও আমেরিকার ভালচার ফান্ডগুলির কাহিনি। আর্জেন্টিনার জাতীয় ঋণের বাকি ৮ শতাংশ নিয়ে যা ঘটল তা থেকে স্পষ্ট হয় কারচুপি করে চাপিয়ে দেওয়া আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর আসল চেহারা‌টা, যা দক্ষিণ গোলার্ধের অর্থনীতিগুলিকে লুঠের কাজে আমেরিকাকে সাহায্য করে। মার্কিন বিলিওনিয়ার পল সিঙ্গারস ও অন্যরা যে সব ভালচার ফান্ড চালায়, আর্জেন্টিনাকে এই ৮ শতাংশ ঋণ দিয়েছিল তারাই। এই সব ভালচার ফান্ডের দল তখন মার্কিন আদালতের দ্বারস্থ হল। এরপর কী ঘটবে তা জানাই ছিল। ২০১২ সালে এই সব ফান্ডের মালিকেরা আদালতের কাছ থেকে যা চেয়েছিল ঠিক সেটাই পেল— এক মার্কিন বিচারপতি আদেশ দিলেন আর্জেন্টনাকে ফান্ডগুলির ঋণ পুরোমাত্রায় শোধ করে দিতে হবে।

তখন দেশের প্রেসিডেন্ট ছিলেন ক্রিস্টনা ফার্নান্ডেজ ডি কির্চনার। তিনি ওই ঋণ মেটাতে অস্বীকার করলেন। কিন্তু পরবর্তী নির্বাচনে দেশে ক্ষমতায় এলেন মরিশিও ম্যাকরি। তাঁর ক্ষমতায় বসার আগে আর্জেন্টিনার জিডিপিতে ঋণের অনুপাত ছিল ৫২.৬ শতাংশ। ম্যাকরির আমলে সেটা বেড়ে হল ৯০.২ শতাংশ। তাঁর আমলে দেশে দারিদ্রের হারও ৩০ শতাংশ থেকে বেড়ে হল ৪০ শতাংশ (‌৪০ লক্ষ মানুষ নতুন করে দারিদ্রে তলিয়ে গেলেন)‌। ২০১৯ সালে যখন তিনি ক্ষমতা থেকে সরলেন, আর্জেন্টিনা থেকে তখন ৭৯.৮ বিলিয়ন ডলার পুঁজি দেশ ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছে, —এবং আর্জেন্টিনা আবারও ঋণ শোধ করতে ব্যর্থ। অ্যালমিরন লিখছেন যে, ‘‌ম্যাকরি ও তার দলবল আর্জেন্টিনার আপেক্ষিক ভাবে স্বাস্থ্যকর আর্থিক ব্যবস্থাকে তছনছ করে দিয়েছিল মাত্র ২ বছরেরও কম সময়ে।’‌ ফিনান্সিয়াল বাইসাইকেলকে ফিরিয়ে আনলেন ম্যাকরি:

‘‌ওদের চালাকিটা ছিল এরকম, আগে পেসো কেনো, এরপর পেসোর ওপরে যে [চড়া হারের] ... সুদ রয়েছে তা থেকে মুনাফা করো, এরপর সব পেসোকে ডলারে বদলে ফেলো এবং সেই ডলার দেশের বাইরে নিয়ে চলে যাও। ইতিমধ্যে ফাটকাবাজদের জন্য রাষ্ট্রকে জোগাতে হয়েছে বিপুল পরিমাণ ডলার এবং তার জেরে সরকারের হাতে পেসো ছাড়া আর কিছুই নেই।’‌

যাওয়ার আগে ম্যাকরি আইএমএফের কাছ থেকে ৫৭ বিলিয়ন ডলার ঋণ নিলেন। পরে তা কমিয়ে করা হল ৪৪ বিলিয়ন ডলার। এবং সেই বিপুল পরিমাণ ডলার ‘‌মাত্র ১১ মাসের মধ্যে স্রেফ উবে গেল’‌।

ম্যাকরির পরে যিনি ক্ষমতায় এলেন সেই অ্যালবার্টো ফার্নান্ডেজ চেষ্টা করলেন কোভিড অতিমারির সময়ে ধ্বংস হয়ে যাওয়া স্বাস্থ্যমন্ত্রক পুনর্নির্মাণের জন্য। কিন্তু ম্যাকরির নেওয়া ৪৪ বিলিয়ন ডলার ঋণের বোঝায় তিনি আটকে গেলেন। প্রায় মরিয়া হয়ে উন্নয়নবাদী অর্থনীতির মতাদর্শে চালিত অ্যালবার্টো চীনের দিকে ঝুঁকলেন। ২০২২ সালে তিনি যোগ দিলেন বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে এবং এখন দেখা যাচ্ছে আর্জেন্টিনার  ব্রিকস–এ যোগ দেওয়ার জন্য যে আবেদন তিনি করেছিলেন তা সফল হয়েছে। আর্জেন্টিনা ব্রিকস–এ যোগ দেবে ২০২৪ সালে। যাই হোক। চীন (‌এবং কাতার)‌এর সঙ্গে সহযোগিতার ফলে এখনও পর্যন্ত আর্জেন্টিনা চীনের কাছ থেকে অতিরিক্ত ঋণও পেয়েছে আইএমএফ–এর ঋণ মিটিয়ে দেওয়ার জন্য। দক্ষিণ গোলার্ধের দেশগুলির সঙ্গে পরিকাঠামোয় বিনিয়োগ এবং প্রাকৃতিক সম্পদের বাণিজ্য সংক্রান্ত চুক্তিগুলি সম্পাদনের ক্ষেত্রে চীন যেমন চেয়ে থাকে, আর্জেন্টিনাকে এই অতিরিক্ত ঋণ দেওয়াটা, ঠিক সেরকম  ‘‌তুমি জিতলে আমিও জিতলাম’‌ ধরনের বোঝাপড়ার মধ্যে পড়ে না।

যদি মিলেই ফের নির্বাচনে জেতেন, এটাই প্রত্যাশিত যে তিনি ব্রিকসের সদস্য হওয়ার আবদেন প্রত্যাহার করে নেবেন। যদি তিনি আর্জেন্টিনাকে ব্রিকস–এ রেখে দেন তাহলে তিনি তাঁর নিজের (‌এবং তাঁর কুকুরগুলির)‌ আর্থিক বিষয় সংক্রান্ত প্রতিভাকে কাজে লাগাবেন যাতে আমেরিকা আরও ভালভাবে আর্জেন্টিনাকে কাজে লাগাতে পারে, এবং তা শুধুমাত্র আর্জেন্টিনাকেই নিঃস্ব করার জন্য নয়, এমনকী চীন সহ (‌সম্ভবত অন্যান্য জরুরিকালীন ঋণদাতাদের) ভাঁড়ারও খালি করার জন্য। 

যতবার আর্জেন্টিনা নতুন করে ঋণের সাগরে ডুববে, ততবারই এই দেশের দক্ষিণপন্থীরা এই রাষ্ট্রটিকে ঋণফাঁদের আরও অতলে ডুবিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবে যাতে আর কখনও দেশটা ভেসে উঠতে না পারে। পোষা কুকুরদের সঙ্গে কানে কানে কথা বলা (ডগ হুইশপারার) মিলেই যখন প্রেসিডেন্টের দপ্তরে পৌঁছবেন, তিনি আগাম কথা দিয়ে রেখেছেন যে, তখন ম্যাকরি যতটা ধ্বংসের রেকর্ড গড়েছেন তিনি তাকেও ছাপিয়ে যাবেন।



সূত্র: পিপলস ডেসপ্যাচ, ১ অক্টোবর, ২০২৩

ভাষান্তরঃ সুচিক্কণ দাস

 


প্রকাশের তারিখ: ২০-অক্টোবর-২০২৩

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org