|
পশ্চিমী আধিপত্যের জোয়াল ভেঙে ডলার সাম্রাজ্যের বাইরে আসার বিপজ্জনক পথ (দ্বিতীয় পর্ব)জাস্টিন পোদুর |
পরিস্থিতি এত শোচনীয় হল কী করে? পাকিস্তানের আর্থিক পরিস্থিতি, সে-দেশের মার্কিন ঋণের বোঝা সহ, বাঁধা রয়েছে দু-দেশের গোপন সম্পর্কের জালে। তাছাড়া দুই দেশই যেভাবে ১৯৭০ সাল থেকে আফগানিস্তানের ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করে আসছে, তার সঙ্গেও |
আমেরিকা ও চীন – দুজনেরই বন্ধু পাকিস্তানের যন্ত্রণাদীর্ণ, কঠিন পথ আর্জেন্টিনার মতো পাকিস্তানও সাম্রাজ্যের ঋণ শাসনে নিয়ন্ত্রিত ছিল— প্রথমে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের এবং পরে মার্কিন সাম্রাজ্যের— এবং তা চলছে কয়েক শতাব্দী ধরে। এখন যেটা পাকিস্তান আগে তা ছিল ব্রিটিশ ভারতের একগুচ্ছ সমৃদ্ধ প্রদেশ। ব্রিটেনের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রতিটি রাজ্যকে তাদের বুটের তলায় নিয়ে আসার পরে তাদের ঘাড়ে বিপুল ঋণের বোঝা চাপিয়ে দিয়েছিল। এই ঋণভার চাপিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থাই ছিল প্রধান উপায় (আরও অনেক পদ্ধতি ছিল) যার মাধ্যমে এই মহাদেশ থেকে ব্রিটেন ৪৫ ট্রিলিয়ন ডলার লুঠ করে নিয়ে গেছে। এরপর হস্তান্তরের আগে ব্রিটেন এই উপমহাদেশকে ভারত ও পাকিস্তানে দ্বিধাবিভক্ত করে ফেলে। আজকের দিনে ব্রিকস-এ ভারত একটা অস্পষ্ট ভূমিকা পালন করছে। আর পাকিস্তানের অভ্যুত্থান–পরবর্তী সরকার গোটা দেশকে নিয়ন্ত্রণে আনতে কঠোর হিংসার নীতি কাজে লাগাচ্ছে। আর্জেন্টিনার মতোই পাকিস্তান এমন একটা দেশ যেখানে ব্রিকস এবং আইএমএফ দুই সংস্থারই খুব গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক উপস্থিতি রয়েছে। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার প্রায় এক বছর পর, এপ্রিল মাসে ইউএস ইনস্টিটিউট অফ পিস জানায় যে পাকিস্তান এমন একটা অর্থনৈতিক সঙ্কটের মুখোমুখি যাতে দেশটার ‘অস্তিত্বই’ বিপন্ন হতে চলেছে। ইউএসআইপি নামক ওই সংস্থাটি পাকিস্তানের ঋণকে তিন ভাগে ভাগ করেছে (বহুপাক্ষিক, বেসরকারি সূত্র ও চীন থেকে নেওয়া ঋণ)। এরপরেই তারা দেখিয়েছে কার কাছে এই দেশের কত ঋণ: ‘ডিসেম্বর ২০২২ পর্যন্ত, পাকিস্তানের বৈদেশিক ঋণ এবং অন্যান্য দায়–এর মোট পরিমাণ ১২৬.৩ বিলিয়ন ডলার। এই ঋণের প্রায় ৭৭ শতাংশ, যার পরিমাণ প্রায় ৯৭.৫ বিলিয়ন ডলার, সরাসরি পাক সরকার ধার নিয়েছে বিভিন্ন ঋণদাতার কাছ থেকে। অতিরিক্ত ৭.৯ বিলিয়ন ডলার ঋণ নিয়েছে সরকার নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্রায়ত্ত উদ্যোগগুলি। তারা ধার নিয়েছে বহুপাক্ষিক ঋণদাতাদের কাছ থেকে।’ পাকিস্তানের বহুপাক্ষিক ঋণের পরিমাণ ৪৫ বিলিয়ন ডলার। এই অর্থকে ভাগ করলে যেটা দাঁড়ায় তা হল, বিশ্ব ব্যাঙ্ক (১৮ বিলিয়ন ডলার), এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাঙ্ক (১৫ বিলিয়ন ডলার), এবং আইএমএফ (৭.৬ বিলিয়ন ডলার)। এছাড়াও অল্প কিছু ঋণ রয়েছে ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাঙ্ক এবং এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাঙ্কের কাছে। আরও ৮.৫ বিলিয়ন ডলার ঋণ রয়েছে জাপান, জার্মানি, ফ্রান্স ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড়ো বড়ো দেশের কাছে। পাকিস্তানের বেসরকারি ঋণের সূত্রগুলির মধ্যে একেবারে শীর্ষে রয়েছে ইউরোবন্ডস ও গ্লোবাল সুকুক বন্ড। এই সংস্থাগুলির কাছে ঋণের পরিমাণ ৭.৮ বিলিয়ন ডলার। এছাড়া রয়েছে বিদেশি বাণিজ্যিক ঋণ প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলারের। চলতি অর্থবর্ষের শেষে এই ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়াবে প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলার।একেবারে শেষে ইউএসআইপি ‘চীনা ঋণ’কে রেখেছে ভিন্ন বর্গে। এই ঋণের পরিমাণ ২৭ বিলিয়ন ডলার: ‘এর মধ্যে পড়ে ১০ বিলিয়ন ডলার দ্বিপাক্ষিক ঋণ এবং ৬.২ বিলিয়ন ডলারের ঋণ যা চীনের সরকার দিয়েছে পাকিস্তানের রাষ্ট্রায়ত্ত উদ্যোগগুলিকে। এছাড়া রয়েছে চীনের বাণিজ্যিক ঋণ যার পরিমাণ প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলার। এছাড়াও, চীনের স্টেট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অফ ফরেন এক্সচেঞ্জ (এসএএফই) পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কে জমা রেখেছে ৪ বিলিয়ন ডলারের বিদেশি ডিপোজিট।’ ২০২২ সালে পাকিস্তানের জিডিপি ছিল ৩৭৬ বিলিয়ন ডলার এবং ঋণের পরিমাণ ছিল ১২৬ বিলিয়ন ডলার। তার মানে পাকিস্তানের ঋণ ও জিডিপির অনুপাত ৩৪ শতাংশ, যা এমনকী ম্যাকরির সর্বনেশে কাণ্ডকারখানার আগের আর্জেন্টিনার তুলনায় অনেক বেশি অনুকূল। তবুও, পাকিস্তানের পশ্চিমী ঋণদাতারা এটাকে একেবারে অসম্ভব পরিস্থিতি হিসাবে দেখানোর চেষ্টা করছে এবং মুদ্রাস্ফীতি সাধারণ মানুষের দুঃখ–দুর্দশা বাড়িয়েই চলেছে। পাকিস্তানের ২০২২–২৩ এর সরকারি বাজেটে দেখানো হয়েছে যে, রাজস্ব বাবদ সম্ভাব্য আয় হবে ২৪ বিলিয়ন ডলার এবং সম্ভাব্য খরচ হবে ৩৩ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে ঋণ পরিশোধ বাবদ খরচ, যা এখানে ধরা হয়নি। তবে দেখে মনে হচ্ছে পরিশোধযোগ্য ঋণের পরিমাণ দাঁড়াবে সরকরের সম্ভাব্য আয়ের চেয়েও বেশি, প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার। ঐতিহাসিক নজিরের কথা ধরলে চীনের থেকে নেওয়া ঋণ পরিশোধের সময়সূচি বদলানো যাবে— তবে এই ঋণ পাকিস্তানের মোট ঋণের মাত্র ৩০ শতাংশ। কিন্তু বাকি ঋণ পরিশোধের কী হবে? গত কয়েক দশক ধরে আর্জেন্টিনার উন্নয়নবাদী সরকারগুলি অর্থনীতির বিকাশকে কর সংগ্রহ বাড়ানো এবং রপ্তানির ভিত্তিকে আরও সম্প্রসারিত করার কাজে ব্যবহার করার চেষ্টা করেছিল, যাতে তারা ক্ষমতায় থাকার সময় ঋণের পরিমাণ কমে আসে। কিন্তু পাকিস্তানের অর্থনৈতিক বৃদ্ধি সংক্রান্ত আগাম ভবিষ্যৎবাণী মোটেই ভালো বলার কিছুর মতো নয়। একইভাবে, দীর্ঘকালীন বিচারে বিষয়টি কেমন দাঁড়াবে তা জাওয়াদ সইদ ও ইয়ুং–সিয়াং ইং তাঁদের ২০২০ সালে লেখা বই, চায়নাজ বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ ইন আ গ্লোবাল কনটেক্সট ভল্যুম ২ : দ্য চায়না পাকিস্তান ইকনমিক করিডোর অ্যান্ড ইটস ইমপ্লিকেশনস ফর বিজনেস– এ লিখেছেন, সিপিইসি পাকিস্তানের ভ্যালু চেন ও পরিকাঠামো— দুটোকেই উন্নত করার দিকে নজর দেয় এবং বিষয়টিকে দুদেশেরই অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি প্রক্রিয়া হিসাবেই দেখে। কিন্তু স্বল্পকালীন বিচারে বিষয়টা কী দাঁড়াবে? পাকিস্তান এ বিষয়ে সৃজনশীল হতে চেষ্টা করেছে: প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান তখন সবে জ্বালানি ও গম সরবরাহের ব্যাপারে রাশিয়ার সঙ্গে একটা চুক্তি করেছেন— নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের ঝুড়িতে এ-দুটো জিনিসই সবচেয়ে জরুরি এবং এ-দুটো পণ্যেই মুদ্রাস্ফীতি সবচেয়ে বেশি— তবে এই চুক্তি করার পরপরই তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। অভ্যুত্থান–পরবর্তী পাক সরকার এই চুক্তি এড়িয়ে যায়। কারণ তাদের আশঙ্কা ছিল, ডলারের বিনিময়ে ব্যবসার বৃত্তের বাইরে থাকা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জারি করা নিষেধজ্ঞার শিকার কোনও দেশের সঙ্গে বাণিজ্য করলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গোলমাল পাকাতে পারে এবং সেই ভয়েই তারা ইমরানের করা চুক্তি এড়িয়ে যায়। তখন পাকিস্তান চীনের প্রাক–নিক্সন–পরিদর্শন বই থেকে একটি পৃষ্ঠা খুলে নিয়ে কাজে লাগায়, এবং বিনিময় প্রথায় চলে যায়। তবে পশ্চিমী ঋণদাতারা এখনও সেদেশে রয়েছে এবং তারা সবকিছুর দাম ডলারে মেটানোর দাবি করছে। পাকিস্তানের ক্রেডিট রেটিং নামিয়েই হোক অথবা মার্কিন ফিনান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্ক ফোর্সের (এফএটিএফ) মাধ্যমে সন্ত্রাসবাদের আর্থিক মদতদাতা হিসাবে ঘোষণা করার মাধ্যমে পাকিস্তানের ওপর নজরদারি চালিয়ে এবং তাদের শাস্তি দেওয়ার মাধ্যমেই হোক, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানকে ঋণ সংক্রান্ত মার্কিন নীতিই মেনে চলতে বাধ্য করতে পারে। পাকিস্তানকে বাধ্য করার জন্য এ-ধরনের আরও অনেক হাতিয়ার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে। পরিস্থিতি এত শোচনীয় হল কী করে? পাকিস্তানের আর্থিক পরিস্থিতি, সে-দেশের মার্কিন ঋণের বোঝা সহ, বাঁধা রয়েছে দু-দেশের গোপন সম্পর্কের জালে। তাছাড়া দুই দেশই যেভাবে ১৯৭০ সাল থেকে আফগানিস্তানের ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করে আসছে, তার সঙ্গেও পাকিস্তানের আর্থিক পরিস্থিতির যোগ রয়েছে। এটা ঠিকই যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাকিস্তান পাঠায় সুতো ও সুতিবস্ত্র, বিনিময়ে ইস্পাত ও মেশিনপত্র ইত্যাদি পাকিস্তানে পাঠায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু দু-দেশের সম্পর্কের একেবারে মূলে রয়েছে সামরিক বিষয়। আফগানিস্তানের মানুষজন সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ সহ্য করেছেন এবং লেখক নিকোলাস জে এস ডেভিডের হিসাব হল, আফগানিস্তানে মৃত্যু হয়েছে ৮,৭৫,০০০ জনের। তবে দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে পাকিস্তানকেও। আফগানিস্তানে পাকিস্তানের হস্তক্ষেপ এবং গ্রামীণ পাকিস্তানে মার্কিন বাহিনীর অভিযানের ফলে আমেরিকার এই মিত্র দেশের খরচ হয়েছে ১৫০ বিলিয়ন ডলার এবং মৃত্যু হয়েছে ৭০,০০০ পাকিস্তানির। ২০২১ সালে এই তথ্য দিয়েছেন আমেরিকাস্থিত পাক রাষ্ট্রদূত। তবে ডেভিসের মতে, পাকিস্তানের মৃতের সংখ্যা হবে ৩,২৫,০০০। আফগানিস্তান দখলে রাখতে আমেরিকা যত টাকা খরচ করেছে তার পরিমাণ বিপুল এবং সম্ভবত খরচের কোনও হিসাব নেই। সরকারি হিসাবে দেখা যাচ্ছে শুধুমাত্র সামরিক কনট্র্যাক্টের পিছনেই খরচ হয়েছে ১০০ বিলিয়ন ডলার। কলামনিস্ট খাজা আকবর মন্তব্য করেছেন যে, যদি সামরিক সহায়তা খাতে কত ডলার পাকিস্তান আফগানিস্তানের হাতে পৌঁছে দিয়েছে তার হিসাব কষা যায়, তাহলে দেখা যাবে সেটা হবে আফগানিস্তানের পিছনে আমেরিকা মোট যত খরচ করেছে তার ভগ্নাংশ মাত্র: ‘যে সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে ১ ট্রিলিয়ন ডলার খরচ করেছে, সেই একই সময়পর্বে পাকিস্তানকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দিয়েছে ৩০ বিলিয়ন ডলার। সেই টাকার প্রভাবকেও অস্বীকার করতে পারেনি আমেরিকা।’ যখন ইমরান খান আফগানিস্তানে মার্কিন প্রয়াসের পিছন থেকে সমর্থন তুলে নিলেন, তখন আফগানিস্তান দখলে রাখার দিন শেষ হয়ে এল। ২০০১–২০২১ সাল পর্যন্ত আফগান যুদ্ধের জন্য যত সামরিক সরঞ্জাম পাঠিয়েছিল আমেরিকা, তার সবটাই গিয়েছিল পাকিস্তানের মধ্যে দিয়ে। তালিবানরা আফগানিস্তান দখলের কিছুদিন পরেই দ্য নিই ইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ‘আফগানিস্তানে মার্কিন সেনাবাহিনী ঢোকার এবং তাদের প্রয়োজনীয় সামরিক সরঞ্জাম পৌঁছে দেওয়ার মূল প্রবেশপথই ছিল পাকিস্তানের বন্দর ও বিমানক্ষেত্রগুলি।’ মার্কিন দখলদারির জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম মজুদ ও সরবরাহ করার (লজিস্টিকস) বিষয়টি ছিল খুবই স্পর্শকাতর ব্যাপার এবং এই ইস্যুতে অসংখ্যবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র–পাকিস্তানের সম্পর্ক ভেঙেছে। ২০০৮ সালে তাঁর ‘দ্য ডুয়েল’ বইটিতে তারিক আলি এরকম একটা মুহূর্তের কথা লিখেছেন: ‘দেশটা খাদ্য ও জ্বালানি সঙ্কটের কবলে পড়ে ভুগছে। মুদ্রাস্ফীতি ১৫ শতাংশ ছুঁতে চলেছে ...গ্যাসের দাম (বহু বাড়িতেই গ্যাসে রান্না হয়) বেড়েছে ৩০ শতাংশ ...গমের দাম বেড়েছে ২০ শতাংশ-এর বেশি ...এসবই চলছে ২০০৭ সাল থেকে। সারা পৃথিবীতেই খাদ্য এবং অন্যান্য পণ্যের দাম বাড়ছে। কিন্তু পাকিস্তানে আরও বাড়তি সমস্যা রয়েছে। ন্যাটোর বাহিনীকে খাওয়াতে অনেকে বেশি পরিমাণে গম আফগানিস্তানে পাচার হয়ে যাচ্ছিল। সাম্প্রতিক সমীক্ষা অনুসারে ৮৬ শতাংশ পাকিস্তানির পক্ষে স্রেফ ময়দা জোগাড় করাটাও ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে, এর জন্য নতুন সরকারকেই দুষছেন পাকিস্তানিরা। [প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট আসিফ আলি] জারদারির সমর্থনের হার ১৩ শতাংশে নেমে এসেছে।’ আফিমের প্রসঙ্গ না-টেনে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের পাচার অর্থনীতি নিয়ে কোনও আলোচনা করা সম্ভব নয়। আক্ষরিক অর্থে আফিম অর্থনীতির সমৃদ্ধির কোনও হিসাব ছিল না। কার্যত এটা ছিল কোটি কোটি ডলারের বেহিসেবী ব্যবসা, হতে পারে তা ২ বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা, কিংবা হতে পারে আরও বেশি। হিসাব পাওয়া যাচ্ছে না কারণ আমেরিকা ও পাকিস্তানভিত্তিক গোপন সংগঠনগুলি, অপরাধীদের সংগঠনগুলি এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান সমূহ— এগুলোকে লাটে তুলে দিয়েছে তালিবানরা। তালিবানরা ক্ষমতায় আসার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানের সঞ্চিত ৭ বিলিয়ন ডলার চুরি করেছে। তাতে পাকিস্তানেরও ক্ষতি হয়েছে কারণ আফগানিস্তান ছিল পাকিস্তানের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার। আফগান যুদ্ধের দশকগুলিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তান একে অপরের সম্পর্কে বিশদ তথ্য সম্বলিত নথি তৈরি করেছিল। তার মধ্যে সম্পূর্ণ গোপন এমন সব তথ্য জড়ো করা হয়েছিল যা দরকারে পরস্পরকে নিয়ন্ত্রণ করার কাজে লাগানো যায়। এবং গোপন তথ্য সংগ্রহ এতটাই করা হয়েছিল যে ২০০১ সালে আফগানিস্তান দখলের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে এটা নিশ্চিত করতে হয়েছিল যাতে পাকিস্তান সে-দেশে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজকর্মগুলির বরাত পায়। এই সব কাজগুলিকে পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নাম দিয়েছিল ‘এয়ারলিফট অফ ইভিল’। গোটা বিষয়টাকে আমরা এভাবে সারসক্ষেপ করতে পারি: আমেরিকার আফগান যুদ্ধের গোটা পর্ব জুড়ে পাকিস্তান গোপনে বিপুল অর্থ খরচ করেছিল, সে-দেশে বহু লোকের মৃত্যু হয়েছিল, এবং সে-দেশে একটা অবৈধ, সমান্তরাল অর্থনীতি চালু ছিল। এসবের জেরে পাকিস্তানের মূল অর্থনীতির ক্ষতি হয়েছিল। আফগানিস্তানে তালিবানদের ক্ষমতায় আসা এবং ইমরান খানের ক্ষমতাচ্যুতির পর, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ফের পাকিস্তানের সঙ্গে গোপন সম্পর্কের জাল গড়ে তুলবে— তবে এবার আফগানিস্তানের বিষয়ে নয়, এবার ইউক্রেনের বিষয়ে। ইন্টারশেপ্ট সংস্থার খবর অনুযায়ী, অভ্যুত্থান–পরবর্তী পর্বে আইএমএফের সঙ্গে পাকিস্তানের আলোচনা একেবারে বিনা ঝঞ্ঝাটে সম্পন্ন হয়েছে কারণ ওই আলোচনায় একটা গোপন চুক্তি হয়েছে এবং তা হল পাকিস্তান আমেরিকার জন্য অস্ত্র উৎপাদন করবে আর সেই অস্ত্র আমেরিকা পাঠাবে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে ব্যবহার করার জন্য। একথা আর বলার দরকার হয় না যে, যদি ইমরান খানের স্বাক্ষরিত রাশিয়ার সঙ্গে পাকিস্তানের গম ও জ্বালানি চুক্তি দাঁড়িয়ে যেত, তাহলে যুদ্ধে ইউক্রেনের ব্যবহারের জন্য অস্ত্রশস্ত্র সম্ভবত পাঠাত না পাকিস্তান।
প্রকাশের তারিখ: ২১-অক্টোবর-২০২৩ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |